রবিবার, ২৪-মার্চ ২০১৯, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন
নতুন সরকারে ৩১ নতুন মুখ 

বাঘা বাঘা মন্ত্রীরা বাদ

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৬:৩৫ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: এক ঝাঁক নতুন মুখ নিয়ে নতুন সরকার গড়তে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই যাত্রায় তার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন বাঘা বাঘা মন্ত্রীরা। এমনকি মহাজোটের শরিক কোনো দলীয় প্রধানকেও নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়নি। নবগঠিত মন্ত্রিসভা থেকে আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, শাজাহান খানের মতো আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা যেমন বাদ পড়ছেন; তেমনি স্থান পাননি জোট শরিক দলের নেতা রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো নেতারাও। বিরোধী দলে যাওয়ায় এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে কাউকে যে মন্ত্রী করা হবে না; সেই সিদ্ধান্ত আগেই হয়েছিলো। একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হওয়ার পর ৭ জানুয়ারি সোমবার শপথ  নেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। তার আগের দিন ৬ জানুয়ারি রোববার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম প্রকাশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
প্রধানমন্ত্রী বাদে ৪৬ জনের মন্ত্রিসভায় ৩১ জনই নতুন মুখ। বাদ পড়ছেন আগের মন্ত্রিসভার ৩৪ জন। এছাড়া পাঁচজন প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন পূর্ণমন্ত্রী এবং তিনজন একই দায়িত্বে থেকে যাচ্ছেন।
আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, মতিয়া চৌধুরী, নুরুল ইসলাম নাহিদ, হাসানুল হক ইনু, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, আসাদুজ্জামান নূরসহ প্রায় সব বড় বড় নেতাই বাদ পড়েছেন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমু ও তোফায়েল ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় থাকলেও ২০০৯ সালের সরকার গঠনের সময় বাদ পড়েছিলেন। পরে অবশ্য তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ২০১৪ সালের সরকারেও তারা শিল্প ও বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া এবং নাসিমও ১৯৯৬ সালের সরকারে ছিলেন; ২০০৯ সালের সরকারে নাসিম না থাকলেও ২০১৪ সালের সরকারে আবার ফিরে এসেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে। মতিয়া তিনটি সরকারেই ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। এবার দুজনের একজনও নেই।
সভাপতিম-লীর সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ টানা দুই মেয়াদে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর এবার বাদ পড়লেন। বিদায়ী সরকারে পূর্তমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও বাদ পড়েছেন এবার।
জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলটির নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদের স্থান না পাওয়া অনুমিতই ছিল। দলটির অন্য দুই প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ ও মুজিবুল হক চুন্নুর বাদ পড়াও একই কারণে।
আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোটসঙ্গী জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু দুই মেয়াদে এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এক মেয়াদে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর এবার বাদ পড়েছেন। ২০০৯ সালের সরকারে সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়াকে মন্ত্রী করা হয়। পরবর্তীতে এক পর্যায়ে ইনু ও মেননকেও মন্ত্রী করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এবার আওয়ামী লীগ বাদে অন্য কোনো দলের কাউকে মন্ত্রিসভায় রাখছেন না তিনি।
ফলে মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি জাতীয় পার্টির (জেপি) নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি ১৯৯৬ সালের পর শেখ হাসিনার ২০১৪ সালের সরকারেও মন্ত্রী ছিলেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আগেই অবসর নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচনেও অংশ নেননি। তবে তিনি পরবর্তীতে আবারও মন্ত্রী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
আওয়ামী লীগের বর্তমান মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন দলে শক্তিশালী নেতা হিসেবে পরিচিত শাজাহান খান ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। শাজাহান খান নৌমন্ত্রী ও মায়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। দুই মেয়াদে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর এবার বাদ পড়েছেন শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের শ্বশুর খোন্দকার মোশাররফ হোসেন। বাদ পড়েছেন আসাদুজ্জামান নূরও।
