শনিবার, ১৭-নভেম্বর ২০১৮, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

 “ওঁরা, ওরা এবং অন্যান্য... ”

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০৭:২৪ অপরাহ্ন

মুহাম্মদ হাসান মাহমুদ: নেতা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে গলার সর্বোচ্চ জোর ছেড়ে দিয়ে পাঁচ থেকে সাত জনের একটি দল নিয়ে ক্যামেরাম্যান ভাড়া করে মহাসড়ক অবরোধ করে বলতে শুরু করলেন- শিশুশ্রম চলবেনা, শিশুশ্রম বন্ধ কর। কেউ এত থেকে এত বছরের কোনো ছেলেকে বা মেয়েকে দিয়ে কোনো কাজ করাতে পারবেন না। কাজ করালে এই ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেই ব্যবস্থা নেয়া হবে । আমরা এত... বছর ধরে শিশুদের নিয়ে কাজ করে আসছি ....
অনেকে আবার বাহঃ বাহঃ দেন, প্রশংসার দরিয়ায় ভাসিয়ে দেন । তখন মনে পড়ে, আজ হয়ত শিশু বিষয়ক কোনো একটি দিবস। শহরের মোড়ে মোড়ে দু-চারজন করে এমন নানান সংগঠন এবং সংস্থার মিলনমেলা। গায়ে আবার ড্রেস, মাথায় ক্যাপ, বিশাল ব্যানার । খুব দরদ লাগে তাদের দেখলে এত ভালোবাসা আজও পৃথিবীতে আছে- ভাবতে গর্ব হয়। মনে ধাক্কা লাগে, আসলেই শিশুরা কেন পরিশ্রম করবে ? তারা কেন লেগুনা, বাসের হেলপার কন্ডাক্টর হবে? তারা কেন মাথায় ভারী বোঝা বহন করবে?ক্যা ন্টিনে সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করবে? হকারি করবে? এর- ওর গালি খাবে রাস্তাঘাটে? তাদের তো পড়াশুনা করার সময়, জ্ঞানার্জনের সময়, নিজেকে বিকশিত করার সময় । কিন্তু আবার দেখা যাচ্ছে, আমি নিজেই এই শিশুটিকে হুকুম দিচ্ছি- এটা কর, ওটা কর। একটু এদিক সেদিক হলে  গালি দিচ্ছি । বাসে কোনো ছোট বাচ্চা বা শিশু হেলপারী করলে ঠিকমত ভাড়া পরিশোধ করছি না, অর্ধেক ভাড়া দেই । আট থেকে দশ ঘন্টা শিশুদের পরিশ্রম করিয়ে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মাইনে দেই । এটি তো আদৌ হওয়া উচিৎ নয়।
যারা শিশুদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে শ্রম বন্ধের জন্য আজ মাঠে নেমেছেন, তারা কতই না মহৎ মানুষ।  কিন্তু পরক্ষণেই  ভাবি- কই এসব সংগঠনের কোনো কাজ দেখেছি কি কখনো? না-তো। তবে কি নিজেদের ব্রান্ডিং, কোম্পানীর প্রচার আর নিজেরা এক বেলা ফাও খাওয়ার জন্য এসব লোক দেখানো প্রোপাগান্ডা?
আমাদের শিশুশ্রম বিষয়ক আইন আছে, শিশুদের নিয়ে কাজ করার মত অসংখ্য সংগঠন আছে, আমার মত  কাজ করতে পারে শিশুদের জন্য এমন অনেক জনবল আছে, কিন্তু নেই সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক কাজ। যার ফলে শিশুশ্রম চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে যদি সঠিক পথে না আসি আমরা।
আমাদের প্রথমে একটি কথা ভাবা উচিৎ, যে শিশুটি পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে সে কেন এ পথে এসেছে? নিশ্চয়ই সে ইয়াতিম বা মিসকীন অথবা একেবারে দরিদ্র, চলার মত কিছু নেই বা চালানোর মত কেউ নেই । তখন এ শিশুটির বেঁচে থাকার পথ কি? কি খাবে? কি পরবে? আমি এমনও দেখেছি- তের বছরের শিশু আশি কেজির বোঝা মাথায় বহন করছে। অদ্ভুত মনে হতে পারে কিন্ত এটাই বাস্তবতা । আর আমি যদি এক্ষেত্রে তাদের পরিশ্রম করতে না দেই, তবে আমি কি তাদের পরিবারের দায়িত্ব নিব? নিব না, আবার কাজও করতে দিব না বিষয়টা অনেকটা গোলমালে। আমি বরং আমার বাসায় যে ছেলেটি বা মেয়েটি কাজ করে তাকেও নির্যাতন-নিপীড়ন করি। যদিবা আজ থেকে শিশুশ্রম বন্ধ হয়ে গেল তবে কি এক শ্রেণির মানুষ তৈরি করবনা যারা ভিক্ষা করবে? কারন তারা পেটের তাগিদে বাধ্য। অথবা চোর, ডাকাত, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী তৈরি করবনা? যেহেতু তাদের কাজ করার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছি। আইন থাকার কারনণ কেউ কাজেও নিচ্ছে না। তখন বাধ্য হয়ে এ উপায় বেছে নেয়া ছাড়া অন্য পথ আছে কি?
