বুধবার, ২০-নভেম্বর ২০১৯, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন

চীনা ঋণের ভয়ংকর ফাঁদে বাংলাদেশ

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৫ মে, ২০১৯ ১২:০৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রায় দুই হাজার বছর আগে চীনে হান সাম্রাজ্যের কালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিল্করুট নামের ঐতিহাসিক বাণিজ্য পথ। এই সড়ক দিয়ে শুধু চীনা ব্যবসায়ীরাই নয়; আরব, তুরস্ক, আর্মেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা ইউরোপ, আফ্রিকা আর এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। এই রুট দিয়ে চীনের উৎকৃষ্টমানের সিল্ক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো বলেই এর নাম হয়ে যায় সিল্করুট। সেই ধারণা সামনে রেখে ৭০টিরও বেশি দেশকে মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত করতে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ নামে এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে চীন। ওই দেশগুলো যাতে এ প্রকল্পের সঙ্গে থাকে, এ জন্য বিভিন্ন দেশকে ঋণ দেয়া হচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই মহাসড়কে যুক্ত হতে গিয়ে ধীরে ধীরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে দেশগুলো। এ জন্যই চীনের এই উদ্যোগকে ‘ঋণের ফাঁদ’ হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা।
২০১৩ সালে নিউ সিল্করুটের উদ্যোগের কথা প্রথম ঘোষণা করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই প্রকল্পের আওতায় বিশ্বব্যাপী রেলপথ, সড়ক এবং বন্দর নির্মাণ করা হবে। এ জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে কোটি কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে বেইজিং। এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, চীন ঋণের ফাঁদ পেতে তার আওতায় যেসব দেশকে ঋণ দিচ্ছে, সেসব দেশের ঋণ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোতে ইতিমধ্যে চীনের বিনিয়োগ পাঁচ ট্রিলিয়ন ছাড়িয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে ছয় হাজার কোটি ডলারই সরাসরি বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশও পায়রা বন্দর নির্মাণের মধ্য দিয়ে চীনের এই ঋণ ‘ফাঁদে পা দিয়েছে’ বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনেও এই শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। এএনআই এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে ঋণের ফাঁদে ফেলতে চাইছে চীন। পাকিস্তানের গোয়াদার, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের পর এবার বাংলাদেশের পায়রা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় বেইজিং। 
ভারতীয় এই সংবাদমাধ্যম বলছে, চীন ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে থাকা সম্পর্ককে আরো বিস্তৃত করতে বেশ কিছু চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। চীনের আড়ম্বরপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অর্থনৈতিক করিডোর ওবর (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) কর্মসূচি, যাকে বিআরআই’ও (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) বলা হয়ে থাকে, তার অধীনে এ চুক্তি করা হয়। এর উদ্দেশ্য অবকাঠামো বিষয়ক প্রকল্পগুলোতে চীনের অর্থায়নে এশিয়ার দেশগুলোকে সম্পর্কযুক্ত করা। একে পর্যবেক্ষকরা দেখেন একবিংশ শতাব্দীর ‘সিল্ক রোড’ হিসেবে। চীন বাংলাদেশে যে প্রকল্পগুলোতে হাত দিয়েছে তার মধ্যে বিশেষ করে একটিতে তাদের বিশেষ স্বার্থ রয়েছে। সেটি হলো পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের বিস্তার ও উন্নয়ন। এই বন্দরের মূল অবকাঠামো নির্মাণে ৬০ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে চীনের দু’টি প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি ও চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। নদী তীরবর্তী অবকাঠামো নির্মাণের কথাও রয়েছে এর মধ্যে। তার মধ্যে আছে গৃহায়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা। এছাড়া চীন বাংলাদেশের সড়ক, বিদ্যুৎ, আইসিটি, নৌ-খাতসহ বিভিন্ন সেক্টরে শত শত কোটি ডলারের ঋণ দিয়েছে। এসব অর্থ বাংলাদেশের পক্ষে আদৌ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে না। সেই সুযোগটিই চীন তাদের স্বার্থ হাসিলের কাজে ব্যবহার করবে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এএনআই বলছে, মূল উদ্দেশ্যকে চীন তার বিনিয়োগ কৌশলের মধ্যে ধোঁয়াসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। তারা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। চীন একই রকম কৌশল প্রয়োগ করেছিল শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দরে তাদের উন্নয়নকালে। ওবিওআর কর্মসূচির অধীনে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসের সরকারকে কয়েক শ’ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল চীন। এর উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোর অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নেয়া। তার মধ্যে কৌশলগত হাম্বানটোটা বন্দরের উন্নয়ন ছিল তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকারে। কিন্তু ঋণের ভারে জর্জরিত শ্রীলঙ্কার নতুন ঋণ ফুলেফেঁপে বেলুনের মতো রূপ ধারণ করতে থাকে। এই তথাকথিত ‘সফ্ট লোন’ শ্রীলঙ্কাকে শোধ করতে গিয়ে ওই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে ৯৯ বছরের জন্য তুলে দিতে হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। ঢাকায় চীনের এই কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার কথা কেউ ভুলে যায়নি। কর্মকর্তারা এটা ভেবে উদ্বিগ্ন যে, চীন সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ত মদতপুষ্ট দু’টি কোম্পানি সিএইচইসি এবং সিএসসিইসি দরজায় পা ফেলেছে। ফলে পায়রা বন্দরে অধিক হারে নিয়ন্ত্রণ চাইবে চীন এটা অনেক দূরের কথা নয়। পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার আগে হাম্বানটোটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে চীন। পোর্ট-পার্ক সিটি নামে পরিচিত হয়ে ওঠা গোয়াদার বন্দরকে ধরা হয় সিপিইসি প্রজেক্টের অন্যতম সফলতা হিসেবে। তবে সেখানেও চীন তার তথাকথিত সফ্ট লোনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। পাকিস্তানকে ঋণের ফাঁদে ফেলে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে গোয়াদারে। সেখানে কার্যত নিজের নিয়ন্ত্রিত এলাকা প্রতিষ্ঠা করেছে চীন। এটি এখন স্পষ্ট যে, ইসলামাবাদ নয়, গোয়াদারের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক এখন বেইজিং।
বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বরিশাল বিভাগের পায়রা সমুদ্র বন্দর কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন এই বন্দরের বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় তার কারণ দেশটির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এতে রয়েছে। গোয়াদার বন্দর থেকে শুরু হয়ে সামুদ্রিক আধিপত্যের যে মুক্তার মালা তৈরি করতে চাইছে চীন তার একটি অংশ হতে যাচ্ছে পায়রা সমুদ্রবন্দর। এদিকে চলতি মাসের ২৭ তারিখে বেইজিং-এ বৈঠকে বসছে ওবর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো।
এএনআই’র দাবি, চীন ওবরভুক্ত দেশগুলোর নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বা চেষ্টা করেছে। এরমধ্যে মালদ্বীপ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কার নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেছে তারা। এছাড়াও রয়েছে মিয়ানমারের কপার মাইনে ব্যাপকমাত্রার চীনা বিনিয়োগ, যা ওই অঞ্চলে তীব্র মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে সাবধান করেছে যে, চীনা বিনিয়োগে সবসময়ই গোপন চুক্তি থাকে। এটি শুধুমাত্র তখনই প্রকাশিত হয়, যখন ঋণ নেয়া দেশটি ঋণ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। পায়রা বন্দরও এই ভয়াবহ পথে যেতে পারে।
প্রতিবেশী দেশগুলো চীনা ঋণের ফাঁদে পড়ছে: যুক্তরাষ্ট্র
প্রতিবেশী দেশগুলোকে ঋণ দিয়ে চীন ধীরে ধীরে আগ্রাসনের পথে হাঁটতে শুরু করেছে বলে মনে করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির কাছে পুরো বিষয়টি জানিয়ে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জোসেফ ডানফোর্ড। 
ডানফোর্ড তার রিপোার্টে বলেছেন, চীনের আর্থিক সহযোগিতায় পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে গোয়াদার বন্দর বানাচ্ছে পাকিস্তান। গোয়াদার বন্দরসহ বিভিন্ন নির্মীয়মাণ প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে ১ হাজার কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে পাকিস্তান। ডানফোর্ড জানিয়েছেন, এভাবেই প্রতিবেশী দেশগুলোকে ঋণের জালে ফাঁসিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে চীন। চীনের এই ঋণনীতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সে সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন ডানফোর্ড।
চীনের এই ‘ছদ্মবেশী ঋণনীতি’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের উদাহরণও তুলে ধরেন ডানফোর্ড। সমুদ্রবন্দর বানানোর জন্য চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। পরিবর্তে ওই বন্দর ৯৯ বছর ব্যবহারের জন্য চীনকে ইজারা দিতে বাধ্য হয় শ্রীলঙ্কা। শুধু তা-ই নয়, শর্ত অনুযায়ী বন্দরের ৭০ শতাংশই চীনের আয়ত্তে থাকবে। মালদ্বীপের ক্ষেত্রেও একই নীতি নিয়েছে চীন। মালদ্বীপের কাছে তার পাওনা ১৫০ কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ৩০ শতাংশ। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের প্রধান শরিক হলো ইউরেশিয়া অঞ্চল। রাশিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও তাজিকিস্তানকে চীন তেল ও গ্যাসে ডুবিয়ে দিতে চলেছে- এমন পরিকল্পনার কথা এখন সবার মুখে মুখে। গত কয়েক বছরে রেলপথেও ইউরেশিয়ার কিছু দেশের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে ফেলেছে চীন। এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে চীনা সামরিক ঘাঁটি বানানোর প্রত্যক্ষ তথ্য কারও হাতে নেই তা ঠিক, কিন্তু জিবুতিতে সেনা ঘাঁটি তৈরির পর ওই সব অঞ্চলেও তারা ঘাঁটি করতেই পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। 
ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইউরেশিয়া অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য সি চিন পিং সরকার বিপুল পরিমাণ পুঁজির সংস্থান করেছে। আর তাতে কাজে লাগানো হচ্ছে চীন ও পূর্ব ইউরোপের ১৬টি দেশ নিয়ে গড়া সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনকে (এসসিও)। লক্ষণীয়, বেশ কিছু পূর্ব ইউরোপীয় দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও (ইইউ) সদস্য।
বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়াচ্ছে চীন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে তারা। ডানফোর্ড তাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এখনই যদি চীনের এই ছদ্মবেশী ঋণনীতি গুরুত্বসহকারে আমলে না নেওয়া হয়, তা হলে এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের উপরও পড়তে পারে। 
যে কারণে উদ্বেগ 
চীনের এই সুপার প্রকল্পকে বলা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর ‘সিল্ক রোড’। এই প্রকল্পের ফলে সংযুক্ত হবে ৭০টিরও বেশি দেশ। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো দেশ সংযুক্ত হবে এই নেটওয়ার্কে। সংযুক্ত দেশগুলোর জনসংখ্যা পুরো পৃথিবীর অর্ধেক। আর দেশগুলোর সম্মিলিত দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগ। 
সি চিন পিংয়ের দেশ বলছে, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হবে। তবে শুরুর পাঁচ বছর পর এসে প্রশ্ন উঠছে-এটি কি উন্নয়নের পথ, নাকি ঋণের ফাঁদ? চীন এই প্রকল্প দিয়ে অন্যান্য দেশগুলোর উপকার করতে চাইছে, নাকি গলায় পরাতে চাইছে ফাঁস? নিন্দুকেরা বলছেন, ঋণের ফাঁদে ফেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে চীন।
হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা এটিকে অশুভ ঋণের ফাঁদে ফেলা কূটনীতি হিসেবে সতর্ক করে দিয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বাস্তবায়ন করতে অন্তত এক লাখ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে বলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে ২১ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছে চীন, যার সিংহভাগই হয়েছে এশিয়ায়। আর এই প্রকল্পের কাজগুলো একচেটিয়াভাবে করছে চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোই। ফলে, নানা দেশের সঙ্গে করা চুক্তির ফলে লাভবান হচ্ছে চীন। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনের সঙ্গে প্রায় ৭০টি দেশের সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার হবে এবং এতে লাভবান হবে শুধু চীনই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক সব দিক থেকেই তারা লাভাবান।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চীন এই যোগাযোগব্যবস্থা দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও হাসিল করতে চাইছে। মূলত, এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাজুড়ে বিশাল এলাকায় নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইছে চীন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে সংযুক্ত হওয়া নিয়ে উভয় সংকটে আছে মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার অনেকগুলো দেশ। কারণ, চীনের এই প্রস্তাবে রাজি না হলে, সি চিনপিংকে অগ্রাহ্য করার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে! আর কে না জানে, বর্তমান বিশ্বকাঠামোর অন্যতম প্রভাবশালী দেশ এই চীন। আবার রাজি হলে পড়তে হচ্ছে ঋণের ফাঁদে। কারণ এত বড় প্রকল্পে নিজস্ব অর্থায়ন করা প্রায় অসম্ভব। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে চীন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশাল অঙ্কের সেই ঋণ নিয়েছেন তো মরেছেন! উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বহুল আকাক্সিক্ষত অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য ঋণ গ্রহণের সর্বশেষ গন্তব্য মনে করা হয় চীনকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের এক গবেষণায় সিল্করুট প্রকল্পের আওতায় ঋণ গ্রহণকারী আটটি দেশের স্থিতিশীলতার বিষয়ে চরম উদ্বেগের কথা জানা গেছে। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- পাকিস্তান, জিবুতি, মালদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া, লাওস, মন্টেনিগ্রো, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তান। ওই গবেষণা মতে, ৬৭০ কোটি ডলারের চীন-লাওস রেলওয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মোট জিডিপির অর্ধেক। হর্ন অব আফ্রিকার দেশ জিবুতি ঋণ সংকটের চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। দেশটির সরকারি ঋণ ২০১৪ সালে ছিল জিডিপির ৫০ শতাংশ। এটা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ শতাংশ। গত এক দশক ধরে চীনের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী অংশীদার হচ্ছে আফ্রিকা।
চীন সব সময়ই এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের ‘বৈশ্বিক উপযোগিতার’ বিষয়টি তুলে ধরতে তৎপর। কিন্তু মালদ্বীপ এই প্রকল্পে যুক্ত হতে গিয়েই চীনা ঋণে আটকে গেছে। সুযোগ বুঝে মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নাক গলাচ্ছে চীন। যদিও সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে যান কথিত ভারতপন্থী ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানাচ্ছে, বেইজিং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মালদ্বীপকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ২০১৩ সাল থেকে দেশটিকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে চীন। পছন্দের লোক না থাকলেও বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এটিই যথেষ্ট।
ওদিকে শ্রীলঙ্কার অবস্থাও বেগতিক। কিছুদিন আগেই দেশটিতে মাহিন্দা রাজাপাকসের ‘অসাংবিধানিক’ সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিল চীন। কিন্তু শেষে রনিল বিক্রমাসিংহে ফের ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে এলে কপাল পোড়ে চীনের। এই দ্বীপ দেশটির হাম্বানটোটা বন্দর নিয়েও কম জল ঘোলা হচ্ছে না। এরই মধ্যে বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছে চীন। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের সুদ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। আর অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত পাকিস্তান চীনের তৈরি ‘সিল্ক রোডেই’ দেখছে মুক্তির পথ!
অর্থাৎ রাজনৈতিক অঙ্গনে পিছু হটলেও, ঋণের কারণে চীনকে অগ্রাহ্য করতে পারছে না কেউই। ইদানীং দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারতের ‘ছায়াযুদ্ধ’ বেশ দেখা যাচ্ছে। প্রভাব বিস্তারের এই প্রতিযোগিতায় আপাতভাবে জয়ী দলের নাম ভারত হলেও, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে তক্কে তক্কে আছে চীনও। এই জায়গাতেই পিছিয়ে আছে ভারত।
সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট গত বছর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা গেছে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর মধ্যে ২৩টি ঋণ সংকটে ছিল। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ আরও অনেকে।
সম্প্রতি বিজনেস ইনসাইডারে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের কারণে যুক্ত দেশগুলোর জীববৈচিত্র্যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এতে করে ভিন্ন ভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজগতের মধ্যে এমন একটি মিথস্ক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা লাভের চেয়ে ক্ষতিই করবে বেশি। আরও একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, রাস্তাঘাট ভালো হলে পণ্য আনা-নেওয়ায় যেমন সুবিধা হবে, তেমনি আসতে পারে সৈন্যসামন্তও!
অবস্থাপন্ন দেশগুলো অবশ্য একটু ভেবেচিন্তেই এগোচ্ছে। ইকোনমিস্ট বলছে, মালয়েশিয়া এরই মধ্যে বেঁকে বসেছে। নাজিব রাজাকের সরকার চীনের বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত হস্তে অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু মাহাথির মোহাম্মদের নতুন সরকার তা আটকে দিয়েছে। মালয়েশিয়া বলছে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হতে ২০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করতে হবে। সেই কাজ করবে চীনা কোম্পানি, শ্রমিকও থাকবে চীনা। অর্থাৎ মালয়েশিয়ার কোনো নাগরিকের সেখানে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। আবার যে অঞ্চলে এই প্রকল্প চলবে, তাতে মালয়েশিয়ার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনকে ‘না’ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা দোটানায় আছে মালয়েশিয়া। সম্প্রতি দেশটির এক মন্ত্রী বলে দিয়েছিলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে। আবার মাহাথির জানান, এর ব্যয় বহন করার সাধ্য নেই তাঁর দেশের। কিন্তু এর এক দিন পরই উল্টে যায় এই অভিজ্ঞ রাজনীতিকের বয়ান। তিনি জানিয়ে দেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি!
অর্থাৎ মালয়েশিয়ার মতো দেশও এই মুহূর্তে চীনকে চটাতে চাইছে না। এর মূল কারণ হলো চীনের সামরিক শক্তি ও কাঁড়ি কাঁড়ি ইউয়ান। আর সেই সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই কিস্তিমাত করতে চাইছেন সি চিন পিং।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের  দিকে আমেরিকা যেভাবে আগের ইউরোপীয় কলোনি শক্তিগুলোর কাছ থেকে দুনিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তির কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল, আর সে জায়গায় নিজ নেতৃত্বের এক নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নিয়ম শৃঙ্খলা চালু করে নিয়েছিল’ ঠিক সেটারই তুলনীয় এক পুনরাবৃত্তির সময়কাল এটাÑ যখন চীন এবার আমেরিকার স্থান নিতে যাচ্ছে, তা বলা যায়। সার কথায় এটা আমেরিকার ধীরে ধীরে প্রস্থান, আর সে জায়গায় চীনের আগমন ও উত্থান। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকেÑ এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদূর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে ততটাই সেই শূন্যতা পূরণ করে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। তারা বলছেন, চীনের নেয়া প্রতিটি প্রকল্পেই চীনের সামরিক স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও আছে। 
চীনা ঋণের ফাঁদে ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্র
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট দ্বীপদেশগুলো অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় ঋণ নিয়েছে। এখন সেই ঋণ পরিশোধ শুরু করার সময় এসেছে। কিন্তু সাউথ প্যাসিফিকের যে দেশগুলো এই ঋণ নিয়েছে, তাদের সবাই তা পরিশোধ করতে পারবে না।
প্যাসিফিক আইল্যান্ডের দ্বীপগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ভঙ্গুর অবকাঠামো ও নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিজনিত সমস্যায় জর্জরিত। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা চীনের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিআরআই প্রকল্পের আদর্শ গন্তব্য হয়ে উঠেছে। টোঙ্গা, ভানুয়াতু ও পাপুয়া নিউগিনির মতো দেশগুলোয় ছোট ছোট ঋণের প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই ঋণ পরিশোধ ও পুনঃ অর্থায়নের আলোচনা করতে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট দ্বীপদেশগুলো পরীক্ষার মুখে পড়েছে। এর মধ্যেই দেশগুলোকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের মতো রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে এই দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে ছোট দ্বীপ নাউরু ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে চাপে পড়ে গেছে। এ ছাড়া তারা আন্তদেশীয় সংগঠন প্যাসিফিক আইল্যান্ড ফোরামের অনুষ্ঠান আয়োজন করে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে।
আপাতভাবে নাউরুতে চীনের একটি প্রতিনিধিদলের অতিরিক্ত দাবিদাওয়া নিয়ে বিবাদ শুরু হয়েছে। তবে এ ঘটনায় চীনের ব্যাপারে দ্বীপপুঞ্জের অন্যান্য দ্বীপের হতাশার বিষয়টিও বেরিয়ে এসেছে। কারণ চীন আগ্রাসীভাবে এসব ছোট ছোট দেশকে তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ত্যাগের জন্য চাপ দিচ্ছে।
পাপুয়া নিউগিনি এবং ভানুয়াতুও ঋণ পরিশোধের সময় হলে চাপে পড়বে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পাপুয়া নিউ গিনি সহজ শর্তে চীনের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল, যা তার মোট ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ভানুয়াতুর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও মারাত্মক। কারণ, তার মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি চীনা ঋণ।
মমবাসা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে কেনিয়া
চীনের কাছে ঋণগ্রস্ত কেনিয়া সরকার তাদের প্রধান সমুদ্রবন্দর মমবাসা পোর্টের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। রাজধানী নাইরোবি থেকে মমবাসা সরাসরি রেল যোগাযোগের জন্য স্ট্যান্ডার্ড গেজ রেলওয়ে (এসজিআর) নির্মাণে কেনিয়া সরকার ওই ঋণ নিয়েছিল।
চীনের আর্থিক সহায়তায় ২০১১ সালে নাইরোবি-মমবাসা রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু হয়; যা স্বাধীনতার পর কেনিয়ায় সবচেয়ে বৃহৎ এবং ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংক মোট ব্যয়ের ৯০ শতাংশ ঋণ দিতে রাজি হলে ২০১৪ সালের ১১ মার্চ দুই দেশের মধ্যে এসংক্রান্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ বছরের মধ্যে কেনিয়াকে সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এ বছর জুনে চীনের দেওয়া পাঁচ বছরের ‘গ্রেস টাইম’ শেষ হয়ে যাবে। যে কারণে জুলাই থেকে কেনিয়াকে প্রতিবছর আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এসজিআর নামে ওই ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের সময় কেনিয়া নিজেদের সম্পদ রক্ষার সার্বভৌম ক্ষমতা ত্যাগ করেছে। যে কারণে ওই চুক্তির শর্তাবলী চীনা আইন অনুযায়ী পরিচালিত এবং কেনিয়া সরকারের নিজেদের সম্পদ রক্ষার কোনো অধিকার নেই।
সম্প্রতি এসজিআর চুক্তিপত্রের কিছু অংশ অনলাইনে প্রকাশ পেয়েছে বলে স্থানীয় একটি দৈনিকের বরাত দিয়ে জানায় রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল। লিক হওয়া ওই চুক্তিপত্রে দেখা যায়, কেনিয়ার ন্যাশনাল রেলওয়ে করপোরেশন যদি চীনের এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ২০০ কোটি ইউরো সময়মতো পরিশোধ করতে না পারে তাহলে চীন সরকার দেশটির সবচেয়ে বড় এবং লাভজনক বন্দর মমবাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।
যদি চীন মমবাসা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিভাগে পরিবর্তন আসবে; এমনকি বন্দরকর্মীরাও চীনা ঋণদাতাদের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হবেন। চীন স্বাভাবিকভাবে সেখানে নিজেদের স্বার্থ সবার আগে দেখবে। এর পর বন্দর থেকে আসা রাজস্ব আয় সরাসরি চীনে চলে যাবে। 
‘ঋণ ফাঁদ কূটনীতি’ 
সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা এক প্রতিবেদনে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ নামের এই প্রকল্পকে অশুভ ঋণের ফাঁদে ফেলা কূটনীতি হিসেবে সতর্ক করে দিয়েছে। 
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো দেশ ‘ঋণ ফাঁদ কূটনীতি’র  শিকার হয়ে পড়েছে। ঋণদাতা দেশগুলো তাদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে ঋণকে ব্যবহার করে থাকে। ঋণদাতা দেশ ঋণের বোঝাকে ব্যবহার করে কৌশলগত সম্পদ অর্জন করতে পারে, যেমন বন্দর বা রাজনৈতিক প্রভাব। ঋণগ্রহণকারী দেশগুলো সচরাচর ঋণের শর্ত পূরণের ফাঁদে পড়ে। প্রতিবেদনের লেখক, স্যাম পার্কার ও গ্যাব্রিয়েল শেফিটজ লিখেছেন, ‘গত এক দশকে চীন এমন সব দেশকে শত সহস্র কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে, যে দেশগুলোর তা পরিশোধের সামর্থ্য নেই।’
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, যেসব দেশ বিপুল অংকের চীনা ঋণ নিয়েছে, চীন সক্ষম হয়েছে সেইসব দেশের উপর প্রভাব বিস্তারে। যেমন সম্প্রতি জিবুতি তার মাটিতে চীনের প্রথম বৈদেশিক নৌঘাঁটি স্থাপনে সম্মত হয়েছে।
 (সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২২ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)