এছাড়াও এবার বাদ পড়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ভূমিমন্ত্রী শামসুজ্জামান শরীফ ডিলু, রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ চন্দ্র, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। পুরনো মন্ত্রীদের মধ্যে থাকছেন কেবল আ হ ম মুস্তফা কামাল, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, আ ক ম মোজাম্মেল হক ও আনিসুল হক। পরিকল্পনা থেকে পদোন্নতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী হয়েছেন মুস্তফা কামাল। বাকি চারজন তাদের আগের দপ্তরেই থাকছেন। ভোটের আগে পদত্যাগ করা টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান তার পুরনো দপ্তর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এবং মোস্তাফা জব্বারও তার পুরনো দপ্তর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিতে ফিরছেন। এক মেয়াদ বিরতির পর মন্ত্রিসভায় ফিরছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি ও প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
বিদায়ী সরকারের নয় প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়েছেন। তারা হলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মতিউর রহমান, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. নজরুল ইসলাম, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। জাতীয় পার্টি থেকে নেওয়া শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাঁও বাদপড়াদের তালিকায় রয়েছেন। বাদ পড়েছেন দুই উপমন্ত্রীও। এরা হলেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আরিফ খান জয়। আরিফ খান জয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি।  
মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেন যারা 
এবার মন্ত্রী হয়েছেন ২৪ জন, প্রতিমন্ত্রী ১৯ এবং উপ-মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনজন। প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রিপরিষদের আকার দাঁড়াচ্ছে ৪৭ জনে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।   
পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে ওবায়দুল কাদের সড়ক পরিবহন ও সেতু, মো. আব্দুর রাজ্জাক কৃষি, আসাদুজ্জামান খাঁন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, আ ক ম মোজাম্মেল হক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক, ড. মোহাম্মদ হাছান মাহমুদ তথ্য, আনিসুল হক আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক, আ হ ম মুস্তফা কামাল হয়েছেন অর্থমন্ত্রী। মো. তাজুল ইসলাম স্থানীয় সরকার, ডা. দীপু মনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, একে আব্দুল মোমেন পররাষ্ট্র, এম এ মান্নান পরিকল্পনা, নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন আসছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। গোলাম দস্তগীর গাজী বস্ত্র ও পাট, জাহিদ মালেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, সাধন চন্দ্র মজুমদার খাদ্য, টিপু মুনশি বাণিজ্য, নুরুজ্জামান আহমেদ সমাজকল্যাণ, শ. ম. রেজাউল করিম গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, মো. শাহাব উদ্দিন পরিবেশ বন ও জলবায়ু, বীর বাহাদুর উশেসিং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে  মো. নুরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ইয়াফেস ওসমান এবং ডাক, টেলি যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হয়েছেন মোস্তাফা জব্বার।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কামাল আহমেদ মজুমদার শিল্প, ইমরান আহমদ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, মো. জাহিদ আহসান রাসেল যুব ও ক্রীড়া, নসরুল হামিদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ, মো. আশরাফ আলী খান খসবু মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান শ্রম ও কর্মস্থান, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, মো. জাকির হোসেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মো. শাহরিয়ার আলম পররাষ্ট্র, জুনাইদ আহমেদ পলক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ফরহাদ হোসেন পেয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। স্বপন ভট্টাচার্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, জাহিদ ফারুক পানি সম্পদ, মো. মুরাদ হাসান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, শরীফ আহমেদ সমাজ কল্যাণ, কে এম খালিদ সংস্কৃতি বিষয়ক, ডা. মো. এনামুর রহমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, মো. মাহবুব আলী বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।
