বুধবার, ২০-নভেম্বর ২০১৯, ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন

 বীরশ্রেষ্ঠ’র ঘরে ফেরা ও কিছু স্মৃতি  

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট, ২০১৯ ১০:১৬ অপরাহ্ন

উইং কমান্ডার এম সালাহউদ্দিন চৌধুরী(অবঃ): সশস্ত্র সংগ্রাম ও লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তেজোদীপ্ত রক্তিম সুর্যের মত ঝলমলে একটি নাম। এই মহান বীরযোদ্ধার বীরত্বগাঁথা তাঁকে আপন মহিমায় করেছে মহিমান্বিত। লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি  আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, পেয়েছি নিজস্ব বিমান বাহিনী, সেই বিমান বাহিনীর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে এবং বীরশ্রেষ্ঠ’র একজন সাধারন উত্তরসুরী হিসেবে তাঁর ঘরে ফেরার ঐতিহাসিক ও আবেগঘন ঘটনার কিছু স্মৃতিচারণ ও তাঁর শাহাদাত বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের নিমিত্তে আমার এই স্মৃতিকথনের ক্ষুদ্র প্রয়াস।

২০০০ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে একটি প্রশিক্ষন কোর্সের জন্য আমি নির্বাচিত হই। উক্ত কোর্স শুরু হয় মে মাসে। পাকিস্তান যাওয়ার পুর্বেই মনে মনে পরিকল্পনা করি বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতঃ তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে প্রার্থনা করব। স্বচক্ষে এই বীরের শেষ কর্মস্থল পাকিস্তান বিমান বাহিনী ঘাঁটি মাসরুর পরিদর্শন করে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর এই বীরশ্রেষ্ঠ’র চরম আত্মত্যাগ সম্পর্কে আরও অধিক কিছু জানার চেষ্টা করব। কেননা সাধারনভাবে আমরা তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানি, তাহচ্ছে ১৯৭১ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর রহমান সপরিবারে ঢাকায় ছুটিতে আসেন। ২৫ মার্চের কালো রাতে তিনি ছিলেন নরসিংদীর রায়পুরার রামনগর গ্রামে৷ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করেন৷মুক্তিযুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তোলেন প্রতিরোধ বাহিনী। 

এরপর ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকা আসেন ও ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান৷তিনি তাঁর অনুমোদিত ছুটির অতিরিক্ত সময় তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করেন। কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে জঙ্গি বিমান দখল এবং সেটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের পরিকল্পনা করতে থাকেন খুব গোপনে। তাকে তখন অন্যান্য বাঙালি পাইলটদের মত উড্ডয়ন ডিউটি থেকে সরিয়ে পিএএফ বেস মাসরুরের ফ্লাইট সেফটি অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি একটি বিমান দখলে নিয়ে বিমান সহ পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে ভারতে অবতরন করে স্বাধীনতার যুদ্ধে যোগদানের জন্য রশীদ মিনহাজ নামে একজন শিক্ষানবীশ পাইলটের উড্ডয়নের দিন ও সময়কে (২০ই আগস্ট, ১৯৭১) বেছে নেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিলো মিনহাজ কন্ট্রোল টাওয়ারের অনুমতি পেয়ে গেলে তিনি তাঁর কাছ থেকে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেবেন। পরিকল্পনা অনুসারে তিনি বিভিন্ন পাইলটের ফ্লাইং শিডিউল নিরীক্ষন করে ২০শে আগস্ট ১৯৭১ রানওয়ের পূর্ব পাশে অবস্থান নেন৷তাঁর সামনে তখন দুই সিটের একটি প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩। পাইলট অফিসার রশীদ মিনহাজ বিমানটি নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত একক উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর রশীদ মিনহাজ বিমানটি নিয়ে রানওয়েতে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিলে বেস ফ্লাইট সেফটি অফিসার মতিউর রহমান বিমানটি থামাতে বলেন। মিনহাজ বিমানটি থামান এবং ক্যানোপি খুলে বিমান থামানোর কারণ জানতে চান। এসময় মতিউর রহমান হাতের ইশারায় বিমানটির কিছু সমস্যার দিকে ইংগিত করে তড়িৎ বিমানের ককপিটে চড়ে বসেন এবং রশীদ মিনহাজকে অচেতন করে ফেলেন। জ্ঞান হারানোর আগে রশীদ মিনহাজ কন্ট্রোল রুমে জানাতে সক্ষম হন যে, তিনি সহ বিমানটি হাইজ্যাক হয়েছে। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার মিনহাজের বার্তা শুনতে পায়। কন্ট্রোল টাওয়ারে তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বাংগালী অফিসার পাইলট অফিসার ফরিদুজ্জামানও উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মতিউর রহমান বিমানটি চালিয়ে পাকিস্তান সীমান্ত পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেন।
-    ভারত সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছে যাওয়া অবস্থায় রশীদ মিনহাজ জ্ঞান ফিরে পান এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেন। এ সময় রশীদ মিনহাজের সাথে টি-৩৩ বিমানের নিয়ন্ত্রন নিয়ে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে পাকিস্তানের থাট্টা নামক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।
-    ২০ই আগস্ট ১৯৭১ একই ঘটনায় মতিউর রহমান এবং রশীদ মিনহাজ স্ব স্ব দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেন। দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ সরকার ফ্লাইট লেফটেনেন্ট শহীদ মতিউর রহমানকে তাঁর সাহসী ভূমিকার জন্য বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে এবং রশীদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক ‘নিশান ই হায়দার’ খেতাব প্রদান করে। প্রসঙ্গতঃ একই ঘটনায় দুই বিপরীত ভূমিকার জন্য দুইজনকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব প্রদানের এমন ঘটনা সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা। কিন্তু বিমান বাহিনীর সদস্য হিসেবে এই বীরশ্রেষ্ঠ সম্পর্কে আরও অধিক কিছু জানার আগ্রহ ও কৌতুহল স্বভাবতই মনের মধ্যে সর্বদা ছিল। আর তাই পাকিস্তানে তাঁর সর্বশেষ কর্মস্থল পি এ এফ বেস মাসরুর পরিদর্শন করার জন্য উদগ্রীব ছিলাম। 
-    ২০০০ সালের ১১ই মে মধ্যরাতে পিআইএ-এর ফ্লাইটে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই এবং ভোরবেলায় করাচি বিমান বন্দরে অবতরন করি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ যে তখন বেশ অস্বাভাবিক ও থমথমে ছিল তা করাচী বিমানবন্দরে অবতরনের পরই টের পেলাম। জনগনের ভোটে নির্বাচিত নওয়াজ শরীফের সরকারকে উৎখাত করে তখন জেনারেল পারভেজ মোশারফ দেশের চীফ এক্সিকিউটিভের পদে আসীন। আমাকে রিসিভ করার জন্য পাকিস্তান বিমান বাহিনীর দুইজন সশস্ত্র বিমানসেনা এসে কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে সরাসরি নিয়ে গেল করাচীতে অবস্থিত বিমান বাহিনী ঘাঁটি ফয়সালে। সেদিন বিকেলেই আমি পরবর্তী ফ্লাইটে চলে গেলাম পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার প্রদেশের পেশোয়ারে অবস্থিত পিএএফ ক্যাম্প বাডাবের (PAF Camp Badaber)এ। সেখানে যাওয়ার পর আমার জন্য প্রদত্ত আরও অধিক কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে কিছুটা অবাক হলাম, কেননা আমার সমপর্যায়ের অফিসারের জন্য এমন ভিআইপি-টাইপ নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বাভাবিক বিষয় নয়! পরে জানতে পারি, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশী সামরিক ও বেসামরিক অতিথিদের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখছে। পেশোয়ারে নিরাপত্তাজনিত কারনে মোটামুটি এক ধরনের বন্দী জীবন যাপন করছিলাম। শিডিউলজনিত ব্যস্ততা ও সফরসুচীর সীমাবদ্ধতার কারনে আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর আমাকে পিএ এফবেস মাসরুর পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে দিতে পারেননি। অনেকটা বেদনাহত মন নিয়ে আমি দেশে ফিরে আসি। বাংলাদেশে ফিরে আসার কিছুদিন পর আমাকে বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে সহকারী বিমান বাহিনী প্রধান(প্রশাসন) এয়ার কমোডর ফখরুল আজম (পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল ও বিমান বাহিনী প্রধান)এর স্টাফ অফিসার হিসেবে বদলী করা হয়। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর তিনি পাকিস্তানে আমার প্রশিক্ষন ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। এক পর্যায়ে আমি বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের সমাধিতে যেতে না পারার কষ্টের কথা তাঁর কাছে প্রকাশ করি। আমার কথা শুনে সদা হাস্যজ্জল মানুষটির মুখে হঠাৎ করেই এক বিষাদের ছায়া ভিড় করে- যেন এক নিমিষে তিনি সুদূর কোন ট্র্যাজিক স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেন। কিছুক্ষন নীরব থাকার পর তিনি ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যা বললেন, তা ইতিহাসের এক মুল্যবান তথ্য হিসেবে বিবেচিত হবে নিঃসন্দেহে। আমি দারুণ উৎসাহ নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাঁর সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে তা শুনতে লাগলাম। তিনি আমাকে বসতে বললেন এবং সেই অজানা ইতিহাসের কিছুটা বর্ণনা দিতে থাকলেন। 

পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পুর্বেই বাঙালী পাইলটদেরকে অলিখিতভাবে ফ্লাইং ডিউটি থেকে সরিয়ে দিয়ে কৌশলে বিভিন্ন গ্রাউন্ড ডিউটিতে নিয়োগ করে পাকিস্তান বিমান বাহিনী কতৃপক্ষ। ফখরুল আজম তখন সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত পাইলট অফিসার। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ছুটি কাটিয়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনী ঘাঁটি মাসরুরে ফিরে গেলে তাঁকে ঘাটির ফ্লাইট সেফটি অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, পাশাপাশি সেকেন্ডারি দায়িত্ব হিসেবে যুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন এয়ারক্রাফট রাখার জন্য নির্মানাধীন স্থাপনার কাজ সুপারভাইজ করতে বলা হয়, যা মূলত গ্যারিসন ইঞ্জিনিয়ারের কাজ। তাঁর ডেপুটি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় পাইলট অফিসার ফখরুল আজমকে। অর্থাৎ বিভিন্ন ছলাকলার মাধ্যমে বাঙালী পাইলটদের বিমান চালানো থেকে বিরত রাখার কৌশল অবলম্বন করা হয়। এক ধরনের ক্ষোভ নিয়ে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর এবং পাইলট অফিসার আজম তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর পাইলট অফিসার আজমকে ভীষন স্নেহ করতেন এবং অনেকটা অভিভাবকের মত তাঁকে দেখভাল করতেন।
-    চারিদিকে তখন অস্থির সময়, বাঙালি অফিসারদের প্রতি পাকিস্তানিদের অবিশ্বাস ও সন্দেহ বাড়ছিল দিন দিন। ফ্লাঃ লেঃ মতিউর কিছুটা অস্থির ও উত্তেজনাকর বিক্ষুদ্ধ সময় কাটাতে থাকেন। মতিউর রহমান বিমান ছিনতাই করে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের পরিকল্পনার বিষয়টি নিজের মাঝেই গোপন রাখেন, যদিও তাঁর আচার আচরন ও একান্ত আলাপচারিতায় পাইলট অফিসার আজম আঁচ করতে পারেন যে, তিনি হয়তো বিশেষ কিছু একটা করতে যাচ্ছেন। তবে কোনো কিছু স্পষ্ট করে বুঝে উঠা সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ সালের ২০শে আগস্ট সকালেও ফ্লাঃ লেঃ মতিউর রহমান পাইলট অফিসার আজমকে মনোবল চাঙ্গা রেখে কাজ করে যাওয়ার উপদেশ দিয়ে কিছুটা হাসি ঠাট্টার মাঝে সময় কাটান। এরপর তিনি একটি নতুন স্বাধীন জাতির স্বপ্নকে হৃদয়ে লালন করে তা বাস্তবায়ন করার জন্য বিমান ছিনতাই করে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা পথে দুর্ভাগ্যজনকভাবে শাহাদাৎবরণ করেন। তাঁর জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তাঁর অধীনে বাঙালি অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন পাইলট অফিসার ফখরুল আজম। এই ঘটনার পরপরই পাইলট অফিসার ফখরুল আজমের ভাই বিশ্বখ্যাত ফাইটার পাইলট স্কোয়াড্রন লীডার সাইফুল আজমকে (পরবর্তীতে অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন)বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং পাইলট অফিসার ফখরুল আজম সহ অন্যান্য বাঙালি অফিসারদের উপর আরও কড়াকড়ি নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। সেইসব দিনের স্মৃতিচারণ করে এয়ার কমোডর আজম কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে থাকেন কিছুক্ষণ।       
-    ২০০২ সালের ৮ই এপ্রিল এয়ার কমোডর ফখরুল আজম বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ঐদিনই এয়ার ভাইস মার্শাল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। উক্ত দিন থেকে আমাকে তাঁর এপিএস হিসেবে বদলী করা হয়। নতুন দায়িত্বে ব্যস্ততম সময় কাটতে থাকে। বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, বিদেশী দুতাবাসগুলোর কূটনৈতিক ও মিলিটারি অ্যাট্যাশে থেকে শুরু করে অনেক ব্যক্তিগত শুভানুধ্যায়ী নবনিযুক্ত বিমান বাহিনী প্রধানের সাথে সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের জন্য বিমান সদরে আসেন। তাঁদের জন্য ভিজিট প্রোগ্রাম প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজে পিএসকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি অন্যান্য দাপ্তরিক কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এরই মধ্যে একদিন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাঃ লেঃ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিসেস মিলি রহমান বিমানবাহিনী প্রধানের সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিমানবাহিনী প্রধান নির্দেশ দিয়ে বলেন “আমার সুবিধাজনক সময় নয় বরং ভাবী (মিলি রহমান)র কখন সুবিধা হবে বিমান সদরে আমন্ত্রিত হয়ে আসতে সেই অনুযায়ী যেন ভিজিট প্রোগ্রাম তৈয়ারি করা হয়।” বীরশ্রেষ্ঠ’র পরিবারের প্রতি বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজমের এই বিশেষ শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি সহজেই অনুমেয়। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এই বীরশ্রেষ্ঠ ও তাঁর পরিবারের সাথে এভিএম ফখরুল আজমের রয়েছে সুদুর অতীতের অনেক মুল্যবান ও পবিত্র স্মৃতির মেলবন্ধন।


নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী মিসেস মিলি রহমান বিমান সদরে এলেন, এবং আমরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানালাম। বিমান বাহিনী প্রধানের সাথে কুশল বিনিময় ও কিছু স্মৃতিচারণ শেষে অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি বললেন, “রনি ভাই, (এভিএম ফখরুল আজমের ডাক নাম) আমি ইতিপুর্বে অনেকবার অনেককে অনুরোধ করেছি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য। আমার বিশ্বাস, যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাণ দিয়েছেন, সেই দেশের মাটির ছোঁয়া পেলে তাঁর আত্মাটুকু অন্তত শান্তি পাবে।” তাঁর কথা শুনে এভিএম ফখরুল আজম বলেন “ভাবী, আমি নিজেও বহুদিন এমনটি ভেবেছি। আমি তো তাঁর জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। আমি অবশ্যই এই ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করব। মিলি রহমান বিমান বাহিনী প্রধানের কথায় অত্যন্ত আশ্বস্ত হয়ে বিদায় নেয়ার প্রাক্কালে বললেন “ভাই, আপনার প্রতি আমার অনেক আস্থা, মতিউর আপনাকে ভীষন পছন্দ করতেন। তাঁর শেষদিনের স্মৃতিগুলো আপনি ছাড়া এতো ভালো করে আর কে জানেন!” 
