মঙ্গলবার, ১৬-জুলাই ২০১৯, ১২:৪০ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • আড়ং কেলেংকারি চাঁদ বিভ্রান্তি ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন
ঈদের মুহূর্তে এক দিনে তিন অঘটন

আড়ং কেলেংকারি চাঁদ বিভ্রান্তি ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ জুন, ২০১৯ ০৭:৪৮ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: এবারের রোজার শেষের প্রাক্কালে ঈদের আগের দিন মঙ্গলবার একদিনেই পর পর তিনটি অঘটনে ব্যাপক তোলপাড় বয়ে যায় সারাদেশে। প্রথমটি আড়ংয়ের আউটলেটে জরিমানা এবং এর জের হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেট বদলি। দ্বিতীয়টি, উত্তরবঙ্গের সড়কপথে নজিরবিহীন যানজটের জের হিসেবে নানা ঘটনা, ডিসি-ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন। তৃতীয়টি, জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ব্যর্থতায় ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক। যদিও ম্যাজিস্ট্রেটকে বদলির ঘটনাটি সোমবারের, কিন্তু এটি বিতর্কে আসে মঙ্গলবার সকালে। এই তিনটি ঘটনা একের পর এক সারাদেশে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। সরকারকে অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়।  
আড়ং কেলেংকারির জেরে বিব্রত সরকার
বেশ কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনিয়ম ও ভেজালবিরোধী অভিযানের লাইভ দেখাতেন মঞ্জুর মোহাম্মাদ শাহরিয়ার। ছয় দিনের ব্যবধানে একই পণ্যের দ্বিগুণ দাম নেয়ায় আড়ংয়ের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়ার পরই তাকে বদলি করায় দেশজুড়ে এখন পরিচিত নাম মঞ্জুর শাহরিয়ার। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এই উপপরিচালকে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করার পরই ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। হঠাৎ তার বদলির কারণে ক্ষোভ দেখান নানা শ্রেণিপেশার মানুষ।
গত ৩ জুন সোমবার দুপুরে উত্তরার জসিমউদ্দিন রোডে আড়ংয়ের একটি আউটলেটে একই পাঞ্জাবির দাম পাঁচ দিনের ব্যবধানে দ্বিগুণ রাখায় সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করেন ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তা মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। পাশাপাশি আউটলেটটি ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর তার বদলির আদেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এমনকি সঙ্গে সঙ্গে আড়ংয়ের আউটলেটটিও খুলে দেয়া হয়। শাহরিয়ারকে বদলি করা হয় খুলনায়। ১৩ জুনের মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। সোমবার সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বদলির আদেশটির প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। পরে তার ওই বদলির আদেশের একটি কপি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নতুন কর্মস্থল সড়ক ও জনপদ অধিদফতর খুলনা জোন। তাকে এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করার তথ্য জানানো হয়। শুধু বদলিই নয়, সরাসরি স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয় তাকে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “আগামী ১৩ জুনের মধ্যে এই কর্মকর্তাকে তার বদলি কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে, অন্যথায় ১৩ জুন দুপুরে তার বর্তমান কর্মস্থল হতে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) মর্মে গণ্য হবেন।”
মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার গত ৩০ মে আমদানি তথ্যবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ব্যবহার করায় রাজধানীর ধানম-ির পারসোনা ও ফারজানা শাকিলস মেকওভার সেলুনে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেন।
সর্বশেষ গত ৩ জুন ঘটে আড়ংয়ের ঘটনাটি। এদিন দুপুর ১টার দিকে উত্তরার আড়ং আউটলেটে অভিযান চালান। আর ওইদিন সন্ধ্যায়ই তার বদলির আদেশ জারি হয়। বিষয়টি নিয়ে তুমুল সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকের টাইমলাইনে আড়ংয়ের পণ্য বর্জনের ঘোষণা আসে। এছাড়া বদলির সেই আদেশটি ভাইরাল হয়ে পড়ে। সেই বদলির আদেশে যে উপসচিবের স্বাক্ষর ছিল তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক বক্তব্য চলতে থাকে। কেউ কেউ সরকারকে দায়ী করতে থাকে, কেউ কেউ আড়ংকে দায়ী করতে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে তুমুল সমালোচনা ও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকলে অবশেষে ৪ জুন ছুটির দিনে শাহরিয়ারের সেই বদলির আদেশ বাতিল করে সরকার। কিন্তু তারপরও এ নিয়ে বিতর্ক বন্ধ হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে আড়ং তাদের নিজেদের পক্ষে নানাভাবে কিছু বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে উপস্থাপন করে। তারা এই বলে দাবি করে যে, আড়ং একটি দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং এর মুনাফা গরিব মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়। তাদের এ বক্তব্য নিয়েও চরম বিতর্ক দেখা দেয়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর পাল্টা তথ্য তুলে ধরেন।  
এ ব্যাপারে ব্যাংকার শামীম রেজা লিখেছেন, “আড়ং নিয়ে পোস্ট দেওয়ায় ব্র্যাকের ফজলে হোসেন আবেদের লোকেরা খুব ঘোসসা করেছে! তাদের যুক্তি, আড়ংয়ের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে নাকি লোকজন দেশীয় শিল্পের ক্ষতি করছে। আড়ংসহ ব্র্যাকের সকল প্রতিষ্ঠান নাকি নন প্রফিট অর্গানাইজেশন যা গরিব মানুষের আতুড়ঘর।
সেই হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে গরিব মানুষের পোলাপান পড়ার কথা। উড়িরচরের সখিনা বিবির পোলার ব্র্যাকে ঈঝঊ পড়ার কথা, জানু বেগমের মেয়ের ইকোনমিক্সে পড়ার কথা। কিন্তু ব্র্যাকে কারা পড়ে?
