বুধবার, ২৮-অক্টোবর ২০২০, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের একজন অভিভাবকের কথা--------

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ জুলাই, ২০২০ ০৩:৫৯ অপরাহ্ন

আশফাক হুসেইন: ১৯ জুলাই দিনটি আমার জীবনে কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলো। আগের দিন স্কুল থেকে এসএমএস পেয়ে আমার ছোট ছেলেটি সকাল ৯ টার দিকেই কম্পিউটারের সামনে বসে পড়ে। সাড়ে ৯ টায় ক্লাস শুরু। তার জুম আইডিতে ক্লাস এইটের রুটিন এসেছে, শিক্ষকদের তালিকা এসেছে। ঘড়ির কাটায় তখন ঠিক সাড়ে ৯টা। স্যার জুম আইডিতে ক্লাসে ঢুকলেন। ছাত্ররা ক্লাসে যোগ দিতে একে একে স্যারের আইডিতে রিকোয়েস্ট পাঠালো । আমার ছেলেও রিকোয়েস্ট পাঠাল। কিন্তু মাত্র ৭জনকে স্যার একসেপ্ট করলেন। আমার ছেলে থাকল ওয়েটিং রুমে। তাকে অনলাইন ক্লাসে ঢুকতে দেয়া হলো না। তার সাথে আরও গোটা দশেক সহপাঠি ওয়েটিং-এ থাকল। ওরা ভেবছিল হয়তো স্যার কোন ভুল করছেন। জুম অপারেট করতে পারছেন না। পরের ক্লাসে অনুমতি পেলো আরও ৩ জন। ৩০ জনের সেকশনে ১০ জন নিয়ে দ্বিতীয় ক্লাস। উদগ্রীব হয়ে আমার ছেলেকে দেখলাম সহপাঠীদের ফোন করছে, স্যারকে জিজ্ঞাস করো,আমাদের কোনো ক্লাসে নিচ্ছে না।  স্যার বললেন, প্রশাসন থেকে একটি তালিকা তাদের ধরিয়ে দেয়া হয়েছে, এই তালিকা ধরেই তাদের অনলাইন ক্লাসে ঢোকার অনুমতি দিতে হচ্ছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষের আমানবিকতা, প্রতারণার কাছে অসহায় হয়ে দেখতে হলো আমার  প্রাণবন্ত সন্তানের বোবা হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। সারা দিন সে এভাবে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকল। কিন্তু ক্লাসে ঢুকতে পারল না। আমি স্কুলের প্রিন্সিপাল ও এমডিকে ফোন করলাম। তারা ধরলেন না। ছুটে গেলাম স্কুল গেটে। ফোন দিলাম সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে। ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তারা ফোনে কথা বললেন না, সাক্ষাৎও দিলেন না। 
পরদিন সকালেও আমার ছেলে যথারীতি সাড়ে ৯ টায় কম্পিউটারে বসে ক্লাসে ঢোকার চেষ্টা করল। কিন্তু ঢুকতে পারল না। সে সারাদিন চুপচাপ কম্পিউটারের সামনে বসেছিল। আমি আবারও ছুটে গেলাম স্কুলে। সাক্ষাৎ করতে চাইলাম প্রিন্সিপাল ও এমডির সাথে। সাক্ষাৎ দিলেন না । প্রিন্সিপাল স্যার ফোনেই জানিয়ে দিলেন তিনি অনলাইন ক্লাসে যোগ দেয়ার ব্যাপারে কিছুই করতে পারবেন না। আর এমডি স্পষ্ট করেই বললেন, জুলাই মাসের বেতন ক্লিয়ার না হলে কাউকে অনলাইন ক্লাস করতে দেয়া হবে না। জানতে চাইলাম অন্য সময়তো ৩ মাস বেতন বাকী থাকলে এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়, এখন কেন অগ্রিম জুলাই মাসের বেতন না দেয়ায়  ক্লাস করতে দেয়া হচ্ছে না। জবাবে তিনে বললেন, ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত, আমি এর বাইরে কিছু করতে পারব না। আমার বড় ছেলের বকেয়া বেতনেও তিনি কোন ছাড় দিতে পারবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।
গত সপ্তাহের বাকী ৩ দিন আমার ছেলে আমার সামনেই কম্পিউটারে বসে স্কুলের পুরো সময়টুকু গেম খেলে কাটিয়েছে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি। পড়ার কথা বলার সাহস পাইনি। ক্লাসে বরাবরই সে প্রথম থেকে তৃতীয়ের মধ্যে থেকেছে। যার সারা বছরে একদিনই স্কুল মিস থাকেনা-আমার অসহায়ত্ব ও স্কুল কর্তৃপক্ষের আমনবিকতার কারনেই আজ এ অবস্থা। এর বিচার আমি কার কাছে চাইব!
আমি জুলাই মাসের টিউশন ফি বিলম্বে পরিশোধের শর্তে আমার ছেলেদের অনলাইন ক্লাসে যোগদানের সুযোগ দেয়ার লিখিত আবেদন করেছি। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ কোন সাড়া দেয়নি। অথচ তারা অভিভাবকদের বলে আসছে প্যারেন্টস ফোরামের ব্যানারে নয়, ব্যাক্তিগত আবেদন করলে তারা বিবেচনা করবে। আমি ইতোমধ্যে ম্যাসেজে সাড়া দিয়ে বেতন ছাড়, কিস্তিতে পরিশোধ, অনলাইন ক্লাসে যোগদানসহ মোট ৪ দফায় স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। সাক্ষাৎও করেছি দু'দফায় । কিন্তু কোন ব্যবস্থাই স্কুল কর্তৃপক্ষ করেনি। এমনকি কিস্তিতে বেতন পরিশোধের আবেদন ৫ তারিখে নিয়ে ১৩ তারিখে এসএমএস দিয়ে বলেছে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। পরদিন অর্থাৎ ১৪ তারিখের ভিতর সমুদয় পাওনা বিনা ফাইনে পরিশোধ করা যাবে। বাস্তবে বিনা জরিমানায় তারা সমুদয় বকেয়া এখনও নিচ্ছে। প্রতারণার সর্বোৎকৃষ্ট এ নজিরও স্থাপন করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

