সোমবার, ১৮-নভেম্বর ২০১৯, ১১:৪০ অপরাহ্ন

অবিচার ও হাহাকারের গতি প্রকৃতি

shershanews24.com

প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৮:২৯ অপরাহ্ন

মঈনুল আহসান, লস এঞ্জেলস থেকে: মানবতার হাহাকার আজ চারিদিকে। কোথাও যেন কেউ নেই তাদেরকে পক্ষে দাঁড়ানোর। সবখানেই ক্ষমতা এখন দুর্বৃত্তদের হাতে। মানবতার দুশমনদের দখলে যেন চলে গেছে সব। তাদের অবস্থা এখন রমরমা। মানবতা এখন চলে তাদেরই মর্জিতে ও ইচ্ছায়। জগতের সব বিত্ত-বৈভব এখন তাদের হাতে। দেশের আমলা-কামলা, আলেম, বুদ্ধিজীবী- শিক্ষাবিদরাও সবাই যেন তাদের তাবেদার। সব এখন তাদেরই দলে ও দখলে। সবাই যেন এখন ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তদের দালাল ও লাঠিয়াল। এমনকি কবি-সাহিত্যিকদের মত মুক্ত চিন্তার কাণ্ডারিদের অনবদ্য শব্দাবলীও এখন নিথর এদের অতি অনাচারের কালচারে। 
দুঃসহ এই অবস্থার মাঝে কেউ যদিওবা মুখ খোলেন সাহস করে কিম্বা ভুল করে, পরক্ষণেই তিনি হারিয়ে যান অজানায়। তারা নিজে থেকেই হারিয়ে যান নাকি তাদেরকে হারিয়ে যেতে বাধ্য করা হয় তা পরিষ্কার না হলেও সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় সম্ভাবনাই বেশী বলে ধারণা করা যায়। হঠাৎ মুখ হা করা তেমনি এক কবির উচ্চারণে কিছুটা হলেও উঠে এসেছে আজকের জটিল অবস্থার ভয়াবহ চিত্র। অসহায় সেই কবি অকপটেই বলেছেন ‘দেখে শুনে মনে হয় বিধাতা যেন দুনিয়াটাকে বেচে দিয়েছেন শয়তানের কাছে’। দারুণ এক উচ্চারণ, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। সেই কবিও এখন নীরব, চলে গেছেন যেন অজ্ঞাতবাসে। 
পরিস্থিতির শেষ বুঝাতে এমন বাক্য বিন্যাস অতি যথার্থ। চরম অসহায়ত্বের মুখে বিধাতাকে এভাবে একতরফা দায়ী করাও নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পরম বিধাতার কোন কাজ এমন সস্তা কেনা-বেচার বিষয় নয় বরং তাঁর সব কাজের পেছনেই রয়েছে সুনির্দিষ্ট কোন না কোন উদ্দেশ্য। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাকের অনাদি কালের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণ ও উদ্দেশ্যও। 
উল্লেখ্য যে মহান আল্লাহ পাক শুধু বিশ্বাসীদেরই স্রষ্টা নন, তিনি একই ভাবে চরম নাস্তিকদেরও স্রষ্টা। তিনি বিশ্বাসীদের চাহিদা যেমন ভাবে পূরণ করে থাকেন, ঠিক একই ভাবে পূরণ করে থাকেন অবিশ্বাসীদের চাহিদাও। তিনি জানেন মানুষের মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাও, সেজন্যেই তিনি সর্বজ্ঞ। তাই অবিশ্বাসীরা কি চায় তা তাঁর মোটেই অজানা নয়। আল্লাহ পাক তার পবিত্র কালামে ওয়াদা করেছেন অবিশ্বাসীদের চাহিদা পূরণ করার। অবিশ্বাসীদের কাজের ফল তিনি তাদের চেষ্টা অনুপাতেই দিয়ে থাকেন কিন্তু শর্ত হচ্ছে পরকালে তাদের প্রাপ্য হবে শূন্য যেহেতু তারা তাতে বিশ্বাসই করে না (সূরা ৩:আয়াত ১৪৫; ৪২:২০ দ্রষ্টব্য)। তাই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসহীন ভালো কাজগুলোও বস্তুত:পক্ষে একেবারেই মূল্যহীন।
