শুক্রবার, ১৫-নভেম্বর ২০১৯, ০৫:৪২ অপরাহ্ন

জীবন বীমা কর্পোরেশন যেভাবে চলছে

shershanews24.com

প্রকাশ : ২১ জুন, ২০১৯ ০৮:১৩ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দেশের ৩২ টি জীবন বীমা কোম্পানির আর্থিক বিষয়সহ যাবতীয় কার্যক্রমের বিশেষ নিরীক্ষা শুরু করেছে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এবং সরকারি একমাত্র কোম্পানি জীবন বীমা কর্পোরেশনও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে লাগামহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতিতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বৃহৎ এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। আর বর্তমানে প্রশাসন তথা পরিচালনা পর্ষদের  নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে একেবারেই ডুবতে বসেছে জীবন বীমা কর্পোরেশন। গত মার্চে অতিরিক্ত সচিব শাওলী সুমন এনডিসিকে জীবন বীমা কর্পোরেশনে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে তিনি আজ পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। জানা গেছে, শাওলী সুমন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার পর বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও জীবন বীমা কর্পোরেশনের দুর্নীতিবাজ চক্রের সদস্যরা কোনোভাবে তাকে সহায়তা করেনি। পদে পদে তাকে বাধা দেয়া হয়েছে। এর কারণ, নতুন এমডির এসব উদ্যোগের ফলে অনেকের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার আশঙ্কা ছিলো। আর তাই এমডিকে নানাভাবে অসহযোগিতা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি পারসোনাল সেফটি ও জীবন বীমায় দুঃশাসনের কথা উল্লেখ করে তাকে এ পদ থেকে প্রত্যাহারের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করেছেন এমডি শাওলী সুমন। 
সূত্র জানায়, মূলত দীর্ঘদিন ধরে জীবন বীমা কর্পোরেশন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে থাকা সরকারের সাবেক সচিব ড. শেলীনা আফরোজার প্রশ্রয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তার একক কর্তৃত্ব ও অনুগত কর্মকর্তাদের কারণেই এমডি শাওলী সুমন কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারে না বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী জীবন বীমা কর্পোরেশনের এমডি-ই বিনিয়োগ কমিটির সভাপতি হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্নীতির জন্য প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান সেই কমিটির সভাপতি হয়ে বসে আছেন। গত ২ মে এই বিনিয়োগ কমিটির সভা ডাকা হয়। সভায় কমিটির সদস্য সচিবসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত না থাকায় বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করে পুনরায় সভা আহ্বান করতে নথিতে প্রস্তাব দেন এমডি শাওলী সুমন। কিন্তু সভাপতি এতে সম্মত না হওয়ায় এফডিআর নবায়নসহ খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনিষ্পন্ন থেকে যায়। এসব ঘটনার ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আর্থিক সুশাসন ব্যহত হচ্ছে। 
অভিযোগ রয়েছে, জীবন বীমার বর্তমান চেয়ারম্যান প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনও বদলে ফেলেছেন। যদিও আইন প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। জানা যায়, জীবন বীমা কর্পোরেশন দুর্নীতি-অনিয়মের একটি আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। কিন্তু এর আয়-ব্যয়ের সঠিক কোনো হিসাব নেই। জীবন বীমা কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয়ের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ছত্রছায়াই প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন রিজিওনাল কার্যালয়ে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি গ্রাহকের পাওনা না দেওয়া, একজনের প্রিমিয়াম (বীমা পলিসির টাকা জমা দেয়া রশিদ) নম্বর দিয়ে অন্যজনের পলিসিতে জমা করাসহ নানা বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করেছে  বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জীবন বীমা কর্পোরেশন সরকারি হলেও এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তা জাতীয় বেতন স্কেলের দ্বিতীয় গ্রেডের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করলেও প্রতিষ্ঠানটি সরকারের বাজেট পদ্ধতি বা অর্থ বছর অনুসরণ করে না। তারা ক্যালেন্ডার বছর দিয়ে এক ধরনের গুপচি বাজেট প্রণয়ন করে। এই বাজেট দিয়ে হিসাব নিকাশে গরমিলের মাধ্যমে জনগণের অর্থ আত্মসাত করছে।
রাজধানীর দিলকুশাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জীবন বীমা কর্পোরেশনের ভবন/অবকাঠামো ও জমি রয়েছে। এসবের আয় ব্যয়ের কোনো হিসাব সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। সম্প্রতি নতুন এমডি এসে এসব সম্পত্তি, অবকাঠামোর তালিকা ও আয় ব্যয়ের যথাযথ হিসাব নিকাশ রাখার উদ্যোগ নেয়ায় নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করে এ সংক্রান্ত নথিপত্রই গায়েব করে দেয়া হয়েছে। 
সূত্র জানায়, জীবন বীমা কর্পোরেশনে নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও চলে ব্যাপক বাণিজ্য। এক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। জীবন বীমা কর্পোরেশনের বাণিজ্যের সবচেয়ে বড়  ক্ষেত্র হচ্ছে এফডিআর। নানা বীমা এজেন্ট ও  তাদের মাধ্যমে বীমা পরিচালনা দুর্নীতির আরেকটি ক্ষেত্র। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পুরনো প্রতিষ্ঠিত এ ধরনের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বাৎসরিক বাজেট প্রণয়নের সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করার ঘটনা খুবই গর্হিত অপরাধ। প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটিতে শুধুমাত্র সম্পত্তি ভাড়া বাবদই আয় হয় কোটি কোটি টাকা। শুধু চট্টগ্রামে যে ভবনগুলো রয়েছে সেগুলো থেকেই মাসিক আয় প্রায় দুই কোটি টাক্ াঢাকা মতিঝিলের জীবন বীমা টাওয়ারসহ বিভিন্ন ভবনের ভাড়া বাবদ আয় আছে আরো কয়েক কোটি টাকা। এছাড়া এফডিআর-এর সুদসহ বিভিন্ন আয় তো রয়েছেই। কিন্তু এই কোটি কোটি টাকা আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ সরকারি নীতি অনুযায়ী সংরক্ষণ করা হয় না, সঠিক নিয়ম অনুযায়ী বাজেট প্রণয়নসহ নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুসরণ করা হয় না শুধুমাত্র লুটপাটের উদ্দেশ্যেই।
জানা গেছে, গত ১৪ মে জীবন বীমা কর্পোরেশনের ৪৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে সেদিন প্রতিষ্ঠা উৎসবেরও আয়োজন করা হয়। আর একে কেন্দ্র করে বেশ আগে থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছথেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। সেই টাকা রাখা হয় একই ব্যক্তিগত হিসাবে অনেকটা হিসাব-নিকাশ ছাড়াই এই অর্থ ব্যয় করা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিষেধ উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে অপরিকল্পিতভাবে একটি বৃহৎ বেলুন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু বেলুনটি ব্লাস্ট হয় এবং তাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং প্রতিষ্ঠানটি সমালোচনার মুখে পড়ে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১০ জুন ২০১৯ প্রকাশিত)