শনিবার, ১৯-অক্টোবর ২০১৯, ০৪:৪০ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • রেলপথ উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলে সাজানো নাকি জলে ঢালা?

রেলপথ উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলে সাজানো নাকি জলে ঢালা?

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৯ জুলাই, ২০১৯ ০৮:৪২ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বাংলাদেশে আগে রেলওয়ে ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ। ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। এ মন্ত্রণালয়ের প্রথম মন্ত্রী হন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তবে তার মন্ত্রী ভাগ্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। রেলের কালো বিড়াল খেদানোর কথা বলে দায়িত্ব নেয়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রীত্ব ছাড়তে হয়েছিল এক রহস্যময় ‘দুর্নীতির’ ইস্যুতে। পরে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মুজিবুল হক। দীর্ঘ দিন  রাজনীতি করলেও সুরঞ্জিতের মতো মুজিবুল হকেরও প্রথম মন্ত্রীত্ব ছিল রেলপথ মন্ত্রণালয় দিয়েই। মন্ত্রীত্ব সুরঞ্জিতের জীবনে এক কলংকময় অধ্যায়ের সূচনা করলেও মুজিবুল হকের সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়। চিরকুমার সংঘের সভাপতি ছিলেন মুজিবুল হক কিন্তু মন্ত্রীত্বের পর ষাটোর্ধ্ব বয়সে তিনি বিয়ে করেন এক তরুণীকে, সন্তানের বাবাও হন। মন্ত্রীত্ব মুজিবুল হকের ভাগ্য খুলে দিলেও রেলপথের ভাগ্য বা অবস্থার কি কোন পরিবর্তন হয়েছিল? এ প্রশ্নটি জোরালো হয়ে উঠেছে সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় রেল দুর্ঘটনা ও তাতে হতাহতের ঘটনায়। রেলবিভাগের দুর্নীতি ও রেলপথের দুরাবস্থা নিয়ে সারাদেশে যখন তোলপাড় চলছিল সেই মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশন একটি প্রতিবেদন পেশ করেছে। গত ২ জুলাই প্রকাশ করা এই প্রতিবেদনে রেল বিভাগের দুর্নীতির ১০টি উৎস চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনটি রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের হাতে হস্তান্তর করা হয়।
কুলাউড়ায় রেল দুর্ঘটনা, আসল ঘটনা কী?
২৩ জুন রাত ১২টার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বরমচলে রেলসেতু ও সংলগ্ন লাইন থেকে কয়েকটি বগি নিচে পড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রেনটি যখন যাচ্ছিলো তখন তাদের মনে হয়েছে ট্রেনটির বগিগুলো যেন চলতে চাইছে না, টেনে হেচড়ে নেয়া হচ্ছে। তবে ট্রেনটি চলছিল খুব দ্রুতগতিতে। সামনের বগিগুলো রেলসেতু পার হলেও নাট-বল্টু খুলে যাওয়ায় পেছনের বগিটি কোনরকমে সেতুতে ওঠার পরপরই তা বিকট শব্দে নিচে পড়ে যায়, দ্রুত গতির কারণে কয়েকটি বগি সেতু পার হয়ে গেলেও ছয়টি বগি খাদে পড়ে যায় কিংবা লাইনচ্যুত হয়। ওই রেলের যাত্রী ছিলেন এমন কেউ কেউ বলেছেন, ট্রেনের দুয়েকটি বগির অবস্থা এতই জীর্ণ ছিল যে ওইদিন প্রচ- ভিড় থাকার পরও ওইসব বগিতে কোন দাঁড়ানো যাত্রী ওঠেননি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সেতুটির