রবিবার, ১৮-আগস্ট ২০১৯, ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতায় ভিকারুননিসার বেহাল দশা

দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতায় ভিকারুননিসার বেহাল দশা

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৭:৫০ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার পর ছয় দশকের পুরানো রাজধানীর নামি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার নানা অনিয়মের চিত্র এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ভালো ফলাফলের সুনামকে পুঁজি করে প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘ দিন ধরেই ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি চলে আসছে। রয়েছে ভর্তি বাণিজ্য, বাধ্যতামূলক কোচিং ব্যবসা, অতিরিক্ত ফি আদায়, অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ। অরিত্রীর আত্মহত্যার পর এই প্রতিষ্ঠানের গভর্নিংবডিসহ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রীতিমতো অভিযোগের পাহাড় হাজির করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
তারা বলছেন, রাজধানীর নামি এই প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ধরনের নিয়ম কানুনের বালাই নেই। নিয়ম যা আছে তার বেশিরভাগই শিক্ষার্থীদের মানসিক নির্যাতন আর বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য। প্রতিষ্ঠানটির এক শ্রেণির অসাধু শিক্ষক আর গভর্নিংবডির সদস্য মিলে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ভর্তি বাণিজ্য করে। বাণিজ্য করতে গভর্নিংবডির নির্বাচনের সময় কোটি কোটি টাকা খরচ করেন একেকজন প্রার্থী। খোদ শিক্ষামন্ত্রীও এসব অভিযোগ তুলেছেন। কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের টিসি দেয়ার হুমকির অভিযোগও উঠেছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নানা অনিয়ম ও গভর্নিংবডির বিরুদ্ধে অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটিতে অবকাঠামোর দ্বিগুণ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে ৯ম, ১০ম ও এইচএসসির পাঠদান চলছে বসুন্ধরা শাখায়।
ভর্তি বাণিজ্য
ভিকারুননিসায় অনিয়মের পাহাড় নিয়ে মুখ খুলেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রীই। প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিংবডির দিকে আঙ্গুল তুলে তিনি বলেছেন, সেখানে নিয়ম-কানুনের কোনো বালাই নেই। লটারির মাধ্যমে নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি ও লাখ লাখ টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন শিক্ষামন্ত্রী। দুর্নীতির মাধ্যমে একেকজন শিক্ষার্থী ভর্তিতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
তিনি বলেন, “সেখানে ১০ লাখ টাকা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সেটা বন্ধ করতে আমরা লটারি সিস্টেম চালু করেছি। কিন্তু তারপরও দেখা যাচ্ছে অনুমোদনের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী তারা ভর্তি করে। তার মানে, বোঝাই যায় কেন তারা অতিরিক্ত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করেন।” তিনি বলেন, ‘‘আমরা নতুন কোনো শাখা খোলার অনুমোদন দেই না। কিন্তু তারা একটার পর একটা শাখা খোলে। এর উদ্দেশ্য সহজেই বোঝা যায়।” 
দিলারা চৌধুরী। যার দুই মেয়েই ভিকারুননিসায় অধ্যয়নরত। সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘প্রথম শ্রেণিতে চলে ভর্তি বাণিজ্য। একজনকে ভর্তি করতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা নেয়া হয়। লটারির নামে চলে দুর্নীতি। টাকা না দিলে লটারিতে নাম ওঠে না। এই কাজে লোক নিয়োগ করা আছে।” অভিভাবক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ সুজন বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে ৪ লাখ টাকার নিচে কাউকে ভর্তি করা যায় না। 
লটারিতেও দুর্নীতি
রাজধানীর স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি চালু রয়েছে। কিন্তু অভিভাবকদের অভিযোগ, সেই লটারিতেও ভাগ্য নির্ধারণ হয় দুর্নীতি-জালিয়াতির মাধ্যমে। তারা বলছেন, ঘুষ না দিলে লটারিতে নাম ওঠেনা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের। বাধ্য হয়ে শিক্ষা জীবনের শুরুতেই দুর্নীতি আর ঘুষের মাধ্যমে সন্তানদেরকে স্কুলে ভর্তি করতে বাধ্য হন অনেক অভিভাবক। 
কোচিং না করলে ফেল!