১৯ জুলাইয়ের আগের দিন সন্ধ্যায় স্কুল থেকে এসএমএস পেয়ে ভেবেছিলাম টিউশন ফি বাকী পড়ায় অন্তত অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে স্কুল বাধা দেবে না। বাকী বলব না, টিউশন ফি অগ্রিম না দেয়ার কারণে আমার সন্তানের এই পরিণতি হবে,  ক্লাস করার জন্য সন্তানের আবেগকে এভাবে জিম্মি করবে-সেটা আমি ভাবতেও পারিনি। 
স্কুল পরিচালনার সাথে জড়িত ও শিক্ষক হয়ে ওরা এভাবে অমানবিক হতে পারে, প্রতারক হতে পারে-সেটা ছিল আমার কল্পনারও বাইরে। ওরা যে প্রতারক তার প্রমাণ রেখেছে, নানা ছলচাতুরীরর আশ্রয় নিয়ে একের পর এক এসএমএস দিয়ে এবং অভিভাবকদের ডেকে নিয়ে গত ২ মাসে যে আচরণ করেছে, তার মধ্য দিয়ে।
তাদের প্রতারক বললাম এই কারণে এক. করোনাকালীন  বেতন অর্ধেক নেয়ার দাবিতে আন্দোলনরত প্যারেন্টস ফোরামের যৌথ আবেদনের প্রেক্ষিতে তারা বলেছিল ব্যাক্তিগত আবেদন করলে তারা টিউশন ফি কমাবে, কিন্তু কমায়নি। দুই. কিস্তিতে টিউশন ফি পরিশোধের সুযোগ দেবে, কিন্তু দেয়নি। তিন. টিউশন ফি বাকী থাকলেও আবেদন করলে অনলাইনে ক্লাসের সুযোগ দেবে, কিন্তু দেয়নি।
আমার দুই ছেলের মধ্যে ছোটজন  ঈদের আগে  ক্লাস করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে। টি্উশন ফি বাকী পড়ায় রেজাল্ট আটকানোয় জুন পর্যন্ত সমুদয় পাওনা পরিশোধ করে, রেজাল্ট পেয়েছি। গ্রেড-৮ এ প্রমোশনও হয়েছে। অন্য জনের মার্চ থেকে শুরু করে কোন অনলাইন  ক্লাস হয়নি। তার আগে স্কুল খোলা থাকলেও ডিসেম্বরে ফাইন্যাল মকের পর বলতে গেলে তেমন কোন নিয়মিত ক্লাসই হয়নি। জানুয়ারিতে ফরম ফিলাপের পর যেখানে ৫ মে থেকে ক্যাম্বিজ সিস্টেমে এএস(একাদশ সমমান) পরীক্ষা ছিল, সেখানে জুন পর্যন্ত তারা বেতন দাবি করেছে,যা অন্যায়। মার্চ থেকে তার ৪ মাসের বেতন বাকী পড়ায় রেজাল্ট আটকে দেয়ার হুমকির প্রেক্ষিতে অর্ধেক বেতন পরিশোধ করে বাকী ৫০ শতাংশ মওকুফের লিখিত আবেদন দিয়েছিলাম। এমডি ডেকেছিলেন জুলাইয়ের শুরুতে । বললেন তাদের পক্ষে প্যারেন্টস ফোরামের পেজে কিছু লেখালেখি করতে- তা হলে বিবেচনা করবেন। বলেছিলাম প্যারেন্টস ফোরামের পেইজের এডমিনতো আর আমি নই, পক্ষে লেখার মতো কিছু করেন সবার জন্য- তাহলে লেখা যাবে। তারা সেরকম কিছু করেননি,তাই লেখাও হয়নি। 
আমার লাখ টাকা বেতনের চাকরি ছিল। স্ত্রীরও তাই। তাইতো দুই সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। আমার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে আমি বেশ কিছুদিন চাকুরি বিহীন ছিলাম। করোনার আগেও প্রায় অর্ধেক সুযোগ সুবিধায় আরেকটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। করোনার কারণে সেটিও  এপ্রিল থেকে বন্ধ। এ রকম এক আমনবিক পরিস্থিতিতে স্কুলের কাছ থেকে মানবিকতাতো দূরের  কথা, করোনকালীন ৫০ ভাগ টিউশন ফির নায্য দাবি থেকে বঞ্চিত। বরং আমরা তাদের প্রতারনার শিকার হলাম। 
(যারা এ ঘটনায় জড়িত তারা ঠিকই বুঝতে পারবে আমি কে, কিন্তু তারা আমার সন্তানের শিক্ষক ও স্কুলের কর্তৃপক্ষ। তাই স্কুল, প্রিন্সিপাল ও এমডির নাম দেয়া হয়নি। তবে সমস্ত ঘটনার নথি সংরক্ষিত আছে)