নাট-বল্টুগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ছিল নড়বড়ে, তারা বিষয়টি স্থানীয় রেল কর্তৃপক্ষকে আগে অনেকবার জানালেও তারা তাতে গা করেনি। কেউ কেউ বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে ট্রেন যাওয়ার পর নাট-বল্টুগুলো এত আলগা হয়ে যেত যে, তারা হাত দিয়ে সেই নাট-বল্টুগুলো টাইট দিতেন। তারা বলেছেন, শুধু সেতুটির অবস্থাই নাজুক ছিল না, রেললাইন, ফিসপ্লেট সবকিছুই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এইসব নড়বড়ে অবকাঠামোর কারণে রেল দুর্ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা দাবি করলেও সরকারের ভাষ্য ভিন্ন। সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ওজনের ভারে ট্রেনটি রেলসেতু থেকে নিচে পড়ে যায়। তবে ঘটনা তদন্তে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেসব কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেই হয়তো জানা যাবে ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পড়ার আসল কারণ। রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে, কোনকিছু ধামাচাপা দেয়া হবে না। 
বাঁশ, ত্যানা আর সুতলিতে প্যাচানো রেল লাইন
রেললাইনে বাঁশের ব্যবহার নিয়ে সরস আলোচনা হিসেবে স্থান পেয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। রেললাইনের স্লিপার যাতে খুলে না যায় সেজন্য বাঁশ দিয়ে পেরেক মেরে আটকে রাখা হয়। তবে রেললাইনে বাঁশের ব্যবহারে অন্যায়ের কিছু খুঁজে পাননি সাবেক রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক। এবার যে স্থানটিতে রেল দুর্ঘটনা ঘটে তার অদূরে মনু রেলসেতুতে ভাঙাচোরা স্লিপার ধরে রাখতে বাঁশের ব্যবহার করা হয়েছিল ২০১৬ সালের শেষের দিকে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও তৎকালীন রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক দাবি করেছিলেন রেলপথে বাঁশের ব্যবহার অযৌক্তিক কিছু নয়।
ওই লাইনে ফিসপ্লেট আর জয়েন্ট নাটগুলোর কার্যক্ষমতা ধরে রাখা হয়েছিল সুতলি, পুরনো কাপড় পেঁচিয়ে। নাট-বল্টুর থ্রেডগুলো ক্ষয়ে গিয়েছিল। রেললাইনের সঙ্গে সংযুক্ত ক্লিপ ও হুকের সংখ্যাও ছিল কম। কাঠের স্লিপারও ছিল দুর্বল। এই সুতলি আর পুরনো কাপড় পেঁচিয়ে রেললাইন সচল রাখার কাজটি কিন্তু রেললাইনের পরিদর্শক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই করেছেন। প্রশ্ন ওঠে, রেললাইনের নাট-বল্টু কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখার এ কাজটি তারা কেন করতেন? নাট-বল্টুর জন্য নিশ্চয়ই অর্থ বরাদ্দ থাকতো তাহলে তারা রেলপথের মতো খুবই স্পর্শকাতর একটি পথের ক্ষেত্রে এমন গাছাড়া আচরণ কেন করেন? তারা কি ওই বরাদ্দ লোপাট করতেন? নাকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও তারা বিষয়টিকে আমলে নেননি। এ দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে হলে এসব প্রশ্নের জবাব জানতে হবে কেন না, নাট-বল্টুর জন্য আর কতই বা খরচ, কতই বা বরাদ্দ সেই টাকার লোভটা যারা সামাল দিতে পারেন না তাদের হাতে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? 
