শুক্রবার, ১৯-জুলাই ২০১৯, ০৪:১১ পূর্বাহ্ন

আমাদের ভাবীরা এবং ঢাকার আগুন 

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:০৬ অপরাহ্ন

আহমেদ আরিফ: প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি মানুষের বসবাস ঢাকা শহরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে প্রতিদিন গড়ে ঢাকায় ঢুকছে অন্তত দুই হাজার মানুষ। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, ২০২০ সাল নাগাদ ঢাকা শহরের জনসংখ্যা হবে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ। বিশ্বের যে কোন দেশের সরকারের জন্যই একটি ছোট্ট শহরের ২ কোটি মানুষের নূন্যতম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা অনেক কঠিন। বাংলাদেশের মত দুর্নীতিগ্রস্থ, রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় বিবেচনায় সরকারী প্রতিষ্টানগুলোতে নিয়োগের দেশে এটি প্রায় একেবারেই অসম্ভব একটি ব্যাপার। 

যানজট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, ভেজাল খাবার, ছিনতাই সহ ডজন ডজন নাগরিক সমস্যার মাঝেও ঢাকায় বসবাসরত প্রায় ২ কোটি মানুষের নুতুন আতংকের নাম ' আগুন '। মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক অগ্নিকান্ডের ঘটনায় যেমনি মারা যাচ্ছে মানুষ তেমনি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। ঘনবসতির ঢাকা শহরের জন্য অগ্নিকান্ড স্বাভাবিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে। যে হারে ঢাকায় মানুষ বাড়ছে তাতে আগামীতে আরো বেশী আগুনের ঘটনা ঘটবে। কারণ, ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব যত বেশী হবে আগুনের ঝুঁকি ততই বাড়বে। 

ঢাকার আলোচিত প্রতিটি অগ্নিকান্ডের ঘটনার পরপরই আলোচনার টপিক হয় 'ফায়ার সার্ভিস'। ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিশ্বের অন্য দেশের ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম বাংলাদেশে নেই কেন এই প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু, উন্নত দেশগুলোর মত অগ্নিনির্বাপক আধুনিক ব্যবস্থা ঢাকায় ব্যবহারের উপযোগী কিনা এই প্রশ্নটি আলোচনায় রাখা হচ্ছেনা । 

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ঢাকার কোথাও আগুন লাগার ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস পৌছাতে পেরেছে এমনটা শোনা যায়না। বেশীর ভাগ সময় ঘটনাস্থলে পৌছাতে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট লেগে যায়। কখনো কখনো দেখা গেছে আগুনে সব পুড়ে ছাই হওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌছে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। কারণ, রাস্তায় যানজট। পিক আওয়ারে রাস্তায়  যানজটের সাথে যুদ্ধ করে ঘটনাস্থলে পৌছানোর পরও বেশীর ভাগ সময় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে পারেনা ফায়ার সার্ভিস। কারণ সরু গলি, অবৈধ ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত ভাবে বিল্ডিং নির্মাণ, পানির অভাব ইত্যাদি ইত্যাদি। 

আগুনে বেশী ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর অন্যতম শর্ত হচ্ছে, সময় মত ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করা। কিন্তু ঢাকা শহরের বাস্তবতায় তা সম্ভব হচ্ছেনা।ফায়ার সার্ভিসকে আমেরিকা, দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়ার মত আধুনিক করে কি হবে যদি সময় মত ঘটনাস্থলে পৌছাতে না পারে? সময় মত আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে না পারলে ফায়ার সার্ভিস যতই আধুনিক হউক না কেন লাভের লাভ কিছুই হবেনা।

কেন ঢাকার সরু গলি আরো সরু হচ্ছে? কেন  যানজট আরো বাড়ছে? কেন অপরিকল্পিত ভাবে বিল্ডিং হচ্ছে? কেন ঢাকায় খালি জায়গা কমে যাচ্ছে? কেন ঢাকা শহরের জলাশয়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছে? কেন ঢাকা শহরের আশপাশের নদীগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে? 

উত্তর একটাই। আর তা হচ্ছে ' ঢাকার জনসংখ্যা '। মানুষের বসবাসের জায়গা করে দিতে ঢাকার খাল, বিল, জলাশয় ভরাট করে ফেলা হয়েছে অনেক আগেই। এমনকি নদী পর্যন্ত দখল করে নির্মাণ হচ্ছে বাড়ি, মার্কেট, কিন্ডার গার্টেন। বাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, রিক্সা, সিএনজি বাড়ছেই। বাড়েনি শুধু রাস্তা৷ ফলাফল, তীব্র যানজট। একটু বৃষ্টিতেই ঢাকার রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে উঠতে রীতিমত যুদ্ধ জয়ের অবস্থা! 

ঢাকার স্কুলে না পড়ালে সন্তানদের শিক্ষিত করানো যাবেনা, সমাজে স্ট্যাটাস থাকেনা এই মানসিকতায় বাড়ি ঘর রেখে গ্রাম ছাড়ছে মানুষ। নিজের ঘরের কথাই বলি। আমার ভাবী ২,৬,৯ বছরের তিনটা বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় থাকে। কারণ, ঢাকায় ভাল স্কুলে পড়াতে পারলে  নাকি ছেলেদের ভবিষৎ উজ্জ্বল! অথচ ভাবীর ভাইয়েরা গ্রামে থেকেই পড়ালেখা করে একজন বিসিএস ক্যাডার, আরেকজন দেশের বাইরে ব্যাংকে জব করেন। আমার ভাবীর মত হাজার হাজার ভাবীরা ঢাকায় ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে থাকে শুধু সন্তানদের পড়ালেখা করানোর জন্য। একটা সময় ছিল সন্তানদের পড়ালেখার জন্য ঢাকায় পাঠানো হত এইচএসসির পর। কিন্তু, এখনকার ভাবীরা আর্থিক ভাবে একটু সচ্চল হলেই হয়েছে! সোজা ঢাকা শহরে! বাচ্চাদের প্রাইমারি থেকেই ঢাকায় পড়াতে না পারলে মান যে থাকবেনা!

নানারকম সংকটে পিষ্ট একসময়কার তিলোত্তমা ঢাকা শহর। অনেক আগেই বাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ঢাকা। নুতুন করে ঢাকাকে মোটামুটি বাসের উপযোগী করতে সবার আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ঢাকার জনসংখ্যা। নজর দিতে হবে পরিকল্পিত শহর ব্যবস্থার দিকে। শহর যদি পরিকল্পিত ব্যবস্থায় গড়ে না উঠে তাহলে সেবাদানকারী প্রতিষ্টানগুলো যতই আধুনিক হউকনা কেন জনগণ সেটার সুফল পাবেনা। ঢাকায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কমাতে হবে মানুষের ঢাকা নির্ভরতা।গ্রাম-মফস্বলে শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি বাড়াতে হবে কর্মসংস্থান। যেন শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরির জন্য ঢাকায় ছুটতে না হয় মানুষের।

ahmedarif2011@gmail.com