বৃহস্পতিবার, ১৮-জুলাই ২০১৯, ০১:১৩ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • স্বাস্থ্যখাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মিঠু সিন্ডিকেট

স্বাস্থ্যখাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মিঠু সিন্ডিকেট

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৭:৫৫ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: স্বাস্থ্যখাতে ঠিকাদারির নামে লুটপাটের এক মাফিয়া সিন্ডিকেটের নাম মিঠু সিন্ডিকেট। প্রায় একদশক ধরে এই খাত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের মাথায় চেপে লুটতরাজ শুরু করলেও মোহাম্মদ নাসিমের আমলেও তা অব্যাহত ছিলো। বিগত ১০ বছরে স্বাস্থ্যখাত থেকে অর্থ হরিলুটের জন্য নামে-বেনামে বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে মিঠু সিন্ডিকেট। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের তদন্তেও তা বেরিয়ে এসেছে। উঠে এসেছে মিঠুর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের ফিরিস্তি। 
সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন সময়ে টেন্ডারের নামে স্বাস্থ্যখাত থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে মিঠুর নেতৃত্বাধীন এই সিন্ডিকেট। কিন্তু দুদকের প্রাথমিক তদন্তে এসব তথ্য প্রমান পেলেও এখন পর্যন্ত মিঠু রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই। 
সূত্রগুলো বলছে, মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু স্বাস্থ্য খাতের অঘোষিত রাজা। স্বাস্থ্যখাতের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নানা রকমের নানা-জালিয়াতির মাধ্যমে কার্যাদেশ নিয়ে অর্থ লোপাট তার পেশা বললেই চলে। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতেও এই ঠিকাদারের নাম এসেছে। 
ডা. আ ফ ম রুহুল হক স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকার সময় উত্থান ঘটে আলোচিত এ ঠিকাদারের। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে সিন্ডিকেট করে একচেটিয়া লাগামহীন লুটপাট চালান তিনি। এমনকি কোনো কোনো হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো হাসপাতালে নির্ধারিত যন্ত্রপাতির বদলে পুরাতন এবং নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, একই কাজের বিল একাধিকবার তুলে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদ নাসিম স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার দৌরাত্ম থেমে থাকেনি। মন্ত্রী নাসিমের পরিবারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তার আমলেও স্বাস্থ্যখাত দাপিয়ে বেড়িয়েছে এই দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার।
স্বাস্থ্যখাতের আতঙ্ক ও বিতর্কিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। নানা অনিয়ম ও অবৈধ টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। দুদকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদার মিঠু অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাটের কৌশলকে পুঁজি করে কয়েক বছরের ব্যবধানে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হকের ছেলে জিয়াউল হককে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার শ্যামলী রিং রোডে গড়ে তুলেছেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল  মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল। মিঠু নিজে এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। এছাড়াও রাজধানীর ধানমন্ডি, বনানী, ওল্ড ডিওএইচএস, গুলশান, মোহাম্মদপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অভিজাত ফ্ল্যাট রয়েছে মিঠুর।  রাজধানীতে নামে বেনামে রয়েছে প্লট। রংপুর মেডিকেল কলেজ  ও হাসপাতালের পূর্ব পাশে নির্মাণ করেছেন রাজকীয় বাসভবন। দেশের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল অর্থ পাচার করেছেন। গড়ে তুলেছেন বিত্ত-বৈভব। মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যৌথভাবে ব্যবসাও চালু করেছেন পাচার করা অর্থে।
যেভাবে মিঠুর উত্থান
