বৃহস্পতিবার, ১৭-অক্টোবর ২০১৯, ০৬:২৮ পূর্বাহ্ন

পাসপোর্ট অফিসে এক দিবস

shershanews24.com

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর, ২০১৯ ০৮:৫৪ অপরাহ্ন

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: আম্মা আর ছোট মেয়ের পাসপোর্ট নবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। আবার আমার বেয়াই ও বেয়াইন (আমি তাঁকে আপা বলেই ডাকি)-র নতুন পাসপোর্ট করতে হবে। দিনক্ষণ ঠিক করে গতকালকের দিনটাকে বরাদ্দ করলাম পাসপোর্ট অফিসের জন্য।
দুবছর আগে যখন নিজের পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়েছি তখন বিরক্ত হয়েছি নবায়নের জন্য কেন নতুন আবেদনের মত করে আবেদন করতে হবে। পাসপোর্ট অফিস বলেছিল লাগবে। তাই ফরম -১ ও ফরম-২ পূরণ করলাম আম্মা ও মেয়ের জন্য। বেয়াই ও আপা ফরম-১ পূরণ করিয়ে প্রস্তুত।পাসপোর্ট অফিসে আমার প্রিয়ভাজন একজন কর্মকর্তা আছেন। তাঁকে ফোন করে রেখেছিলাম, তাঁরই ভরসায় বেলা ১১ টায় পৌঁছলাম আগারগাঁয়ে।তিনি তখন সভায়। তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নতুন করে গুছিয়ে দিলেন ফরমগুলো। এবার জানলাম- নবায়ন করতে এখন আর ফরম-১ লাগে না। আরো জানলাম- ফরম-১ কাগজের এপিঠ ওপিঠে মূদ্রণ করতে হবে, নইলে মহাভারত পুনর্লিখন। তবে তিনি রক্ষা করলেন- সাজিয়ে দিলেন এপিঠ ওপিঠে মূদ্রণের মত করে।আহা এ কথাগুলো যদি ১৪ টি পৃষ্ঠার মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট নির্দেশিকা-২০১৬’ তে থাকতো তাহলে আম জনতার কী উপকারই না হতো। পিও সাহেব অবশ্য উত্তর দিলেন আমাদের কাছে আগে জেনে নিলেই পারতেন।যাইহোক প্রিয়ভাজন কর্মকর্তার সইসাবুদ নিয়ে চললাম কক্ষ ১০১ এ।
১০১ এ দুই দরজা, দুই কক্ষ। এককক্ষের দরজায় সারিবদ্ধ নারীই বেশি দুয়েকজন পুরুষ আরেক কক্ষের দরজায় নারী পুরুষ উভয়ই।সংখ্যাসাম্যের কক্ষকেই নিরাপদ ভাবলাম। দ্বারে আনসার প্রহরায়, ভিতরেও আনসার কয়েকজন।নিরাপদ প্রকোষ্ঠের দ্বারীকে শুধোলাম কোনটায় যাবো।তিনি বললেন বাইরে দাঁড়ান, ভিতরে ভিড় কমুক, তারপর ঢুকেন।তথাস্তু। দেখি আবারো এক আনসারসহ কয়েকজন ঢুকে গেল ভিতরে। দ্বারী আমায় বললেন, আপনি আর দাঁড়ায় থাকবেন কেন, ভিতরে যান। আবারো জো হুকুম। ভিতরে যেয়ে ঠাহর করলাম, চেয়ারে বসা এক কর্তার সামনে ছোট টেবিল, সেই টেবিল ঘিরে মানুষ, যেন চিনির দানায় পিঁপড়ের ঢল। আমারও তখন মোক্ষ ঐ টেবিল ছোঁয়া।ফাঁকফুঁক গলিয়ে ডান দিক দিয়ে একটু যখন এগিয়েছি তখনই এক বামাকন্ঠ- আমাকে যেতে দিন, আমাকে যেতে দিন। আমি তৈলাক্ত বাঁশ বাওয়ার মত করে পিছিয়ে গেলাম কয়েক পা।
