বুধবার, ১৯-জুন ২০১৯, ০১:১৬ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • জাল-জালিয়াতি করে স্বাস্থ্যখাতের ৮০ কোটি টাকার কাজ বাগানোর চেষ্টা

জাল-জালিয়াতি করে স্বাস্থ্যখাতের ৮০ কোটি টাকার কাজ বাগানোর চেষ্টা

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৮:১৩ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বিশ্বখ্যাত জাপান ব্র্যান্ড ক্যাননের অথরাইজেশন লেটার জালিয়াতি করে ৮০ কোটি টাকার মেডিকেল যন্ত্রপাতি সরবরাহের টেন্ডার বাগানোর চেষ্টা চালাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের একটি প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। এই চক্রের অন্যতম নাটের গুরু এএসএল নামক প্রতিষ্ঠানটি জাপানি ক্যাননের ভুয়া অথরাইজেশন লেটার দিয়ে চিকিৎসার জন্য স্পর্শকাতর এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিনসহ যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য টেন্ডার দাখিল করেছে। মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দাখিল করা টেন্ডার যাচাই-বাছাইয়ে ভয়াবহ এ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। 
জানা গেছে, অথরাইজেশন জালিয়াতি করে পুরানো মেশিন দিয়ে নতুনের দামে ৮০ কোটি টাকা বাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। খোদ স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল কলেজের জন্য স্পর্শকাতর চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার টেন্ডারে এ ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা ও কালোতালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এতকিছু প্রকাশ্যে আসার পরেও জালিয়াত প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দিতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। এর আগেও চক্রটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দফতরে নিম্নমানের এবং পুরাতন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জালিয়াতি যেভাবে ধরা পড়ে
সূত্র জানায়, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে জাপানের নামী কোম্পানি ক্যাননের অথরাইজেশন লেটার জালিয়াতি করে ৮০ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে এএসএল-ঢাকা নামক প্রতিষ্ঠানটি। যার সত্ত্বাধিকারী আফতাব আহমেদ। কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ  হাসপাতালের ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ের টেন্ডার আহ্বান করা হয় গত ২২ জুলাই।
টেন্ডারে কয়েকটি গ্রুপ অংশ নেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রক্রিয়া শেষে দরপত্র জমা পড়ার পরই কয়েকটি প্রস্তুতকারী কোম্পানির কাছ থেকে টেন্ডারে অথরাইজেশন জালিয়াতির তথ্য পান কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। তথ্য পেয়েই কয়েকটি গ্রুপে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলোর দরপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বাছাই করার উদ্যোগ নেন। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) এবং স্ট্যান্ড্যার্ড টেন্ডার ডকুমেন্ট (এসটিডি) মোতাবেক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ম্যানুফ্যাকচারার অথোরাইজেশন লেটার এবং কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট চাওয়া হয়। আর এই অথোরাইজেশন লেটার এবং স্ট্যান্ড্যার্ড সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে নতুন মেশিনের পরিবর্তে কম দামে পুরাতন মেশিন দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এএসএল।
তথ্য যাচাইয়ে দেখা যায়, জাপানি কোম্পানি ক্যানন থেকে একই এমআরআই এবং সিটি স্ক্যান মেশিন সরবরাহে টেন্ডার দাখিল করেছে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি (বিএসএসসি) ও এএসএল নামে দু’টি কোম্পানি।
স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্টের (এসটিডি) শর্তানুসারে দু’টি প্রতিষ্ঠানই জাপানি কোম্পানি ক্যাননের ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন লেটার এবং কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট জমা দেয়। এ নিয়ে যাচাই কমিটির সভায় সন্দেহ হওয়ায় সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জাপানের ক্যানন কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের কাছে মেডিকেল কলেজের প্রকল্প পরিচালক ই-মেইল পাঠান।