আল্লাহ পাক ভালো করেই জানেন যে ফেরাউনের করুণ পরিণতি জানা থাকা সত্ত্বেও দুনিয়াতে এমন বহু মানুষ থাকবে যারা মনে প্রাণে চাইবে ফেরাউনের মত রাজত্ব, হতে চাইবে তার চেয়েও বেশী ক্ষমতাবান। দেশে-দেশান্তরের অনেকেই যে যেনতেন উপায়ে সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা ও তদবিরে ব্যস্ত থাকেন তা আমরা জানি সবাই। সেই তালিকায় আছে মুসলিম নামধারীরাও। বলাই বাহুল্য যে শুধুমাত্র মুসলিম নামের কারণে কেউ বিশ্বাসী হয় না। বরং অনেক সময় ভয়ংকর অবিশ্বাসীরাও লুকিয়ে থাকে নিরীহ মুসলিম নামের আড়ালে। সে ভাবেই বরং পাপাচার করা যায় নির্বিঘ্নে কারণ তাতে ধরা পড়ার ভয় থাকে কম। কিন্তু তারপরও ধরা তাদের পড়তেই হয়। মাটি ফুঁড়ে চারা গাছ বের হওয়ার মতই তাদের পাপাচারও এক সময় বেরিয়ে পড়ে তাদের কথিত মুসলিম পরিচয়ের খোলস ফুঁড়ে। অতঃপর সেই পাপিষ্ঠকে আল্লাহ পাক উৎখাত করে থাকেন ফেরাউনের মতই সমূলে। ফেরাউন হওয়ার স্বাদ মিটিয়ে দেন চিরতরে ফেরেউনের মতই লোমহর্ষক পতনের মধ্য দিয়ে। সেটাই ঘটেছে সাদ্দাম ও গাদ্দাফির ক্ষেত্রে, সে পথেই চলছে আজকের সিসি ও সালমানেরা। এহেন শত ভাগ, আশি ভাগ ভোট খেকোদের পথ সাধারণত একমুখীই হয়ে থাকে, ফেরার রাস্তা এরা হারিয়ে ফেলে চিরতরে।
আল্লাহ পাক বস্তুত এভাবেই এদের মনোবাঞ্ছাগুলো পূরণ করে থাকেন যতটুকু তিনি চান, যেমন করেছিলেন ফেরাউনের ক্ষেত্রে। অতঃপর চোরের দশ দিনের পর আসবে সেই একটি দিন যখন এক লহমায় ক্ষান্ত হবে দলবল সহ সব অনাচারী এবং তাদের সমস্ত অনাচার। এটা মহান আল্লাহ পাকের এমনই এক সর্বময় কর্ম পদ্ধতি যার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকেন পাপিষ্ঠ স্বৈরাচারদের পাপকে (৩৫:৩৯ দ্রষ্টব্য)। তারা পাপ কামায় সম্পদ ও ক্ষমতা থেকে, সেই পাপ বাড়তে থাকে মজলুমের নিত্য আর্তনাদ আর অভিশাপের অব্যাহত ধারা থেকে। অতঃপর সেটাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে আল্লাহ পাক উৎপীড়িতের পাপগুলোকেও চাপিয়ে থাকেন ঐ সব স্বৈর-পাপিষ্ঠদের উপর। সবশেষে তাদের ভালো কাজের সওয়াবগুলোকেও কেড়ে নিয়ে বিলিয়ে দেন তাদের হাতে নির্যাতিতদের মাঝে। এভাবেই সর্বস্বান্ত ও সর্বব্যাপী ধিক্কৃত হয়ে বিদায় নেয় স্বৈরশাসকেরা। সর্বশক্তিমানের এই অনবদ্য মহান বিচার ব্যবস্থাই বস্তুত ইতিহাসের পরম শিক্ষা যা থেকে দুর্ভাগ্যবশত কেউই কখনও শিক্ষা নেয় না। এই শিক্ষার উপসংহারে নির্যাতিত প্রজাদেরকেই সব সময় দেখা যায় টিকে থাকতে আর জমিদারদের রাজকীয় প্রাসাদগুলোকে পড়ে থাকতে দেখা যায় ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে। এমনই দুরবস্থা হয় অত্যাচারিদের প্রাসাদগুলোর যে অতি গরীব প্রজারাও থাকতে চায় না সেখানে। সেখানে বাসা বাঁধে সাপ-খোক, পাখী আর পশুদের দল। একালের প্রজাদেরও মুক্তির সেই দিন খুব বেশী দূরে নয় ইনশাআল্লাহ ।  
(লেখকের বই পেতে: Search ‘Mainul Ahsan’ at ‘amazon.com’)