মঙ্গলবার, ২০-অক্টোবর ২০২০, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন
  • মন্তব্য প্রতিবেদন
  • »
  • রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকলসমূহ কতিপয় ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে মহা পরিকল্পনায় ব্যস্ত সরকার

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকলসমূহ কতিপয় ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে মহা পরিকল্পনায় ব্যস্ত সরকার

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট, ২০২০ ০৮:৩৪ অপরাহ্ন

আবু হাসান টিপু: মরণঘাতি করোনার ভয়াবহ সংক্রামণে স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা-লুটপাট আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ যখন লন্ডভন্ড, ক্ষুধা আর দারিদ্রতা যখন সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে ঠিক সেই সময় সরকার দেশের অবশিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসমূহ বন্ধের ঘোষণা দিলেন। এর পূর্বে ’৯০ এর দশকে তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকার বিশ^ব্যাংকের প্রেসকিপশনে রাষ্টায়ত্ত পাটকল বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপি-জামাত জোটের সরকারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মতিউর রহমান নিজামীর হাত ধরে আন্তর্জাতিক পাটের বাজারে নেতৃত্ব দানকারী বাংলাদেশের পাট ও রাষ্টায়ত্ত পাটকলগুলোকে বন্ধ করে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার নীলনক্সা তৈরী করে বিশ^ব্যাংক। 
৯০ দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাটখাতে দুটি সমীক্ষা চালিয়েছিলো। একটি হলো The Jute Manufacturing Study, আরেকটি হলো Bangladesh Restructuring Options for the Jute Manufacturing Industry. এইসব সমীক্ষার ধারাবাহিকতায় ২৪৭ কোটি ইউএস ডলার ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৯৯৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জামায়াত সমর্থিত বিএনপি সরকারের সাথে বিশ্বব্যাংকের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি Jute Sector Adjustment Credit এর আওতায় ছিলো। তবে উল্লেখিত ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন বা পাটশিল্পের বিকাশের জন্য ছিলো না। ঐ ডলার দেওয়ার শর্ত ছিলো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটখাত সংকুচিত করে আনা, পাটকলগুলো থেকে শ্রমিক কমানো, বেসরকারিকরণ বাড়ানো, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি না করা ইত্যাদি। 
জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও লক্ষ্যের সাথে বেইমানী করে বিশ্বব্যাংকের উক্ত প্রেসক্রিপশন ও ভারতকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে তৎকালীন সরকার লোকসানের মিথ্যা অজুহাতে গোল্ডেন হ্যান্ডসেক-এর নামে শ্রমিকদের পথে বসিয়ে দিয়ে পর্যায়ক্রমে ১১টি রাষ্টায়ত্ত্ব পাটকল বন্ধ করে দেয়। আর বর্তমান মহাজোট সরকারের নেতৃত্বে পাটমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর গাজী মুক্তিযুদ্ধের নাম করে অবশিষ্ট ২৫টি পাটকল ধ্বংস করার ঘোষণা দিলেন। সরকার বিএনপি’র না আওয়ামী লীগের; মন্ত্রী রাজাকার না মুক্তিযোদ্ধা সেটা বড় কথা নয় বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও লুটপাটে রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা সবাই একাকার। এদের কারো হাতেই দেশ-জাতি, দেশের মানুষ আর জাতীয় সম্পদ কোনটাই নিরাপদ নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী গত ৪৯ বছর ধরে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী এই সত্যেরই প্রমাণ দিচ্ছেন বার বার।
বিশ্বব্যাংকের দেয়া শর্ত মানতে গিয়ে বিএনপি-জামাত সরকার যেভাবে একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকল বন্ধ করে দিয়েছিলো, মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত চ্যাম্পিয়ন দাবিদার বর্তমান সরকারও সেই বিএনপি-জামাত জোট সরকারের পদাংক অনুসরণ করে তাদের থেকে আরও একধাপ এগিয়ে অবশিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করার কেবল ঘোষণাই দিলেন না বরং ভিন্ন কায়দায় বেসরকারিকরণের চেষ্টাও করছেন। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ মালিকানায় মিল চালানোর পিপিপি (Public Private Partnership- PPP) বাস্তবায়নে তারা এখন মরিয়া। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয়করণকৃত পাটকল, যেগুলো পরে ব্যক্তি মালিকানা বা বিরাষ্ট্রীকরণ হয়েছে, সেগুলোর অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। খুলনাতে আফিল, সোনালী, মহসীন, অ্যাজাক্স জুটমিল এবং দাদা ম্যাচ কারখানা বহু বছর ধরে বন্ধ। শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন ভাতার কোটি কোটি টাকা এখনও পাওনা রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) ওয়েবসাইটের তথ্যই বলছে, ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্ব ব্যাংকের পাটখাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মোট ১১টি মিল বন্ধ/বিক্রয়/একীভূত করার ফলে এবং বিশেষ করে ২০০২ সালে আদমজী জুট মিলস বন্ধ হওয়ার পর বিজেএমসি চরম আর্থিক দূরাবস্থার সম্মুখীন হয়। ২০০৫-২০০৮ সালের দিকে খুলনা অঞ্চলের শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত খালিশপুর এলাকা মৃত নগরীতে পরিণত হয়েছে। এমনকি বিজেএমসির পাটকলগুলোতে ৩০-৪০ সপ্তাহের মজুরী এবং ৬-৭ মাসের বেতন বকেয়া পড়ে রয়েছে।

অনিবার্য কারণেই উক্ত বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে গত বছরে প্রথমে ৯ দফা এবং এরপরে আরো দুই দফা যুক্ত করে ১১ দফা দাবিতে আন্দোলনে নামেন পাটকল শ্রমিকরা। শ্রমিকদের দাবির মধ্যে ছিল, পাটকলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারীত্বের সিদ্ধান্ত বাতিল, কাঁচা পাট কিনতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫-এর সুপারিশ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ গ্র্যাচুইটি ও মৃত শ্রমিকের বীমার বকেয়া টাকা প্রদান, টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ ইত্যাদি। এসব দাবিতে সবশেষ তারা আমরণ কর্মসূচি শুরু করেন, যাতে অন্তত দুজন শ্রমিকের মৃত্যুও হয়।

বর্তমান সরকারও রাষ্টায়ত্ত্ব পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়ার পেছনে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের মতোই অজুহাত দেখাচ্ছেন লোকসানের। এই লোকসানের সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা, তারা বলছেন বিশ্বব্যাংকের দেয়া সুচতুর প্রেসক্রিপশন, ক্ষমতাসীন লুটেরা শাসকশ্রেণির ভ্রান্ত নীতি, ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতা, সর্বোপরি পুরাতন যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন না করে এই শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাধীনতার পর থেকে পাটকলে লোকসান হওয়ার আরও যে কয়েকটি কারণ ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য; পাকিস্তান আমলে পাটশিল্পের জন্য যেসব সুবিধা ও ভর্তুকি ছিল, সেগুলো অব্যাহত না রাখা। যথাসময়ে পাট ক্রয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ না দেয়ায়, বিলম্বে দুই বা তিনগুণ বেশি দামে পাট ক্রয় করা। উৎপাদিত পণ্যে বৈচিত্র্য না আনা। 

প্রকৃত অর্থে বিজেএমসি ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আমলা সিন্ডিকেট খুব পরিকল্পিতভাবে পাটের সিজনে যখন কাঁচা পাটের দাম কম থাকে, তখন পাট কেনেন না। কারণ দেখায় সরকারের কাছ থেকে টাকা আসেনি। সকল কাঁচা পাট তাদের নিজস্ব পাইকার এবং স্টকিস্টরা কিনে গুদামজাত করার পর দ্বিগুণ দামে এরা কাঁচা পাট কেনেন। ফলে পাটের ক্রয়মূল্য বেশী হওয়ায় উৎপাদিত পণ্যের মূল্যও বেশী পড়ে। তাই বিশ^ বাজারে বাংলাদেশের ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকলের সাথেও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনা। আর এসবই হলো লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ। উল্লেখিত কারণগুলো চিহ্নিত হলেও সমাধানে উদ্যোগী না হওয়ায় দিন দিন লোকসানের পাল্লা ভারী হয়েছে। সুতরাং কারখানাগুলোর লোকসানের দায় কোনোভাবেই শ্রমিকদের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। এর দায় ব্যবস্থাপক তথা বিজেএমসিকেই নিতে হবে।

স্বাধীনতা পরবর্তী গত ৪৯ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির রাজনীতি ও অর্থনীতির ছত্রছায়ায় দেশি-বিদেশি লুটেরা চক্র দায়ী হলেও কোনকালেই এই লুটেরা চক্রের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনরূপ ব্যবস্থা নেয়ার একটিও নজির নেই। বেসরকারি পাটকলগুলো লাভজনক হলেও কেন রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের টাকা লোকসান দিচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর সরকার ও বিজেএমসিকেই দিতে হবে।

তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলোতে গত ৪৮ বছরে লোকসান হয়েছে মাত্র ১০,৬৭৪ কোটি টাকা। অথচ এই একই সময়ে ব্যাংক ডাকাত-ঋণখেলাপিদের ৪৫ হাজার কোটি টাকা মাফ করে দিয়েছে সরকার। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গত ১০ বছরে উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ভর্তুকি দিয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। অথচ ৪৮ বছরে পাটকলে মাত্র ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে বলে সোরগোল তোলা হচ্ছে। সরকার দেশি-বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার অজুহাত হিসেবে লোকসানকে বড় করে দেখাচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক পরিবারের জীবিকা, পাটচাষীসহ কতো মানুষের জীবিকা এই পাটকলের ওপর চলে সেটা দেখা হচ্ছে না।  

আবার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকল তথা দেশের পাট শিল্প, পাটশ্রমিক ও চাষিদের রক্ষায় সরকারের টাকা নেই অথচ অস্ত্র কিনতে সরকারের টাকার অভাব হয় না। বাংলাদেশ চীন থেকে দু’টি সাবমেরিন কিনেছে ১৬৫০ কোটি টাকায়। এখন কক্সবাজারে ওই সাবমেরিন ঘাঁটি তৈরি করা হবে ১০২ কোটি টাকায়। সরকার ভারত থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার ও রাশিয়া থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কিনবে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আর তাই সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, পাটশিল্পের বিকাশে অনুকূল বিশ্ব পরিস্থিতিকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিয়ে সরকার কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে?

ইতোমধ্যেই সবুজায়নে জোর দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশে^র প্রায় ২৮টি দেশ পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে শুধু পাটের ব্যাগের চাহিদা বাড়বে কয়েক গুণ। প্রাকৃতিক আঁশ সমিতি বলেছে, ২০২০ সালের পর শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে দেড় হাজার কোটি পিস পাটের শপিং ব্যাগের চাহিদা সৃষ্টি হবে। এমনকি ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে শুধু পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বিলিয়ন পিস। এছাড়া শৌখিন দ্রব্যসামগ্রী ও আসবাবপত্র তৈরির কাঁচামাল উৎপাদনের সুযোগও বাড়ছে দিনদিন। সবকিছু মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের বিপুল সম্ভাবনা বিরাজ করছে। এখান থেকে মাত্র দশ শতাংশ বাজার ধরতে পারলেও বছরে বাংলাদেশের ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। তাছাড়া ২০১০ সালের ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং এ্যাক্ট-এ পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে দেশে পাটের ব্যবহার বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকলেও সরকার সেই এ্যাক্ট বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়নি। বরং জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে একদিকে দেশিয় পাটকল মালিকদের নির্মম শ্রম শোষণের পথ প্রসস্ত করছেন, অপরদিকে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী রাষ্ট্রের হাতে পাটের আন্তর্জাতিক বাজার ছেড়ে দেয়ার বিশ^ব্যাংকের প্রেসকিপশন বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। 

সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো মাত্র ১২শ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের আধুনিকায়ন করা সম্ভব হলেও সরকার তা না করে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে কারখানা বন্ধ করছেন। অথচ পাটশিল্প রক্ষার বিষয়টি কেবল পাট শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখাই নয়, এটা জাতীয় স্বার্থসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও লক্ষ্যের সাথেও যুক্ত। 
পাটকলগুলোতে গত জুন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৭২১ জন স্থায়ী শ্রমিক এবং ৩ হাজার ৭৩০ জন কর্মচারী ও কর্মকর্তা ছিলেন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত ২৩ হাজার ২৭৮ জন বদলি শ্রমিক এবং ৬ হাজার ৫৪৮ জন শ্রমিক দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করতেন। করোনা মহামারির এ ভয়ংকর সংকটকালে এই বিশাল অঙ্কের শ্রমিকের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সরকারের কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছেনা। অথচ রাষ্ট্র কর্তৃক খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পাওয়া জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। আর তাই অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের বিশাল সম্ভাবনার এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত কেবল আত্মঘাতিই নয়, অযৌক্তিক ও জাতীয় স্বার্থবিরোধীও বটে।

শুধু তাই নয়, শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করতে হলে ২ মাস পূর্বে নোটিশ দিতে হয়। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকলগুলো বন্ধে এ নিয়ম মানা হলো না। পাট মন্ত্রণালয় বন্ধ করলে এ নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা ছিল তাই চালাকি করে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। কারণ বাংলাদেশে একটি অলিখিত বিধান আছে; আর তা হলো আইনে যাই থাকুক না কেন প্রধানমন্ত্রী কোনো ঘোষণা দিলে সেটাই আইনে পরিণত হবে। রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধে ভোট ডাকাত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল। বিএনপি-জামাত জোট সরকার আদমজী পাটকলটি ৭ দিনের নোটিশে বন্ধ করেছিল এবারে কোনো সময় না দিয়ে বিনা নোটিশে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ২৫টি পাটকল বন্ধ করা হলো। আসলে আওয়ামী লীগ-বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তারা উভয়েই লুটেরা ধনিকদের স্বার্থ রক্ষাকারী দল।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে লোকসানে ফেলে কিছু লোক শত বা হাজার কোটি টাকা লুটে নেবে এটিও বাংলাদেশের অলিখিত নিয়ম। অবশ্য একটি লুটেরা ধনিকশ্রেণীর আমলাতান্ত্রিক পুজিঁবাদী রাষ্ট্রে এর ব্যাতিক্রম হওয়ার তেমন কোন সুযোগও নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকলের জায়গা-জমি-রাস্তা-গোডাউন-নদীরঘাট এবং যন্ত্রপাতির বাজারমূল্য প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। পিপিপির নামে রাষ্ট্রের এই বিশাল স¤পদ কতিপয় ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়ার মহা পরিকল্পনায় ব্যস্ত সরকার। স্বাধীনতার পর পাটের গুদামে আগুন দিয়ে একদল যেমন কোটি কোটি লুটে নিয়েছিল, আজ পাট শ্রমিকদের কপালে আগুন দিয়ে আর একদল লোক পাটকলগুলোর জায়গা-জমিসহ সব কিছুই লুটেপুটে খাবে। জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত চ্যাম্পিয়ান সরকার নিজ দলীয় লুটেরাদের পকেট ভারি করতে আজ সেই পথে হাটছেন। বাজার অর্থনীতির নামে এই লুটপাটের মহোৎসব আর কতো দিন দেখবে বাংলাদেশ?

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা জাতীয় সম্পদ রক্ষা ও বিকাশের কমিটমেন্ট, অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে সৃষ্টি হওয়া পাট ও পাটজাত পণ্যের অমিত সম্ভাবনা এবং সর্বোপরি দেশের পাটশিল্প, পাটশ্রমিক ও চাষিদের রক্ষায় যুক্তিসংগত হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ নয়, বেসরকারিকরণও নয়; বিশ্বব্যাংক ও ভারতকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের চাপ তোয়াক্কা না করে, সরকারী ভ্রান্তনীতি ও ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা কাটিয়ে তোলা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং পুরাতন যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করে রুগ্ন দশা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্পকে বের করে আনা। উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান, বহুমুখিতা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করাসহ পাটশিল্পের সম্প্রসারণ ঘটাতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করা। এসব না করে সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি ও লুটপাটের খেসারত পাট শ্রমিক, পাট চাষীসহ গোটা দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দেবার কোন অবকাশ নেই।  (লেখক: পলিট ব্যুরোর সদস্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটি। ফোন: ০১৬৮২-৮১৪৫৬৪)