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে ছোটখাট ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু হয়েছিলো মিঠুর। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্যখাতে প্রবেশ করেন তিনি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে ডা. আ ফ ম রুহুল হক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলে সৌভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় মিঠুর। ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন মন্ত্রীর ছেলে  জিয়াউল হকের সঙ্গে। জিয়াউল হককে নিজের ব্যবসায়িক পার্টনার করেন মিঠু। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্ষমতা, দাপট, অর্থ সবই তিনি কব্জা করে নিয়েছেন অল্প দিনের মধ্যে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলেকে পার্টনার করার পর মিঠুর ঠিকাদারিও আর ছোটখাট গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।  রাতারাতি পুরো স্বাস্থ্যখাতের শীর্ষ ঠিকাদার হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। সেই থেকে স্বাস্থ্যখাতের টেন্ডারবাজদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক মিঠু। মন্ত্রীর আশির্বাদ ও তার ছেলের ব্যবসায়িক পার্টনার হওয়ার বদৌলতে কোন অবস্থাতেই বেগ পেতে হয়নি মিঠুকে। লুটপাটের সুবিধার জন্য বিভিন্ন ভুয়া ঠিকানায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে ১০ টি ঠিকাদারি ফার্মের লাইসেন্স করেছেন। যার মাধ্যমে বিগত ১০ বছরে দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোর সিংহভাগ ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেন মিঠু।
মিঠু সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ ও লাগামহীন দুর্নীতির কারণে ২০১৩ সালের শেষে নির্বাচনকালীন সরকারের সময় রুহুল হককে মন্ত্রীপদ থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ নাসিম। মোহাম্মদ নাসিম মন্ত্রীপদে বসেই যে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটকে এড়িয়ে চলার ঘোষণা দেন। এ সময় কিছুটা বেকায়দায় পড়েন মিঠু। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মিঠু সবকিছু আগের মতো ঠিকঠাক করে ফেলেন। মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যকে সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে আবারো পুরো স্বাস্থ্যখাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হন। এসময় স্বাস্থ্যসচিব পদে ছিলেন নিয়াজউদ্দিন মিয়া। এরপর স্বাস্থ্যসচিব হয়ে আসেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এই দুই সচিবও মিঠু সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) পদে থাকাকালে ডা. এবিএম আবদুল হান্নান এবং তার পরের পরিচালক (হাসপাতাল) ড. সামিউল ইসলাম সাদীও মিঠু সিন্ডিকেটের সদস্য হয়ে যান। অধিদফতরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) ডা. আব্দুর রশিদও এ সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করেন। এরা মিঠুকে শত শত কোটি টাকা লুটপাটে সহযোগিতা করেন। সূত্রমতে, মন্ত্রী-সচিবসহ স্বাস্থ্যখাতের উপরের প্রশাসনিক পদগুলোতে যখন যিনি আসেন তিনিই মিঠুর সিন্ডিকেটের সদস্য হয়ে যান। এছাড়া নিচের পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন পদে মিঠু সিন্ডিকেটের কিছু পারমানেন্ট সদস্যও আছে। 
যেভাবে লুটপাটের পথ তৈরি করে মিঠু সিন্ডিকেট 
বহুল আলোচিত মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু সিন্ডিকেট বলতে গেলে গত এক দশক ধরে গোটা স্বাস্থ্যখাতে জাল বিস্তার করে আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, সিএমএসডি ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমুহে মিঠু তার এজেন্ট নিয়োগ করেছে। এসব এজেন্টরাই মিঠুর হয়ে কাজ করে। কখনো উপরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব খাটানো হয়, কখনো অর্থের লেনদেনে ম্যানেজ করা হয়, আবার তাতে কাজ না হলে হুমকি-ধমকি দিয়ে কাজ আদায় করা হয়। সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল সরকারি হাসপাতালেই মিঠু সিন্ডিকেটের প্রচন্ড দৌরাত্ম রয়েছে। এসব জায়গায় মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনার নামে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। 
 শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটে রয়েছে সরকারি সিনিয়র পর্যায়ের ডাক্তার, প্রশাসনের কর্মকর্তা, কর্মচারী ছাড়াও বাইরের কিছু দালাল। এরা সরকারি যে হাসপাতাল বা যে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে সেই হাসপাতালের প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে আগেই বোঝাপড়া করে নেয়। টেন্ডার যেভাবেই আহ্বান করা হোক, যে বা যারাই টেন্ডারে অংশ নিক না কেন কাজ তাদেরই দিতে হবে। ওই স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কোনো যন্ত্রপাতির প্রয়োজন না থাকলেও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চাহিদা তৈরি করা হয়। যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে তারাই এনে দেয়ার ব্যবস্থা করে। এরপরেই শুরু হয় টেন্ডার কারসাজি। টেন্ডার ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়ার সব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয় টেন্ডার সিডিউল তৈরি করার সময়ই। সিন্ডিকেটের বিশেষ প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ যাতে টেন্ডারে অংশ নিতে না পারে সেভাবেই স্পেসিফিকেশন তৈরি করা হয়। সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কেউ টেন্ডারে অংশ নিলেও সেগুলোকে নানান অজুহাতে নন-রেসপন্সিভ করা হয়। এভাবেই কমমূল্যের যন্ত্রপাতি বেশি মূল্যে বা অস্বাভাবিক মূল্যে সরবরাহের কার্যাদেশ আদায় করে নেয় সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু, তাতেও এরা ক্ষান্ত হয় না। এক দেশের তৈরিকৃত মালামাল সরবরাহের কথা বলে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আরেক দেশের তৈরি করা কমমূল্যের ও নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করে থাকে। দেখা যায়, ইউরোপ-আমেরিকার মালামালের কথা বলে চীন বা ভারতের মালামাল সরবরাহ করা হয়। যেহেতু সর্বত্রই সিন্ডিকেটের লোকজন নিয়োজিত থাকে তাই এসব জাল-জালিয়াতি কোথাও বাধা পায় না। আর এভাবেই হাতিয়ে নেয়া হয় সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা।
মিঠু সিন্ডিকেটের সদস্যকে দুদকে তলব 
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ভুয়া টেন্ডারের মাধ্যমে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মিঠু সিন্ডিকেটের সদস্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে তলব করেছে দুদক। এরপর গত ১৬ জানুয়ারি আরো ৫ কর্মচারীকে তলব করা হয়। দুদকের উপপরিচালক শামসুল আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়সহ গোটা স্বাস্থ্য খাতে মিঠু সিন্ডিকেটের আরো অনেক দুর্নীতিবাজ সদস্য রয়েছে। যারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। এমনকি গডফাদার মিঠুও এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। মিঠু কখনো দেশে থাকছে কখনো বা বিদেশে। এরমাধ্যমে সে অবৈধপন্থায় উপার্জিত শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। ১৪ জানুয়ারি দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে সিন্ডিকেটের এক সদস্য হাজির হয়েছে। এদিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের উপ-পরিচালক মো. শামছুল আলম।
এর আগে গত ৯ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর ৪ জনকে তলব করে নোটিশ প্রেরণ করে দুদক। যাদেরকে তলব করা হয় তারা হলেন, পরিচালক (চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি) ডা. আবদুর রশীদ, পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন, সহকারী পরিচালক (বাজেট) ডা. আনিসুর রহমান ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আফজাল হোসেন।
এদের মধ্যে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে এদিন হাজির হয়েছে, সহকারী পরিচালক (বাজেট) ডা. আনিসুর রহমান।
উল্লেখ্য, পরিচালক আবদুর রশীদের দুর্নীতি-অপকর্ম নিয়ে শীর্ষ কাগজে ইতিপূর্বে একাধিক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। কিন্তু, তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের ছত্রছায়ায় থাকায় তিনি তখন পার পেয়ে যান।
দুদকের উপ-পরিচালক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামছুল আলম বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমানকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে টেলিফোনে দুদিন সময় চেয়েছেন পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন। আর ১৫ দিনের সময় আবেদন করেছেন লাইন ডিরেক্টর ডা. আব্দুর রশিদ। এর আগে হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা আফজাল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, যার কারণে তিনি আসেননি।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সিন্ডিকেট করে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশে অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
