বুধবার, ২০-নভেম্বর ২০১৯, ০৪:৪৭ অপরাহ্ন
   শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে

 ১ বছরেই খেলাপি ঋণ বাড়ল ৪৮ শতাংশ

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৩৩ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: এক সময় শুধু রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ঋণেই বড় অনিয়ম হতো। তাই ঋণ খেলাপি ব্যাংকের তালিকায় ওপরের দিকে থাকত এসব ব্যাংকের নাম। এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বেসরকারি খাতের বেশ কিছু ব্যাংকের ঋণে বড় ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। এসব ঋণ আদায়ও করা যাচ্ছে না। পুনঃ তফসিল করলেও তা আবার খেলাপি হয়ে পড়ছে। ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে, তার বেশির ভাগই বেসরকারি খাতের। দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। মন্দ ঋণ কমানোর জন্য সরকারের নানা উদ্যোগের মধ্যেই শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণ। শত চেষ্টা করেও এর লাগাম টানা যাচ্ছে না। গত এক বছরে বেসরকারি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা দেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। মন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি, বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি, এমডিদের সংগঠন এবিবির সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এখন ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হয়। ঋণের ধরন বিবেচনা করে পরিশোধে এক বছরের জন্য গ্রেস পিরিয়ডেরও ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া ব্যবস্থার কোনো প্রতিফলন নেই শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে এর খেলাপি ঋণের পরিমাণ। আরও নানা ক্ষেত্রে ব্যাংকটির অনিয়ম বেরিয়ে আসছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তার কোনো তোয়াক্কা করেনি শাহজালাল ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের জন্য তাদের ৩৩৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিতরণ করেছে মাত্র ৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
ঋণ সম্পর্কিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের গত জুন শেষে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৬১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা ২০১৭ সালের জুনে ছিল ৬৩৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। শতাংশীয় হিসাবে বৃদ্ধি ৮১ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৭ সালের জুন থেকে ১৫২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বেড়ে ২০১৮ জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৭৯২ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা শতাংশীয় হিসাবে প্রায় ২৪ শতাংশ।
এ থেকে গত এক বছরে ৩৬৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধি ঘটে প্রায় দ্বিগুণ- ৫০ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৬১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ঋণের ঝুঁকি বিবেচনা করে তার বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। চলতি জুন শেষে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১০০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, একদিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে, অন্যদিকে বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত ঋণগুলো ঠিকমতো আদায় হচ্ছে না। ফলে প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে না পারার পেছনে ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের ঘাটতি দেখছেন সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ। সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার খেলাপিদের একের পর এক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না কোনোভাবেই। এর কারণ ব্যাংকগুলোতে জবাবদিহি নেই, সুশাসনেরও অভাব রয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া ছাড়া কোনো পথ নেই উল্লেখ করে সালেহ উদ্দিন আরও বলেন, আগামীতে খেলাপি যেন আর না বাড়ে সে জন্য ব্যাংকগুলোকে দেখে শুনে ঋণ দিতে হবে। অনৈতিকভাবে যাতে পুনঃতফসিল সুবিধা নিতে না পারে তা তদারক করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব বেসরকারি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি জরুরি বলে মনে করেন সাবেক এ গভর্নর।
খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম। সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে যাচ্ছি।
এদিকে বিভিন্ন ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক অন্যতম।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৪ অক্টোবর ২০১৯)