মঙ্গলবার, ২৫-জুন ২০১৯, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন

আমার পেশাগত জীবনঃ এক মায়ের গল্প 

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৩ জুন, ২০১৯ ০৮:৩৬ অপরাহ্ন

ড. জাকিরুল ইসলাম: তখন আমি একটা উপজেলার ম্যাজিস্ট্রেট । একদিন ঊকিল সাহেব এক নালিশী মামলা দায়ের করলেন । অভিযোগ কারীনি হচ্ছেন মা –অভিযোগ সন্তানের বিরুদ্ধে মায়ের গায়ে হাত তোলার । বাদিনী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। উকিল সাহেব বললেন – মাননীয় আদালত , এই বৃদ্ধা মহিলাকে তাঁর ছেলে মাঝে মাঝেই গায়ে হাত তুলে। ছেলেটা গুন্ডা প্রকৃতির –ফলে গ্রামের সবাই তাকে ভয় পেয়ে তাঁর এই জঘন্য অপরাধের বিষয়ে কোন প্রতিবাদ করে না। ইউপি মেম্বর চেয়ারম্যান সবাই তাকে ভয় পায় । স্যার আপনার ন্যায় বিচারের কথা সব জায়গায় আলোচনা হয় । পত্র পত্রিকায়ও আপনার অনেক কাহিনী পড়েছি। তাই আশা করে এসেছি আপনি এই অসহায় মা-এর কষ্টটা বুঝে আমলে নিয়ে ন্যায় বিচার করুন। উকিলের বক্ত্যব্যের পাশাপাশি আমি আরজিটা পড়ে ফেললাম। মামলা হয়েছে দন্ড বিধির ৩২৩ ধারায়। অতি সাধারণ মামলা -সমন পাঠানোর নিয়ম । কিন্তু আমি ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি । আমি গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করার আদেশ দিলাম। এজলাস থেকে নেমেই ওসিকে ফোনে নির্দেশ দিলাম –এই ইবলিশটাকে যেখানে পাবে গ্রেপ্তার করবে এবং ওর কোমরে দড়ি বেধে পিটাতে পিটাতে হেটে হেটে এনে থানা হাজতে ভরবে । তারপর উলটা করে ঝুলিয়ে রাখবে সারারাত একগ্লাস পানিও খেতে দেবে না। যদি মরে যায় দায়িত্ব আমি নেব। কাল সকালে আমার কোর্টে হাজির করবে। ওসি সাথে সাথে একশনে নেমে গেল এবং বিকেলেই তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে নির্দেশ মত ভাল সমাদর করল । 
পরদিন আদালতে আনলে তাঁর জন্য কয়েকজন উকিল সাহেব জামিনের দরখাস্ত করলেন। তারা বললেন –স্যার এই মামলায় শমন জারি করা হয় –আপনি স্যার গ্রেপ্তারী পরোয়ানা দিয়েছেন। এখন স্যার আদালতে হাজির করা হয়েছে । মামলাটি দন্ড বিধির ৩২৩ ধারায় হয়েছে । এটা জামিন যোগ্য এবং জামিন দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাদিনী আর বিবাদীর সম্পর্ক যাই থাকুক মা এবং ছেলে হলেও আইনের দৃষ্টি তে আসামী জামিন পাবে । উকিল সাহেবদের বক্ত্যব্য শুনার পর আমি –ওরডারশিটে আদেশ দিলাম- এই সমাজ কতটা অধপাতে গিয়েছে যে গর্ভধারিণী মায়ের সাথে সন্তান দুর্ব্যবহার করে তাঁর গায়ে হাত তুলে অথচ মা সেই সমাজে ন্যায় বিচার পায় না । তাকে আদালত পর্যন্ত আসতে হয়েছে । সমাজপতিরা কি সব বিবেকহীন –অন্ধ বধির । এই আসামি যে অপরাধ করেছে তাঁর জন্য দুনিয়ায় এবং আখেরাতে সে অভিশপ্ত । আইনে জামিনের বিধান থাকলেও আমি তাকে জামিন দিচ্ছি না। এ ক্ষেত্রে বিবেকের আইনই আমার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে । আসামীকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হোক। সাক্ষীর জন্য পরবর্তী তারিখ উল্লেখ করে দিলাম। উকিল সাহেবরা দাঁড়িয়ে বললেন - স্যার জামিন যোগ্য অপরাধে জামিন দিতেই হবে । মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা আছে। বললাম আমার আদেশ দেয়া হয়েছে। আপনারা উচ্চ আদালতে যান । আচ্ছা উকিল সাহেব্ বলুন ত, আপনি কি আপনার মায়ের সাথে এমন আচরণ করেন? উকিল সাহেব বললেন না স্যার কখন ই না। বললাম তাহলে আপনি এই ইব্লিশটার জন্য উকালতি কেন করছেন? উকিল বললেন স্যার আমি আইনের কথা বলছি। আমি বললাম আমি বিবেকের আইনের কথা বলছি। মানুষের জন্যই আইন। আইনের জন্য মানুষ নয়।