ই-মেইলের জবাবে ক্যানন কোম্পানি থেকে জানানো হয়Ñ এএসএল কোম্পানির দাখিল করা এমআরআই এবং সিটি স্ক্যান মেশিনের ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন লেটার এবং কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট ক্যানন জাপান-কর্তৃক দেয়া হয়নি।  জালিয়াতি করে এটি দেয়া হয়েছে। তবে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক এন্ড সার্জিক্যাল কোং (বিএসএসসি), ঢাকা এর দাখিলকৃত ম্যানুফ্যাকচারার অথারাইজেশন লেটার এবং কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট সঠিক।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, গত ১০ অক্টোবর ক্যানন মেডিকেল সিস্টেমস কর্পোরেশনের ইন্টারন্যাশনাল সেলস ডিভিশনের সিনিয়র ম্যানেজার কোহ ইয়ামাদার কাছে ইমেইল পাঠান ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। কোহ ইয়ামাদা পরের দিনই ফিরতি মেইলে জানান, এএসএল ঢাকা এর দাখিলকৃত কাগজপত্রে স্বাক্ষরকারী সিনিয়র মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ জুনিচি নাকাহাতা নামে কোন ব্যক্তি ক্যাননে নেই। এই ডকুমেন্ট সঠিক নয়। এছাড়া এএসএল ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) সার্টিফিকেটটিও জাল। কারণ এফডিএ সার্টিফিকেট কখনো দুটি প্রডাক্টের এক সঙ্গে দেয় না। পৃথক পৃথকভাবে দেয়। এএসএল এর দাখিলকৃত এমআরআই এবং সিটি স্ক্যানের এফডিএ সার্টিফিকেট একই সঙ্গে প্রদান করা হয়েছে। যা জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণ করে।
টেন্ডার পেতে মরিয়া জালিয়াত এএসএল
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উচ্চমূল্যের স্পর্শকাতর চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের দরপত্রে জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ায় এখন বিভিন্ন দপ্তরে দরখাস্তের পর দরখাস্ত দিয়ে চলেছে এএসএলের স্বত্বাধিকারী আফতাব আহমেদ। মূলত এতো জালিয়াতির পরেও টেন্ডারটি নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এএসএলসহ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ পাইয়ে দিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে শক্তিশালী চক্রটি। ৮০ কোটি টাকার টেন্ডার পেতে অথরাইজেশন লেটার জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর এএসএল কোম্পানির মালিক আফতাব আহমদ স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের কাছে টেন্ডার নিয়ে অভিযোগ করেন। আবেদনে তিনি টেন্ডার সঠিকভাবে যাচাই করার অনুরোধ জানান। আফতাব আহমদের আবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপ-সচিব হাসান মাহমুদের স্বাক্ষরে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের কাছে ২১শে অক্টোবর একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে ২২শে অক্টোবরের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়। মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়ে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে জবাব দেন প্রকল্প পরিচালক ডা. দেলোয়ার হোসেন। জবাবে তিনি জানান, গত ১৯শে সেপ্টেম্বর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকের আলোচনায় বলা হয়, পিপিআর ও টেন্ডার ডকুমেন্ট অনুযায়ী ম্যানুফ্যাকচার অথরাইজেশন লেটার (উৎপাদনকারী কোম্পানির অনুমোদনপত্র) জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। টেন্ডারের একটি প্যাকেজে ১১টি আইটেমের মধ্যে একটি মাত্র বৈধ ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন লেটার পাওয়া যায়। এদের মধ্যে দুইজন বিডারই জাপানের ‘ক্যানন’ কোম্পানির এমআরআই এবং সিটি স্ক্যান মেশিনের ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন লেটার এবং কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট জমা দেয়। তখনই মূল্যায়ন কমিটি বিষয়টি যাচাই করতে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে ই-মেইল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর ভিত্তিতে ১০ অক্টোবর ক্যানন মেডিকেল সিস্টেমস করপোরেশন-এর ইন্টারন্যাশনাল সেলস ডিভিশনের সিনিয়র ম্যানেজার কোহ ইয়ামাদার কাছে ই-মেইল পাঠান প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। ই-মেইল করার পরই থলের বেড়াল বেরিয়ে এসেছে। ই-মেইলের জবাবে ক্যানন কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোং, ঢাকার দাখিল করা ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন লেটার এবং কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট আসল ও সঠিক। অন্যদিকে এএসএল-এর ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন লেটার এবং কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেট লেটারটি সঠিক নয়। এ ছাড়া এএসএল-এর দাখিলকৃত কাগজপত্রে স্বাক্ষরকারী সিনিয়র মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ জুনিচি নাকাহাতা নামে ক্যানন-এ কেউ নেই। এই ডকুমেন্ট সঠিক নয়। শুধু তাই নয়, এএসএল-এর ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সার্টিফিকেটও সঠিক নয়। কারণ এফডিএ কখনো দুটি প্রডাক্টের সার্টিফিকেট এক সঙ্গে দেয় না। আলাদা আলাদা দেয়। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রাথমিকভাবে এএসএল কোম্পানির অথরাইজেশন জালিয়াতির বিষয়টি উদঘাটন করেছে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। আমরা আইনগত দিক খতিয়ে দেখছি। আশা করছি, সহসাই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১২ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)