মঙ্গলবার, ২২-অক্টোবর ২০১৯, ০৩:২০ অপরাহ্ন

টাকা কী রপ্তানি পণ্য!

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৩ জুলাই, ২০১৯ ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

মোহাম্মদ আবু নোমান
বর্তমানে দেশে অন্যতম রপ্তানি পণ্য হচ্ছে টাকা! যারা সুইস ব্যাংকে টাকা রপ্তানি করছেন, এক অর্থে তারা এদেশে পরবাসী! একদিকে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো টাকার পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষ বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো খালি করে ফেলেছেন। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটা ভাবার বিষয়। এছাড়া যারা কানাডা, মালয়েশিয়া, দুবাই, আবুধাবি, ভারত, সিঙ্গাপুরে সেকেন্ড হোম বানাচ্ছেন, সে টাকাইবা তারা কোথায় পেয়েছেন? যে অর্থ বৈধ পথে অর্জিত হয়নি, সেটি বিদেশে পাচার হয়েছে। এভাবে ধনবানেরা প্রথমে টাকা পাঠান, তারপর পরিবারের সদস্যদের পাঠান এবং সবশেষে নিজেকেও পাচার করে দ্বৈত নাগরিকত্ব নেন!
শুধুমাত্র দেশের প্রতি ভালবাসা ও ভবিষ্যতের প্রতি যাদের আস্থা নেই, তাদের কারণেই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। কেন উচ্চবিত্তরা দেশে টাকা রাখেন না, সেটি দুশ্চিন্তার বিষয়। এ ধরনের কাজ আইনের আওতায় না এনে প্রশ্রয় দেয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত? দেশে দুর্নীতি বেড়েছে বলেই অর্থ পাচারও বেড়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বেড়ে থাকে। বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক।
২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৯ শতাংশ বা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) গত ২৭ জুন ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮’ বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এই ১২০০ কোটি টাকা যদি শুধু বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের হিসেব থেকে হয়, তাহলে বিদেশী পাসপোর্টধারী বাংলাদেশী, যিনি নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করছেন, সে হিসেব কত হবে? কেননা যিনি বাংলাদেশী নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করেছেন তার তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। সুইস ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশিদের মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক। বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা।
অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে থাকে। গত বছর দেশে নির্বাচন হওয়ায় টাকা পাচার বেড়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পণ্য আমদানির নামে বিদেশে টাকা পাচার করা হয়। এতে খেলাপি ঋণও বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত বছর আমদানি ব্যয় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ধারণা করা যায়, এর একটি অংশ পাচার হয়ে সুইজারল্যান্ডে জমা হয়েছে। যেকোনো অনিয়ম বন্ধ করা না গেলে তা আরও বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। বিনিয়োগ পরিবেশের ঘাটতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই দেশ থেকে বিদেশে অর্থ নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ।
এর আগে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশির জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী। কিন্তু এ পর্যন্ত কাউকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ধরনের কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি। তারপরও বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় কীভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হল। এ ছাড়া ব্রিটেন, হংকং, সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকেও বাংলাদেশিদের টাকা রয়েছে বলে জানা যায়।
আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সরকার চাইলে অর্থ পাচার ও পাচারকারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু সেই কাজটি সরকার কেন করছে না? সারা দুনিয়া থেকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ জমার পরিমাণ যখন কমছে; সেখানে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। ভারত অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ায় সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পেরেছে। অর্থ পাচার রোধে ভারত সুইস ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ নেয় ২০১৬ সালে। তখন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুইস ব্যাংকগুলো থেকে ভারতীয় গ্রাহকদের তথ্য পেয়ে থাকে ভারত সরকার।
দু’শ বছরের পুরনো ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংক মুদ্রা পাচারকারীদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য। আগে সুইস ব্যাংকে জমা টাকার কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হত না। এমনকি আমানতকারীর নাম, ঠিকানাও গোপন রাখা হত। একটি কোড নম্বরের ভিত্তিতে টাকা জমা রাখা হত। কিন্তু ২০০২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী টাকা পাচার রোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ব্যাপকভাবে কার্যকর করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক চাপে সুইস ব্যাংক জমা টাকার তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তারা ওই সময় থেকে বিভিন্ন দেশের জমা টাকার তথ্য প্রকাশ করছে। ওই প্রতিবেদনে কোন দেশের কত টাকা জমা আছে সে তথ্য প্রকাশ করা হয়, কিন্তু আমানতকারীদের নাম, ঠিকানা প্রকাশ করা হয় না। ফলে পাচারকারীদের ঠেকানো যাচ্ছে না।

abunoman1972@gmail.com