বুধবার, ১৭-জুলাই ২০১৯, ১২:৫১ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • সরকারি ভর্তুকি কৃষক নয়, যাচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাদের পকেটে
ধান ক্রয়ে দুর্নীতি

সরকারি ভর্তুকি কৃষক নয়, যাচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাদের পকেটে

shershanews24.com

প্রকাশ : ২০ জুন, ২০১৯ ০৬:৩৫ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দাম অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়ায় মাঠভর্তি সোনালী ধানে আগুন দিয়ে এই প্রথম এক অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের কৃষক সম্প্রদায়। তারা দাবি করেছেন ব্যাপক লোকসানের মুখে, কোন প্রকারের উপায়ান্তর না দেখে সরকারের টনক নড়ানোর জন্য এই কায়দা বেছে নিয়েছেন। দেশের টাঙ্গাইল, বগুড়াসহ কয়েকটি জেলার বেশ কিছু স্থানে এই ঘটনা ঘটে। সরকার দলীয় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা-কর্মী, অসাধু কিছু মিল-মালিক ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দামে তারা সরকারি গুদামে সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারছে না। তাদের কাছ থেকে সরকার দলীয় প্রভাবশালীরা জোর পূর্বক কম দামে ধান ক্রয় করে দ্বিগুণ দামে তা সরকারি গুদামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এদের দাপটে সরকারি প্রশাসনের এক্ষেত্রে ‘সাক্ষী গোপালের’ ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকছে না। এমনকি ধানের স্থানীয় বাজার মূল্যও অনেক কম। অবস্থা এমন শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এ বছর ধানে কৃষকের উৎপাদন খরচই উঠছেই না, বরং ধান বিক্রি করে বিঘা প্রতি ৬ থেকে ১০ হাজার টাকারও বেশি লোকসান গুণতে হচ্ছে। খোদ কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ধান বিক্রির দুর্নীতির সাথে জড়িত সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের অপকর্মের কথা স্বীকার করে বলেছেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা সম্ভব হচ্ছে না। আর খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের চাপের মুখে তারা কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করতে পারছেন না। সরকারি দলের লোকদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ধান কিনতে হচ্ছে। অন্যথায় তাদেরকে হুমকি ধামকিসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। ফলে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে, জমি বর্গা নিয়ে করা ধানের চাষে লোকসান দিয়ে কপাল ঠুকছেন সাধারণ কৃষকরা। ধান চাষে তাদের যে ব্যয় হয়, ধান বিক্রি করে তাও উঠছে না, মুনাফা তো দূরের কথা।
অবশ্য এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সাফাই গেয়ে বলেছেন, ধান কেনার ক্ষেত্রে কোন প্রকারের রাজনৈতিক প্রভাব বরদাশত করা হবে না। প্রকৃত কৃষক ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে ধান না কেনার জন্য প্রশাসনকে কড়াভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দলীয় মধ্যস্বত্বভোগীরা যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা তদারকির জন্য মনিটরিং টিম কাজ করছে। ধান ও চালের সংগ্রহ ও মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভবিষ্যতে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার ২০০ স্থানে প্যাডি সাইলো স্থাপন করা হবে।