ঐখানে টিউশন ফি এতোটা বেশি যে উচ্চ-মধ্যবিত্ত, ধনী পরিবারের সন্তান না হলে আপনি ব্র্যাকে পড়াশোনা করতে পারবেন না। ব্র্যাকে বিবিএ করতে নাকি ৭/৮ লাখ টাকার মত লাগে। আর্কিটেকচার পড়তে নাকি ২০ লাখের ওপর লাগে। এতো টাকা দিয়ে আর্কিটেকচার না পড়ে সরাসরি তাজমহল বানানো যাবে। তাজমহল বানানোর পর অবশিষ্ট টাকা জাইকার মার হাতে তুলে দেওয়া যাবে সংসারের বিবিধ খরচের জন্য। সবগুলো প্রোগ্রাম আমি চেক করলাম কোনটাই ৮-১০ লাখ টাকার নিচে না। এখন আরও বেশি.....
একটা গরিবের ছেলে ৭/৮ লাখ টাকা খরচ করে ৪ বছরে বিবিএ করবে, তারপর ঢাকা শহরে ৪ বছরে বাসা ভাড়া, খাওয়া দাওয়া সবমিলিয়ে খরচ ১২-১৪ লাখ! এখন আপনারাই বলেন, কোন গরিব মানুষের পক্ষে কী সম্ভব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ছেলে মেয়েকে পড়ানো?
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কী গরিব মানুষের প্রতিষ্ঠান, না গরিব মারার কল?
এদেশে যারা স্যার, নাইট উপাধি পেয়েছে তারা ছিল ব্রিটিশদের ঘেঁটুপুত্র! আর যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তারা হয়েছে মহানায়ক সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম।
এদেশের মানুষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় বিলেতি পণ্য বর্জন করেছিল। যা ইতিহাসে স্বদেশী আন্দোলন নামে পরিচিত।
স্বদেশী আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের উৎপাদিত পণ্য বর্জন করে অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। আর এভাবে ত্বরান্বিত হয়েছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন। এখন সময়- নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ স্যার নাইটদের পণ্য আড়ং বর্জন করা!
এরপর শুনবো ব্র্যাক বাংকও নন প্রফিট। একাউন্ট খুললেই বিক্যাশে ইন্সট্যান্ট ক্যাশব্যাক। আর এই ইন্সট্যান্ট ক্যাশব্যাক দেওয়া হবে আড়ংয়ের গুলশান শাখার ভ্যাট ফাঁকির ১৫ কোটি টাকা থেকে। দেশ ও জাতি গঠনে দারুণ অফার। দারুণ না!”
রেহান উদ্দিন লিখেছেন, “ঘটনার গভীরে না গিয়ে কেন আমরা এমন মন্তব্যের ঝড় তুলি! আপনি যদি ভেবে থাকেন যে, শুধু আড়ং এ হানা দেয়ার কারণেই মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে ঢাকা থেকে খুলনায় বদলি করা হয়েছে, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বলছি কারণ শুধু এটাই নয়।
চলুন একটু পেছনের দিকে যাই, মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার ভোক্তা অধিকারের ব্যাপারে শুরু থেকেই সততা নিয়ে স্বচ্ছতার সাথে কাজ করে আসছিলেন। অনেকটা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন বছরের পর বছর নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। তারপর যখন প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন দূর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের, তখন তিনি আর কাউকে তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশের অনেক বড় বড় বেনিয়াদের অপরাধ এবং অপকর্মের আখড়ায় হাত দিয়ে ফেলেছিলেন।
কিন্তু সমস্যা হলো, যাদের আখড়ায় ভদ্রলোক হাত দিয়েছিলেন তারা সবাই বাংলাদেশের এক একজন অঘোষিত মাফিয়া। এরা যখন যে রাজনৈতিক দলের সরকার ক্ষমতায় আসে তখন সে দলে কোটি কোটি টাকা ডোনেট করে। অঢেল টাকার উপহার সামগ্রীর বিনিময়ে কিনে ফেলে হোমরাচোমরা নেতাদেরকে। আর সচিবালয়ের সব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাও খুব সহজেই চলে আসে এই বিকিকিনির হাটে।
