সোমবার, ১৮-নভেম্বর ২০১৯, ০৫:৫৯ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাস সম্পত্তিতে অবৈধ পৌর মার্কেট নির্মাণ 

ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাস সম্পত্তিতে অবৈধ পৌর মার্কেট নির্মাণ 

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ জুলাই, ২০১৯ ০৬:১৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সরকারি হাটবাজারের সম্পত্তিতে কোনোরকমের নির্মাণ কাজের প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হয়। তারমধ্যে অন্যহত হলো- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেয়ার অপরিহার্যতা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ইমারত বা বহুতল ভবনসহ যে কোন ধরণের অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং সরকারি বিধির পরিপন্থি। এইসব সম্পত্তিতে নতুন করে কিছু নির্মাণ, পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া আবশ্যক। কিন্তু তা না করে নিজের খেয়াল খুশি মতো কোন প্রকারের অনুমতি ব্যাতিরেকেই ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি খাস জায়গা দখলে নিয়ে পছন্দমতো স্থানে ভবন (পৌর মার্কেট) নির্মাণ করছেন নীলফামারী পৌর মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ। মার্কেট নির্মাণের নামে করছেন কোটি কোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য। তার সকল অপকর্মের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পৌর কমিশনার সামসুল হকের তত্ত্বাবধানেই চলছে এই সমস্ত জবর-দখল। জেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নির্মিতব্য এই মার্কেটের ফলে সরকারের ভূমি যেমন বেদখল হচ্ছে তেমনি ক্ষতি হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমণ রাজস্ব। 
নীলফামারী জেলার নীলফামারী-ডোমরা রাস্তা সংলগ্ন বড় বাজার হাটের সম্পত্তিতে (সরকারি খাস জমি) পৌরসভার উদ্যোগে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য ট্রাফিক মোড় হতে পৌর ভূমি অফিসের রাস্তা পর্যন্ত পুরাতন সব দোকানপাট ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই কাজের জন্য ১০ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়। ভবন নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি-রাজস্ব) কে প্রধান করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু পৌর মেয়র কামাল আহমেদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে নির্মাণাধীন ভবন থেকে আয়কৃত রাজস্বের বিধিসম্মত বণ্টন চুক্তি হয় নি। উপরন্তু তড়িঘড়ি করেই মেয়রের অনুগত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দোকানপাট ভেঙ্গে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে দেয়। এসব অপকর্মে সরাসরি সহযোগিতা করেন এডিসি (রাজস্ব)। এর ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হাতছাড়া হয়েছে। মেয়র কামালের নির্দেশে উক্ত মার্কেট নির্মাণে কোনরূপ পূর্ব অনুমতি ও বিধিমালার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। তাই অবৈধ ও নিয়ম বহির্ভূত ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধের জন্য ৩০/০৪/২০১৯ইং তারিখে নীলফামারী রেভেনিউ ডেপুটি কালেক্টর, জোহরা সুলতানা যুথী স্বাক্ষরিত একটি পত্র নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। যার স্মারক নং-০৫.৪৭.৭৩০০.০১৬.০৭.০৯০.১৯-৫৬৬।
উক্ত পত্রে বলা হয়, নীলফামারী সদর উপজেলাধীন নীলফামারী বাজার মৌজাধীন এস. এ ০১ নং খতিয়ানভূক্ত ৫৩৫৭ দাগে ১.২৮ একর হাট শ্রেণির জমি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক নীলফামারীর নামে রেকর্ডভূক্ত। উক্ত সম্পত্তিতে নীলফামারী ‘বড় বাজার’ অবস্থিত যা সায়রাত ও পেরিফেরিভূক্ত এবং বাজারটি ২০১৯ (বাংলা ১৪২৬) সালের জন্য ইজারা প্রদান করা হয়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ০৪/০৪/১৯৯৯ইং তারিখের ভূম/৭-হাট-০১/৯৮/১০৫(৭৬) নং স্মারকের ১২(ক) অনুচ্ছেদের নির্দেশানুযায়ী দেশের সকল মেট্রোপলিটন এলাকায়, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং থানা অধিক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত হাটবাজার অভ্যন্তরস্থ খাসজমিতে কেবল জনস্বার্থে ও সরকারি বেসরকারি অর্থায়নে অথবা বৈদেশিক সাহায্যে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক বহুতল বিশিষ্ট মার্কেট ভবন নির্মাণ করা যাবে। তবে বহুতল মার্কেট নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব এবং অর্থায়নের উৎস সম্পর্কিত প্রস্তাব অবশ্যই ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। বর্ণিত স্মারকের ১২(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারের যে কর্তৃপক্ষ বহুতল বিশিষ্ট মার্কেট নির্মাণ করুক না কেন এবং যে কর্তৃপক্ষই অর্থ বরাদ্দ করুক না কেন হাটবাজারের অভ্যন্তরস্থ জমির মালিকানা সরকার তথা ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে জেলা প্রশাসকের নামে থাকবে। অর্থাৎ মালিকানা কোনক্রমেই হস্তান্তরিত হবে না। স্মারকের ১২(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বহুতল মার্কেট নির্মাণ কাজ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর নেতৃত্বাধীন ০৭ সদস্য বিশিষ্ট নির্মাণ কমিটির মাধ্যমে করতে হবে। এ কমিটির পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) দোকান বরাদ্দের সালামি এবং ভাড়া নির্ধারণ করবে। স্মারকের ১২(ঘ) অনুযায়ী বরাদ্দকৃত দোকানসমূহ হতে আদায়কৃত সালামির ২৫% এবং ভাড়ার ৩০% টাকা ভূমি মন্ত্রণালয়ের পাওনা হিসেবে ৭- ভূমি রাজস্ব খাতে জমা প্রদান করতে হবে।
চিঠিতে বলা হয়, বর্ণিত স্মারকের আলোকে পেরিফেরিভূক্ত সরকারি হাট-বাজারের সম্পত্তি সরকারি বিধি লঙ্ঘণ করে ইমারত বা বহুতল ভবন সহ যে কোন ধরণের অবকাঠামো নির্মাণ করা অবৈধ এবং সরকারি বিধির পরিপন্থি। পৌর ভূমি সহকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি বিধি লঙ্ঘণ করে নীলফামারী- ডোমরা রাস্তা সংলগ্ন বড় বাজার হাটের সম্পত্তিতে ট্রাফিক মোড় হতে পৌর ভূমি অফিসের রাস্তা পর্যন্ত পৌরসভার উদ্যোগে পুরাতন দোকানপাট ভেঙ্গে উক্ত স্থানে বিধি বর্হিভূতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। যা সরকারি নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ পর্যায়ে হাট-বাজারের সম্পত্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা জরুরি।
চিঠিতে বলা হয়, এমতাবস্থায়, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে সরকারি হাট-বাজারের সম্পত্তিতে পৌরসভার উদ্যোগে বিধি বর্হিভূতভাবে ট্রাফিক মোড় হতে পৌর ভূমি অফিসের রাস্তা পর্যন্ত পুরাতন দোকানপাট/ভবন ভেঙ্গে উক্ত স্থানে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ করার জন্য এবং এতদ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে লিখিত বক্তব্য প্রেরণ করার জন্য তাকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
জেলার নীলফামারী-ডোমরা সড়কে জনপথ সড়ক বিভাগের একটি চলমানাধীন সড়ক প্রশস্ত প্রকল্প রয়েছে। অথচ ভবন নির্মাণের বিষয়ে সড়ক বিভাগকে জানানোর প্রয়োজনই মনে করেনি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। উল্টো নিয়ম লঙ্ঘন করে এবং উক্ত সড়কের প্রায় পাঁচফুট জায়গা খনন করে পুরো সড়কটিকেই যানবাহন চলাচলের অযোগ্য ও ঝুকিপুর্ণ করে ফেলা হয়। ফলে জন দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে ‘সওজ’র সাথে সমন্বয় করে ভবন নির্মাণ কাজ করার জন্য ০৮/০৫/১৯ইং তারিখে নীলফামারীর ‘সওজ’র নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম হামিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি পত্র জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, মেয়র, ইউএনও বরাবর প্রেরণ করা হয়। যার স্মারক নং-৬৩৬(৮)।
পত্রে বলা হয়, “নীলফামারী-ডেমরা (জেড-৫৭০৭) জেলা মহাসড়কের ২য় কিলোমিটারে বড়বাজার সংলগ্ন (বাম পাশর্^) বাজার মার্কেট ভবন নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মার্কেট ভবনের ভিত্তি নির্মাণের নিমিত্তে পাকা সড়কের ধার ঘেষে প্রায় ৫-৬ ইঞ্চি গর্ত খনন করা হয়েছে। নির্মাণ এলাকায় জননিরাপত্তা/সড়ক পরিবহনের নিরাপত্তামূলক সতর্কতার কোন দৃশ্যমান সাইন-সিগন্যাল না থাকায় যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে জীবন বিপন্ন হতে পারে। চলমান রমজান মাসে বাজার এলাকা সংলগ্ন সড়কে লোকবলের সমাবেশ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে জননিরাপত্তা বিষয়টি গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করা জরুরি। সড়ক/মহাসড়কের পাশের্^ যেকোন নির্মাণ কাজ করার সময় যাতে কর্ম এলাকা দুর্ঘটনামুক্ত থাকে সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার নিমিত্তে কর্ম এলাকার চর্তুদিকে ঘিরে রাখার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, বর্ণিত সড়কটি ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশস্থকরণে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এমতাবস্থায়, সড়কটি প্রশস্থকরণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য অত্র দফতরের সাথে সমন্বয় করে স্থায়ী ইমারত নির্মাণ করার অনুরোধ করা হলো।” পত্রের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাাসন থেকে পৌরসভা মেয়র কামাল আহমেদকে নোটিশ প্রদান করে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়ার পরেও সেখানে মাটি খনন করে আরসিসি পিলার নির্মাণ করা হয়। এর ফলে সৃষ্ট উক্ত সড়কে জনদুর্ভোগের বিষয়টি সাবেক বিভাগীয় কমিশনারের নজরে এলে তিনি এ সম্পর্কে জেলা প্রশাসনকে টেলিফোনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলে কাজটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। 
উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে একই খাস সম্পত্তিতে যুক্ত আরও দুটো শাখা মাছা ১ ও শাখা মাছা ২ বহুতল মার্কেট বিধি বহির্ভুতভাবে ২০০৯ সালে নির্মাণ করা হয়। যা থেকে পাওয়া ৩৭০টি দোকানের সালামি ও আদায়কৃত রাজস্বের কোন অংশ সরকারি খাতে জমা হয়নি। সেই সাথে আরও একটি কিচেন মার্কেট একইভাবে নির্মাণ করা হয়। যার কোন বিধিসম্মত হিসেব-নিকেশ বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়নি। জানা যায়, খাস জমিতে নির্মিত মার্কেটগুলি থেকে দোকানের সালামি ও ঠিকাদারের কাছ থেকে পাওয়া ৫/৬ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছেন। যারা ঘুষ দিচ্ছেন তাদেরকেই মার্কেটে দোকানের বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এতে কপাল পুড়ছে পুরোনো দোকানদারদের। মোটা অংকের ঘুষ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে, মেয়রের বাহিনী হুমকি-ধামকিসহ নানা ভাবে হয়রানি করছে সাধারণ দোকানদারদের। তারা তাদের এতদিনের জমানো পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। মেয়রের ছত্রছায়ায় বহুতল মার্কেট নির্মাণে চরম অনিয়ম, সরকারি বিধি লঙ্ঘনসহ বিবিধ কর্মকা-ে জনমনে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাই তারা এর একটি বিহিত করার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আর্জি জানিয়েছেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৪ জুন ২০১৯ প্রকাশিত)