মঙ্গলবার, ২৫-জুন ২০১৯, ০৬:১৮ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের জুনিয়র এক কর্মকর্তার এত পদ, এত ক্ষমতা, এত অপকর্ম!

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের জুনিয়র এক কর্মকর্তার এত পদ, এত ক্ষমতা, এত অপকর্ম!

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৭ মে, ২০১৯ ০৫:৪৫ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: অসীম কুমার দাস। কখনো ঢাকা চিড়িয়াখানার কর্মকর্তা, কখনো আইন কর্মকর্তা, কখনো-বা এস্টেট অফিসার এরকমের নানা পরিচয়ে পরিচিত তিনি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তিনি কোন পদে আছেন, এটা বোঝাই অনেকের জন্য মুশকিল হয়ে পড়ে। চলাফেরা, বেশভূষা অনেকটা ফ্রি-স্টাইলেই। ভিজিটিং কার্ডেও তিনি একাধিক পদের উল্লেখ করছেন। একটি ভিজিটিং কার্ডে দেখা যাচ্ছে, তিনি নিজেকে ‘ল এফেয়ার্স অফিসার’ ডিপার্টমেন্ট অব লাইভস্টক সার্ভিসেস, আবার একই ভিজিটিং কার্ডে ঢাকার মিরপুরস্থ জাতীয় চিড়িয়াখানার ‘এস্টেট অফিসার’ বলে উল্লেখ করেছেন। ওই ভিজিটিং কার্ডেই তিনি আবার আলাদাভাবে নিজেকে ‘মিনিস্ট্রি অব ফিসারিজ এন্ড লাইভস্টক’ এর অফিসার বলে পরিচয় দিয়েছেন।  এ ধরনের আরো একাধিক পরিচয়ের ভিজিটিং কার্ড অসীম কুমার দাস ব্যবহার করছেন। প্রভাব বিস্তার করে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম-দুর্নীতি, করাই তার এই বিচিত্র পরিচয়ের উদ্দেশ্য বলে সূত্র জানিয়েছে। 
এমনকি অসীম কুমার দাস কী কাজ করেন সেটাও সুনির্দিষ্ট নয়। তিনি নিজেকে অধিদফতরের ‘ল এফেয়ার্স অফিসার’ এবং চিড়িয়াখানার ‘এস্টেট অফিসার’ বলে দাবি করলেও এমন কোনো পদ অধিদফতর বা চিড়িয়াখানার বিদ্যমান অর্গানোগ্রামে নেই। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অফিসার বলে তিনি যে দাবি করছেন সেটিও অবৈধ। মূলত তার বর্তমান পদ হলো, উপজেলা লাইভস্টক অফিসার (লিভ রিজার্ভ)। তিনি এ পদের বিপরীতেই বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। লিভ রিজার্ভ পদটি জনপ্রশাসনের ওএসডি পদের মতোই। অধিদফতরের এ ধরনের লিভ রিজার্ভ পদধারীরা সাধারণত কোনো রুম বা বসার চেয়ার-টেবিল পান না। অথচ অসীম কুমার দাস বর্তমানে একই সঙ্গে অধিদফতরে একটি এবং চিড়িয়াখানায় আরেকটি অফিসকক্ষ অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। কেউ তাকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও তার ভয়ে তটস্থ থাকেন। দুর্নীতি দমন কমিশন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে অসীম কুমার দাসের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ জমা পড়লেও, এমনকি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও এক পর্যায়ে তা থেমে যায়। 
বস্তুত অসীম কুমার দাসের ক্ষমতাও অসীম। আর এ কারণে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হলেও একটানা ১৩ বছর ধরে ঘুরেফিরে রাজধানী ঢাকাতেই পোস্টিং নিয়ে আছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের এই কর্মকর্তার ক্ষমতা যেমন অসীম, দুর্নীতি-অপকর্মও তেমনি লাগামহীন। এমনকি দশম সংসদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অসীমের দুর্নীতি-অপকর্ম ও অবৈধ ক্ষমতার ব্যবহার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করার নির্দেশনা দেয়া হলেও তা দীর্ঘদিনেও কার্যকর হয়নি। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাজধানীতেই থেকে যান দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তা।
জানা যায়, রাজধানীর আলাউদ্দিন রোডস্থ দফতরে কর্মরত থাকাকালে নারীঘটিত কেলেঙ্কারির কারণে সেখান থেকে তাকে বদলি করা হয়। পোস্টিং হয় ঢাকা চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানায় পোস্টিং পেয়েই যেন লুটপাটের রাজত্ব পেয়ে যান অসীম কুমার। অধিদফতর ও চিড়িয়াখানার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে লুটপাটের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। এই সিন্ডিকেটের সুবিধা নিয়ে চিড়িয়াখানার প্রত্যেকটি দরপত্র কমিটির সদস্য হয়ে যান অসীম। সেই সুবাদে সব দরপত্র তার নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজ ভাগাভাগি করে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। অর্গ্রানোগ্রামে না থাকলেও এস্টেট অফিসার, আইন কর্মকর্তা, দরপত্র কমিটির সদস্য হিসেবে একেক সময়ে একেক পদ-পরিচয় ব্যবহার করছেন। শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটি পদের উল্লেখ করে আলাদা আলাদা সিলও বানিয়ে নিয়েছেন তিনি। যখন যেটি লাগে তখন সেটি কাজে লাগান। এভাবে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। সূত্র জানায়, অসীম কুমার পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হওয়ার পরেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ঢাকা চিড়িয়াখানার সকল দরপত্র কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ওই সময়েও তিনি সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। ওই গাড়ির লগ বই পরীক্ষা করলেই এই অনিয়ম প্রমাণিত হবে।
পিএইচডি কোর্স ন্যূনতম ৩ বছরের হলেও অসীম ২ বছরেই এ কোর্স শেষ দেখিয়েছেন। অথচ তিনি কোর্সে যোগ দিয়েছিলেন তার সঙ্গে আদেশপ্রাপ্ত অন্যদের চেয়ে অন্তত ৬ মাস পর।