তবে যে সব সৎ এবং দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তাদের ওরা বাগে আনতে না পারে, তাদের নামের তালিকাও এই ব্যবসায়ী নামক মাফিয়া সিন্ডিকেটের কাছে থাকে। এই মাফিয়া সিন্ডিকেট ওৎ পেতে থাকে কখন কিভাবে সেই লিস্টেড কর্মকর্তাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা যায়। সেই সিন্ডিকেটে শুধু ব্যবসায়ী মালিক নয়, বরং মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা ভোগকারী দালালরাও থাকে। সঙ্গত কারণেই সেই সিন্ডিকেট মাফিয়াদের শেকড় বা পিলার অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।
যেহেতু মঞ্জুর মোহাম্মদ একদিকে সৎ, তাকে কোনভাবে এতো দিনেও কিনে ফেলা যায়নি, তার উপর উল্টো এই লোক ঢাকা শহরের নামকরা শপিংমল, নারী মাফিয়াদের বিউটি পার্লার, বড় বড় হসপিটাল কাউকেই ছাড় দেয়নি তাই সব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সিন্ডিকেট তলোয়ারে শান দিয়েই ছিলো।
এরপর গতকাল যখন আড়ং-এ হাত দিয়েছে সেখানেও বর্তমান কর্ণধার আরেক ব্যবসায়ী প্রভাবশালী নারী তামারা হাসান আবেদ, যার বাবা ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক এর প্রতিষ্ঠাতা। ব্র্যাক এবং আড়ং একই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ব্র্যাক যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লোন দেয় তাদের ভাগ্য উন্নয়ন করবে বলে কিন্তু কোন কারণে সেই লোনের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে সেই দরিদ্র ব্যক্তির গোয়ালের গরু, ঘরের চালের টিন খুলে আনার খবর আমরা অনেকেই জানি।
১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আড়ং এবং প্রতিষ্ঠাতা বাবার দায়িত্ব যে কন্যা তামারা আরো শক্ত হাতে পরিচালনা করছে তার ফল তো কয়েক বছর থেকে আরো নোংরা ভাবেই দেখে আসছি, ১৭০ টাকার বিছানার চাদরের গায়ে কারখানার প্রাইস ট্যাগ না উঠিয়ে তার উপরে নতুন করে আড়ং এর ২৫০০ টাকার প্রাইস ট্যাগ লাগিয়ে বিক্রির প্রতিবাদ দু’বছর আগেই তো দেখেছিলাম। তারপরেও কি আড়ংয়ের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পেরেছিলো? পারেনি তো, আর পারবেইবা কীভাবে? ১৯৭৮ সালে জিয়ার প্রিয়ভাজন হয়ে সে আমলেই যখন খুটি গেড়েছিল তা কি আর এমনি এমনি! গত ৪১ বছর আড়ং যা পরিয়েছে সমাজের তথাকথিত এলিট শ্রেণী সেটা পরেছে মহানন্দে। নতুন নতুন টাকা চোখে দেখা লোকজনেরা পণ্য নয় শুধু ব্র্যান্ডনেম কিনে নিজেদের এলিট সাজাতে ছুটে যায় আড়ং এ। কারণ ওদের টাকা তো আর আমাদের মতো কষ্টার্জিত সৎ পথের নয়, তাই পণ্যের মান বোঝার সামর্থ্য ওদের নেই।
যা বলছিলাম, বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চিকে যারা প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করে তুলছে। বাচ্চাদের খাবার, পানি, ওষুধ, দুধ, ফল, মাছ, সবজিসহ সকল কিছুতে যখন ভেজাল মিশিয়ে মানুষের জন্য মৃত্যুকূপ তৈরী করে কোটি কোটি টাকার পাহাড় বানানো ব্যবসায়ী মাফিয়াদের কমবেশি আমরা সবাই চিনি এবং চিনে ফেলেছিলো মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার নিজেও। তাই সেই চেনা মাফিয়াদের ডেরায় যখন একের পর এক হাত দিয়ে যাচ্ছিলো এই ভদ্রলোক! তাহলে ওরাই বা ছাড়বে কেন? শুধু তো ট্রান্সফার করিয়েছে ঢাকা থেকে খুলনায়, ভাগ্যিস পৃথিবী থেকেই ট্রান্সফার করে দেয়নি!
এসব ব্যবসায়ী মাফিয়াদের সমস্ত শক্তি হচ্ছে ব্ল্যাক মানি বা কালোটাকা। শক্তির উৎস কালো টাকা দিয়েই এরা রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করে। তাই সেখানে যখন পর পর এতো বার এতো জন বাধাগ্রস্ত হয়েছে তবে কি এভাবে দেখতেই থাকবে মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার এর বীরত্বগাঁথা!