কিন্তু মন্ত্রীর কোন কথার সাথেই বাস্তব পরিস্থিতির কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় তা হলো, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা এ ব্যাপারে কারও কথা এমনকি স্বয়ং মন্ত্রীর কথাও আমলে নিচ্ছে না। ঘটনা থেকে বুঝা যায়, অনেক কিছুই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতার বিষয়টিও এই ঘটনার দ্বারা স্পষ্ট হয়। ধানের ন্যায্য মূল্য কৃষক পাবে এমন আশানুরূপ কোন কর্মকা-েরই এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গোচরীভূত হচ্ছে না। তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে এক ধরণের হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। কৃষকদের অধিকার রক্ষার অঙ্গিকার নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন কৃষকলীগেরও এই ব্যাপারে কোন দৃশ্যমান কর্মসূচী দেখা যাচ্ছে না। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, কৃষকলীগের বড় হর্তাকর্তারাও অবৈধ ধান বাণিজ্যের সাথে জড়িত। তাই তারাও এ বিষয়ে বোবা-বদির হওয়ার অভিনয় করছেন। যার ফলে কৃষকদের আকাশ ভারী আর্তনাদ তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। আর প্যাডি সাইলো কবে নাগাদ স্থাপন হবে সেই বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট কোন আভাস আসে নি। তাই প্যাডি সাইলো নির্মাণের বিষয়টি শুধু মুখে মুখে থাকবে নাকি বাস্তব রুপ নিবে তাও হলফ করে বলা যাচ্ছে না। 
চলতি মৌসুমে বাজারে ধানের দাম অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়ায় কৃষকরা যেমন বিপাকে পড়েছে, তেমনি ধান পোড়ানোর ঘটনায় সরকারও বিব্রত। ধানের এই ক্রমাগত দরপতন ঠেকাতে গত ২৬ এপ্রিল থেকে সরকারিভাবে ধান-চাল কেনা শুরুর কথা ছিল। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সমূহের সমন্বয়হীনতার জন্য যথা সময়ে ধান-চাল কেনা যায়নি। ঈদের সপ্তাহ দুয়েক আগে সরকারিভাবে ধান-চাল কেনা শুরু হয়। তখন ধানের মৌসুম প্রায়ই শেষের পথে। অথচ এই ক্রয় চলবে আগামি ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই বোরো মওসুমে মোট ১৩ লাখ টন ধান-চালের মধ্যে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল, দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং দেড় লাখ টন ধান সংগ্রহ করবে সরকার। সিদ্ধ চালের দাম কেজি প্রতি ৩৬ টাকা , আতপ চাল ৩৫ টাকা এবং ধান ২৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মণ প্রতি ধান সংগ্রহের জন্য সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৪০ টাকা। কিন্তু সরোজমিনে দেখা যায় শুরু থেকেই ক্ষমতাসীনদের কবজায় চলে যায় ধান সংগ্রহ অভিযান। শুধু সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতারাই গুদামে ধান সরবরাহ করতে পারছেন। অবৈধভাবে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তারা ধান বেচার সিøপ সংগ্রহ করেন। এবং রাতারাতি নিজেরা কৃষক বনে যান। এইসব নেতারা কৃষকদের কাছ থেকে মণ প্রতি ধান ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় ক্রয় করে সরকারি গুদামে দ্বিগুণ দামে সরবরাহ করছে। ফলে তারা মণ প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। যা ছিল কৃষকের প্রাপ্য। অর্থাৎ সরকার ধান ক্রয়ে ভর্তুকি দিলেও তা কৃষকের পকেটে না যেয়ে সরকারি দলের নেতা কর্মীদের পকেট ভর্তি করছে। অল্পদিনেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠছেন তারা। আর এতে কপাল পুড়ছে সাধারণ নিরীহ কৃষকদের। ক্ষেত ভর্তি সোনালী ফসলে তাদের মুখে সাময়িক হাসি ফুুটলেও দিন শেষে তা মলিন হয়ে যাচ্ছে। ধান বাণিজ্য ও সিøপ বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে অনেক জেলা-উপজেলায় স্থানীয় নেতাদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল সৃষ্টি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, তারা ধান নিয়ে খাদ্যগুদামে গেলে ধানে চিটা ও ময়লা, ধানে আর্দ্রতা কম-বেশি, গুদাম খালি নেই ইত্যাদি অজুহাত দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রকাশ্যে নেতাদের সিøপে ভেজা ধান নেয়া হচ্ছে। অনেক এলাকায় নেতারা কৃষকের কৃষি কার্ডও জোর পূর্বক রেখে দিচ্ছেন। আবার ভুয়া কার্ড ব্যবহার করেও সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করছেন তারা। আর এদিকে চালকল মালিকরা আমদানি করা পুরনো নিম্নমানের চাল সরকারি গুদামে দিচ্ছেন। মোটকথা কৃষকরা সব দিক থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন। 