উপমন্ত্রী হয়েছেন তিন জন। বেগম হাবিবুন নাহার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; এ কে এম এনামুল হক শামীম পানি সম্পদ এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী হয়েছেন।
মন্ত্রিসভায় প্রথমবারের মতো ঠাঁই পেলেন ২৭ জন 
নতুন মন্ত্রিসভায় অর্ধেকেরও বেশি এসেছে নতুন মুখ। নতুন মন্ত্রিসভার ২৭ জন এবারই প্রথম মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হলেন।
মন্ত্রী হয়েছেন- কুমিল্লা-৯ আসন থেকে নির্বাচিত মো. তাজুল ইসলাম। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি। নতুন মন্ত্রী সিলেটের সাংসদ এ কে আবদুল মোমেন বিদায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাই। জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ইতিপূর্বে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম পিরোজপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত। রেজাউল করিম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক। আইনজীবীদের বিভিন্ন ফোরামের নির্বাচন ও কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। রাজনীতিবিদ এবং সিনিয়র সফল আইনজীবী হিসেবে ক্লিন ইমেজও তার রয়েছে।
নতুন মন্ত্রী টিপু মুনশি, রংপুর-৪ আসনের এই সাংসদের বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি টিপু মুনশি এর আগে একটি সংসদীয় কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
নতুন মন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, নরসিংদী-৪ আসনের এই সাংসদ যুবলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী। খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা গাজী গ্রুপের মালিক, যাদের বিভিন্ন ব্যবসার পাশাপাশি টেলিভিশনও রয়েছে। সাধন চন্দ্র মজুমদার, নওগাঁ-১ আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন।
প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়েছেনÑ মৌলভীবাজারের আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহাব উদ্দিন। এছাড়া রেলমন্ত্রী হয়েছেন নুরুল ইসলাম সুজন, পঞ্চগড় আওয়ামী লীগের এই নেতা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। 
নতুন মন্ত্রিসভায় ১৯ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ১৫ জনই নতুন। তারা হলেন- কামাল আহমেদ মজুমদার, ইমরান আহমাদ, জাহিদ আহসান রাসেল, আশরাফ আলী খান খসরু, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, জাকির হোসেন, ফরহাদ হোসেন, স্বপন ভট্টাচার্য, জাহিদ ফারুক, মুরাদ হাসান, শরীফ আহমেদ, কে এম খালিদ, এনামুর রহমান, মাহবুব আলী, শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন খুলনার মুন্নুজান সুফিয়ান, যিনি ২০০৯ সালের সরকারেও এই দায়িত্বে ছিলেন। 
মন্ত্রিসভার তিন উপমন্ত্রীই এবার প্রথম মন্ত্রিসভায় এসেছেন। তারা হলেন- খুলনার মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের স্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। 
যে কারণে নতুন সরকারে ঠাঁই হয়নি বাঘা বাঘা মন্ত্রীদের
শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি অনেক বাঘা বাঘা মন্ত্রীর। পরিবহনখাতে একচেটিয়া আধিপত্যবিস্তারকারী বিতর্কিত মন্ত্রী শাজাহান খানের স্থান হয়নি নতুন মন্ত্রিসভায়। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় রাজধানীতে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় হেসে হেসে বিতর্কিত মন্তব্য করায় শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে তার নানা কর্মকা- নিয়ে। একের পর এক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে তার নেতৃত্বে পরিবহনখাতে চরম নৈরাজ্যের চিত্র।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানান মন্তব্য করে বিতর্ক সৃষ্টি করেন শাজাহান খান। তার মন্তব্য নিয়ে আলোচনার চেয়ে সমালোচনাই ছিল বেশি। সারাদেশে পরিবহন খাতে একের পর এক নৈরাজ্যের পরও বারবার পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ নেয়ায় তিনি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয়েছেন। নানা ইস্যুতে বিতর্কিত কর্মকা-ে আলোচিত-সমালোচিত শাজাহান খানের পদত্যাগেরও দাবি ওঠে একসময়। তবে নিজের জায়গা ছাড়েননি তিনি। এসব কারণে নতুন মন্ত্রিসভায় তিনি স্থান পাননি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। 