তাই সব ব্যবসায়ী মাফিয়া সিন্ডিকেট একত্র হয়ে মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে বেচারাকে বদলি শুধু নয়, সেই সাথে স্ট্যান্ড রিলিজ করিয়ে নিজেদের ক্ষমতার কিছুটা ঝলক দেখিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে ওরা মৌন ম্যাসেজ দিয়ে সবাইকে এটা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, পরবর্তীতে কেউ ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে তাদের অবস্থা আরো খারাপ করার ক্ষমতা ওরা রাখে।
হঠাৎ ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে আড়ং: রাত পোহালে ঈদুল ফিতর। কাপড়ের দোকানগুলোতে বেচাকেনা নিয়ে তুমুল ব্যস্ততা। কিন্তু হঠাৎ করেই ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড আড়ং। আজ ৪ জুন, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে রাজধানীতে আড়ংয়ের কয়েকটি শাখা ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
এদিন দুপুর ১ টায় রাজধানীর ধানমন্ডির সাইন্সল্যাব এলাকায় আড়ংয়ের শাখায় দেখা যায়, পুরো তিন তলায় ৫ থেকে ৬ জন ক্রেতা। তবে পাশেই অন্য দোকানগুলোতে বেশ ভিড়।
বেলা পৌনে ২টার দিকে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের আড়ং শাখায় গিয়েও ক্রেতাদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি। এ বিষয়ে আড়ংয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বসুন্ধরা শপিং সেন্টারের আড়ং শাখায় এক ক্রেতা বলেন, আড়ং ক্ষমতা দেখিয়ে নিজেদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছে। তারা খুবই নোংরা মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
‘আমি আড়ং থেকেই কাপড় কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই ঘটনার পরে আর কিনব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেখতে এসেছিলাম মানুষ কেমন প্রতিবাদ করছে,’ বলেন ওই ক্রেতা।
সাইন্সল্যাব আড়ংয়ে আরেক ক্রেতা বলেন, ‘আড়ং অনেক বেশি দাম নেয় জেনেও অনেকে এখানে আসেন। তবে কাল যে ঘটনা ঘটেছে এরপরে আড়ং বর্জন করা উচিত।’
‘মেয়ে একটা জামা আগেই পছন্দ করে রেখেছিল। তার জেদের কারণেই কিনতে এসেছি। না হলে আসতাম না,’ যোগ করেন তিনি।
আরেক ক্রেতা বলেন, সবচেয়ে বড় কথা সরকারের ইচ্ছের অভাব রয়েছে। আড়ং তো আর কাউকে বদলি করে দিতে পারে না। এটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় করেছে। তাই আড়ংয়ের চেয়ে তাদের দায় বেশি।
ঈদের জামা পুড়িয়ে প্রতিবাদ: ঈদের জামা পুড়িয়ে আড়ং বর্জনের ডাক দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সজীব ওয়াফি। তিনি নিজেও আড়ং থেকে ঈদের জামা কিনেছিলেন। আড়ং তার পছন্দের ব্র্যান্ড ছিল বলেও জানান সজীব। 
এরপর সজীব ওয়াফি তার ফেসবুকে লেখেন-
‘আাড়ং-এর নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম বলতে গেলে। লুটপাট যখন জায়েজ করা হবে, গণমানুষের উপর খবরদারি চলবে, শোষণ চলবে; তখন ঈদের নতুন জামা পুড়িয়ে হলেও আড়ং বর্জনের ডাক দিলাম....!!”
উপসচিব আব্দুল লতিফের আত্মপক্ষ সমর্থন: মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির আদেশে স্বাক্ষরকারী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ের প্রেষণ-১ শাখার উপসচিব মুহাম্মদ আব্দুল লতিফের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ ঝেড়েছেন অনেকে। সাংবাদিক মো. নুরুল আলম বদলির আদেশটিতে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার নামের উপর মার্ক করে লিখেন, “এই সেই আড়ংয়ের জরিমানাকারী ম্যাজিসট্রেটকে বদলির আদেশ দেয়া উপসচিব আব্দুল লতিফ ঘুষখোর। যিনি টাকার কাছে নিজের বিবেককে বিক্রি করেছেন।”
এদিকে এ বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে উপসচিব মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ ৪ জুন মঙ্গলবার বিকালে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাতে তিনি দাবি করেন, উপসচিব মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির ফাইলটি উপস্থাপিত হয়েছিল ২৯ মে বিকেল ৩টায়। ৩ জুন সোমবার সকালে ফাইলটি অনুমোদিত হবার পর তখনই তিনি এ বদলির আদেশ জারি করেন বলে জানান। কিন্তু, সকালে আদেশ জারি হবার পর এটি প্রকাশিত হতে অর্থাৎ ওয়েবসাইটে দিতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেন লাগলো, এর কোনো ব্যাখ্যা জনাব লতিফ তার স্ট্যাটাসে দেননি। তবে তিনি চাকরি জীবনের বিভিন্ন পদায়নের ব্যাখ্যা তুলে ধরে পরিশেষে নিজের সততা সম্পর্কে লিখেন, “আপনারা অনুসন্ধান করে দেখুন প্লিজ। যদি প্রমাণ করতে পারেন, আমি অবৈধভাবে কারো কাছ থেকে ২ (দুই) টাকা নিয়েছি কিংবা এক কাপ চা খেয়েছি তবে আমি কথা দিলাম- সেদিন আমি চাকরি ছেড়ে দিবো। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিট বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে প্রশাসন সার্ভিসে এসেছি জনগণের সেবা করতে আর আত্ম-সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে। শুধুমাত্র অনুমান নির্ভর হয়ে এমনভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করাটা কতটা যৌক্তিক হয়েছে সেই ভারও আপনাদের উপরই ছেড়ে দিলাম। আমার বেতন যেহেতু জনগণের করের টাকায় হয় তাই নিজেকে জনগণের কাছে ক্লিয়ার করার ক্ষুদ্র চেষ্টা করলাম।” তিনি আরেকটি কথা তার লেখায় উল্লেখ করেন, “অফিসিয়াল কাজ সম্পর্কে যারা জানেন তারা নিশ্চয় অবগত আছেন ফাইল অনুমোদনের পর সেকশন অফিসারকেই আদেশটি জারি করতে হয়, আমিও সেটিই করেছি”। 
অবশ্য, এ কথাটি পুরোপুরিই সঠিক। কারণ, ফাইল উপস্থাপন এবং আদেশ জারি উভয় কাজ যদিও সেকশন অফিসারের হাত দিয়ে হয়ে থাকে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তার কোনোই হাত থাকে না। বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে এটা শতভাগ সঠিক। সাধারণত উপসচিব পর্যায়ের বদলির ক্ষেত্রে দু’একটি বাদে প্রায় সব বদলিই হয়ে থাকে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) এর ইচ্ছায়। শাখা অফিসার তাদের নির্দেশ অনুযায়ী ফাইলটি উপস্থাপন করেন এবং অনুমোদিত হলে আদেশ জারি করেনমাত্র। মাঝেমধ্যে দু’একটি ক্ষেত্রে এসব বদলি হয়ে থাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ইচ্ছায়। সেইসব ইচ্ছাও বাস্তবায়িত হয় সচিব বা অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) এর মাধ্যমে। 
ছোট্ট মেয়ের প্রশ্নে নিশ্চুপ মঞ্জুর শাহরিয়ার: প্রজ্ঞাপনে বরাবরের মত জনস্বার্থে ঢাকা থেকে খুলনায় বদলির কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষ বলছেন, আড়ংকে জরিমানা করায় তাকে বদলি করা হয়েছে। এমন প্রশ্ন মঞ্জুর শাহরিয়ারের নিজের ছোট্ট মেয়ের মনেও উঁকি দিয়েছে। বাবার কাছে তাই জানতে চেয়েছে, ভালো কাজ করার পরও কেন তাকে বদলি করা হলো?