এবার দেখি এক মজার কাণ্ড। টেবিল ছুলেই যে কর্তার নাগাল পাওয়া যায় তা নয়। তিনি হাত বাড়িয়ে ডান বাম সামনে থেকে ফাইল নিচ্ছেন। তখনো ছুইনি টেবিল, হাত এগোল আমার পানে। সই সিল ছাপ্পড় মারার পর জানতে চাইলাম কই যাব? শুনলাম ৩০১।
লিফট আছে তবে ৫ এর নিচে বিরতি নেই। আমার বেয়াই সাহেবের শরীর ইংরেজ আমলের। আপাও আমার ৪ বছর আগে অবসরে গেছেন। ভাগ্যিস আম্মাকে সঙ্গে আনিনি, নবায়নের জন্য লাগবে না এই আশায়। অতএব থাকিতে চরণ, মরণে কি ভয় গাইতে গাইতে সিঁড়ি ভাঙ্গি।
তিনতলায় ৩০১ আর ৩০৫ পাশাপাশি। করিডোর দিয়ে ঢুকে হাতের বামে ৩০১ আর ডানে ৩০৫। আমরা যেহেতু আদিষ্ট হয়েছি ৩০১ এর জন্য তাই দাঁড়িয়ে গেলাম ৩০১ এর কাতারে। ৩০৫ এর প্রচণ্ড ভিড়ের তুলনায় ৩০১ এ ভিড় কম। ভাবলাম বোধকরি সু্বিধা পেয়েছি।মহিলা পুরুষ লেখা দুটি ঘুলঘুলি। মহিলা কাতারে ভিড় বেশি দেখে আমিই দাঁড়ালাম।তবে কাতার আগে বাড়ে না। আমার সামনে যে ৫জন সেই ৫ জনই। পিছনে বাড়ছে। বেলা দুটোর কাছাকছি সময়ে ঘুলঘুলি বললো লাঞ্চে যাব। পরে আসেন। সামনের দুজন বলে উঠলেন আমরা যারা লাইনে আছি তাদেরটা নিয়ে রাখুন, পরে ডেকে ডেকে দিয়েন। দয়ার শরীর। রাজি হয়ে গেলেন।আমার হাতের ফাইল দেখে বললেন, আপনি এ লাইনে কেন? নবায়নের দুটোর জন্য যাবেন ৩০৫ এ। আর নতুন দুটো তো অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী- তাঁদের ছবি তুলতে সোজা ৪০৩ নম্বর কক্ষে।
আহারে এই বাণীটাই যদি আগে জানতাম! মেয়েকে ৩০৫ এর বিশাল তরঙ্গরাশির শেষপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে বেয়াই সাহেব ও আপাকে নিয়ে চললাম ৪০৩ এ। দুয়ারে দ্বারী নেই। দ্বার ঠেলে ভিতরে যেয়ে বেয়াই ও আপাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলাম। লাইন থেকে একটু দূরে চেয়ার টেবিলে এক সৈনিক বললেন এখানে ফাইল জমা দিয়ে বাইরে বসুন।সানন্দে। ফাইল দুটো জমা দিয়ে করিডোরে অবস্থান। ডায়াবেটিস জানান দিচ্ছে কিছু খা, কিছু খা। কেমন করে যেন আপাও বুঝে গেলেন। বাড়িয়ে দিলেন বিস্কুট ও পানি। আহা কী তৃপ্তি! তাঁরা দুজন তো পড়ে গেলেন সিস্টেমে। ফাইল জমা, যখন ডাকবে তখন হাজিরা। আমি চললাম নিচে মেয়ের অবস্থান দেখতে। না এগোয়নি, এক রত্তিও।বিবেচনা করলাম এই জলধি কূল পেতে পেতে অফিসের সময় শেষ হয়ে যেতে পারে। মেয়েকে বললাম, চল বাসায় যাই। কাল শবেবরাতের ছুটি, পরশু সক্কালে আসবো- ঘুলঘুলিতে লোক বসার আগেই।বেলা দুটোর পরপর আমরা লালমাটিয়ার পথে।