 ২০০৯ সাল থেকে টানা দুই মেয়াদে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শকদের প্রতিবেদন দেয়ার ক্ষেত্রে ‘সহনশীল মাত্রা’য় ঘুষ খাওয়ার বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হন  ব্যাপকভাবে। এ ছাড়া একের পর এক বোর্ড পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, জেএসসি-পিএসসি পরীক্ষা, পাঠ্যপুস্তকে ভুলসহ নানা কারণে সমালোচিত হন তিনি। তার পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষাখাতে দুর্নীতির ফিরিস্তিও দীর্ঘ। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে দেশে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নাহিদ সারাদেশে ব্যাপক সমালোচিত হন। সরকার ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। তখন তার পদত্যাগেরও দাবি উঠে। এসব কারণে নতুন মন্ত্রিসভায় তিনি স্থান পাননি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। 
রেলে ব্যাপক নিয়োগ দুর্নীতির কারণে অনেক আগ থেকেই সমালোচনায় ছিলেন রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক। যে কারণে তিনি বাদ পড়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির কারণে বিতর্কিত মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারও বাদ পড়েছেন এবার। পঁচাগম আমদানিসহ নানা কারণে বিতর্কিত  খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামও ঠাঁই পাননি নতুন মন্ত্রিসভায়।  
ফোন না পেয়ে কাঁদলেন মন্ত্রীরা
৬ জানুয়ারি রোববার নতুন মন্ত্রিসভায় ডাক না পাওয়া মন্ত্রীরা সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে অফিস করলেও তবে কোনো কাজ করেনি। পুরনো মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই ৬ জানুয়ারি সকালে সচিবালয়ে এলেও ঘণ্টা দুয়েক থেকে বেরিয়ে যান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক নিজ দপ্তর থেকে কেঁদে চলে যান। অফিস করলেও তারা দাপ্তরিক কোনো কাজ বা অফিসিয়াল কোনো ফাইলে সই করেনি। অনেকে অফিসেই আসেননি।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, রেলমন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, তথ্য প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে উপস্থিত হলেও কোনো দাপ্তরিক কাজ করেননি। অফিসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে সচিবালয় থেকে কেউ দুপুরের আগে কেউবা দুপুরের খানিক পরে বেরিয়ে যান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান মন্ত্রীরা ফোন না পাওয়ায় কেঁদেছেন। অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মন্ত্রী বলেন, এবার এ রকম মন্ত্রিসভা গঠন করবে তা বুঝতে পারিনি।
এছাড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত,স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী শাহজাহান কামাল, ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু  ৬ জানুয়ারি সর্বশেষ কর্মদিবসে অফিসেই আসেননি। নতুন মন্ত্রিসভায় যোগদানের জন্য ৬ জানুয়ারি সকাল থেকে অন্যরা ফোন পেলেও পুরনো এসব মন্ত্রীরা ফোন না পেয়ে নিশ্চিত হয়ে যান তারা এবার ডাক পাচ্ছেন না। 
বাম আউট ছাত্রলীগ ইন
নতুন মন্ত্রিসভার চমক মূলত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্য। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দেয়া নতুন মন্ত্রিসভার তালিকা দেখে মনে হচ্ছে এবার সরকার গঠনে বাম আউট ছাত্রলীগ ইন ঘটতে যাচ্ছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভায় বামদের আধিক্য দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর অধিকাংশই সিপিবির অঙ্গসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতাদের দখলে ছিল। বাম চেতনার মন্ত্রীদের মন্ত্রণালয়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা ছিলেন অবহেলিত। এবার মন্ত্রিসভায় নতুন-পুরনো মিলে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। বামপন্থী হিসেবে পরিচিত যারা পুরনো মন্ত্রিসভায় জাঁদরেল মন্ত্রী ছিলেন, তাদের প্রায় সকলকেই বাদ দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভায় যেমন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ওবায়দুল কাদের রয়েছেন; তেমনি এ কে এম এনামুল হক শামীম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর মতো সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জায়গা পেয়েছেন। এ ছাড়াও শ.ম. রেজাউল করিম, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, দীপু মনি, নুরুল ইসলাম সুজন, শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, মহিবুল হাসান চৌধুরী, হাবিবুন নাহার কে এম খালিদ, স্বপন ভট্টচার্য যারা নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা পাচ্ছেন তাদের অধিকাংশই ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৭ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)