শুক্রবার, ১৪-আগস্ট ২০২০, ০২:১৪ পূর্বাহ্ন

চীনের বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশকে বাণিজ্য ঘাটতি ও ঋনের ফাঁদে ফেলবে

shershanews24.com

প্রকাশ : ১২ জুলাই, ২০২০ ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

দীপাঞ্জন রায় চৌধুরি: বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চীনের পক্ষ থেকে নিছক এক কাগজে-কলমে থাকা প্রতিশ্রুতি। বেইজিং নিজস্ব  পণ্যের বাজারের বিষয়ে খুবই সচেতন। মহামারিকে কাজে লাগিয়ে চীন যাকে বাংলাদেশে কূটনৈতিক বিজয় বলছে, তা শুধুমাত্র একটি উদীয়মান অর্থনীতিকে ধ্বংসই করে দেবে।
চীনের দেয়া বাণিজ্য সুবিধার কারণে বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি ও ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে। এর ফলে ঢাকা বেইজিং এর চাপিয়ে দেয়া শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে। বাংলাদেশের উচিত শ্রীলঙ্কা থেকে শেখা। দেশটি চীনের ঋণের ফাঁদে পড়ে বেইজিং এর কাছে হাম্বানটোটা সমুদ্র বন্দর ৯৯ বছরের জন্য তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। যখন বিশ্ব করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত তখন চীন বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে।

এমন একটি সময় চীন এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে যখন করোনা ভাইরাসের কারণে দেশটির বিআরআই প্রজেক্ট ধীর হয়ে গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় এরইমধ্যে চীন ঋণ মওকুফের আবেদন পেতে শুরু করেছে। মালদ্বীপ চীনকে জানিয়েছে যে তারা ঋণ ফেরত দেয়ার বিষয়ে পুনরায় আলোচনায় বসতে চায়। অপরদিকে বাংলাদেশ চীনকে ঋণ ফেরতের সময় বৃদ্ধির অনুরোধ জানিয়েছে। আসন্ন মাসগুলোতে চীন থেকে ঋণ গ্রহণে ভাটা পড়তে যাচ্ছে। এক গবেষণাপত্রে এমনটাই দাবি করেছেন রাহুল ভাটিয়া ও দীপ পাল নামের দুই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

এদিকে, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি করছে ভারত। বাংলাদেশি বন্দর থেকে শুরু করে, আভ্যন্তরীণ নৌরুট, রেল ও হাইওয়ে দিয়ে ভারতে পণ্য পরিবহণ বৃদ্ধি করতে পারবে বাংলাদেশ। ভারত ছাড়াও, নেপাল ও ভুটানের বাজারেও ঢুকতে পারবে বাংলাদেশি পণ্য। দুই দেশের সরকারই ১৯৬৫ সালের পূর্বে থাকা রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের নদীপথ কাজে লাগিয়ে ভুটান ও ভারতে পণ্য পরিবহনেও কাজ করছে উভয় সরকার। এর অংশ হিসেবে জুন মাসে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতীয় পণ্য ত্রিপুরায় পৌছায়। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে আখাউড়া ও বিবিরবাজার স্থল বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগ চালু হয়। যদি এটি চালু থাকে তাহলে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য আমদানি-রপ্তানি চালু রাখতে পারবে। আর বাংলাদেশ এই পরিবহন থেকে শুল্ক আরোপ করে লাভবান হতে পারবে।

বেইজিং বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার কয়েক দশক পূর্ব থেকেই ভারত বাংলাদেশকে এই সুবিধা দিয়ে আসছে। এটি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেও সাহায্য করছে।

বাংলাদেশের জন্য ভারতের দেয়া শর্ত মেনে ব্যবসা করাও সহজ। অপরদিকে বেইজিং ঢাকাকে এই সুবিধা দেয়ার পূর্বে বছরের পর বছর হিসেব কষেছে এবং চীনের দেয়া শর্ত বাংলাদেশকে ঋণের ফাঁদেও ফেলতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবথেকে বড় বাণিজ্য সহযোগি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। গত এক দশকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স্থিতিশীলতার সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। ২০১৮-১৯ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ক্রয় করে। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় ১.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু বেইজিং এর সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্য ব্যপকভাবে চীনের জন্য লাভজনক। চীন বাংলাদেশে রপ্তানি করে ১৩ হাজার ৬৩৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি করতে পারে মাত্র ৫৬৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।

সেদিক থেকে ভারতের অবস্থান অন্যরকম। গত ৮ বছরে দেশটি বাংলাদেশে সড়ক, রেল, বন্দরসহ অবকাঠামো খাতে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। একইসঙ্গে আখাউড়া-আগরতলা রেল যোগাযোগ, আভ্যন্তরীণ নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রজেক্টেও সাহায্য করছে ভারত। মানব সম্পদ উন্নয়নও বাংলাদেশকে ভারতের সাহায্য করার আরেকটি বড় ক্ষেত্রে। ভারতে বাংলাদেশিদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম ও নিয়মিত বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালে ভারত সরকার প্রায় ১৮০০ বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশও ভারতের বিভিন্ন পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তারা সেখানে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশের দায়িত্ব পালন ও তদন্তের নানা প্রক্রিয়া সম্পর্কে শিখছে। তাই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির যে কৌশলের কথা বাংলাদেশ ভাবছে তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ যদি তার সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চায় তাহলে তাকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে দিকে নজর দিতে হবে।
 



..........