রবিবার, ৩১-মে ২০২০, ০১:০৪ অপরাহ্ন

ত্রাণ বিতরণে ফটোসেশন কাম্য নয় -কাম্য মানবসেবা

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ মে, ২০২০ ০৬:২৬ অপরাহ্ন

 

প্রফেসর ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে মানুষ যখন গৃহবন্দি এবং খিদার জ্বালায় দিশেহারা -  তখন সরকার এবং বিত্তবানদের সহযোগিতার হাত সর্ব মহলের প্রশংসা কুড়াচ্ছে l কিন্তু ত্রাণ বিতরণে নানা অনিয়ম ও অদক্ষতা এবং বিতরণের সময় ত্রাণ হাতে নিয়ে ছবি তোলা একটি বাজে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে l শুধু ছবি তোলাই নয়, ফেসবুকে আপলোড করা, বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে ছাপিয়ে দেওয়া, এমনকি ভিডিও প্রচার করা হয় l এতে নানা সমালোচনায় পড়ছে নেতা-নেতৃবৃন্দ l ত্রাণের পরিমাণ খুব একটা চোখে না পড়লেও ছবি তোলার মহা আয়োজন কারো দৃষ্টিতেই বাদ পড়ে না l ঠিকমতো ছবি উঠাতে না পারলে সেই ক্যামেরাম্যানের অবস্থা যে কি হয় আল্লাহই জানে l ক্ষুধার্ত ত্রাণ গ্রহীতা ঠিকমতো ছবির সামনে পোজ দিতে না পারলে চড়-থাপ্পড়, গলাধাক্কা, এমনকি ত্রাণ কেড়ে নেওয়ার কাহিনী এখন অনেকেই জানে l ত্রাণ দেওয়ার ছবি তোলার পর তা আবার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও আছে এবং প্রতিবাদ করায় উল্টো মারধরের শিকার হয়েছেন (চট্টগ্রামের হাটহাজারী: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ এপ্রিল, ২০২০)। এ ধরনের আরো অনেক দৃশ্য পত্রিকায় হরহামেশাই ছাপা হয়, বিভিন্ন টেলিভিশনেও দেখা যায় l ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, কালো চশমা এবং আশেপাশে কয়েকজন সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ত্রাণ বিতরণের এই মহা উৎসব চলছেই চলছে l উদ্দেশ্য একটাই - ফটোসেশন এবং বড় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ, মানবসেবা নয় l

নেতা ত্রাণ দিবে এই অপেক্ষায় ক্ষুধার্ত মানুষগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে আরও নির্জীব হয়ে পড়ে l  কিন্তু কি আর করা l অদৃশ্য এই মহামারীর দুর্যোগকালে কোন কাজকর্ম নেই, আয়-রোজগারও নেই l তাই অপেক্ষায় থাকতেই হবে l অপেক্ষা শেষে যে পরিমাণ ত্রাণ পায়, তা নেতার কথার সাথে কোন মিল থাকেনা l নেতা দেয় ১০ কেজি কিন্তু বাস্তবে থাকে তার চেয়ে অনেক কম,  বড়জোর ৭ কেজি l নেতাদের এসব কর্মকাণ্ডে বিব্রত সরকার এবং সভ্য সমাজ l আজকাল অনেকেই বলে থাকেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউই কোন কাজ করছে না l তারা শুধু নিজেদের পকেট ভারি করছে, সম্পদ বিদেশে পাঠাচ্ছে এবং সেখানেই সেকেন্ড হোম তৈরি করছে l অর্থাৎ সময় ও সুযোগ বুঝে স্থায়ী বসবাসের জন্য সেখানে উড়াল দেবে l অবশ্য সর্বক্ষেত্রে  এমনটি হয় তা নয় l অনেক নেতা দেশের জন্য কাজ করছেন মনেপ্রাণে, গরীবদেরকে সাহায্য করছেন নিজের তহবিল থেকেও l ১০ টাকা কেজি দরের চাল অনেক  জনপ্রতিনিধি ফ্রী দিচ্ছেন এমন নজিরও আছে l তারা ছবি তোলা কিংবা ফেসবুকে আপলোড করার চেয়ে জনসেবাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন l তাদের উদ্দেশ্য ফটোসেশন নয় l

ছবি তুলতে যেয়ে কার আগে কে দাঁড়াবে কিংবা কোন নেতার পাশে কে থাকবে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা l চলে হাতাহাতি, মারামারি, এমনকি হতাহতের ঘটনাও ঘটছে অহরহ l ছবি তোলার এই প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে কৃষকের ধান কাটাকে কেন্দ্র করে l তবে এক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে আছে নারী নেতৃবৃন্দ l বিউটি পার্লার থেকে মেকআপ নিয়ে দামি শাড়ি ও গাড়ির বহরসহ কাস্তে হাতে নিয়ে কৃষকের জমিতে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার যে স্টাইল - তা ঢালিউড বা বলিউডের আধুনিক সিনেমাকেও হার মানায় l নারী নেত্রীদের এইসব রোমান্টিক দৃশ্য দেখে পুরুষ নেতাদের মাথা কি আর ঠিক থাকে? তাই নায়কত্ব দেখাতে গিয়ে হাতের কাছে পাকা ধান না পেয়ে কাঁচা ধানই কাটছে আর ছবি তুলছে l তবুও অনেক ভালো যে ধান কেটে কৃষকের জমিতেই রেখে দিয়েছে l মাড়াই করে  বাড়িতে নিয়ে যায়নি l বস্তায় ভরে গুদামজাত করেনি কিংবা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখেনি l স্বল্পমূল্যে কোন অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেনি l আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর ভয়ে পুকুরে ফেলে দেয়নি l উদ্দেশ্য একটাই - ফটোসেশন এবং বড় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ, মানবসেবা নয় l