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এই প্রজ্ঞাপনকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিলেও নিজের ছোট্ট মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলতে পারেননি তিনি। বললেন কিছু বলতে না পারাটাই আমার ব্যর্থতা।
গত ৩ জুন সোমবার দুপুরে উত্তরা আড়ংকে সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করেন তিনি। এরপর রাতেই তার বদলির আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
গণমাধ্যমকে মঞ্জুর শাহরিয়ার বলেন, আমার ছোট্ট মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘বাবা তুমি ভালো কাজ করলে তোমাকে বদলি করা হলো কেন?’ আমি তার উত্তর দিতে পারিনি। এটাই আমার ব্যর্থতা। তাকে উত্তর দেওয়ার জবাব আমার জানা নেই। আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, যেখানে বদলি করা হবে, সেখানেই কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আগে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। সুনামগঞ্জে দায়িত্ব পালনের পর যখন আমার বদলি হলো, সেখানের মানুষ আমার জন্য কান্নাকাটি করেছে, মানববন্ধন করেছে। বললেন, এসবই প্রাপ্তি। আর যেখানেই যাবেন সেখানে ন্যায়ের পক্ষে কাজ করবেন।’
তবে ঈদের ঠিক একদিন বা দুদিন আগে এই বদলিটা নিজের পরিবারের জন্য সুখকর নয় বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।
শাহরিয়ার বলেন, ‘আমি যেখানেই যে অবস্থায় থাকি, ন্যায়ের পক্ষে কাজ করে যাবো। এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করেছি, সেসব এলাকায় ন্যায় ও সুনামের সঙ্গে কাজ করেছি সেইসব জেলার মানুষ এখনও আমাকে ফোন করে, মনে রেখেছে। তবে ঈদের আগে আমার পরিবারের জন্য এই বদলির আদেশটি বিব্রত ও সুখের সংবাদ না।’
সোমবার দিবাগত রাতে মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমি আজকে সারাদিনই ব্যস্ত ছিলাম। উত্তরা ও গুলশান এলাকায় অভিযানে ছিলাম। সেখান থেকে এসে অফিসে কাজ করেছি। ইফতার করেছি বাইরে। এরপর বেসরকারি টেলিভিশন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির একটি আলোচনায় অংশ নিয়েছি। সেখান থেকে বের হয়ে রাতে ফের আরটিভির আলোচনায় অংশ নিতে বের হই। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে আমার ভাই ফোন দিয়ে আমাকে জানায়, আমার বদলি হয়েছে। আমি আলোচনার বিরতিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে বদলির আদেশটি দেখতে পাই। এরপর আরটিভি থেকে বাসায় চলে আসি।’ 
ভোক্তার ওই কর্মকর্তা ‘ইল মোটিভেটেডলি’ প্রোপাগান্ডা করেছেন: তুমুল সমালোচনার পর মঙ্গলবার সকালে বন্ধের দিনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির আদেশটি বাতিলের কথা জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদ। উল্লেখ্য, শাহরিয়ারের বিতর্কিত বদলির ফাইলটিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলেন সচিব ফয়েজ আহম্মদই। 
তিনি দাবি করেন, ‘আড়ংয়ে অভিযানের আগেই তার বদলির আদেশ হয়। এরপর ভোক্তার ওই কর্মকর্তা ইল মোটিভেটেডলি কিছুটা প্রোপাগান্ডা করেছেন। জনমনে যেহেতু ভুল মেসেজ যেতে পারে সেজন্য আমরা আদেশটি বাতিল করেছি।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘ওই কর্মকর্তার বদলির আদেশের ফাইলটি ২৯ তারিখ উত্থাপিত হয়। পরে সকালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার আগেই তার বদলির অর্ডারটি হয়।’
তবে এ বিষয়ে মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার জানান, ‘আমি যা করেছি, তা আইন অনুযায়ী করেছি।’ 
দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি: সাংবাদিক সুকান্ত সেন এ প্রসঙ্গে লেখেন, ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলি আদেশ স্থগিতের মাধ্যমে আবার প্রমাণিত হলো, জনগণই সকল ক্ষমতার অধিকারী। তবে এই বদলী ঘটনার সাথে যারা যারা জড়িত তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক।
সাইফুল্লাহ সুমন লিখেছেন, সকাল বেলার ভালো খবর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের বদলির আদেশ স্থগিত করে তাকে স্বপদে বহাল রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, এজন্য সাধুবাদ। 
একই সঙ্গে প্রভাবশালীদের প্ররোচণায় প্রশাসনের যিনি ও যারা এ বদলির নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হোক।
ঈদের চাঁদ নিয়ে বিভ্রান্তি-বিতর্ক
শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেছে এবং এর ফলে বুধবারই ঈদুল ফিতর পালিত হবে বলে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে ৫ জুন রাত সোয়া এগারোটার দিকে সংবাদমাধ্যমকে জানান। এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপক হইচই পড়ে যায়, চাঁদ দেখা না যাওয়ার ঘোষণায়। কারণ, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে ইতিমধ্যে ৪ জুন ঈদ পালিত হয়ে গেছে। ভারত, পাকিস্তানসহ গোটা বাকি বিশ্ব ৫ জুন ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছে। বাদ থাকছে শুধু বাংলাদেশ। ৬ জুন বৃহস্প্রতিবার অর্থাৎ সৌদি আরবের ৪৮ ঘণ্টা পর বাংলাদেশে ঈদ হবে- যা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এবং সবাই ধরেই নিয়েছিল, ঈদ হবে ৫ জুন বুধবার। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতিও চলছিল।  
কিন্তু, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী সন্ধ্যায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সঙ্গে বৈঠক শেষে ঘোষণা দেন চাঁদ দেখা যায়নি। ঈদ বৃহস্প্রতিবার। এর আগে মাগরেবের পর থেকেই চাঁদ দেখা কমিটির বরাতে সংবাদ মাধ্যমসমুহে এই মর্মে ঘোষণা আসে যে, ৬৪টি জেলার কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি। কীসের ভিত্তিতে এত দ্রুত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সেন্সেটিভ সিদ্ধান্ত দেয়া হলো তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই তাড়াহুড়োর কেন প্রয়োজন হলো এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন রেখেছেন অনেকে।  
ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দ্বিতীয় ঘোষণার পর মানুষ আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়। কারণ, ইতিমধ্যে সবাই তারাবিহের নামাজ পড়ে পরের দিন রোজা রাখার প্রস্তুতি নিয়েছেন। অনেকে ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। ব্যাপক কটাক্ষ ও তোলপাড় চলেছে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির এমন কর্মকান্ড নিয়ে।
চরম সমালোচনা-কটাক্ষ: সাবেক অতিরিক্ত সচিব একেএম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী এ সম্পর্কে কটাক্ষ করে এক দীর্ঘ বক্তব্য তুলে ধরেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তিনি লিখেন, “চাঁদ বিজ্ঞান অনুসরণ করে। শুধু চাঁদ নয়, মহাবিশ্বের সকল গ্রহ উপগ্রহ যার যে পথে যেমনটি করে ঘোরার কথা তেমনটি করেই ঘোরে- বিচ্যুতি ঘটে না এক চুলেরও কোটি ভগ্নাংশের। জ্যোতির্বিদগণ হিসাব করে এখনই বলে দিতে পারেন ২১১৯ সালের শাওয়ালের চাঁদ কখন দৃশ্যমান হবে। এবারের যে চাঁদ নিয়ে আমাদের আকুতি ছিল, অপেক্ষা ছিল, শেষাবধি যে চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার ঘোষণা হয়েছে পূর্বে দেয়া না দেখতে পাওয়ার ঘোষণা বাতিল করে। জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী সে চাঁদের জন্ম ঘটেছিল বাংলাদেশ সময় ৩ জুন বিকাল ৪:০১ এ। ৪ জুন সন্ধ্যা ৭:৪০ পর্যন্ত আমাদের আকাশে দৃশ্যমান থাকার কথা, অর্থাৎ সূর্যাস্তের পরে প্রায় ৫৭ মিনিট পর্যন্ত। অথচ আমরা রাত এগারটার আগে কেউ চাঁদ দেখার খবর পাইনি। কেন?
