রবিবার, ১৫-ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:১৮ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বিসিআইসির দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দুই মাসের মধ্যে তদন্তে হাইকোর্টের নির্দেশ

বিসিআইসির দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দুই মাসের মধ্যে তদন্তে হাইকোর্টের নির্দেশ

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ আগস্ট, ২০১৯ ০৮:৩৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বাংলাদেশ রসায়ণ শিল্প সংস্থা যা সংক্ষেপে বিসিআইসি নামেই পরিচিত, শিল্পমন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা এটি। এই প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তার অবৈধ নিয়োগ পাওয়া, পদোন্নতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণের অভিযোগের রসায়নটা জম-জমাট দীর্ঘদিন ধরেই। পরিচালক লুৎফর রহমান ও মহাব্যবস্থাপক মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অভিযোগ জানানোর পরও তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কেউ। না প্রশাসন না দুর্নীতি দমন কমিশন; তাদের দু’জনের দুর্নীতি নিয়ে শীর্ষ কাগজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রতিকার চাইতে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বিসিআইসির অবসরপ্রাপ্ত উৎপাদন সহকারী জাকির হোসেন। নিজের সাবেক কর্মস্থলের দুর্নীতির বিষয়টি জানতে পেরে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করেছেন তিনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ দুই মাসের মধ্যে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের বেঞ্চে রিটটি দাখিল করা হয় গত মে মাসে। রিটে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং যে দু’জনের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সে দু’জন অর্থাৎ বিসিআইসির পরিচালক  লুৎফর রহমান ও বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মমতাজ বেগমকে বিবাদী করা হয়েছে। 
রিটে বলা হয়েছে, সরকারের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও বিসিআইসির দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লুৎফর রহমান ও মমতাজ বেগম অবাধে দুর্নীতি করে যাচ্ছেন।                  
লুৎফর রহমান ১৯৯৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিসিআইসিতে ডেপুটি চিফ একাউন্টেন্ট হিসেবে যোগ দেন। তিনি যে পদে নিয়োগ পান সে পদের জন্য স্নাতকোত্তর পাস এবং সংশ্লিষ্ট পদে আট বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল, আর স্নাতক পাশের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল ১৩ বছর। মাস্টার্স পাস থেকে অভিজ্ঞতা ধরা হলেও তার অভিজ্ঞতা ছিল ছয় বছরেরও কম। ¯স্নাতক পাস থেকে ধরা হলে তার অভিজ্ঞতা ১০ বছরেরও কম। তিনি ছোট বড় বিভিন্ন পদে চাকরির সবমিলিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন তাতে তার ১০ বছরের অভিজ্ঞতাও হয়নি। অর্থাৎ তিনি নিয়োগের সময় অভিজ্ঞতার বিষয়টি নিয়ে জালিয়াতি করেছেন। 
অথচ ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদে চাকরি নেয়ার জন্য শাস্তি দেয়ার নজির শিল্প মন্ত্রণালয়েরই আছে। জানা গেছে, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দেখিয়ে চাকরি নেয়ার অভিযোগে ২০১৫ সালে শিল্পমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাদের মধ্যে দু’জনকে বদলি করা হয় আর একজনকে অবসরোত্তর ছুুটিতে পাঠানো হয়। অথচ এই তিনজনকে চাকরিচ্যুত করার কথা বলেছিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তবে এটাকে মন্দের ভাল বলতে হয় এজন্য যে এই তিনজন অন্তত: তাদের জালিয়াতির কিছুটা হলেও সাজা পেয়েছেন কিন্তু লুৎফর রহমান একই অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তিনি আছেন বহাল তবিয়তে। 
লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের পক্ষ থেকে বিসিআইসি চেয়ারম্যানকে বলা হলে ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিসিআইসি, ্ওই কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য বলা হলেও সে তদন্ত বা তদন্ত প্রতিবেদনের কোন খবর নেই, বিসিআইসি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন তদন্তকমিটি করে লুৎফর রহমানের বিষয়টি প্রকারান্তরে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, দুদক যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বললো বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে রক্ষার জন্য সবকিছু করলো। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দুদকই বা কতটা ফলোআপ করেছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে, আর এজন্যই জাকির হোসেন তার রিটে দুদক চেয়ারম্যানকেও বিবাদী করেছেন। 
বিসিআইসির আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত মমতাজ বেগম। শুধু দুর্নীতিই নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, নিজের অনুগতদের পছন্দমতো জায়গায় পদায়নের মতো কাজ তিনি করে গেছেন অবলীলায়। তিনি দীর্ঘদিন বিসিআইসিতে কর্মচারী প্রধান (সিওপি) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর সিওপির হাতেই নিয়োগ ও বদলির মতো স্পর্শকাতর বিষয় দেখভালের দায়িত্ব থাকে। 
তবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা দুর্ব্যবহারের জন্যই শুধু নয় বিসিআইসিতে তিনি সমালোচিত তার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লাগামহীন বিতর্কিত কর্মকা-ের জন্য। অভিযোগ আছে মমতাজ বেগমের নিজেরই নিয়োগ হয় নিয়োগ বিধি অনুসরণ না করে বা এসবের কোন তোয়াক্কা না করেই। নিয়োগ বিধি বা পত্রিকায় কোনরকম বিজ্ঞাপন না দিয়েই মমতাজ বেগমকে সরাসরি নিয়োগ দেয়া হয়। ইতিপূর্বে এক দফায় হাইকোর্টে রিটের পর ২০১৭ সালের ১৪ জুন দুদক মমতাজ বেগমের নিয়োগের ব্যাপারে তদন্ত শুরু হয়। দুদক তদন্ত শুরু করার পর বিসিআইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান তাকে সিওপি পদ থেকে বদলি করেন। মমতাজ বেগম বর্তমানে বিসিআইসির এমআইএস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসেবে কর্মরত আছেন। তবে সিওপি পদে ফিরে আসতেও সব ধরণের চেষ্টাই করছেন মমতাজ বেগম। 
মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকেও ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলা হয়েছিল। ইতিপূর্বে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৯ সালের ৩১ আগস্ট তাকে বিসিআইসির প্রধান কার্যালয় থেকে বদলি করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে ওই আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি উল্টো তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল। 
জাকির হোসেনের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষ হয়েছে। হাইকোর্ট এ ব্যাপারে কোন রুল জারি করেনি, আদালত বলেছেন, এ পর্যায়েই তারা এ বিষয়ে কোন রুল জারি করতে চান না, তবে জাকির হোসেন ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য যে আবেদন করেছেন সে আবেদন নিষ্পত্তি করতে অর্থাৎ অভিযোগ তদন্তের জন্য দুদক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত এই তদন্তের জন্য দু’মাসের সময় দিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যানকে। হাইকোর্টের এ নির্দেশনা অনুযায়ী দুদক যদি তদন্ত করে তাহলে এই বিতর্কিত দুই কর্মকর্তার নিয়োগে অনিয়মেরই শুধু নয়, দায়িত্ব পালনকালে তাদের নানা ধরণের দুর্নীতি-অপকর্মের অনেক চিত্র বেরিয়ে আসবে, এমনটাই ধারণা বিসিআইসিতে কর্মরতদের।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)