মঙ্গলবার, ২১-মে ২০১৯, ০৭:০৩ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীক্ষার খাতা গায়েব!

স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীক্ষার খাতা গায়েব!

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দেশের ৯ জেলায় সিভিল সার্জন অফিসে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রই গায়েব হয়ে গেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করতেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক একজন পরিচালকের নেতৃত্বে এই খাতা গায়েবের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, মূলত যেসব প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি তাদেরকে অবৈধভাবে নিয়োগ দিতেই এসব খাতা গায়েব করা হয়েছে। এতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এমন অনেক প্রার্থীই বাদ পড়েছেন উত্তীর্ণদের তালিকা থেকে। 
জানা গেছে, এ পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের বর্তমান কর্মকর্তারা। কারণ, একই নিয়োগ পরীক্ষার দু’টি সিট তাদের হাতে এসেছে। কোনটি সঠিক- সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নিয়োগ পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনরায় দেখা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই উত্তরপত্র জায়গামত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে সর্বোচ্চ আদালতের রায় এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য। এছাড়া নিয়োগ প্রত্যাশীদেরও আন্দোলনের কর্মসূচির চাপ আছে। 
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনে ১১টি জেলায় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির প্রায় ৯১টি শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। ২০১৩ সালের ২৬ এপ্রিল ৯টি জেলায় লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২৫ জুন অধিদফতরের ওয়েবসাইটে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। ১৯-২০ আগস্ট লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এ সময় লিখিত পরীক্ষায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হলে আদালত শুনানি শেষে কিছু অবজারভেশন দিয়ে মামলা খারিজ করে দেয়।
এরপর স্বাস্থ্য অধিদফতর নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে তিনটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল করেন এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে নিয়মানুসারে নিয়োগ দেয়ার নির্দেশ দেন। তারপরও অধিদফতর নিয়োগ সম্পন্ন করতে গড়িমসি করলে বিষয়টি ফের আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এরপর ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিয়োগ সম্পন্ন করতে আদালত বরাবর ৪৫ দিন সময় প্রার্থনা করে নিয়োগ বাস্তবায়ন কমিটি। এরইমধ্যে আপিল বিভাগ এবং রিভিউ নিয়ে আইনগত জটিলতায় ৩ বছর গড়িয়ে যায়। ২০১৮ সালের ২১ মে স্বাস্থ্য অধিদফতর দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করতে কমিটিকে নির্দেশ দেয়। পরে আদালত ও মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাতিলকৃত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। ফলে নিয়োগ সম্পন্ন করার দাবিতে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ২ হাজার ৭৩৩ জন লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিসহ নানা ধরনের আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) ও  নিয়োগ কমিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান ডা. শাওনেওয়াজকে স্বাস্থ্য অধিদফতরে ডাকা হয়। এ সময় তাকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের একটি তালিকা দিয়ে এতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। কিন্তু ওই তালিকা পর্যবেক্ষণ করে এতে গরমিল দেখতে পেয়ে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান ডা. শাহনেওয়াজ। ডা. শাহনেওয়াজের দাবি, তিনি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিয়োগপ্রত্যাশীদের যে তালিকা দিয়েছিলেন সেই অরিজিনাল তালিকা এটি নয়। নতুন এই তালিকায় জালিয়াতির মাধ্যমে অনেক নিয়োগ প্রত্যাশীর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং অনুত্তীর্ণ অনেককে পাস দেখিয়ে এই তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। 
জানা যায়, ডা. শাহনেওয়াজের পরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে যিনি এসেছেন তার সময়ে এই তালিকা পরিবর্তিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই নিয়োগ কেলেঙ্কারির পুরো ঘটনা লিখিতভাবে অবহিত করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনও পাঠিয়েছে অধিদফতর। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই তালিকার কোনো সুরাহা করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়। এমনকি লিখিত পরীক্ষায়  উত্তীর্ণদের কোন তালিকা সঠিক সেটিও নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। কারণ,  জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন তালিকা করতে গিয়ে নিয়োগ প্রত্যাশীদের লিখিত পরীক্ষার খাতাই গায়েব করে দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে। এসব কারণে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে নিয়োগপ্রত্যাশীদের মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। ৭ বছর অপেক্ষায় থাকা নিয়োগপ্রত্যাশীরাও আন্দোলন করে যাচ্ছেন। এমন অবস্থায় এই নিয়োগ কেলেঙ্কারি নিয়ে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও। 
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত বর্তমান কমিটির চেয়ারম্যান, পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো আমিরুজ্জামানকে শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে মোবাইল ফোনে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথম বলেন, এসব তথ্য আপনি কোথা থেকে জানলেন? তারপর তিনি বলেন, আমাদের কাছে রেজাল্টসিট আছে তার ভিত্তিতেই আমরা ফলাফল এবং নিয়োগ দেবো। এই নিয়োগ পরীক্ষার উত্তরপত্র অধিদফতরে আছে কিনা, এ প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি খানিকটা থেমে যান এবং এক পর্যায়ে ফোনটি কেটে দেন।
প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের আওতাধীন সিভিল সার্জন অফিসে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কর্মচারী নিয়োগ করার নিয়ম ছিল। ২০১২ সালের ২০ মার্চ এক পরিপত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের জন্য এখন থেকে সারা দেশে একযোগে নিয়োগ পরীক্ষা হবে। লিখিত পরীক্ষা জেলা পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জেলায় এবং মৌখিক পরীক্ষা বিভাগীয় পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিভাগে নেওয়া হবে। জেলা সিভিল সার্জনকে সভাপতি, ইউএইচএফপিওকে (উপজেলা হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি প্ল্যানিং অফিসার) সদস্যসচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে সদস্য করে তিন সদস্যের জেলা নিয়োগ কমিটি করার কথা বলা হয়।
ওই পরিপত্র অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নওগাঁ, যশোর, নড়াইল, সাতক্ষীরা, বরিশাল ও নোয়াখালী এই ৯ জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, স্টোরকিপার, মালি, সুইপার, নিরাপত্তা প্রহরী, আয়া প্রভৃতি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেয়ার পর মামলা জটিলতাসহ নানা কারণে ইতিমধ্যে প্রায় ছয় বছর পার হয়ে গেছে। এখন আবার দেখা দিলো নতুন সমস্যা। এই সমস্যার কীভাবে সুরাহা হবে তা কেউ বলতে পারছেন না।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)