বুধবার, ১৭-জুলাই ২০১৯, ০৪:৫৮ অপরাহ্ন

বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও বিকাশে যা করণীয়

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৫ মার্চ, ২০১৯ ০৭:৪২ অপরাহ্ন

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: ‘বাংলা’ বিশ্বের ৩০ কোটির অধিক মানুষের মাতৃভাষা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা ও সরকারি ভাষা। এককালের ‘ভাবের ভাষা’ একালের কাজের ভাষাও বটে। বাংলাদেশের সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি অফিস, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রসমূহ, সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় ও সমাজ জীবনের বিভিন্ন স্তরে বাংলা ভাষা বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পেশাজীবি, বুদ্ধিজীবী, মননজীবী সকলে তাদের ধ্যান-ধারণায়, চিন্তা-চেতনায় ও কর্মজবিনে নানাভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করছেন। এটা অত্যন্ত আনন্দ, সুখ ও গর্বের বিষয়। কেননা ভাষা স্থবির নয়, বরং জঙ্গম। তা প্রবহমান নদীর মতো দু’কুল ছাপিয়ে চলে উত্তম গতিতে। পথে নানা স্থান হতে সংগৃহীত হয় নানা উপকরণ যা ভাষাকে সতত সমৃদ্ধ করে চলে। তাই ভাষার বহুমাত্রিকতা ও কলেবর ক্রমাগত বেড়েই চলে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, কালের পর কাল। যুগ যুগ ধরে সমৃদ্ধিশালী হয়। পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয় নতুন আঙ্গিক ও অবয়বে।
একটি ভাষা তখনই সামগ্রিকভাবে পঠন-পাঠনের উপযোগী হয়ে ওঠে, যখন ভাষাটির একটি প্রমিত লিখন রূপের বিকাশ ঘটে। মূলত এই লিখিত রূপের মাধ্যমে ঐ ভাষীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির রূপায়ণটিও সমৃদ্ধ হয়। আর ভাষাটির শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি একে কাজের ভাষায় পরিণতও করতে হয়। অর্থাৎ শুধু সাহিত্য, কলা বা সংস্কৃতি প্রকাশের বাহন হিসেবেই নয়, বরং অর্থনীতি, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি সকল বিষয় সম্পর্কিত ভাবের প্রকাশ রূপেও এটিকে সমর্থ হয়ে উঠতে হয়। বাংলা ভাষা বিভিন্ন বিষয়ের লেখ্য রূপ প্রকাশের উপযোগী মাধ্যম হিসেবে গড়ে না ওঠার ক্ষেত্রে ভাষা হিসেবে এর অবয়বগত সীমাবদ্ধতা যত না দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যবাহী ব্যক্তিমানুষের ঔপনিবেশিক মানসিকতা। ‘ব্যক্তিমানুষ’ বলতে এখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, নীতি-নির্ধারত সবাইকে বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি প্রকৃত আবেগ, ভালোবাসা ও দরদ থাকলে নিজের ভাষার সীমাবদ্ধতাকে দূর করার জন্য নানারকম অবয়ব পরিকল্পনা অনায়াসেই গ্রহণ করা যেতে পারে। আর সরকারি প্রণোদনা এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। 
অতীতে বাংলা বিভাগের অধীনে ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণাকর্ম সম্পাদিত হলেও সাম্প্রতিককালে এ বিষয়ে অতিরিক্ত কোর্স হ্রাস করার কারণে বাংলা বিভাগে বাংলা ভাষা বিষয়ক উচ্চতর গবেষণা ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। তাই এ ধরনের সুযোগ এখন শুধু ভাষাবিজ্ঞান বিভাগেই বর্তমান রয়েছে। ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা উচ্চতর পর্যায়ে বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপাদান বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম সম্পাদন করার সুযোগ লাভ করে থাকে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর পর্যায়ে চালুকৃত ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন তাত্ত্বিক কোর্সে বাংলা ভাষার উপাদানসমূহের সাংগঠনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কৌশলসমূহ আয়ত্ত করে নিতে পারে।  