ব্রিটিশ আমলের ব্রিজ আর কালভার্টেই চলছে রেল
বাংলাদেশ ভূখ-ে রেলের প্রচলন হয় ব্রিটিশ আমলে। তাই রেল চলাচলের জন্য সেতু ও কালভার্টগুলোও সে সময়ই তৈরি করা। রেলওয়ের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দেশের রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ১ হাজার ৬শ’ ৩৯টি সেতু ও কালভার্ট  আছে। এগুলোর শতকরা ৮৫ ভাগই ব্রিটিশ আমলের। পশ্চিমাঞ্চলে সেতু ও কালভার্ট আছে ১ হাজার ৩শ’ ৬৭টি। এ অঞ্চলে অবশ্য বেশকিছু সেতু ও কালভার্ট নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। দেশে কমবেশি সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের মতো রেলপথ আছে। জানা গেছে, সাধারণত রেলসেতুর মেয়াদ ৫০ থেকে ৫৫ বছর হয়। তবে বাংলাদেশে দেড়শ বছরের পুরনো রেলসেতুও আছে। রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন নিজেও স্বীকার করেছেন, দেশের রেলপথের বেশিরভাগ লাইন ও রেলসেতু-কালভার্টগুলো ব্রিটিশ আমলের তৈরি। এসব রেল লাইন ও সেতু নিয়মিত সংস্কার হওয়া প্রয়োজন, তবে রেল লাইনের সংস্কার হলেও রেলসেতু ও কালভার্টগুলোর সেভাবে সংস্কার করা হয় না। তাই সেতু-কালভার্টগুলো ঝঁকিপূর্ণ। 
৯৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, সুফল কোথায়?
রেলখাত বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের একটি, আর অগ্রাধিকার খাত বলেই রেলখাতে বরাদ্দও দেয়া হচ্ছে উদারভাবে। জানা গেছে, গত ১০ বছরে রেলের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাত মিলিয়ে বরাদ্দ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ বরাদ্দের মধ্যে কিছু প্রকল্পের কাজ চলমান, তবে যেসব কাজ শেষ হয়েছে তার সুফলই বা কতটা পেয়েছে মানুষ? এ প্রশ্নও করছেন সবাই।
বর্তমান সরকারের আমলেই চালু হয়েছিল ডেমু ট্রেন। চীন থেকে আমদানি করা এ ট্রেনের প্রায় সবই এখন অচল হয়ে ভাগাড়ে পড়ে আছে। বিদেশ থেকে বগি এনে আন্তঃনগর ট্রেনেও তা সংযুক্ত করা হয়েছে, সাড়ম্বরে এসব বগি যুক্ত করার কার্যক্রম উদ্বোধনও করা হয়েছে। তবে ট্রেনের অবস্থা পাল্টায়নি মোটেও। এখনো ট্রেনের বগি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভাঙা আর রং ওঠা, কাঁচবিহীন জানালা, অপরিষ্কার ও নোংরা টয়লেট, ছেড়া আসন। রেলপথ নিয়ে সাবেক মন্ত্রী মুজিবুল হক সবসময়ই গালভরা কথা শুনিয়েছেন কিন্তু কাজের কাজ কতটা হয়েছে? সরকার রেলখাত উন্নয়নে যে ৯৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে তারমধ্যে ফাস্টট্র্যাকভুক্ত প্রকল্পগুলো এখনো চলমান এবং তা শেষ হতে আরো অনেক সময় লাগবে, তবে গত ১০ বছরে সংস্কার ও ক্রয়ের মাধ্যমে রেলের যে চেহারা হওয়ার কথা ছিল তাও কি হয়েছে? 
জানা গেছে, গত ৫ বছরে বিদ্যমান রেলসেবা উন্নয়নে ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তবে সে সেবা কি আসলেই যাত্রীদের সেবা? বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগই ব্যয় হয়েছে নিত্য নতুন স্টাইলের ভবন নির্মাণ ও স্টেশনগুলো রিমডেলিং এর নামে। অথচ ইঞ্জিন আর বগির সমস্যা, রেল লাইনে স্লিপার সরে যাওয়া, পাথর না থাকা, ফিসপ্লেট সরে যাওয়া, রেললাইন ও রেলসেতুর নাট-বল্টু লাগানোর মাধ্যমে সংস্কার করার কাজটি মোটেই গুরুত্ব পায়নি। 
রেলের ইঞ্জিনের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৫৪টি। এরমধ্যে নিয়মিত চলাচলের জন্য পাওয়া যায় একশ’রও কম ইঞ্জিন। রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়ে ২৮০টি ইঞ্জিনের মধ্যে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল আছে ৯০টির মতো ইঞ্জিনের। রেলের আরেক সমস্যা পর্যাপ্ত কোচ না থাকা, আর যা আছে তার অবস্থাও বেশ নাজুক। জানা গেছে, রেলে বর্তমানে মোট কোচের সংখ্যা আড়াই হাজারের কাছাকাছি। কোচ সংকট কাটাতে ইন্দোনেশিয়া থেকে ১২০টি কোচ আনা হয়েছে, আরো ১৫০টি কোচ আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রেল লাইনে পাথর না থাকাটাও রেলপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেলপথের যে আকার সে অনুপাতে বরাদ্দ কম নয়। কিন্তু রেলের সেবাটা মোটেও কাক্সিক্ষত মানের হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলওয়ের মূল সমস্যা জনবল সংকট। দীর্ঘ রেললাইন দেখভালের জন্য যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন তা না থাকায় অনেক সময় রেলপথগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা সম্ভব হয় না। তবে রেলের দুর্নীতির একটা বড়ক্ষেত্র হচ্ছে এর জনবল নিয়োগেই। লাগামহীন দুর্নীতির কারণে দক্ষ ও যোগ্য জনবল নিয়োগ করা আদৌ কখনো সম্ভব হয় না। আর এর জের টানতে হয় রেল বিভাগকে।
ঢেলে সাজানো নাকি জলে ঢালা!
‘ঢেলে সাজানো’ বাংলাদেশের খুবই জনপ্রিয় একটি শব্দ। কোন কিছুতে ত্রুটি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে কিংবা ধরা পড়লে কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা প্রকাশিত হলে তাকে  ‘ঢেলে সাজানো’ হবে এমন একটা আশ^াস দেয়া হয় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে। কখনো কখনো সেই ঢেলে সাজানোর জন্য প্রকল্প করা হয়, সে প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয় তবে শেষাবধি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই বিষয়টিকে আর ঢেলে সাজানো হয় না, ঢেলে সাজানোর নামে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই টাকা যায় জলে (সংশ্লিষ্টদের পকেটে)। রেলপথ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। হয়তো একটা সময় আসবে যখন দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ এ সম্ভাবনাকে বাস্তবতার খুব কাছাকাছি নিয়ে যাবে। অবশ্য এ ধরণের স্বপ্ন আর আকাঙ্খার চে’ এখন সবচে’ জরুরি হচ্ছে বিদ্যমান রেলপথকে নিরাপদ করা এবং রেলযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করে তোলা।
দুর্নীতির ১০ উৎস: কী করবে রেল মন্ত্রণালয়?
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাংলাদেশ রেলওয়েতে দুর্নীতির ১০টি উৎস চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতিবাজদের ধরতে ১৫ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের হাতে গত ২ জুলাই এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। রেলের দুর্নীতির যে ১০ উৎস তুলে ধরে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো: ১. চট্টগ্রাম এবং রাজশাহীর (পূর্বাঞ্চল) অধীনে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি লিজ ও হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি। ক. জলাশয় লিজ দেয়া খ. রেলের জমিতে অবৈধ স্থাপনা গ. রেলের শত শত একর জমি বেহাত। ২. লোকোমোটিভ, কোচ, ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডিএমইউ) ক্রয় ও সংগ্রহ। ৩. সিগনালিং ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়ন। ৪. ডাবল ও সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ কাজ। ৫. রেলের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ। ৬. রেলের কারখানা সংস্কার, যন্ত্রাংশ বিক্রয় ও সংস্থাপন। ৭. ওয়ার্কশপ ও স্লিপার ফ্যাক্টরি কার্যকর না করে আমদানির মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি। ৮. রেলের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে টিকিট বিক্রিতে ব্যাপক কালোবাজারি। ৯. যাত্রীবাহী ট্রেন ইজারা দেয়া। ১০. ট্রেনে নিম্নমানের খাবার দিয়ে বেশি দাম নেয়া।