জ্যামমুক্ত পথে দ্রুতই বাসায় পৌঁছলাম। রাস্তায় বাসায় আসার পথে পাল্টালাম সিদ্ধান্ত। বাসা থেকে আবার রওনা দেব সাড়ে তিনটায়।নামাজ পড়ে, খেয়ে দেয়ে ঠিকঠিক সাড়ে তিনটায় রওনা দিলাম। এবার আম্মাকে সঙ্গে নিলাম। যদি কোন ঘুলঘুলি বলে বসে উপস্থিতি লাগবে, তাই।
বেলা ৪টার পরে দেখি ৩০৫ এর সামনে একটা স্বস্তিদায়ক ভিড়। কাঁচের উপর সাটানো নোটিশটাও চোখে পড়লো। যাদের ছবি তুলতে হবে না আগের মত করেই নবায়ন হবে তাদের জন্য এই ঘুলঘুলি। মেয়ের ছবি পাল্টাতে হবে। যে ছবি আছে পাসপোর্টে তাতে সে এখনো স্কুলের ছাত্রী। জানলাম মেয়েকে যেতে হবে ৪০৩ এ। আবারো আহারে, যদি আগে জানতাম কোন ভাবে! আপা ও বেয়াই সাহেব ছবিটবি তুলে সাড়ে তিনটায় বাড়ির পথ ধরেছেন।
 মেয়ে গেল ৪০৩ এ, আম্মাকে নিয়ে আমি ৩০৫ এ। ইত্যবসরে দেখি আমরা জনসমূদ্র ত্যাগ করার সময় মেয়ের সামনে সে মহিলা ছিলেন তিনি তৃপ্তির হাসি হাসতে হাসতে ঘুলঘুলি ছাড়ছেন। ৫টা বাজার মিনিট দশেক আগে আম্মা ঘুলঘুলি ছুলেন। আম্মার পরে আর কেউ নেই। ফাইল দিলেন এগিয়ে, ওপার থেকে অমোঘ বচন, ২০১ এ যেয়ে একটিভেট করে নিয়ে আসেন দ্রুত, ৫টা বাজলে আমি চলে যাব। তড়িঘড়ি ২০১ এর জন্য কাছের সিঁড়ি দিয়ে নিচে। দ্বারে সৈনিক প্রহরায়। তাঁকে বুঝিয়ে প্রবেশ। বেশ কটা ঘুলঘুলি। কাজ কোনটায় বুজছি না। এটি মূলতঃ পাসপোর্ট বিতরণ কক্ষ। ঘড়ির কাঁটা দৌড়াচ্ছে, ঘুলঘুলির চেয়ারও খালি হয়ে যাচ্ছে। আমি এ ঘুলঘুলি হতে ঐ ঘুলঘুলি করতে করতে জানলাম বামের অংশের ডানের কোনায় তিনি আমার ত্রাতা। ত্রাতার কাছে সোজাসুজি পাসপোর্ট পৌঁছানোর উপায় নেই। ডানে কাত হয়ে পাসপোর্ট দিলাম। তিনি লেজার দিয়ে কী কী করে দিয়ে ফেরত দিলেন। এখন দেখি শরীরে তরুণ বয়সের তাগদ এসে গেছে, প্রায় দৌড়ে উঠলাম ৩০৫ এ। কপাল ভাল, তখনো ঘুলঘুলি কর্তা রয়েছেন। আম্মার ফাইল জমা হলো। পাসপোর্ট পাওয়া যাবে নতুন। এবার মেয়ের খোঁজ। আমরা সিঁড়ির কাছে আসতেই দেখি মেয়ে নামছে। কাকতালীয়ভাবে আম্মা আর মেয়র এনরোলমেন্ট আইডি দুটো পরপর। তবে দেয় স্লিপে মেয়ের ফোন নম্বর ভুল লিখেছে। তার মানে মেয়ে এসএমএস পাবে না। জানতে পারবে না তার পাসপোর্ট রেডি হলো কিনা। আবার দৌড়ালো ৪০৩ এ, বলা হলো সংশোধন হবে না। নিয়ম আছে, স্লিপে ভুল হলে সাথে সাথে যেতে হবে ৬০৫ এ, তারাই কেবল সংশোধন করে দিতে পারে। সারা দিনের এত ধ্যন্তারার পর আর ইচ্ছা হলো না ৬০৫ এ যাই। যাই হোক তবুও তো পাসপোর্টের ফাইলগুলো জমা হলো সারাটা দিন কাটিয়ে।
এবার উলুবনে কিছু ছাই (মোটেও মুক্তা না) ছড়াই। যারা পাসপোর্ট নিতে যান তাদেরকে পাসপোর্ট অধিদপ্তর ’মানুষ’ মনে করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আগারগাঁও অফিস দিনে প্রায় ২০০০ মানুষের পাসপোর্ট সেবা দেয়। আবার সমসংখ্যক মানুষকে বিকালে দিতে হয় তৈরি পাসপোর্ট। একই মানুষকে দৌড়াতে হয় ১০১, ৩০১, ৩০৫/৪০৩ আবার কখনো কখনো ২০১, ৬০৫ এ। ফলে সংখ্যাটা চার হাজারের জায়গায় হয়ে পড়ে প্রায় হাজার দশেক। যদি ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ দেয়া যেতো তাহলে খুবই ভাল হতো, তাহলে সংখ্যাটা চার হাজারই থাকতো। এজন্য প্রয়োজন একটা বড় মানে বিশাল হল রুমে কমপক্ষে কুড়িটা ঘুলঘুলি বানিয়ে পাসপোর্টপ্রার্থীদের সেবা দেয়া। এরফলে মানুষের ইঁদুর দৌড় বন্ধ হয়ে যাবে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পৌঁছানো মানুষ সর্বোচ্চ এক ঘন্টায় সেবা পেতে পারবে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েব সাইটে এবং বাহিরে বিলবোর্ডে লিখে দিলেই হয় নতুন আবেদনের প্রিন্ট কাগজের দুই পিঠে নিতে হবে; কাগজপত্র কোন ধারাবাহিকতায় সাজাতে হবে এবং ফিসের হার কত। ওয়েব সাইটে প্রবেশের পর দুটো অপসন দিক- নতুন আবেদন আর নবায়ন। যার যা অপসন সে মতে আবেদন ফরম পূরণের ব্যবস্থা নেয়া হোক।
এটা খুবই অবাক করে যে, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েব সাইটের ফিসের হার দেয়া নাই।পুরাতন পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে নবায়ন করতে জরিমানা দিতে হয়। সে কথাও ওয়েবসাইটে নেই। মেযাদশেষে একদিন পেরিয়ে গেলেই জরিমানা ৩০০ টাকা যোগ ভ্যাট ৪৫ টাকা। প্রতি বৎসরের জন্য বৎসরের সংখ্যা দিয়ে গুণন।
পাসপোর্ট অধিদপ্তর যদি এসব সমাধান করতে নাইই পারে তাহলে লাইসেন্সধারী সেবাকারী নিয়োগ করুক। যেসব সেবাকারীগণ প্রতি পাসপোর্টের জন্য ৫০০.০০ টাকা সার্ভিস চার্জ নিয়ে ছবি তোলানোর ঘরে পৌঁছে দিয়ে নির্দিষ্ট তারিখে পাসপোর্ট তুলে দেবে। হয় বৈধ দালাল বা সেবাদাতা যাই বলি নিয়োগ করুক নইলে মানুষকে মানুষ মনে করে ভোগান্তি কমাক।