গত ১৬ জানুয়ারি আরো যে ৫ কর্মচারীকে তলবের চিঠি দেয়া হয় এরা হলেন ফরিদপুর টিবি হাসপাতালের ল্যাব এটেনডেন্ট বেলায়েত হোসেন, জাতীয় অ্যাজমা সেন্টারের হিসাবরক্ষক লিয়াকত হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক রাকিবুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের উচ্চমান সহকারী বুলবুল সিলাম ও খুলনা মেডিকেল কলেজের অফিস সহকারী শরিফুল ইসলাম। এই ৫ জনকে ২২ জানুয়ারি দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে।
অঢেল সম্পদ আবজাল দম্পতির
তিনি বেতন পান সর্বসাকুল্যে ৩০ হাজার টাকার মতো। অথচ চড়েন হ্যারিয়ার ব্র্যান্ডের গাড়িতে। বাম হাতে রোলেক্সের ঘড়ি, আঙ্গুলে হিরার আংটি। উত্তরার এক সড়কে পাঁচটি বাড়ি। দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্যমতে, গুলশান, বনানী, বারিধারায় ২০টি, সারাদেশে প্লট-বাড়ি কেনায় সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। শুধু দেশেই নয়; সম্পদের পাহাড় গড়েছেন মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও। 
নাম তার আবজাল হোসেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখায় অ্যাকাউন্টস অফিসার পদে আছেন তিনি। অধিদফতরের সিনিয়রদের যোগসাজশে কেনাকাটার টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। বদলি বাণিজ্যও করতেন। তবে দুর্নীতি আর অবৈধ আয়ে সিনিয়রদেরও টপকে গেছেন আবজাল। বাংলাদেশের সাজাপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে হাজার, দুই হাজার, তিনহাজার কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ থাকলেও আবজাল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে সেগুলোর সন্ধান পেতে শুরু করেছে দুদক।
আবজালের জ্ঞাত সম্পত্তিকে টাকায় অঙ্কে আনতে হিমশিম খাচ্ছে দুদকের কর্মকর্তারা। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কেই তাদের ৪টি পাঁচতলা বাড়ি ও একটি প্লট রয়েছে। ১১ নম্বর সড়কের ১৬, ৪৭, ৬২ ও ৬৬ নম্বর বাড়িটি তাদের নামে। সড়কের ৪৯ নম্বর প্লটটিও তাদের।
মিরপুর পল্লবীর কালশীর ডি-ব্লকে ৬ শতাংশ জমির একটি, মেরুল বাড্ডায় আছে একটি জমির প্লট। মানিকদি এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছেন, ঢাকার দক্ষিণখানে আছে ১২ শতাংশ জায়গায় দোতলা বাড়ি। নিজ জেলা ফরিদপুরেও অঢেল সম্পত্তির মালিক আবজাল। মালয়েশিয়ায় ২ একর জমি, অস্ট্রেলিয়ায় ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা-বাড়ি, কানাডায় কেসিনোর মালিকানা-ফার্ম হাউজ এবং যুক্তরাষ্ট্রে হোটেল রয়েছে। অ্যাকাউন্টস অফিসার থাকা অবস্থায় ব্যবহার করেছেন লেক্সাস গাড়ি। যা বাংলাদেশের মন্ত্রী ও সচিব পদের কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন। আবজাল দম্পতি নানা কাজের জন্য বছরে ২০ থেকে ২৫ বার দেশের বাইরে ভ্রমণ করেন বিজনেস ক্লাসের টিকেটে। প্রাথমিক তদন্তে আবজালের উত্তরার বাড়ি-প্লট, ফরিদপুরের অঢেল সম্পদ ও অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি থাকার অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। আবজাল চাকরিরত অবস্থায় এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পর্দার আড়ালে ছিলেন তার স্ত্রী রুবিনা। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের তদন্তকারী অফিসারদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০১২ সালে তৈরি করেছেন পাসপোর্ট, যার অধিকাংশ তথ্যই ছিল ভুল (পাসপোর্ট নম্বর এসি-৭৮৯৭২৫৪)। পাসপোর্টে তার বর্তমান, স্থায়ী ঠিকানার জায়গায় তিনি ১৫/১ আলবদিরটেক, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, পল্লবী, ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করেছে। ঠিকানাটি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের। রুবিনার বর্তমান ঠিকানা খিলক্ষেতের নিকুঞ্জে এবং স্থায়ী ঠিকানা গোপালগঞ্জে। এমনকি ইমার্জেন্সি কন্টাক্টে তার স্বামী আবজাল হোসেনের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাকে স্বামীর একই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন তিনি।
আবজাল দম্পতির এমন কর্মকা-ের প্রমাণ পেয়ে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ৮ জানুয়ারি পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখায় চিঠি পাঠায় দুদক। ১০ জানুয়ারি তাকে দুদক কার্যালয়ে ডেকে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন দুদকের উপ-পরিচালক (ডিডি) সামছুল আলম।
থেমে আছে গডফাদার মিঠুর তদন্ত
মিঠুর শীষ্যদের দুর্নীতির তদন্ত শুরু করলেও গডফাদার মিঠুর লাগামহীন দুর্নীতি-জালিয়াতি ও হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত থেমে আছে গত প্রায় তিন বছর ধরে। দুর্নীতি দমন কমিশন ২০১৬ সালে অনেক ডাকঢোল পিটিয়ে স্বাস্থ্যখাতের গডফাদার মিঠুর দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছিল। তদন্ত অনেকটা এগিয়েও ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত থেমে যায়। 
ওই সময় দুদকের প্রাথমিক তদন্তে মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর নামে বেনামে থাকা ১৬ প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে। স্বাস্থ্যখাতে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকা-ের বিষয়ে তথ্য চেয়ে ২০১৬ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি পাঠায় দুদক।  এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মিঠু ও তার স্ত্রীর যৌথ নামে রয়েছে লেংক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্রেট লিমিটেড। দুদকের চিঠিতে মিঠুকে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের  প্রোপাইটর উল্লেখ করে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে- (১)বাসা নং-৮, রোড-৬, ব্লক-সি, বনানী, ঢাকা। (২) কাজী ভবন, ৭ম তলা, ৩৯ নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। (৩) রুম নং-৩০৯, রাজা রামমোহন মার্কেট, রংপুর (৪) হাউজ নং ৪২০, রোড-১১, সিডিএ, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম। (৫) ১৪৩, মালিবাগ বাজার রোড, ঢাকা। (৬) বাড়ি নং-৫/এ,  রোড-২৫/এ, ব্লক-এ, বনানী, ঢাকা। 
এছাড়া মিঠুকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান উল্লেখ করে সে বিষয়েও তথ্য চায় দুদক। মিঠুর স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বড়ভাইয়ের নামে রয়েছে সিআর মার্চেন্ডাইজ ও এলআর এভিয়েশন নামে দুটি লাইসেন্স। মিঠুর ভাবীর নামে রয়েছে জিইএফ এন্ড ট্রেডিং। ভাগ্নের নামে রয়েছে ট্রেড হাউস। ভাগ্নেবধূর নামে রয়েছে মেহেরবা ইন্টারন্যাশনাল। আত্মীয়দের নামে আরো আছে- ক্রিয়েটিভ ট্রেড, ফিউচার ট্রেড, লেক্সিকোন আইটি প্রাইভেট লিঃ, টেকনো ট্রেড, বেলএয়ার এভিয়েশন, জিইএস এন্ড ট্রেডিং, হ্যাভ ইন্টারন্যাশনাল, লেসিকন হসপিটালিটি, নর্থ টেক এলএলসি লিমিটেড। দুদকের ওই চিঠিতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও পরিচালককে লেখা দুদকের  চিঠিতে ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ ঠিকাদারী ব্যবসায় দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ’ বিষয়ে সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে এসব ঠিকাদারি ফার্ম ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছর থেকে  এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সেক্টরে বিভিন্ন উন্নয়ন, সেবা খাতে  যে সমস্ত কাজ বাস্তবায়ন করেছে, চলমান আছে এবং ওষুধ-মালামাল-যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছেন সেগুলোর প্রশাসনিক অনুমোদন, বরাদ্দপত্র, প্রাক্কলন-টেন্ডার,  কোটেশন, দাখিলকৃত টেন্ডার, টেন্ডার সিডিউল, ওপেনিং মেমো, তুলনামূলক বিবরণী, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কার্যাদেশ/ সরবরাহ আদেশ,  চুক্তি, কার্যসমাপ্তি প্রতিবেদন,  ওষুধ-মালামাল-যন্ত্রপাতি গ্রহণ সংক্রান্ত নোট শিট, বিল ভাউচার,  কাজ বুঝে নেয়ার  রেকর্ডসহ  প্রাসঙ্গিক সব তথ্য/ রেকর্ডপত্র ২০১৬ সালের ৩০ মের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কয়েক দফা তাগিদ দেয়ার পরেও স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে এসব রেকর্ড দেয়া হয়নি। একসময় ওই বিষয়টি ধামচাপা পড়ে যায়। দুদকও আর তৎপরতা দেখায়নি। ফলে গত প্রায় পৌনে তিন বছর যাবৎ এতোবড় দুর্নীতি-লুটপাটের তদন্ত থেমে রয়েছে। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২১ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)