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা জানান, ভিকারুননিসায় শিক্ষকদের কাছে কোচিং করা অলিখিতভাবে বাধ্যতামূলক। প্রায় সব বিষয়েই কোচিং করানো হয় এখানে। সে কারণে শুক্রবার ছুটির দিনেও পুরো ক্যাম্পাস থাকে সরগরম। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই বিষয় একসঙ্গে করে কোচিং করানো হয় ১ হাজার ২০০ টাকা ফিতে। প্রতি ব্যাচে শিক্ষার্থী নেওয়া হয় ৪০ জন করে। কোচিংয়ে না গেলে ফেল করানোর অভিযোগ আছে ভিকারুননিসার কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে। গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞানের এক শিক্ষকের নাম উল্লেখ করেই অভিযোগের আঙ্গুল তোলেন কয়েকজন অভিভাবক। ৯ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা সাহানা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, “ছেলে-মেয়েরা পরীক্ষা দিয়ে আসে আর দোয়া করে, আল্লাহ ...স্যারের কাছে যেন খাতা না যায়। কোচিং যারা করে না, তাদেরকে ফেল করিয়ে দেওয়া হয়। সে কারণে সবাই কোচিং করতে বাধ্য হয়।” অভিভাবক দিলারা চৌধুরী বলেন, “কোচিংয়েই যদি ৪০ জন করে ছাত্রী থাকে, তাহলে তারা শিখবে কীভাবে? ফলে কোচিং করালেও সিলেবাস সম্পূর্ণ না করে পরীক্ষায় বসিয়ে দেওয়া হয়।”
ফলাফলে দিনে দিনে পিছিয়ে পড়ছে ভিকারুননিসা
এক সময় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলে ধারাবাহিকভাবে প্রথম হলেও গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান নিচে নেমে এসেছে। ২০১৪ সালের এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডে ভিকারুননিসা তৃতীয় হয়েছিল। ২০১৫ সালে সেটা নামে চতুর্থ অবস্থানে। ২০১৪ সালে ঢাকা বোর্ডে এইচএসসিতে পঞ্চম অবস্থানে ছিল। সর্বশেষ ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সেরা ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ভিকারুননিসার কেউই ছিল না। যেখানে প্রথম হয়েছিল শ্যামপুরের এ কে স্কুলের এক শিক্ষার্থী। এইচএসসিতে সেরা ১০ এর মধ্যে কেবল সপ্তম স্থান ছিল ভিকারুননিসার এক শিক্ষার্থীর।
এক সময় দেশ সেরা হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের মানে অবনতির বিষয়ে গভর্নিংবডির নীতিকেই দায়ী করেছেন অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ, গভর্নিংবডির নানা দুর্নীতি, জালিয়াতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়মের কারণেই প্রতিষ্ঠানটির এই দশা হয়েছে। কোচিংয়ের প্রতি শিক্ষকদের ঝোঁক এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণকেও এর জন্য দায়ী করছেন অভিভাবকরা। 
অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে নাজুক পাঠদান
ভিকারুননিসার মূল ক্যাম্পাসসহ ৪ টি ক্যাম্পাসে মোট ২৪ হাজার শিক্ষার্থী পড়ছে। নতুন নতুন সেকশন চালুর কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে। অথচ এই সময়ে কোনো নতুন অবকাঠামো তৈরি হয়নি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবকাঠামোর তুলনায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিতে। প্রতিষ্ঠানটির মূল ক্যাম্পাসের প্রতিটি শ্রেণিতে (প্রভাতী ও দিবায়) মোট ৯ টি সেকশন রয়েছে। সে হিসাবে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৯০ টি সেকশন। বসুন্ধরা, আজিমপুরের প্রতি শ্রেণিতে ৬ টি হিসাবে ৬০ টি এবং ধানমন্ডিতে ৪ টি করে মোট ৪০ টি সেকশন রয়েছে। এছাড়া ইংরেজি ভার্সনে মোট ৪ টি সেকশন রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতো আছেই। স্কুলের কোনো কোনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮০ জনেরও বেশি। ফলে এসব শ্রেণিতে পাঠদান হয়না বললেই চলে। গাদাগাদি করে বসা শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পরিবেশই থাকে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবছর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে আসন সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আবেদনকারীদের লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত আসনে ভর্তি করা হয়ে থাকলেও এর বাইরেও শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, “দেখা যাচ্ছে যা অনুমতি পায়, তার চেয়ে বেশি ভর্তি করে ফেলে। তার মানে অন্য কোনো পথে করে, হয়ে যায়।” ভিকারুননিসায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ঢোকার পরিসংখ্যান পাওয়া যায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্যে। সরকারি নীতিমালা না মেনেই এইসব ভর্তি চলে বলে অভিযোগ তাদের। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধন নীতিমালা-২০১১ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্র ও শিক্ষকের অনুপাত হতে হবে ৩০:১। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে একক শ্রেণি বা শাখায় শিক্ষার্থী সংখ্যা হবে ৫০ জন। তবে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ এর অধিক হলে পরবর্তী ৪০ জনের জন্য দ্বিতীয় শাখা খোলা যাবে। তৃতীয় বা পরবর্তী প্রতি শাখার জন্য পূর্ববর্তী শাখায় ৫০জন পূর্ণ হতে হবে। প্রতি শাখায় একজন করে হিসাব করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। এসব নিয়মের কিছুই মানা হচ্ছে না ভিকারুননিসায়। একজন অভিভাবকের অভিযোগ, স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ‘বি’ শাখায় ও সপ্তম শ্রেণির ‘এ’ শাখায় পড়ে তার দুই মেয়ে। চতুর্থ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭৮ জন আর সপ্তম শ্রেণিতে ৮৩ জন। “৫০ জনের জায়গায় ৬০ জন হতে পারে। কিন্তু এখানে প্রতিটি ক্লাসেই এই রকম বেশি বেশি শিক্ষার্থী। এক ক্লাসে এত শিক্ষার্থী হলে তারা বুঝবেটা কী?” প্রশ্ন ওই অভিভাবকের।
নানা অজুহাতে বর্ধিত ফি আদায়
বোর্ডের নির্ধারিত ফি’র বাইরে ভিকারুননিসায় ভর্তির শুরুতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় না করলেও পরে বিভিন্ন নামে সেটা আদায় করে নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন অভিভাবক সাংবাদিকদের জানান, জানুয়ারি মাসে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সময় সরকার নির্ধারিত ৮ হাজার টাকা এবং ওই মাসের বেতন ১১০০ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি-মার্চের ২২০০ টাকা বেতনের সঙ্গে উন্নয়ন ফিসহ নানা অজুহাতে কমপক্ষে আরো ২৫০০ টাকা আদায় করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
টিসি দিলেই আয় ১০ লাখ!
অরিত্রী আত্মহননের পর বেসরকারি টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেছেন, ‘একটি ছাত্রীকে টিসি দিয়ে বের করে দিলে, আরেকটি ছাত্রী ভর্তি করা যাবে। তাহলে নগদে ১০ লাখ টাকা আয় হয়ে যাবে। প্রতিটি শিক্ষকের মাথায় এটি ঘোরে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি সেকশনে ৭০ জন থাকার কথা। সেখানে ১০০-১১০ জন ভর্তি হচ্ছে। এটা কীভাবে সম্ভব? এটা ভর্তি বাণিজ্যে হয়েছে তা না হলে কীভাবে হলো। এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা যায়। কিন্তু ভিকারুননিসা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করা দুষ্কর।’ অভিভাবকরা বলছেন, বাণিজ্য করতেই শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের মধ্যে রাখা হয়। কেউ চলে গেলেই নতুন বাণিজ্য করা যায়।
বছরের পর বছর ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে ভিকারুননিসা
১৯৫২ সালের ১৪ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী ভিকারুননিসা নূনের উদ্যোগে ঢাকার বেইলি রোডে যাত্রা শুরু করে এ বিদ্যালয়। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ঈর্ষণীয় ফলাফল দেখিয়ে আসা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের বিষয়ে অভিভাবকরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন অরিত্রীর মৃত্যুর পর। ওই ঘটনার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে আসেন শিক্ষামন্ত্রী। ওই প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ওখানে বহুদিন ধরে অধ্যক্ষ নেই, একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা বার বার তাগিদ দেওয়ার পরও তারা নিয়ম অনুসরণ করে অধ্যক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা নেয়নি, এটাও একটা বড় ধরনের অনিয়ম।” প্রতিষ্ঠানটিতে প্রভাবশালীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ারও অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন পক্ষ থেকে। জানা যায়, অতিক্ষমতাশালী গভনিংবডিই শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে। শিক্ষা সচিব বলেন, “শিক্ষক নিয়োগ আমরা করি না, এটি একটি প্রাইভেট স্কুল, সেখানে একটা ম্যানেজিং কমিটি আছে। তারা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেন, তারাই সে কাজটি করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিকারুননিসায় ২০১১ সালের জুলাইয়ের পর থেকে তিনজন অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করলেও তাদের সবাই ছিলেন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে। ওই বছরের ১৩ জুলাই শিক্ষক পরিমল জয়ধর কর্তৃক ‘ধর্ষণের’ পর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অধ্যক্ষের পদ ছাড়তে হয়েছিল হোসনে আরা বেগমকে। তারপর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে এসে ভারপ্রাপ্ত অবস্থায়ই ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর অবসরে যান মঞ্জু আরা বেগম। এরপর পুনরায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের উপরই ভরসা রাখে স্কুলের পরিচালনা পর্ষদ। সে বছরের ১২ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবেই ২০১৭ সালের ৩ জুলাই অবসরে যান শিক্ষক সুফিয়া খাতুন। তারপর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান নাজনীন ফেরদৌস; যাকে অরিত্রীর মৃত্যুর পর আন্দোলনের মুখে বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের উপর ‘খবরদারি’ করার স্বার্থে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে গভর্নিংবডিই সব। তাদের কথামতো চলার জন্য অধ্যক্ষকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবেই দায়িত্বে রাখা হয়।” বিধিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ অধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এরপর সেটা অনুমোদন দেয় শিক্ষা বোর্ড। অধ্যক্ষ পদাধিকারবলে থাকেন গভর্নিংবডির সদস্য সচিব পদে।
ভিকারুননিসায় প্রতাপশালী গভর্নিংবডিই সব, পাত্তা পান না শিক্ষামন্ত্রীও 
ভিকারুননিসার গভর্নিংবডির কর্মকা-ে ক্ষুব্ধ খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রতাপশালী গভনির্ংবডি নানা-অনিয়ম দুর্নীতি যেমন করে তেমনি পাত্তা দেয়না শিক্ষামন্ত্রীকেও। স্কুল-কলেজের পরিচালনা পর্ষদে স্থানীয় এমপির সভাপতি পদে মনোনীত হওয়ার পথ বন্ধ করে ২০১৬ সালের জুনে রায় আসে সর্বোচ্চ আদালত থেকে। এরপর ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি নির্বাচিত হন গোলাম আশরাফ তালুকদার। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদক ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। নিজদলের এই নেতার নানা অপকর্মে চরম ক্ষুব্ধ শিক্ষামন্ত্রী। ভিকারুননিসার গভর্নিংবডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার কতোটা বেপরোয়া তার সাম্প্রতিক দম্ভোক্তিতেই এর প্রমাণ মেলে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অরিত্রী আত্মহত্যার পর গভর্নিংবডিকে না জানিয়ে ভিকারুননিসা স্কুলে যাওয়াকে ‘অন্যায়’ জ্ঞান করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের তীব্র সমালোচনা করেন প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিংবডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার। অরিত্রী আত্মহননের ঘটনা তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যের কমিটির কাছেও উষ্মা প্রকাশ করেছেন তিনি। ৪ ডিসেম্বর রাতে তৈরি করে ৫ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া চার পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ‘ভিকারুননিসার গভর্নিংবডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার দাম্ভিকতার সাথে অভিযোগ করেন যে, শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় তাদেরকে [গভর্নিংবডি] না জানিয়ে কেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছেন। সভাপতির এহেন আচরণ কোনভাবেই কাম্য নয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সাধারণ অভিভাবকদের তারা মানুষ বলেই গ্রাহ্য করেন না। প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি বিরাজমান আছে বলেই অরিত্রী ট্রাজেডি সংঘটিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গভর্নিংবডি ভেঙ্গে দেয়া প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’ যদিও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের যে কোনও জায়গায় যে কোনও সময় যেতে পারেন। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেকোনও সময় যেতে পারেন। গভর্নিংবডি বা অধ্যক্ষকে জানিয়ে যেতে হবে না। মন্ত্রীর ভিকারুননিসায় যাওয়া নিয়ে সভাপতির মন্তব্য হাস্যকর।’ শিক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ, ভিকারুননিসার গভর্নিংবডি যেমন খুশি তেমন করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে। নির্ধারিত আসনের বাইরে শত শত শিক্ষার্থী ভর্তি করে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করে। অনুমোদন না দিলেও স্কুলের একটির পর একটি শাখা খোলার অভিযোগও উঠেছে গভর্নিংবডির বিরুদ্ধে। 
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় ক্ষোভ-হতাশায় ফেটে পড়েছেন রাজধানীর নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় তুলেছেন তারা। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপক মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে এর মধ্যে। অরিত্রীর আগেও ছোট-খাট নানা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় শিক্ষকদের কাছ থেকে রূঢ় আচরণ পাওয়ার কথা বলেছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। সদ্য বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসের আচরণ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকরা। 
নাজনীন ফেরদৌসের বিরুদ্ধে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণের অভিযোগ উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও শিফট ইনচার্জ অভিভাবকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সদাচরণ করেন না। হঠাৎ সাক্ষাতের সুযোগ হলেও তারা অভিভাবকদের সঙ্গে চরম অশোভন আচরণ করেন বলে তদন্তকালে অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে কাউন্সেলিং বা মতবিনিময় না করে কথায় কথায় টিসি দেওয়ার ভয় দেখান।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ‘ছোটখাটো বিষয়েও তাদের অপমান অপদস্থ করা হয়। অভিভাকদের ডেকে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। শির্ক্ষাথীরা সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে। শিক্ষকদের কাছে কোচিং না করলে, প্রাইভেট না পড়লে নানাভাবে অপমান করা হয়।
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই অতিরিক্ত ভর্তি, যত্রতত্র শাখা
কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই প্রতিবছর শত শত অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করছে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ। আইনে না থাকলেও যেখানে সেখানে শাখা খুলে অননুমোদিত শ্রেণিতেও দেয়া হচ্ছে পাঠদান। আর এতে ক্রমেই ভিকারুননিসার শিক্ষার মান নিচে নামছে। সব শাখায় পর্যাপ্ত অবকাঠামো আর দক্ষ শিক্ষক না থাকায় সঠিকভাবে পাঠদান ব্যহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির যে অবকাঠামো রয়েছে তার ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এখানে। ফলে শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে কোনো মতে বসতে হচ্ছে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকেই। অভিযোগ রয়েছে, চলতি শিক্ষাবর্ষেও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুই শতাধিক অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। গভর্নিংবডির সভাপতিসহ একাধিক সদস্যের নেতৃত্বেই এই ভর্তি হয়েছে। স্কুল পরিচালনা নীতিমালায় কোনো শাখা ব্যবস্থা চালুর বিধান না থাকলেও মূল ক্যাম্পাস ছাড়াও ২০০৪ সালে রাজধানীর বসুন্ধরা, ২০০৫ সালে ধানমন্ডি এবং ২০০৭ সালে আজিমপুরে ভিকারুননিসার শাখা চালু হয়। ঢাকা বোর্ড বলছে, প্রতিষ্ঠানটির বসুন্ধরা শাখায় নিম্ন মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানোর অনুমোদন থাকলেও অবৈধভাবে ৯ম-১০ম এমনকি এইচএসসি পর্যন্ত পাঠদান হচ্ছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)