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “এখন রেল মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো দুদকের এই প্রতিবেদন ধরে এবং সুপারিশ অনুসরণ করে দুর্নীতি বন্ধ ও দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়। তবে দুদকের দায়িত্ব এখানেই শেষ হয়ে যায় না। তারা রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের এখন উচিত হবে দুর্নীতিতে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা।”
আর দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, “কমিশনের বর্তমান আইনে এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরির বিধান আছে। তবে এটা সাধারণভাবে রিকম্যান্ডেশন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে এটা ধরে দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া”
রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন এ প্রতিবেদন সম্পর্কে গণমাধ্যমকে বলেন, “দুদকের এই প্রতিবেদন আমাদের মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পথ চলায় সহায়তা করবে। যে দুর্নীতি করে সে কী বলে যে, আমি দুর্নীতি করি? তারা যে খাতের কথা বলেছেন সেই খাতগুলো দেখব। তাদের সুপারিশগুলোও বিবেচনা করবো”
তিনি আরো বলেন, ”তারা যে ১০টি উৎসের কথা বলেছেন তার বাইরে কি দুর্নীতি হয় না? বিষয়গুলো নতুন নয়। আমাদের জানা। আমরাও কাজ করছিলাম। সব পর্যায়েই দুর্নীতি বন্ধ হোক সরকার এটা চায়। আমিও মন্ত্রী হিসেবে আমার মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে চাই।” 
অবশ্য, দুদকের এই প্রতিবেদনে দুর্নীতির সঙ্গে কারা জড়িত তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। আর কত টাকার দুর্নীতি বা সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা-ও নির্দিষ্ট নয়।
তবে প্রতিবেদন উপস্থাপনকারী দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো দেখিয়ে দিয়েছি। এখানে আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও মন্ত্রণালয়ের নৈতিক দায়িত্ব হলো ব্যবস্থা নেয়া। বলতে পারেন আমরা সফট ভয়েসে জানিয়ে দিলাম। নয়তো এখনই আমাদের মামলায় যেতে হয়। আমাদের এই প্রতিবেদনে যদি কাজ না হয় তাহলে আমরা আরো সিরিয়াস হবো। তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ কাগজপত্রসহ আমাদের কাছে আসে। আমরা আমাদের মতো করে আইন অনুযায়ী সেই অভিযোগগুলো দেখবো।”
নিরাপদ হোক রেলপথ
সারা পৃথিবীতেই রেলকে মনে করা হয়, নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম। বাংলাদেশে এখনো রেলের তেমন ভাবমূর্তি গড়ে ওঠেনি উপরন্তু পুরণো, ভাঙা সেতু, কালভার্ট, নড়বড়ে রেললাইন, রশি আর বাঁশ দিয়ে লাইনকে মজবুত করার অদ্ভুত চেষ্টা! এসব রেলপথের ব্যাপারে মানুষের মনে আস্থা ও বিশ^াসে ভাঙন ধরাচ্ছে। এ খাতে সরকারের বরাদ্দ অনুপাতে সেবা নিয়ে প্রশ্নটা কিন্তু বেশ জোরেসোরেই উঠছে। রেলপথের উন্নয়নে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা কিভাবে ব্যয় হয় আর তার অনুপাতে আসলেই কতটা উন্নয়ন হয় বা হয়েছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, এমনটাই ভাষ্য রেলের যাত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের। রেলপথকে নিরাপদ করতে হলে এর পরিচালনা, নিয়ম নীতি, রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছুতে স্থিরতা আনতে হবে, এসব কিছুই বড় চ্যালেঞ্জ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জন্য। পূর্বসুরী মুজিবুল হক কথা দিয়ে চমক সৃষ্টি করতে চাইতেন, মূল সমস্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করতেন, নিজের লোকজনকে সুযোগ করে দিতেন লুটপাটের। এমনকি তার নিজের বাসায়ই এসব লুটপাটের পরিকল্পনা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সামনে শুধু রেলপথের সংস্কার এবং রেলের উন্নয়নের দায়িত্বই নয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি গড়ার দায়িত্বও।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)