তবে আশার বাণী কিছুটা এই যে, সরকারিভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে দরিদ্র ছেলেমেয়েদের সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং কিছু সংগঠন/ সংস্থা সত্যিকারার্থে শিশুদের জন্য অনেক কাজ করছেন । আর বাকি গুলো নিজেদের নাম কামাচ্ছেন। এমনকি শিশুদের নামে টাকা তুলে নিজেরা পকেট ভরছেন। তাই এ ক্ষেত্রে প্রথমত আমাদের মানসিক উৎকর্ষতা অর্জন করতে হবে এবং শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে আমাদের মূলের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। কোনো বাবা-মা চান না বর্তমান সময়ে তার ছেলে কিংবা মেয়ে অশিক্ষিত থাকুক, প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগে শ্রম দিয়ে টাকা উপার্জন করুক।
তবে এসব শিশুদের জন্য কিছু করা যেতে পারে- 
সরকারীভাবে এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর প্রথমত যে শিশুটি শ্রমের সাথে যুক্ত তার পরিবারের খোঁজ নেয়া, সমস্যা গুরুতর হলে একটি ক্ষুদে ব্যবসার ব্যবস্থা করা এ চুক্তিতে যে, এক বছর বা ছয় মাস পরে তাদের সকল টাকা আবার ফেরত দিতে হবে (তবে কোনো মুনাফা আদায়ের বিনিময়ে নয়), যাতে তারা (শিশুটির পরিবার, পরিবার না থাকলে তাকে যারা লালন-পালন করছেন) শিশুটিকে দিয়ে কঠোর পরিশ্রমের পরিবর্তে নিজেরা অল্প পরিশ্রমে সাবলম্বী হতে পারবেন । ফলে শিশুটিকেও কঠোর শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে না। যে সকল প্রতিষ্ঠানে শিশুরা কাজ করেন সে সকল প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে তাদের ভারী কাজ থেকে বিরত করে, কম শ্রমের কাজের ব্যবস্থা করা। তাদের (শিশুদের) প্রতি মনিটরিং বাড়ানো, তাদের সাথে কখনো বাজে ব্যবহার না করা।
যেহেতু শুধুমাত্র আইন পাশ এবং ঘোষণার মাধ্যমে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয় । তাই কিছু  দরিদ্র শিশু বা পরিবারকে টার্গেট করে তাদেরকে ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যবস্থা করে দিয়ে ছ’মাস বা এক বছর পর তাদের কাছ থেকে টাকাগুলো ফেরত (ক্ষুদ্রব্যবসার ব্যবস্থা করতে যে টাকা গুলো খরচ করা হয়েছিল) নিয়ে আবার অন্য দরিদ্র পরিবারগুলোকে টর্গেট করা, এভাবে করলে অল্প সময়েই আমরা আমাদের দেশ থেকে শিশুশ্রম নামক অভিশাপটি দূর করতে পারব বলে মনে হয়। শুধু মাইক আর ব্যানার দিয়ে লোক দেখানো কর্মসূচি পালন না করে যদি এভাবে প্রতিটি সংগঠন কাজ করে এবং সরকারীভাবেও সহযোগীতা করা হয়, তবেই শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে। 
শিশুরা আমাদের সম্পদ, আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদেরকে ঝরে যেতে দেয়া যাবে না, ধ্বংস হতে দেয়া যাবেনা কিছুতেই। তাহলে আমরা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হব।

দারিদ্রতা দুর্বলতা নয়, শিশুদের প্রতি অবহেলা নয় । মনে রাখতে হবে কাজী নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্টিভ জবস, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর মত বিখ্যাত মনীষীও দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং তারাও এক সময় শিশু ছিলেন।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়