ধান-চালের দামের নিয়ন্ত্রণ সরকারের কাছে নেই বলে দাবি করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন কৃষি, খাদ্য আর বাণিজ্য এই তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা ও গাফেলতির সুযোগ নিয়ে মধ্যসত্বভোগী, ফড়িয়া ও ক্ষমতাসীনদের একটি সিন্ডিকেট দখলে নিয়েছে ধান বিক্রির স্থানীয় বাজার। বাজার নিয়ন্ত্রণ, কৃষকের সরলতা ও ক্ষমতাকে পুঁজি করে এই সিন্ডিকেটটি ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে যে দামে ধান ক্রয় করে তার থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে ধান বিক্রি করছে। তাই ধান-চালের উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। কৃষক যেখানে কেজি প্রতি চালের দাম পাচ্ছেন ১৮ থেকে ২০ টাকা, সেখানে ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। ক্ষেত্র বিশেষে দাম আরও বেশি হয়ে থাকে। এক কেজি ভালো মানের চাল কেনার জন্য ভোক্তাকে গুণতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অথচ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ভালো মানের চাল বিক্রি হয় ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়। এখানেও কেজি প্রতি ৮ থেকে ১০ টাকার ব্যবধান। ঢাকার পাইকারি বাজারে বর্তমানে ৫০ কেজির প্রতিবস্তা আটাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টাকায়, মিনিকেট নতুন চাল ২ হাজার ২০০ টাকায় এবং পুরনোটা ২ হাজার ৪০০ টাকায়। কোনো কোনো খুচরা বাজারে আরো বেশি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে। স্বর্ণা ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৮০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও গুটি চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতিবস্তা ১ হাজার ৩২০ টাকায়। এদিকে চালের দাম না কমলেও ধানের দাম কমেই চলেছে। অর্থাৎ ধান-চাল উৎপাদন ও ক্রয়ে শুধু কৃষক ও ভোক্তা শ্রেণিই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। আর লাভবান হচ্ছেন মধ্যসত্বভোগীরা। এ বছর এক বিঘা বোরো জমি চাষ করতে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। ধান উৎপাদন হয়েছে প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ১৮ মণের মতো। বাজারে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা ধরে ধান বিক্রি করতে পারছেন কৃষক। প্রতি বিঘায় কৃষকের লোকসান প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এ ছাড়াও একজন কৃষি শ্রমিকের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতিদিন ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। তাই মন প্রতি ধানের দামে লোকসান আরও বেড়ে যায়। সরকারি দামে কৃষক ধান বিক্রি করতে না পারায় দুর্দশা আরও বাড়ছে। ধানের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ার জন্য বড় কোম্পানিগুলোর আধিপত্যও দায়ী। কারণ তারা সিন্ডিকেট তৈরি করে কৃষককে ফাঁদে ফেলে কম দামে ধান সংগ্রহ করছে। এদিকে বাংলাদেশে বার্ষিক কত টন চালের প্রয়োজন তার স্পষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য সরকারি কোনো দফতরে নেই। সাধারণত কৃষি বিভাগের কাছ থেকে খাদ্যশস্যের বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে থাকে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর। কিন্তু চালের গুদাম, মজুদ, আমদানি ও উৎপাদন সম্পর্কিত তথ্য থাকলেও চাহিদা বা কতটুকু চাল ভোগ করা হয়, তার কোনো সঠিক তথ্য বা হিসাব সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই নেই। তাই দেশে কি পরিমাণে ধান উৎপাদন হয়েছে, চালের মোট উৎপাদন কত ইত্যাদি বিষয়ের সঠিক হিসাব কেউই দিতে পারে নি। সবাই অনুমাণের ভিত্তিতে বিভিন্ন হিসাব কষছেন। এটিও সরকারের আরেকটি ব্যর্থতা। 
ধান নিয়ে রাজনীতির মাঠও কম ঘোলাটে হয়নি। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বগুড়ায় কৃষকের ধানক্ষেতে আগুন দেয়ার যে ঘটনা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে সেটিকে ভারতের পাঞ্জাবের একটি গমক্ষেতে আগুন দেয়ার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হানিফের এ বক্তব্য নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ধানে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে স্যাবোটেজ বলে উল্লেখ করেন। তিনি এতে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পান। ওবায়দুল কাদেরের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার কৃষকদের ন্যায্য দাবির কথা কানে নিচ্ছে না। বরং সরকারের একজন মন্ত্রী কৃষকদের এই বিক্ষোভকে ‘স্যাবোটেজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। সরকারি জোটের অন্যতম শরীক ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, কামলা দেয়ার নামে ক্ষমতাসীনদের ফটোসেশন চলছে। কৃষক ধান কাটার লোক চায় না, ধানের লাভজনক মূল্য চায়। তার বদলে মন্ত্রীসহ কর্তাব্যক্তিরা কামলার দাম বেশি হওয়ার আজগুবি দোষ খুঁজে পেয়েছেন। কৃষক-ক্ষেতমজুরকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন। কৃষককে নিয়ে এ ধরনের প্রহসনের খেলা বন্ধ করতে হবে। তার এই ধরণের বক্তব্য সরকারের বিভিন্ন মহলে তোলপাড়ের সৃষ্টি করেছে। এতে সরকারি জোটে যে অন্তর্কোন্দল বিদ্যমান তা আরও স্পষ্ট হয়। অবশ্য ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী ব্যাক্তিবর্গ ধান-চাল ক্রয় প্রক্রিয়ায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে দায়িত্বরত কর্তাব্যক্তিদের সমালোচনা করেছেন।
ধানে আগুন দেয়ার ইস্যুটি ফেসবুকে নানা রকম আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সব চেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় যখন ছাত্ররা আগুন দেয়া ধান ক্ষেতের অবশিষ্ট ধান কেটে দেয়। এরপরই ধান কাটা নিয়ে ফটোসেশনের প্রতিযোগিতা চালু হয়। শুরু হয় ধান ক্ষেতে গিয়ে লুঙ্গি পরে, নতুন সেন্ডু গেঞ্জি গায়ে দিয়ে, গামছা কোমরে ও মাথায় বেঁধে, কাস্তে হাতে নিয়ে সেলফি তোলা ও ফেসবুকে আপলোড় দেয়ার হিড়িক। এতে আমজনতার পাশাপাশি ছাত্র, শিক্ষক, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফেসবুক সেলিব্রেটিসহ নানা পেশা ও স্তরের মানুষ অংশ নেয়। বাদ যায়নি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও। বিশেষ করে আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন- ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে নিম্ম-স্তরের নেতাকর্মী সবাই এই মহা কর্মযজ্ঞে অংশ নেয়। এমনকি পুলিশকেও বন্দুক কাঁদে নিয়ে ধান কাটার ফটোসেশনে দেখা গেছে। সস্তা খ্যাতি লাভের আশায় সবাই ফেসবুকে তাদের মনকাড়া এডিটেড ছবি আপলোড় করে। কিন্তু কে কতটুকু ধান কাটল বা কৃষকেরই বা কতটুকু উপকার হলো তার হিসেব কেউ করেও নি। সবাই ফটোসেশন প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। অবশ্য বিষয়টি ভাইরাল হতে হতে এমন পর্যয়ে পৌঁছেছে যে, প্রশংসার পরিবর্তে উল্টো এই কর্মের সাথে জড়িত সবাইকে সমালোচনার স্বীকার হতে হয়েছে। এটি শেষ পর্যন্ত হাস্যরসের খোরাকেই পরিণত হয়েছে। ঈদ-উল-ফিতরের কারণে ফটোসেশন কার্যক্রম ধামাচাপা পড়ে গেছে। নয়তো ফটোসেশনের নামে হলেও বিনা পারিশ্রমিকে কিছু ধান কাটা হতো। তবে ধানের বর্তমান যে বাজার মূল্য তাতে সরকার যদি সারাদেশে বিনা পারিশ্রমিকে ধান কাটানোর ব্যবস্থা করে তাও কৃষককে লোকসান গুণতে হবে। কারণ ধান কাটানোর খরচ ছাড়াই মণ প্রতি ধানে কৃষকের খরচ প্রায় ৬০০ টাকার মতো। আর মণ প্রতি ধানের বাজার মূল্য সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো টাকা। হিসাবে একশো থেকে দেড়শো টাকা লোকসান হচ্ছে। তাই ধান কাটা নিয়ে যে তালগোল পাকানো হচ্ছে তা কৃষকের বস্তুত কোন উপকারেই আসবে না। যদি মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের উৎখাত না করা যায়, ধান সংগ্রহে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লাগাম না টানা যায় এবং সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্য ধান সংগ্রহ না করে।
প্রতি বছরই এই সময়ে ধানের সংগ্রহ, মজুদ ব্যবস্থা ও দাম নিয়ে কৃষককে নানামূখী সংকটে পড়তে হয়। ফলে কৃষক অবরোধ-ধর্মঘটসহ নানা প্রকারের কর্মসূচী দিয়ে সরকারের উপর সাময়িক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকে। সরকারও তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু প্রভাবশালী মিল-মালিক, সরকারি সংস্থা ও দলীয় লোকজনের কারণে কোন পরিকল্পনারই সুষ্ঠু বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। তারা বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে হাজার কোটি টাকা লুফে নিজেদের পকেট ভর্তি করে। যার ফলে কৃষকরা ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ধান-চাল সংগ্রহ নীতিমালা পরিবর্তন না হলে সরকারের এ সহায়তা কৃষকের কাছে পৌঁছাবে না। ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্রয়কেন্দ্র চালু করে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা উচিত। কৃষির এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে প্রথমেই চালের উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। কৃষি উৎপাদনের বড় একটা খরচ হচ্ছে কৃষি শ্রমিক। ধান কাটার মওসুমে কৃষি শ্রমিকের সঙ্কট চরম আকার ধারণ করে। তাই কৃষি শ্রমিকের ব্যবহার কমিয়ে কৃষিকে পর্যায়ক্রমে আধুনিকীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণে নিয়ে যেতে হবে। বেসরকারি হিসেবে এ বছরে দেশে চালের চাহিদা সাড়ে তিন কোটি টনের মতো। উৎপাদন হয়েছে প্রায় চার কোটি টন। সরকার প্রায় ১৩ লাখ টনের মতো ধান ও চাল কিনবে। যা মোট উৎপাদনের তুলনায় নগণ্য। এর মধ্যে মাত্র দেড় লাখ টন ধান কিনে সরকার বাজারে উল্লেখযোগ্য কোন প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। কারণ কৃষকের কাছ থেকে মূলত ধানই সংগ্রহ করা হয়। আর চাল সংগ্রহ করা হয় মিল-মালিকদের কাছ থেকে। চালের তুলনায় খুবই সীমিত পরিমাণে ধান ক্রয় করায়, কৃষক নয় লাভবান হচ্ছে অসাধু মিল-মালিকসহ সরকারি দলের দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মীরা। এ বিষয়টি সমাধান ও কৃষকের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা থাকা দরকার। ধানের মজুদ ব্যাপক হারে বৃদ্ধিসহ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চত করতে হবে। কৃষি, খাদ্য আর বাণিজ্য এই তিনটি মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। চাল আমদানি-রপ্তানি নীতিতে বাস্তবমূখী পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলেই কৃষকেরা ধান চাষে লাভবান হবেন। ধান উৎপাদনে তারা উৎসাহী হবেন। অন্যথায় কৃষক যদি ধান উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হন তাহলে দেশে খাদ্য সংকটের আশংকা দেখা দিবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১০ জুন ২০১৯ প্রকাশিত)