আসলে চোখে রঙ্গিন চশমা থাকলে গোটা পৃথিবীকেই রঙিন দেখায় l তাই হয়তোবা কাঁচা ধান পাকা মনে হয়েছে l এখানে ওই নেতার কোন দোষ নাই - দোষ ওই চশমার l অর্থাৎ “যত দোষ - নন্দ ঘোষ” l এখানে ক্যামেরাম্যানের কোন ভূমিকাই কার্যকর হওয়ার কথা নয় l সে তার চাকরি রক্ষার জন্যই ছবি তুলেছে l আবার ধান পাকতে পাকতে যদি করোনার দিন চলে যায় - তাহলে কিভাবে সে কৃষকের জমিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে? কিভাবে সে জাতিকে বুঝাবে যে কৃষকের জন্য তার প্রাণ কাঁদে? তাই অতি চালাক এই দরদী নেতা সময়ের সদ্ব্যবহার করতে কোনো রকম ভুল করে না l হয়তোবা এই ছবিই তাকে ভবিষ্যতে আরো অনেক বড় নেতা বানাতে সাহায্য করবে l তাই ছবি তুলতেই হবে l কারণ, উদ্দেশ্য একটাই - ফটোসেশন এবং বড় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ, মানবসেবা নয় l

ধরুন ধান কাটার সময় ছবির দৃশ্য ধারণ করতে যেয়ে হাত কেটে যায় কিংবা বিষাক্ত পোকামাকড় বা সাপে দংশন করে l তাহলে চিকিৎসা করবে কোথায়, দেশে নাকি বিদেশে? অবশ্যই বিদেশে l কারণ বিদেশের উন্নত চিকিৎসা শেষে জনদরদি এই কৃষক নেতাকে আবার কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে না? তাহলে কি এভাবেই চলতে থাকবে এসব নাটক এবং সিনেমা?  নাকি একবার নিজের বিবেককে প্রশ্ন করবেন? কি করছি আমি, মানবসেবা নাকি ভাওতাবাজি ? আসলে এসব নাটক, সিনেমা এবং ছবি সম্বলিত অপপ্রচার দীর্ঘকাল কেহই মনে রাখবে না l দেখতেই তো পাচ্ছি করোনায় আক্রান্ত মৃত বাবার জানাযায় নিজের সন্তানই যাচ্ছে না l তাহলে কি লাভ এসব করে?  দান করতে হবে ডান হাতে, যেন টের না পায় বাম হাত l হযরত ওমর (আ:) অন্ধকার রাতে হেঁটে হেঁটে ত্রাণ দিতেন দুঃখী মানুষের ঘরে l সেই সময়ে ছবি তোলার কোন ব্যবস্থা ছিল না l কিন্তু পনেরশত বৎসর পূর্বের ঘটনা মানুষ আজও ভুলেনি l ভুলবে না কিয়ামত পর্যন্ত l তাই দান করতে হবে সৎ নিয়তে, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য, মজলুমের কল্যাণে l কারণ মজলুম এবং আল্লাহ তালার মাঝে কোন পর্দা থাকে না l রাব্বুল আলামিনের কাছে মজলুমের দোয়া চাইতে দেরি - কিন্তু কবুল হতে দেরি হয় না l আপনার কৃতকর্মে সন্তুষ্ট হয়ে এরকম একজন মজলুমের দোয়াও যদি কবুল হয়ে যায় তাহলেই যথেষ্ট l ছবি, ফটোসেশন, ভিডিও কিংবা সম্পত্তি কিছুই সাথে যাবে না l যাবে সাথে আপনার কৃতকর্মের আমল l পরিহার করতে হবে এইসব লোভ দেখানো কর্মকাণ্ড l

প্রকৃতপক্ষে ছবি তোলার এই হীন স্বার্থ কারোই কাম্য নয় l কারণ এ ধরনের ছবি ও ফটো সেশন সরকারের অনেক সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে l কিন্তু প্রশ্ন হলো এরা কি আসলে নেতা ? এরা কি দেশ ও দশের এবং গরিবের সেবক? তাদের এই লোভ দেখানো ত্রাণ বিতরণের নামে ফটোসেশন কি দেশের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য কোন কাজে আসে? যদি তাই না হয়, তাহলে সরকারের তরফ থেকে দেওয়া ত্রাণ বিতরণের নামে ছবি উঠানো এবং তা মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেওয়ার হীন মানসিকতা এবং অপসংস্কৃতি পরিহার করতে হবে l প্রয়োজনে আইন করে এইসব অপচর্চা নিষিদ্ধ করতে হবে l এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ ও পদক্ষেপ একান্ত কাম্য l

পরিচালক (আইআইটি)
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়