এরপর উকিল সাহেবরা জজ কোর্টে গেলেন জামিনের জন্য আপিল করতে । জজ সাহেব ছিলেন মারজিউল হক। তিনি মামলার নথি তলব করলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায় পরায়ন বিচারক । পরে হাইকোর্টের জজ হয়েছিলেন । তাঁর বাবা ছিলেন এক সময়ের খ্যাতনামা বিচার পতি মওদুদ । তাঁর এক বোন ছিলেন বেবী মওদুদ। পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন। যাক, পরদিন  জামিনের শুনানি হল। আমিও প্রস্তুত জবাব দিতে, জজ সাহেব যদি কারণ দর্শাতে বলেন । কিন্তু শুনানি শেষে জজ সাহেব বিজ্ঞ ম্যাজিস্ত্রাট এর আদেশ বহাল রেখে রায় দিলেন । আসামী জামিন পেল না। সেই সাথে আদালতে বললেন, এমন ম্যাজিস্ট্রেট দেশের জন্য সম্পদ । 
এরপর তাদের যাওয়ার জায়গা হচ্ছে হাইকোর্ট । কিন্তু আসামী পক্ষ বুঝে ফেললেন । আর কোন লাভ হবে না। তারা এখন কিভাবে মামলা মীমাংসা করা যায় সেই পথে গেলেন। 
দিন পনের পরে দুপুরে ডাক বাংলোয় বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। দেখি এক বৃদ্ধ মহিলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছেন। দেখে মনে হল সেই মহিলা যার ছেলেকে জেলে পাঠিয়েছি । আমি ভিতরে আসতে বললাম –বললাম –মা আরও কোন সমস্যা হয়েছে? ইব্লিশটাত জেলেই আছে। মহিলা বললেন –বাবা আমি খুব খুশি হয়েছি আপনি ন্যায় বিচার করেছেন। আল্লাহ আপনাকে অনেক বড় করুন। কিন্তু বাবা ছেলেটা ত পাজী জানি । কিন্তু আমার দুইটা নাতী এখন আমার কাছে কান্না কাটি করে আর বলে –দাদী আমার বাবাকে জেল থেকে আইন্যা দাও। শুধু কাঁদে । ছেলের বউ সারাদিন পায়ে ধরে কাঁদে । কি করব বাবা। আমি বিষয়টা বুঝতে পারলাম। বললাম –আপনি যা বলবেন তাই করব। বলুন কি চান ? বললেন –বাবা ওকে ছেড়ে দিন। বললাম - ঠিক আছে আগামী কাল উকিল সাহেবকে বলুন জামিনের আবেদন করতে । মহিলা চোখের জল মুছতে মুছতে চলে গেলেন। দেখলাম মুখে তাঁর খুসির ঝিলিক। আসলে নাতীর চেয়েও বেশি কস্টে ভুগছিলেন মহিলা। কারণ তিনি যে গর্ভধারিণী । আমি সেটা বুঝতে পারছিলাম। ছেলের কষ্ট মায়েরা কখনই সহ্য করতে পারেন না। প্রাচীন রোম এর নিষ্ঠুর শাসক নীরু যখন তাঁর মাকে হত্যা করার জন্য পাঠিয়েছিল এবং সৈনিকরা যখন তাঁর গলায় ছুরি চালাচ্ছিল, এমন অবস্থায়ও নীরুর মা সৈনিকদের বললেন বাবারা আমি ত মরেই যাব । তোমরা কিন্তু নীরু কে দেখবে –তাঁর বিপদে ঝাপিয়ে পড়বে! 
যাক পরদিন কথামত জামিন দিয়ে দিলাম। জামিন পাওয়ার দুদিন পর সেই ইবলিশটা আমার চেম্বারে ঢুকে আমার দুই পা জড়িয়ে কাদতে লাগল । আর বলল –স্যার আপনি ন্যায় বিচার করেছেন। জেল খানায় যাওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি, আমি কতবড় পাপ করেছি। স্যার আমি আসলে আমার বঊ এর কথায় এগুলি করেছি। আর করব না। বললাম শুন – মাকে মায়ের জায়গায় রাখবে বঊ কে বঊ এর জায়গায় রাখবে । তাহলেই ন্যায়বিচার দুজনের প্রতি করা হবে। আবার মায়ের জন্য বউ কে মার ধর করলে সেটাও বড় পাপ হবে। যাও সবাইকে নিয়ে ভালভাবে জীবন-যাপন কর । কেঊ কিছু শিখতে চাইলে এই ঘটনা টা কি উদাহরণ হতে পারে?