মিলি রহমানকে বিদায় জানানোর পর এভিএম আজম দ্রুত সিদ্বান্ত নিলেন এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংগে জরুরী ভিত্তিতে আলোচনা করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার প্রাক্কালে বিমান বাহিনী প্রধান এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা সম্পর্কে প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে বিমান বাহিনী প্রধান বিষয়টি উত্থাপন করেন। বেগম জিয়া উত্থাপিত বিষয়বস্তু ও তাঁর প্রস্তাব শোনার সংগে সংগেই অত্যন্ত গুরুত্ব ও আগ্রহ সহকারে বিমান বাহিনী প্রধানকে নির্দেশ দেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করার জন্য। এবং তিনি আরও বলেন যে, “আমি স্বয়ং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়গুলোকে নির্দেশ দিব সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে বিমান বাহিনী সদর দপ্তরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এই বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য। আপনি আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ’র দেহাবশেষ পুর্নাঙ্গ মর্যাদা সহকারে দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করুন।” এখানে উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের সমাধি স্থানান্তরের মহান দায়িত্ব পালনে নবগঠিত মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জনাব রেদোয়ান আহমেদ এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক রেজাউল করিম সহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগন আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন। 

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয় এবং বিমান সদরের পক্ষ থেকে সেই কমিটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে এয়ার কমোডর লিয়াকতকে দায়িত্ব দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একযোগে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেন। কমিটির কর্মপদ্ধতি ও পরিধির একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল বীরশ্রেষ্ঠ’র দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে কোথায় সমাহিত করা হবে, সেই স্থান নির্বাচন করা। সম্ভাব্য তিনটি স্থানের তালিকা করা হয়; যার মধ্যে একটি বিমান বাহিনী ঘাঁটি কুর্মিটোলায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বর, অন্যটি তেজগাঁও রানওয়ের দক্ষিন পশ্চিম কোনায় বিজয় স্মরণির নিকটে, এবং অপরটি মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে। সবশেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত করার বিষয়টি চুড়ান্ত করা হয়। কমিটির কাজের অগ্রগতি এবং স্থান নির্বাচনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবগত করা হলে তিনি তাঁতে সম্মতি দিয়ে বিমান বাহিনী প্রধানকে বলেন যে, “বীরশ্রেষ্ঠ’র প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, তা আপনারা করুন। এই বিষয়ে আমার পুর্ণ সমর্থন, সার্বিক সহযোগিতা ও অনুমতি রইল।” বিমান সদরের পক্ষ থেকে কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন করে কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন এবং কমিটির কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে বিমান বাহিনী প্রধানের সম্মেলন কক্ষে ব্রীফিং ও মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়। সেই সকল ব্রিফিং/মিটিং এর আয়োজনে সংশ্লিষ্ট থাকতে পেরে নিজেকে আজও ভীষণ সৌভাগ্যবান মনে হয়। দুই দেশের সরকারের বিভিন্ন মত্রনালয়ের মাঝে পারস্পারিক যোগাযোগ,সহযোগিতাপূর্ণ কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে চলতে থাকে। পাশাপাশি দুই দেশের বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব ও যত্ন সহকারে দেখভাল করতে থাকে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল কলিম সাদাত (মার্চ ২০০৩- মার্চ ২০০৬) ছিলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজমের কোর্সমেট। তারা পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে একই কোর্সে কমিশনপ্রাপ্ত হন। এভিএম ফখরুল আজম তাঁর কোর্সমেট ও পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধানকেও টেলিফোন করে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অনুরোধ করলে এয়ার চীফ মার্শাল কলিম সাদাত তাঁকে তাঁর পুর্ণাঙ্গ সহযোগিতার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে একটি ঐতিহাসিক মহেন্দ্রক্ষনের দিকে সময় গড়াতে থাকল। দুই দেশের সরকারী পর্যায়ে ক্রমাগত যোগাযোগের মাধ্যমে ২০০৬ সালে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সমস্ত ফর্মালিটিজ সম্পন্ন করা হয়। তাঁর দেহাবশেষ ধর্মীয় নিয়ম মেনে এবং পূর্ণমর্যাদা সহকারে পাকিস্তানের মাটি থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বহন করে আনার জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে এয়ার কমোডর লিয়াকত পাকিস্তানে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহন করেন। পাকিস্তান যাত্রার পূর্বে বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজম এয়ার কমোডর লিয়াকত এবং অন্যান্য সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, আমরা সকলেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কর্মের সফল পরিসমাপ্তির কাছাকাছি পৌঁছেছি। পুরো জাতি বীরশ্রেষ্ঠ’র আগমনের প্রতীক্ষায় রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, তিনি পাকিস্তান থেকে যথাযথ মর্যাদার সাথে নিজ দেশে ফিরতে পারবেন। বিমান বাহিনী প্রধান পূণরায় সকলকে মনে করিয়ে দিয়ে বলেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বারংবার আমাকে স্মরণ করে দিয়েছেন যে, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান যেন একজন বীরের মর্যাদা নিয়েই পাকিস্তানের মাটি ত্যাগ করেন এবং এতে যেন কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। বিমান বাহিনী প্রধান আরও বলেন যে, পাকিস্তানে যাওয়ার পর কোন কিছুর প্রয়োজন হলে যেন সরাসরি তাঁকে ফোনে জানানো হয়। 

এয়ার কমোডর লিয়াকত পাকিস্তানে যাওয়ার পর অনুভব করেন বা ধারণা করেন যে, বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কফিন যদি বিমানবন্দরে স্বাভাবিক বহির্গমনের পথে বহন করে বিমানে তোলার চেষ্টা করা হয় এবং পাকিস্তানের জনগন যদি সেটা জানতে পারে তবে বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও হতে পারে, যা ছিল সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত শংকা এবং তাঁর শংকার বিষয়টি তিনি বাংলাদেশে বিমান বাহিনী প্রধানকে ফোন করে অবগত করলে বিমান বাহিনী প্রধান তাঁকে পাকিস্তান এয়ারফোর্স বেস মাসরুরের বেস কমান্ডারের সাথে কথা বলে বিশেষ ব্যবস্থায় বিমানে তোলার নির্দেশ দেন। এয়ার কমোডর লিয়াকত বেস কমান্ডারের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে এভিএম ফখরুল আজমের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করিয়ে দেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান পাকিস্তান এয়ারফোর্স বেস মাসরুরের বেস কমান্ডারকে তাঁর ইচ্ছা ও প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করতেই বেস কমান্ডার পরম শ্রদ্বার সাথে তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে, তারা এই ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। পাকিস্তান সরকার পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে বিদায় জানায়,যা আরেকটি নতুন  ইতিহাসের সৃষ্টি করলো! অর্থাৎ যাকে পাকিস্তানীরা ‘গাদ্দার’ বলে দারুণ অবহেলায় সমাধিস্থ করেছিল, সেই পাকিস্তানীরাই ৩৫ বছর পরে সশস্ত্র সালাম প্রদানের মাধ্যমে সম্মান জানিয়ে তাঁকে বিদায় সম্ভাষণ দিল। এই অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিমান বাহিনী প্রধানের অবদানের কথা নিঃসন্দেহে এদেশের জনগন ও ইতিহাস শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের সমাধি, বুদ্ধিজীবী গোরস্তান, মিরপুর, ঢাকা
অবশেষে ২০০৬ সালের ২৪শে জুন-সব বাঁধা বিপত্তি ও প্রতীক্ষা পেরিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তাঁর প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করলেন। তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। হাজার হাজার মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান যেন সেই অমর বাণীকেই আরেকবার সত্য বলে প্রমাণ করলেন-
“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী 
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই ওরে ক্ষয় নাই”। 
লেখক: nomaan1966@gmail.com