সোমবার, ২৩-সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:১৭ অপরাহ্ন

ইনাম আহমেদ চৌধুরীর সেই বিশ্বাসের কী হবে?

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০৪:১৯ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন গত নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া ইনাম আহমেদ চৌধুরী। একাদশ সংসদ নির্বাচনের টালমাটাল সময়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে গত ১৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন বিএনপির সহ-সভাপতি ইনাম আহমেদ চৌধুরী। ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় সিলেট-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়েই তিনি রাতারাতি বিএনপি থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগে গিয়েছিলেন। যদিও তখন ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেছিলেন, মনোনয়ন না পাওয়াটাই তার দল ছাড়ার একমাত্র কারণ নয়। নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আকাঙ্খা থেকেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। তিনি সে সময় গণমাধ্যমে বলেছিলেন, তার যে অভিজ্ঞতা ও পারদর্শীতা রয়েছে তা তিনি কাজে লাগাতে চান। তাহলে কি একাদশ সংসদ নির্বাচন যে একটা প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত হতে যাচ্ছে এবং এ নির্বাচনটা বস্তুতঃপক্ষে আওয়ামী লীগকে আরেক মেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখার একটা সিলমোহর ছাড়া কিছু নয় এমন কোন তথ্য তিনি আগেই পেয়ে গিয়েছিলেন! বা বিষয়টা কি ঘটতে যাচ্ছে তিনি আঁচ করেতে পেরেছিলেন?
তবে মানুষ মনে করে, নির্বাচন করার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার বেদনা থেকেই তিনি নৌকায় উঠেছিলেন, এখন সেই দলের একজন উপদেষ্টাও হয়েছেন তিনি। নিজের স্বপ্ন পূরণে বিএনপি আমলের প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরীর সামনে সম্ভাবনার আর কোন দুয়ার খুলে যায় কি না সেজন্যই হয়তো তিনি অপেক্ষা করবেন। আর সেরকম কিছু হলে তাতে অবাক হওয়ারও কিছু থাকবে না- কেন না ইনাম আহমেদ যতটা না রাজনীতিক তারচে’ অনেক বেশি একজন ’প্রফেশনাল’। 
তবে তার বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া এবং দলের উপদেষ্টা হওয়াটাকে অনেকে আমলার স্বভাবজাত রাজনৈতিক কৌশল বলেই মনে করেন। তার বড় ভাই প্রয়াত ফারুক আহমেদ চৌধুরী ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা, আরেক ভাই ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী ছিলেন ১/১১ পরবর্তী সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। বিএনপি বা আওয়ামী বিরোধী বলয় সবসময়ই বলে আসছে ১/১১ তথা ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের সুফলভোগী হচ্ছে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ আওয়ামী বলয়ের একজন ব্যক্তি ইনাম আহমেদ চৌধুরী হয়তো শেষ পর্যন্ত তার আসল ঠিকানায়ই ঘাঁটি গেড়েছেন।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী বিএনপির নেতা ছিলেন, আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের সময়ে তিনি কারাগারেও গেছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘ছোটদের জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, ‘চিরঞ্জীব জিয়া’ নামের বই। খালেদা জিয়াকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’ নামের একটি বই। ইনাম আহমেদ চৌধুরীর দাবি, তার আওয়ামী লীগে যোগ দেয়াটা অনেকটা আদর্শিক কারণেও হয়েছে কেন না তিনি ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস  করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার মতো বিষয়গুলোও তার আওয়ামী লীগে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় এসেছে। এছাড়া দেশে সম্প্রীতির রাজনীতি থাকবে এ আকাঙ্খা থেকেই তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন।
রাজনীতিতে দলবদল বা রাজনীতিবিদদের দলবদল কোন অত্যাশ্চর্য্য ঘটনা নয় আমাদের দেশে। ৮০’র দশকে দলবদল আর নানা দলের টানাটানি ছিল মূলত: আন্দোলন আর সংগ্রাম করে রাজনীতিতে স্থান করে নেয়া ব্যক্তিদের নিয়ে। এরশাদের জাতীয় পার্টিতে নাম লেখান বিএনপি, আওয়ামী লীগের অনেক বাঘা বাঘা নেতা। তাদের কেউ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী হয়েছেন অনেকেই।  বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে কিংবা আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগদানের নজিরও একেবারে কম নয়। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যাওয়া নেতাদের নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসার ঘটনা অর্থাৎ ঘরের ছেলের ঘরে ফিরে আসার ঘটনা তো আছে অগণিত। তবে ইনাম আহমেদ চৌধুরীর বিষয়টি একটু আলাদা এ কারণে যে তিনি কোন জাত রাজনীতিবিদ নন, বিএনপির রাজনীতিতেও তিনি খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না। অবশ্য তার অভিযোগ, বিএনপি তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করেনি বা কাজে লাগায়নি। নিজের কর্মস্পৃহাকে কাজে লাগাতেই বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন তিনি। ইনাম আহমেদ চৌধুরী নিজেই গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি জীবনের আর যে সময়টুকু কর্মক্ষম থাকবেন সে সময়টা দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে তার উপযুক্ত জায়গা বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেখানে অবদান রাখার সুযোগ পাবেন এ আশা তার আছে, তবে তিনি কোন পদের জন্য লালায়িত নন বা কোন পদ পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগে আসেননি বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, কোন কিছু পাওয়ার আশংকা থেকে নয় অবদমিত কিংবা হারানোর ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল বলেই তিনি বিএনপি ছেড়েছেন।
ইনাম আহমেদ বিএনপি ছেড়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হয়েছেন তাকে সরকারের কোন কাজে লাগানো হবে কি না তা সময়ই বলে দেবে, তবে ইনাম আহমেদ চৌধুরীর দাবি অনুযায়ী তিনি যদি আদর্শিক কারণে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে থাকেন তাহলে প্রশ্ন জাগে তার রাজনৈতিক বিশ্বাস  নিয়ে, তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং দলের চেয়ারপাসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে যে বই লিখেছেন নিশ্চয়ই তা বিশ্বাস  থেকেই লিখেছেন। এখন আওয়ামী লীগের আদর্শের সাথে নিজেকে তিনি খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য চেষ্টা করবেন, তবে প্রশ্ন কিন্তু একটা থেকেই যায় আর তা হচ্ছে জিয়াউর রহমান আর খালেদা জিয়ার ব্যাপারে তার যে ধারণা ও বিশ্বাস  সে সব বিশ্বাসের এখন কী হবে?
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৯ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)