৫ জুন বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট খেলা। বিশ্বকাপের। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বাংলাদেশিরা আছে মৌতাতে। নিউজিল্যান্ডের সাথে খেলা দেখার জন্য পুরো জাতি হামলে থাকবে টিভির সামনে। তাতে আবার সাড়ে তিনটা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভারতের খেলা, যেটাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ খেলা দেখার আনন্দ হতে বঞ্চিত হবে ঈদের আনন্দ করতে গেলে। ঈদ মানেই তো আনন্দ। তাই খেলা দেখার আনন্দ হতে জাতিকে বঞ্চিত না করতেই চাঁদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশের আকাশে ৪ জুন দৃশ্যমান না হতে। ৬ তারিখে অস্ট্রেলিয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা, যা এই জাতির কাছে তত গুরুত্ববহন করে না। ৬ তারিখ ঈদ হলে মানুষ শুধু ঈদই করবে।
রাত গড়াল। যাদের চাঁদ দেখার কথা তারা বাড়ি ফিরে এশা ও তারাবি পড়ে যখন ডিনারে, তখন খেঁকিয়ে উঠলেন গিন্নিরা। ৫ তারিখে ঈদ না হলে ৬:৪৭ এ ইফতার। সাড়ে ছয়টায় শুরু হওয়া খেলা দেখবো নাকি ইফতার করবো? ঈদ হলেতো ইফতারের তাগিদ নাই, খেলাটা দেখা যাবে শুরু হতেই। নাতি পুতিদেরও আব্দার তাই।
টনক নড়ে কর্তাদের। বিশ্বকাপের একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলা ইফতারির সাথে সংঘাত তৈরি করবে তাতো হতে পারে না। বিশ্বকাপের সূচিতেও পরিবর্তন আনা সম্ভব না। অতএব চাঁদকে আবার আকশি দিয়ে টেনে নামাও। চাঁদ তখন বিশ্রামে। চাঁদই খবর পাঠালো তাকে নাকি যথাসময়ে দেখেছিল পাটগ্রামের কেউ। যিনি দেখেছিলেন তাঁর মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনায় আর ইন্টারনেটের স্পিড কম থাকায় কর্তাদের কর্ণগোচর করতে একটু সময় লেগে যায়।
এখন ৫ জুন ঈদ। ৫ জুন বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা। ইফতারের সাথে সংঘাত এড়াতেই আজ ঈদ। না জ্যোতির্বিদ্যা, না চাক্ষুস! আমাদের ঈদ হয় আমাদের ইচ্ছায়। ঈদ মুবারক।” 
সাবেক যুগ্মসচিব মেজবাহ উদ্দিন লিখেছেন, “চাঁদ দেখা কমিটির জন্য মেঘভেদী দূরবীন যন্ত্র বা চাঁদ দেখা হেলিকপ্টার কেনা দরকার অথবা এই কমিটি বাতিল করা দরকার।” অন্য একজন লিখেছেন, “লজ্জা শরম তুলে রেখে চাঁদ মুখ দেখিয়েছে। ভাগ্যিস রাত পোহানোর আগেই মুখ দেখাল!” সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তা লিখেছেন, ঘুমাতে গেলাম। চাঁদ বাতিল হলে টাইমলি কেউ খবর দিয়েন। তবে সাংবাদিক আমিনুর রহমান তাজ লিখেছেন, “ব্যবসায়ীদের আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিলো চাঁদ দেখা কমিটি। সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা কমিটির বৃহস্পতিবারে ঈদ ঘোষণায় ব্যবসায়ীরা দোকানে মাল তুলেছিলেন। কসাইরা মাংস বিক্রির আশায় অতিরিক্ত গরু জবাই করেন। একই অবস্থা হয় মুরগী বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে। তারাও অতিরিক্ত মুরগীর যোগান নেন। সবকিছুকে ছাপিয়ে রাতে চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত বিপাকে ফেলে দেয় ব্যবসায়ীদের। আজ তাদের একাংশের বক্তব্য ছিলো, চাঁদ নিয়াও রাজনীতি শুরু হয়েছে দেশে।”
সাংবাদিক মোস্তফা কামাল লিখেছেন, “চাঁদ দেখা কমিটি নির্দোষ: দায়ী শয়তানসহ ৬ কারণ। ১) এবারেরটি চাঁদ নয়, চাঁদনি। মামা নয়, মামি। তারওপর পর্দানশীল। তাই চাঁদনি মামিকে ঠাওর করিতে বাড়তি সময় লাগিয়াছে। ২) এছাড়া, ইহা ছিল দুর্বল কিছিমের। গাঝাড়া দিয়া উঠিতে দেরি করিয়াছে। ৩) রোজা শেষে বন্দিখানা হইতে মুক্তি পাইয়াই শয়তান চাঁন্দু আমাদের চাঁন মিয়াদের বিভ্রান্তিতে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছে। ৪) দেশে রাতের কাজের পরিমাণ বাড়িয়া যাওয়ায় চাঁদ দেখা যাওয়ার ঘোষণাও রাতে দেওয়া বরকতময় বলিয়া মনে হইতেছিল। ৫) নিউজিল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার দিনে ঈদ রাখা ঠিক হইবে কি-না সেই চিন্তা-ভাবনায় কিছু সময় লাগিয়াছে। ৬) অন্যান্য সেক্টরের মতো চাঁদ দেখা কমিটির সুযোগ-সুবিধা, সম্মান-সম্মানি বৃদ্ধি পায়নি। ইহাতে কাজের বেগ-গতি দু’টাতেই কিঞ্চিত ঘাটতি হইতে পারে।”