সূত্র আরো জানায়, অসীম কুমার দাস প্রথমে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা। কিন্তু ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা থাকতেই ঢাকায় পোস্টিং হওয়ার পর সার্বক্ষণিকভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে আসছেন। আইনানুযায়ী, ৯ম গ্রেডে তো নয়ই, বর্তমান পদের কর্মকর্তা হিসেবেও অসীম কুমার দাস সার্বক্ষণিকভাবে সরকারি গাড়ি প্রাপ্য নন। অথচ বর্তমানে তিনি একটি সমাপ্ত প্রকল্পের গাড়ি অবৈধভাবে নিজের দখলে এনে সার্বক্ষণিকভাবে ব্যবহার করছেন। গাড়ি নম্বর, ঢাকা মেট্রো থ-১৩-২১৮৭। পিকআপ ধরনের ‘ক্যারিবয়’ নামের এই ভারী গাড়িটি ছিল মাগুরা হ্যাচারি প্রকল্পের। প্রকল্পটি শেষ হয় গত বছরের জুনে। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প সমাপ্ত হওয়ার পর গাড়ি অধিদফতরের পুলে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্প পরিচালক তা পারেননি। অসীম কুমার দাস অবৈধ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে গাড়িটি দখল করে নেন। এই গাড়ির চালকের নাম জোহরী। গাড়িচালকের বেতন-ভাতা বাবদ সরকার প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করছে। এছাড়া তেল, রক্ষণাবেক্ষণসহ অসীমের পেছনে সরকারকে আরো বড় অংকের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ইতিপূর্বে তিনি একটি রকি জিপ গাড়ি সার্বক্ষণিক ব্যবহার করতেন। সেই গাড়িটি ছিল দ্বিতীয় পশুসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের। ১৯৯৭ সালে প্রকল্পটি শেষ হবার পরে গাড়ি পুলে জমা দেয়া হয়নি। অন্য একজন কর্মকর্তা গাড়িটি ব্যবহার করছিলেন। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অসীম তার কাছ থেকে গাড়িটি দখল করে নেন। পরবর্তীতে এই গাড়ির আর হদীস পাওয়া যায়নি। যতোটা জানা গেছে, গাড়িটির দামী পার্টসগুলো খুলে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। 
সূত্র জানায়, আইন কর্মকর্তা সেজে চিড়িয়াখানার বেদখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারের নামে মামলা করেছিলেন অসীম কুমার দাস। এই মামলার অজুহাতে অবৈধ ভোগদখলকারীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা উৎকোচ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার এ কাজে সহযোগিতা করেছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগেরই আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আবু সাঈদ কামাল বাচ্চু। বাচ্চু বর্তমানে উপসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। নিজেরা মামলা দায়েরের পরে উৎকোচের বিনিময়ে অবৈধ দখলকারীদের দিয়েই আবার আদালতে মামলা করিয়ে উদ্ধার অভিযান বন্ধ রেখেছে এই জালিয়াত সিন্ডিকেট। এতে বহুমুখী অবৈধ আয় হয়েছে সিন্ডিকেটের।
বিভাগীয় মামলার খোঁজ খবর নেয়া দায়িত্ব হলেও মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়ে সরকারি মামলার নানা নথি ও তথ্য বেদখলকারীদের কাছে সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে অসীমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, অসীম প্রতিপক্ষের লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদেরকে মামলার গোপন খবরাখবর জানিয়ে দেন এমনকি কখন কোন মামলা/ আপিল দায়ের করতে হবে সেই পরামর্শও দিয়ে দেন আগেভাগে।
সূত্র জানায়, অসীম কুমার দাস এস্টেট অফিসার হিসেবে সিল ব্যবহার করে চিড়িয়াখানাসহ অধিদফতরের অন্যান্য দফতরের মামলা খরচ বাবদ প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন একই সাথে আইন কর্মকর্তা হিসেবে সিল ব্যবহার করে আইনজীবী এবং আদালতের খরচ বাবদ লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করে যাচ্ছেন। একই সময়ে তিনি নিজের বিল-বেতন বাবদ অন্য সিল ব্যবহার করে যাচ্ছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে একসঙ্গে এতো পদের সিল ব্যবহার করে সরকারি টাকা আত্মসাত করছেন বিভিন্নমহল থেকে সেই প্রশ্ন উঠেছে। 
সূত্র জানায়, সরকারি জমি আত্মসাত ও পশুখাদ্য থেকে বিপুল অংকের ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে অসীম ও বাচ্চুর বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন এবং চিড়িয়াখানার জমি উদ্ধারের জন্য ভূমি জরিপ অধিদফতরকে পত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত হলেও বিষয়টি অসীম জানার পরে সংশ্লিষ্ট এক প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে তদবির করে নোটসিট পরিবর্তনের ব্যবস্থা করেন। এরপর শুধুমাত্র ভূমি জরিপ অধিদফতরকে পত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।
জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ বিভাগের জুনিয়র এই কর্মকর্তা বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক। গ্রামের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ জমিজমা, ঢাকায় ফ্ল্যাট ও ব্যাংকে কোটি টাকার এফডিআর/ সঞ্চয়পত্র লগ্নী রয়েছে তার। অসীমের নানা রকমের দুর্নীতি-জালিয়াতি, অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগও জমা পড়েছে। সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে বদলি করে তার দুর্নীতি-অপকর্মের সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।  
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ মে ২০১৯ প্রকাশিত)