শুক্রবার, ১৯-জুলাই ২০১৯, ০৫:০১ অপরাহ্ন

চলার পথের গল্প

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৯ জুন, ২০১৯ ০৮:২৩ অপরাহ্ন

মাহবুবা বেগম: বয়স্ক মানুষ অন্যলোকের সংগ চায়। চায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞ জীবনের গল্প কেউ শুনুক মন দিয়ে। প্রশ্ন করুক কৌতুহলে।বিস্মিত হোক তার উত্থান পতনের গল্পে।এই ব্যস্ত নগরজীবনে সময় যেন সোনার হরিনের চেয়েও দুর্লভ। সকাল সন্ধ্যা জ্যাম পেরিয়ে আর জীবনের নানা রূপ রস লাবন্য উপভোগ করতে করতে ঘরের কোনের সেই সিনিয়র সিটিজেনের দিকে নজর ফেলার সময় খুব কম লোকেরই হয়। অথবা মুরুব্বিদেরকে টেকেন ফর গ্রান্টেড ধরে নিয়ে আমরা অনেকটাই ভুলে থাকি, চোখ ফিরিয়ে রাখি। অথচ ভুলে যাই এইরকম বা তারচেয়েও একলা দিন আমাদের সামনে অপেক্ষায়।

কালকে এক অসুস্থ পিতাকে দেখলাম, অধীর চোখে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতে। আর সন্তানসম সদ্য পরিচিত লোকজনকে তার পুত্র কন্যার ব্যস্ততার জাস্টিফিকেশন দিতে, যেন নিজেকেই নিজে বোঝাচ্ছেন। আবার সমবয়সীদেরকে বলছেন তার অসুস্থতা আসলে তেমন সিরিয়াস কিছুনা। অসুস্থ মানুষের মন এমনিই নরম থাকে তার উপর যদি একাকীত্বের অনুভব ভর করে তাইলে যা হয় আর কি! ভদ্রলোককে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, এককালে নিশ্চয়ই সেইরকম দৌর্দন্ডপ্রতাপ পিতা ছিলেন তিনি। আর এখন কেমন শিশুর মতো বায়না করছেন। 

সেদিন গ্রীন লাইনে করে ফিরছি বরিশাল থেকে। অসুস্থ মা'কে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে এক বিদেশগামী পুত্র। মা ক্যান্সার রোগী আবার কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন।যখন তখন চিৎকার করে উঠছে,গান গাইছে। ছেলে যে কি গভীর মমতা নিয়ে মাকে সামলাচ্ছে সারাটা পথ তা-ই দেখছিলাম। আমার মতো অনেকেই কৌতুহলে দেখছিলো তাদের। রেস্টলেস ছেলেটার অসহায় চেহারা দেখে লঞ্চের অনেকেই  তাকে স্বান্তনা দিচ্ছিলো, ধৈর্য রাখতে বলছিলো। পঞ্চাশোর্ধ বেশ ক'জন ভদ্রলোক আকুল চোখে দেখছিলো তাদের। কয়েকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেও ফেললো, আহ মা! তবু তো আছে। অদ্ভুত একটা অনুভুতি হচ্ছিলো সারাটা পথ, যার রেশ কাটেনি এখনও।

বোনকে সাথে নিয়ে বসে আছি হাসপাতালের ওটির পাশে ওয়েটিং রুমে। এক পরিবার এলো। তাদের পরের প্রজন্মের জন্মের অপেক্ষায়। বেশ খানিক অপেক্ষার পর বাচ্চার বাবা সদ্যজাত শিশুপুত্রকে কোলে করে এলেন সেখানে। অপেক্ষমান আত্মীয়কুল (বাচ্চার দাদা দাদী আরও মুরুব্বিরা) খুবই স্বাভাবিক সৌজন্যে গ্রহণ করলেন তাদের। একটা সদ্যজাত বাচ্চার জন্য যে স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস দেখে অভ্যস্ত আমরা সেইরকম কিছু না দেখে আমি খানিকটা অবাক হলাম। ডাক্তার বোনকে বললাম, ঘটনা কি? সে এইটুকু শুনেই অভিজ্ঞতা দিয়ে বলল, আগে থেকেই জানে ছেলে হবে; তাই আনন্দ আগে ভাগেই করে ফেলেছে হয়তো। এই সিজারটা হলো নিয়ম রক্ষার।

আমারও মনে হলো সেইরকমই হবে ঘটনা। তাও কেমন কেমন অনুভূতি হলো। নতুন শিশুর মুখ দেখার আনন্দটা তো প্রতিবারই ইউনিক আমার মতে, সে যত শিশুই দেখুক না কেন! যাই হউক যার যার দু:খ তার তার আর যার যার আনন্দও তার তার। আমার আর কি! চলার পথে আমি তো শুধুই দর্শক!