একমাত্র বাংলা বিভাগেই বিশুদ্ধ অর্থে কথ্য এবং লেখ্য মাধ্যম রূপে বাংলা ব্যবহৃত হয়। বিষয়টি যৌক্তিকও বটে। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্বে বাংলা বিভাগ প্রতিষ্ঠার অন্তরালে নিহিত কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা এবং সাহিত্যের অন্তর্নিহিত রূপ ও রসকে উন্মোচিত করা যাতে করে এ ভাষার সম্ভাবনাকে সকলেই সম্যক উপলব্ধি করতে পারে। তবে কলা অনুষদে ইংরেজি ব্যতিরেকে অন্য বিভাগগুলোতে শ্রেণিকক্ষে বাংলা ব্যবহৃত হলেও পরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে এর মিশ্ররূপ পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার উত্তরপত্রে বাংলা বা ইংরেজি যে কোন একটিতে উত্তর দিতে পারে, যদিও সম্প্রতি কোন কোন বিভাগ পরীক্ষার লিখন মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকে বাংলা বিভাগ ব্যতীত কলা অনুষদসহ বিভিন্ন অনুষদের বিভাগসমূহের শিক্ষার মাধ্যম ছিল মূলত ইংরেজি। তবে এই ধারাটির বিপরীতে বাংলার পক্ষে হাওয়া বইতে শুরু হয়ে পঞ্চাশের দশকে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধার সময় থেকেই। পরবর্তীকালে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে এক নতুন উদ্দীপনা স্ফুরিত হয়, যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিভাগই বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু করার প্রেরণা লাভ করে। বিশেষ করে, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বশবর্তী হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন ইত্যাদি অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে তখন শ্রেণিকক্ষের ভাষারূপ যেমন নির্ভেজাল বাংলা ছিল, তেমনিভাবে উত্তরপত্রের লেখ্যরূপ হিসেবে তখন দ্বি-ভাষারীতি চালু ছিল। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী তখন ইংরেজি বা বাংলা যেকোনো একটি রীতিতে পরীক্ষার খাতায় উত্তর প্রদান করতে পারত। তাতে করে, শিক্ষার্থীরা বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে। কেননা, উত্তরপত্রের ভাষারীতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের পছন্দক্রমের একটা স্বাধীনতা ছিল, যা একজন শিক্ষার্থীর মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার এই অগ্রগমন স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েক বছর বর্তমান থাকলেও বিশ্বায়নের প্রভাবে নব্বইয়ের দশকে এসে তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, বাংলা বিভাগ ব্যতীত কলা অনুষদের অন্যান্য বিভাগ, আইন এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের লেখার মাধ্যম হিসেবে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে প্রত্যাবর্তন করে। বাংলাদেশের একাডেমিয়াতে ইংরেজির এই প্রত্যাবর্তনকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যেতে পারে। প্রথমত, ঔপনিবেশিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি দুশো বছর ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে রাজত্ব করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ভাষার প্রসঙ্গে প্রথমেই এদেশবাসীর মনোচেতনায় জ্বল জ্বল করে বিরাজমান ইংরেজির কথাই মনে আসে। এর পাশাপাশি আরেকটি কারণও এক্ষেত্রে বেশ প্রকট, সেটি হচ্ছে বৈশ্বিক একাডেমিক ভাষা হিসেবে ইংরেজির বিশালতা ও বৈভব। তবে ইংরেজির কারণে আমাদের বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ ইতিহাস ম্লান হতে পারে তা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমাদের ভাষার উৎকর্ষতার বৃদ্ধির জন্য ইংরেজি বা অন্য কোন ভাষা আমাদের জন্য আদৌ কোন চ্যালেঞ্জ নয়।  খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সমাপ্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশে প্রত্যাবর্তন করলেও ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি মাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি তাদের সারাজীবন এক ধরনের সহানুভূতি থেকে যায়। সে কারণে নিজ দেশেও তারা ইংরেজি শিক্ষার বিস্তারকে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা চালায়। বাংলাদেশে বর্তমানে এই অবস্থা বিরাজমান। ঐতিহ্যগতভাবে প্রাক্তন ব্রিটিশ কলোনি হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকেরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইংরেজি-নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই তাদের পছন্দের শীর্ষে স্থান দিয়ে থাকে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সমাপন শেষে দেশে ফেরার পর ইংরেজি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম রূপে প্রতিষ্ঠা করতে তারা তৎপরতা দেখায়। সেই সাথে বিশ্বায়ন পর্ব তাদের এই তৎপরতায় নতুন করে ঘি ঢেলে দিয়েছে। যাই ঘটুক না কেন আমরা মানসিকভাবে তৎপর হলে এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা সুন্দর হলে বাংলা ভাষাতেই সাধারণ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিÑ সকল শিক্ষার যথার্থ বাহন করে তোলা সম্ভব এবং একদিন এই বাংলা ভাষাই আন্তর্জাতিক বিশ্বে পঠন-পাঠন উপযোগিতা লাভ করে বিশ্বের ভাষা তালিকার অবস্থানকে সদৃঢ় ও মজবুত করে সম্মান ও মর্যাদার আসনে আসীন হবে।  
বিশ্বায়নের এই যুগে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি একে অন্যে মিলেমিশে পারস্পরিক মেলবন্ধন ও বৈশ্বিক সংস্কৃতি প্ল্যাটফর্ম রচনা করে বিশ্বজনীতা লাভ করবেÑ এটাই তো যুগের হাওয়া। এই যুগের হাওয়ার বিরুদ্ধচারণ কোন সুবিধা বয়ে আনবে না। অন্য কোন ভাষা বা সংস্কৃতির আগ্রাসনে আমাদের স্বর্কীয়তা যেন নষ্ট না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের নজর দিতে হবে। প্রয়োজনে ভাষার উন্নয়নে এবং রক্ষণাবেক্ষণে সঠিক ভাষানীতির প্রবর্তন করে মাতৃভাষার সমৃদ্ধি ঘটাতে হবে। বাংলা বানান নিয়ে বর্তমান সমস্যার অন্ত নেই। বাংলাদেশেও এ সমস্যা প্রকট বলে অনেকের ধারণা। একই শব্দের বিভিন্ন বানান লেখা হচ্ছে যত্র-তত্র। সাহিত্য ছাড়াও পোস্টারে, বিজ্ঞাপনে, সাইন বোর্ডে, সংবাদপত্রে, সাময়িকীতে, বেতার-টেলিভিশনে এই ভুলের ছড়াছড়ি অনেকের চোখে ধরা পড়ে। সেই সঙ্গে বাদ পড়ে না অফিস আদালতে ব্যবহৃত লিখিত চিঠিপত্রে, নোট, সারাংশ, প্রতিবেদনে, সভা-সমিতির কার্যপত্রে ও কার্যবিবরণীতে অশুদ্ধ বানানের বিপুল সমাহার। আমরা বাংলাদেশি, বাংলা আমাদের ভাষা। বাংলায় আমরা কথা বলি, আমাদের কথা বলাটা কতটা শুদ্ধ ও সঠিকভাবে করছি তাকে আমরা কখনও ভেবে দেখেছি। অথচ আমরা তো ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। বাংলা ভাষা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার সম্মান লাভ করেছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস অনেক গর্ব ও গৌরবের। তাই বাংলা ভাষায় শুদ্ধ কথপোকথন ও বাংলা শুধু রীতির আচারে আমাদেরকে বিশ্বাসী হতে হবে।  কিন্তু আমরা তার প্রায়োগিক দিক থেকে অনেকটা দায়সারা আচরণে অভ্যস্ত। নিজের ভাষার প্রতি আমাদের দৈন্যতা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। ভাষার গর্ব ও গৌরব যেন কোনো অবস্থাতেই ম্লান না হয়ে যায় সেদিকে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং একমাত্র মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করে আমরা আগামী দিনের একটা সুন্দর, সফল ও সাফলীল জাতিতে পরিণত হতে পারব। 
লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট