সোমবার, ১৭-জুন ২০১৯, ০৫:১৭ অপরাহ্ন
ঋণ খেলাপিদের জন্য অর্থমন্ত্রীর আকর্ষণীয় টিপস

খেলাপি হলেই পুরস্কার!

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১৮ মে, ২০১৯ ১১:০৮ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৫৮টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একই সময়ে ঋণ খেলাপির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ১১৮ তে। দেশের ব্যাংকিং খাতে যে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে এই হিসাব দেখলেই তা বোঝা যায়। লাগামহীনভাবে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে গেছে। বাড়ছে মূলধন ঘাটতি। এর পাশাপাশি ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল কমে যাচ্ছে। এদিকে তুলনামূলক কম সুদ হওয়ায় ব্যাংকে আমানত প্রবাহ কমে গেছে। এতে দেখা দিয়েছে চরম তহবিল সঙ্কট। ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের চ্যানেল ঠিক রাখতে স্বল্প মেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করছে। একই সাথে দৈনিক প্রয়োজন মেটাতে রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কেউ কেউ ধার নিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো ব্যাংক কলমানি মার্কেট নির্ভর হয়ে পড়েছে। সাধারণ আমানত না পাওয়ায় এমনকি কিছু ব্যাংক সরকারি আমানত নির্ভর হয়ে পড়েছে। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় চালাতে ব্যাংকে রাখা সরকারি আমানত প্রত্যাহার করতে হতে পারে। এতে ভয়াবহ বিপদে পড়ে যেতে পারে দুই ডজনেরও বেশি ব্যাংক। সবমিলে নানামুখী সঙ্কটে পড়ে গেছে দেশের ব্যাংকিং খাত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে আদায় বাড়াতে না পারলে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে দেশের ব্যাংকিং খাতকে। কিন্তু খেলাপি ঋণের উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাংকিং খাতকে দুর্দশা থেকে টেনে তুলতে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার না করে উল্টো খেলাপিদের জন্য নানা ধরনের পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফায় খেলাপি ঋণ নীতিমালায় শিথিলতা এনে খেলাপিদের জন্য নানা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়। এমনকি খোদ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল খেলাপি ঋণের জন্য কাউকে জেলে যেতে হবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।
ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের সুযোগ দেয়ার ঘোষণায় ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। যারা এত দিন নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তাদের অনেকেই হঠাৎ করে ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে ব্যাংকের নগদ আদায়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকের নগদ আদায় কমে যাওয়ায় ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক ব্যাংক। এতে ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের সক্ষমতা। প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের মুনাফায়।
এ অবস্থা চলতে থাকলে বছর শেষে নিশ্চিত লোকসানের মুখে পড়তে হবে ব্যাংকগুলোকে।
ঋণখেলাপিদের একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেয়ার ঘোষণায় গোটা ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঋণখেলাপিদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সরল সুদে ১২ বছরে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ দেয়া সংক্রান্ত অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। তাদের মতে, ঋণখেলাপিদের এই ধরনের সুবিধা দেয়ার অর্থ হচ্ছে, নিয়মিত ব্যাংক ঋণ পরিশোধকারীদের নিরুৎসাহিত করা। এতে, যে সব ব্যবসায়ী ১১/১২ শতাংশ সুদে নিয়মিত ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করছেন, তাদের সুবিধা না দিয়ে ঋণখেলাপিদের পুরস্কার করা হচ্ছে। এই ধরনের প্রণোদনা ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা আরো বাড়বে। এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, যে সব ব্যবসায়ী নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন তাদের চেয়ে ঋণ খেলাপিদের বেশি সুবিধা দেয়া হলে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। নিয়মিত ব্যাংক ঋণ পরিশোধকারীরা যদি ঋণ পরিশোধ না করে খেলাপি হয়ে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে, তখন কি হবে ?
মির্জ্জা আজিজ বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যবসায়ী ১১/১২ শতাংশ সুদে নিয়মিত ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করছেন, আর অন্যদিকে ঋণখেলাপিরা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করবে? এটা কিভাবে সম্ভব? তাহলে কাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে? তিনি বলেন, ঋণখেলাপিদের  ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টেসহ ১২ বছরে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সুবিধা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। ঋণখেলাপিদের এই সুবিধা দেয়া হলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীরা কেন ১১/১২ শতাংশ সুদে ২/৩ বছরে ঋণ পরিশোধ করবে। বরং ঋণ পরিশোধ না করলে ৯ শতাংশ সরল সুদে ১২ বছরে তা পরিশোধ করার সুবিধা পাবেন তারা। কাজেই সেই পথই অবলম্বন করবেন তারা, এটাই স্বাভাবিক।
সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ঋণ খেলাপিদের সুবিধা দেয়ার পক্ষে আমি নই। বরং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে কিভাবে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। একইভাবে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে তা সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। যেকোনো মূল্যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ উদ্ধার করতে হবে। এটা উদ্ধার করতে না পারলে ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণ দেওয়ার প্রবৃদ্ধি কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা দেয়ার অর্থ হলো যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন তাদেরকে বঞ্চিত করা। ঋণখেলাপিরা যখন ঋণ নিয়েছিল তখন ১১/১২ শতাংশ সুদে নিয়েছিল। এখন এসে তাদের ৯ শতাংশ সরল সুদে ১২ বছরে পরিশোধ করার সুযোগ দেয়া হলে ব্যাংকের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে করে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, ১১/১২ শতাংশ সুদে নিয়মিত যারা ঋণ পরিশোধ করছেন তাদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হচ্ছে না। ফলে এইসব সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হবে। তবে, যারা ঋণ নিয়ে সত্যিকার অর্থে বিশেষ বিপদে পড়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কেইস টু কেইস দুই-একটি ঘটনার ক্ষেত্রে কিছু যৌক্তিক পন্থা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। কিন্তু, ঢালাওভাবে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেয়ার কোনো মানে হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নিয়মিত ব্যাংক ঋণ পরিশোধকারীরা ১২/১৩ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করছেন। আর ঋণ পরিশোধ না করার কারণে ৯ শতাংশ সুদে ১২ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। তবে, একই সুবিধা আগে নিয়মিত পরিশোধকারীদের দিয়ে এটা করা যেতে পারে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে প্রণোদনা ঘোষণা করেন। প্রথমে তিনি খেলাপিদের জন্য সুদের হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা হতে থাকলে পরে আরেক ঘোষণায় এটি বাড়িয়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত করেন। ২ এপ্রিল রাজধানীর শের-ই বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণখেলাপিরা দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সরল সুদে ১২ বছরে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ পাবেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, এর আগে ৭ শতাংশ ছিল, এটা এখন ফাইনালি ৯ শতাংশ করা হয়েছে। ৯ শতাংশ হলো বেঞ্চমার্ক, এখন কেউ আপত্তি করতে পারবে না। ৭ শতাংশ কম ছিল, এখন ৯ করে দিয়েছি।
খেলাপি ঋণ নীতিমালায় শিথিলতা
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন শ্রেণির অনাদায়ী ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২১ এপ্রিল জারি করা প্রজ্ঞাপনে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, সন্দেহজনক ও মন্দঋণ শ্রেণিকৃত করার সময় আরো তিন মাস করে বাড়ানো হয়েছে। ৩০ জুন থেকে এ পদ্ধতি কার্যকর হলে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমে আসবে।
বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ঋণের কিস্তি টানা তিন মাস পরিশোধ না করলে ওই ঋণকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ছয় মাস পরিশোধ না করলে সন্দেহজনক ও নয় মাসের কিস্তি বকেয়া পড়লে মন্দমানের খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত করা হয়। নতুন প্রজ্ঞাপনে শ্রেণিকরণের সময় সবক্ষেত্রেই তিন মাস করে বাড়ানো হয়েছে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে পাঠানো প্রজ্ঞাপনটি চলতি বছরের ৩০ জুন থেকে কার্যকর হবে।
খেলাপি ঋণ গণনার মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণের ওপর বছরে চারবারের পরিবর্তে দুবার সুদ আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি মাসের মধ্যেই ঋণে সুদ আরোপের এ নীতিমালা জারি হতে পারে। বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ নীতিমালা অনুযায়ী, বছরে চারবার সুদ আরোপ করে ব্যাংক। প্রতি ত্রৈমাসিকে ঋণের ওপর সুদ আরোপ করা হয়। এতে ব্যাংকের সুদ আয় বাড়লেও ভুক্তভোগী হন ঋণগ্রহীতা। এ অবস্থায় গ্রাহকদের বাড়তি সুবিধা দিতে ঋণ পরিশোধের নীতিমালায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ত্রৈমাসিকের পরিবর্তে ছয় মাসে একবার অর্থাৎ প্রতি বছরের জুন ও ডিসেম্বরে সুদ আরোপ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে বছরে ব্যাংকগুলোর সুদ আয় ৯৬৩ কোটি টাকা কমবে। ফলে সুফল পাবেন গ্রাহকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণের মেয়াদ গণনায় কিছু পরিবর্তন এনেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ নীতিমালায় কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে। আশা করছি, এর মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমে আসবে।
ঋণে সুদ আরোপের নীতিমালায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে অনেক আগে থেকেই আলাপ-আলোচনা চলছে। সরকারও ব্যাংকঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধারাবাহিকতায়ই ঋণের ওপর বছরে চারবারের পরিবর্তে দুবার সুদ আরোপের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে নির্দেশনা আসবে।
নতুন নীতিমালায় ব্যাংকগুলোর আয় হাজার কোটি টাকা কমে যাবে
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণের ওপর বছরে দুবার সুদ আরোপ করা হলে ব্যাংকের সুদ আয় প্রায় হাজার কোটি টাকা কমে যাবে। এ অবস্থায় নতুন নীতিমালা জারি হলে তফসিলি ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খেলাপিদের কাছে ব্যাংকগুলোর যে পাওনা তা আদায়ের বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু নীতিমালা পরিবর্তন করে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো অর্থ হয় না। তাছাড়া নতুন এই শিথিল নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গেও সামনয্যস্বপূর্ণ নয়।
আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং সংক্রান্ত মাস্টার সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ের পর টানা তিন মাস পরিশোধ না করলে ওই ঋণকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ছয় মাস পরিশোধ না করলে সন্দেহজনক ও নয় মাস কিস্তি বকেয়া পড়লে মন্দমানের খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়। ব্যাংকিং খাতের জন্য বিশ্বব্যাপী অনুসরণীয় ব্যাসেল-২ ও ৩ বাস্তবায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ওই নীতিমালা জারি করা হয়েছিল। বর্তমানে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ।  পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনকৃত স্ট্রেসড বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ এবং অবলোপনকৃত ঋণ হিসাবায়ন করলে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার জন্য নীতিমালায় পরিবর্তন আনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, টানা নয় মাস পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও একজন গ্রাহক খেলাপি হবেন না। তিন থেকে সর্বোচ্চ নয় মাসের মধ্যে কোনো গ্রাহক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড মানে শ্রেণীকরণ করা যাবে। টানা নয় মাস থেকে ১২ মাস পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সে ঋণের শ্রেণিকরণ হবে সন্দেহজনক। এছাড়া টানা ১২ মাস বা এর বেশি সময়েও কেউ ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেটি হবে মন্দমানের খেলাপি ঋণ।
কন্টিনিউয়াস লোন, ডিমান্ড লোন, ফিক্সড টার্ম লোন বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই নীতি বাস্তবায়ন হবে। কন্টিনিউয়াস ও ডিমান্ড লোনের ওভারডিউ হওয়ার মেয়াদ গণনা শুরু হবে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার তারিখ থেকে। আর ফিক্সড টার্ম লোন ওভারডিউ হওয়ার মেয়াদ কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার তারিখের ছয় মাস পর গণনা শুরু হবে। সে হিসেবে ফিক্সড টার্ম লোনের গ্রাহকরা টানা নয় মাস কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে তবেই ব্যাংক তাকে খেলাপি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিতে পারবে। তবে নতুন নীতিমালাটি আগামী ৩০ জুন থেকে বাস্তবায়ন হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন,এ নীতিমালার সুযোগ নেয়ার জন্য বর্তমানে নিয়মিত গ্রাহকরাও ঋণের কিস্তি পরিশোধ থেকে বিরত থাকতে পারেন। এটি ঘটলে ব্যাংকের দৈনন্দিন জমার পরিমাণ কমে যাবে, ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরো বাড়বে। ঋণ শ্রেণীকরণের নতুন নীতিমালাটি বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমবে। তবে তাতে বিদ্যমান তারল্য সংকটের কোনো সমাধান হবে না। কারণ খেলাপি ঋণ কমলে ব্যাংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণ কমবে। উদ্বৃত্ত সঞ্চিতি ব্যাংকের মুনাফায় যোগ হবে। এতে শেয়ারহোল্ডাররা উপকৃত হলেও তারল্য পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।
সংকট আরো বাড়বে
খেলাপি ঋণ নীতিমালায় শিথিলতা আনায় ভালো গ্রাহকরা নিরুৎসাহিত হবেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এতে স্বল্পমেয়াদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে এলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। গত বছরও বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ অবলোপন নীতিমালা শিথিল করেছিল। কিন্তু তাতে কোনো সুফল মেলেনি।
রাইটঅফ (অবলোপন) বা খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই নির্ধারণ হয়ে থাকে। হঠাৎ করেই নীতিমালা কেন শিথিল করা বা এতে পরিবর্তন আনা হলো, সেটা পরিষ্কার নয়। এর মাধ্যমে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কমেছে বলে মনে হলেও বাস্তবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক চিত্র ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। বিশ্লেষকরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত ঋণগ্রহীতার জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধাই তৈরি করছে না, বরং খেলাপি ও মন্দ ঋণগ্রহীতার জন্য একের পর এক সুবিধা প্রদান করে বাজারের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট করছে বলে অভিযোগ আনছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি অবশ্যই চিন্তার বিষয়। এতে আর্থিক খাতের সংকট আরো বাড়বে।
পুরনো গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ করছেন না। কারণ তারা বুঝে গেছেন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করলে কিছু হয় না। এ বার্তা চলে যাচ্ছে নতুন গ্রাহকদের কাছেও। এ কারণে নতুন গ্রাহকরাও ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিচ্ছেন না। ফলে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে খেলাপির পরিমাণ, যা এ খাতের জন্য বড় দুঃসংবাদ। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এ বিষয়ে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে দিন দিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়বেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, খেলাপি ঋণ বিস্তারের অন্যতম কারণ অব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ। এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে সুদের হার কমানো সম্ভব নয়। সুদের হার না কমলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না, যা অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটাবে। কাজেই খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এজন্য সবার আগে দরকার ব্যাংকিং খাতকে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বাড়বে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি ও নজরদারি বৃদ্ধির বিকল্প নেই। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ মে ২০১৯ প্রকাশিত)