সাংবাদিক কাফি কামাল লিখেছেন, “আমাদের জীবনে এই নিয়ে দু’বার ঈদের চাঁদ উঠলো রাত ১১টায়। ১৯৯৭ সালে উঠেছিল দক্ষিণবঙ্গে, ২০১৯ সালে উঠলো উত্তরবঙ্গে। ২২ বছরের ব্যবধানে আমাদের জীবনটা ফের ধন্য। আর ২২ বছর (২০৪১ সাল পর্যন্ত) বেঁচে থাকলে আশাকরি পূর্ববঙ্গেও আমাদের ঈদের চাঁদ উঠতে দেখব। আমাদের জীবনটা ধন্যতর হবে।” শহিদুল ইসলাম লিখেছেন, “চাঁদ নরমাল ডেলিভারিতে না হওয়ায়, সিজারে বের করেছে বাংলাদেশ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। তারাবি নামাজের পর রাত ১১ টায় চাঁদের সন্ধান পাওয়া গেছে।” মইন উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, “গতকাল শয়তান এক মাস পর ছাড়া পেয়ে প্রথমেই চাঁদ কমিটির উপর হামলা করেছে।” দিদারুল আলম লিখেছেন, “চাঁদ দেখা কমিটি উল্টা দিকে খোঁজাখুঁজি করায় সন্ধ্যা রাতে চাঁদ খুঁজিয়া পান নাই ! তবে মধ্যরাতে চাঁদ আবিস্কার !! দেশে অনেকেই হয়তো প্রথম বারের মতো সেহেরী + ঈদ করিবেন !! ঈদ মোবারক।” নাজমুস সাকিব লিখেছেন, “আমরা তারাবি নামাজ জামাতে পড়েছি। এখন এ নামাজের কি হবে? মহিউদ্দিন খান মোহন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আগামী বছরের জন্য এডভান্স জমা থাকবে। স্বাক্ষী ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ।” হাসিনা মমতাজ এর উত্তরে বলেছেন, “ভাই এবার তো শুধু নামাজের উপর দিয়ে গেল,আগামীবার রোজার উপর দিয়ে যায় কিনা তাই দেখেন।”
সমালোচনা যে কারণে: মূল চাঁদ দেখা কমিটির সাথে একযোগে প্রতিটি জেলায় একটি করে কমিটি কাজ করে। দেশের কোথাও চাঁদ দেখা গেলে সেটি স্থানীয় প্রশাসন বা ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জেলা কমিটির কাছে পৌঁছায়। পরে জেলা প্রশাসন দ্রুত সেটি নিশ্চিত করে বিভিন্ন ভাবে- যেমন স্থানীয় অনেকে চাঁদ দেখেছে কি-না কিংবা স্থিরচিত্র বা ভিডিও চিত্র এসব দ্রুত সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়ে থাকে স্থানীয় প্রশাসন। সেক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ও ভালো দৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন কাউকে চাঁদ দেখতে হবে। পরে সে খবরটি যাচাই হয়ে জেলা কমিটি হয়ে কেন্দ্রীয় চাঁদ দেখা কমিটির হাতে পৌঁছায়। একই সাথে আবহাওয়া অধিদফতরের দেশজুড়ে যে ৭৪টি স্টেশন আছে সেখান থেকেও তথ্য নেয় চাঁদ দেখা কমিটি। যদি আবহাওয়া অনুকূল না থাকে অর্থাৎ খালি চোখে চাঁদ দেখার সুযোগ না থাকলে আবহাওয়া স্টেশন থেকে পাওয়া তথ্যও চাঁদ দেশের আকাশে উঠেছে কি-না তা নিশ্চিত হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, যেখানে এতগুলো প্রক্রিয়া চলমান, এ প্রক্রিয়াগুলো পুরোপুরি সম্পন্ন না করে কেন তড়িঘড়ি করে ‘চাঁদ দেখা যায়নি’ এমন ঘোষণা দেয়া হলো? তাহলে কী পূর্বনির্ধারিত কোনো বিষয় এর নেপথ্যে ছিল, এমন প্রশ্ন রেখেছেন কেউ কেউ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানাজনের কটাক্ষের মধ্য দিয়েও এ প্রশ্নটি এসেছে। এমনকি শীর্ষকাগজের এ প্রতিবেদকের কাছেও কেউ কেউ এ প্রশ্নটি ফোনে ওইদিন রেখেছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা ৪জুন রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফোনে শীর্ষকাগজের এ প্রতিবেদককে জানান, আওয়ামী লীগের উপজেলা পর্যায়ের একজন সিনিয়র নেত্রী তাকে ২ জুন নিশ্চিত করে জানিয়েছিলেন, ঈদ হবে বৃহস্প্রতিবার। ৪ জুন ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর প্রথম সংবাদ সম্মেলনের পর ওই নেত্রী তাকে ফোন করে দুদিন আগের ভবিষ্যদ্বাণীটি স্মরণ করিয়ে দিলেন। এই সরকারি কর্মকর্তা শীর্ষকাগজের প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন করেন, কীভাবে এটা সম্ভব?
ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও কটাক্ষ যখন চলছিল তারই মধ্য দিয়ে অবশেষে রাত সোয়া ১১টায় দ্বিতীয় দফায় সংবাদ সম্মেলন করে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী জানালেন, উত্তরবঙ্গের লালমনির হাট এবং কুড়িগ্রাম থেকে স্থানীয় লোকেরা চাঁদ দেখতে পেয়েছেন বলে কমিটিকে খবর দিয়েছেন।
ইতিহাসের স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রায় ডিসি-ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন-ভাঙচুর
সড়কপথে এবারের ঈদযাত্রায় কোনো ভোগান্তি হবে না এবং একেবারেই স্বস্তিদায়ক হবে বলে দাবি করেছিলেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী