রবিবার, ২২-সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:৫৬ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • রাজউক পূর্বাচলের ৮৪ প্লট কেলেংকারি: আম-ছালা দু’টোই হারাচ্ছে বরাদ্দপ্রাপ্তরা

রাজউক পূর্বাচলের ৮৪ প্লট কেলেংকারি: আম-ছালা দু’টোই হারাচ্ছে বরাদ্দপ্রাপ্তরা

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০৯:৩২ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: চরম অনিশ্চয়তায় আছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক এর পূর্বাচল প্রকল্পে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা। অবৈধভাবে বরাদ্দ দেয়া প্লট বাতিল হওয়ার আশংকা তাদের, ভয় আছে এই প্লট বরাদ্দ পেতে তারা যে কোটি কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন করেছেন সে টাকা মার যাওয়ারও। একই সাথে আছে অবৈধ লেনদেনে অবৈধভাবে বরাদ্দ করা প্লট বরাদ্দ নেয়ায় আইনি বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় জড়ানোরও ভয়। এইসব প্লট বরাদ্দের সাথে জড়িত রাজউকের শীর্ষ কর্তার এ প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নেয়ায় এই প্লটপ্রাপ্তরা অনেকটা দিশেহারা। নিজেদের করণীয় কি তা ভেবে পাচ্ছেন না তারা। 
জানা গেছে, নকশায় পরিবর্তন এনে পূর্বাচলে ৮৪টি প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বের করে রাজউক। পূর্বাচলে নতুন প্লট বরাদ্দ দেয়া কিংবা নকশায় পরিবর্তন আনতে হলে আদালতের অনুমতি নিতে হবে, সর্বোচ্চ আদালতের এমন একটি আদেশ আগে থেকেই কার্যকর ছিল। নতুন করে বের করা ও বরাদ্দ দেয়া এসব প্লটের আকার দেড় বিঘা থেকে ১০ বিঘা পর্যন্ত। পাঁচবার কাটাছেড়া করে এই প্লটগুলো বের করেছে রাজউক, এতে কমেছে উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ ও বন। 
রাজউক এই প্লটগুলো বের করার ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞাও আমলে নেয়নি, বরং তাদের পূর্বাচল প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডাটা এক্সপার্টস প্রাইভেট লিমিটেডকে দিয়ে অনেকটা জোর করে নকশা বহির্ভূতভাবে এই প্লটগুলো বের করার ব্যবস্থা করেছে। ডাটা এক্সপার্টকে একাধিক চিঠি দিয়ে এবং চাপ প্রয়োগ করে বন, উন্মুক্ত স্থান ও খেলার মাঠের জায়গা কমিয়ে নতুন প্লট বের করেছে রাজউক। ডাটা এক্সপার্টের দাবি, তারা নতুন প্লট বের করার ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথাও রাজউকের নজরে এনেছিলেন কিন্তু রাজউক আদালত থেকে অনুমোদন নেয়ার ব্যাপারে তাদের আশ^স্ত করেছিল। প্লটগুলো বের করলেও আদালতের নির্দেশনা ছাড়া ওইসব প্লট যাতে বরাদ্দ না দেয়া হয় সেজন্য রাজউককে সতর্কও করে দিয়েছিল ডাটা এক্সপার্ট। কিন্তু কোনকিছুর তোয়াক্কা না করেই প্লটগুলো বরাদ্দ দেয় রাজউক। আর এই বরাদ্দ যারা পেয়েছেন তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে কোটি কোটি টাকা। গোপনে প্লট বের করা, গোপনে লেনদেন আর সবশেষে গোপনে বরাদ্দ করা এই ৮৪টি প্লটের খবর শেষ পর্যন্ত গোপন থাকেনি। সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং অবশেষে তা গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত যদিও রাজউক কর্মকর্তারা আদালতকে অন্ধকারে রেখেই সবকিছু সম্পন্ন করে ফেলতে চেয়েছিলেন।
অবশ্য পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ আর নকশায় কাটাছেড়া করা কোন নতুন কিছু নয়। এই প্রকল্পের মূল লে-আউট প্ল্যান তৈরির পর থেকে এতে কয়েক দফায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নষ্ট করা হয়েছে জলাভূমি আর বন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) বেশি কয়েকটি সংগঠন। ওই মামলাগুলো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে আপিল বিভাগ নির্দেশ দেয় আদালতের অনুমতি ছাড়া পূর্বাচল প্রকল্পে কোন পরিবর্তন আনা যাবে না।
তবে আদালতের এ নির্দেশ উপেক্ষা করেই ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ সালে ৮৪টি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক। জানা গেছে এই প্লট বের করার ক্ষেত্রে শুধু আদালতের নির্দেশই লংঘন করা হয়নি, প্লট বরাদ্দের প্রচলিত নিয়ম-কানুন বা প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি। রাজউকের এদিনের বোর্ডসভার আলোচ্যসূচিতে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের কোনো কথা উল্লেখ ছিল না। বৈঠকের কার্যপত্রও দেয়া হয়নি বোর্ডসভার সদস্যদেরকে। এমনকি সেই বৈঠকে পূর্বাচলের প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আলোচনাও হয়নি। অথচ পরবর্তীতে সভার কার্য বিবরণী স্বাক্ষরের সময় বোর্ড সদস্যরা কাগজে দেখতে পান এসব আলোচনা ও সিদ্ধান্তের কথা। যা তাদের কাছে ভৌতিক বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের চাপে তাদের ওই কার্য বিবরণীতে স্বাক্ষর করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না, জানিয়েছেন একজন বোর্ড সদস্য। এইসব প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সব কলকাঠি নাড়েন রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুর রহমান। নতুন বরাদ্দ দেয়া প্রাতিষ্ঠানিক প্লটগুলোতে সামাজিক অবকাঠামো, নার্সারি স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ-ইনস্টিটিউট, বিশ^বিদ্যালয় ও হাসপাতাল ক্যাটাগরির প্লট রয়েছে। অবশ্য, শুধু চেয়ারম্যান একাই নয়, অন্তত একজন বোর্ড সদস্য এবং রাজউকের একজন প্রভাবশালী পরিচালকও এই অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
নতুন এসব প্লট তৈরি করা এবং তা বরাদ্দে আইনি জটিলতা সম্পর্কে রাজউকের জানা ছিল, এ ব্যাপারে সরকারের আইন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া বা আশ^াসও পায়নি রাজউক তারপরও রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান তার মেয়াদের শেষভাগে এসে এসব প্লট তড়িঘড়ি করে বরাদ্দ দিয়ে দেন। এসব প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের ঘনিষ্ঠজনরা। তবে এ বরাদ্দ পেতে প্রায় সবাইকেই মোটা অংকের ঘুষ গুণতে হয়েছে। প্রথমে প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও পরে এর আনুষ্ঠানিকতা সারা হয়। প্লটের সরকার নির্ধারিত দাম কাগজপত্রে দেখানো হলেও এসব প্লট বরাদ্দে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। অবৈধভাবে বরাদ্দ দেয়া এসব প্লটের বিষয় অবশেষে আদালতে গড়ালে নকশায় পরিবর্তন এনে এইসব নতুন প্লট বরাদ্দের অনুমতি দেয়নি হাইকোর্ট। রাজউক আপিল বিভাগে আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিন্তু তাও ইতিমধ্যে অনেক দিন পার হয়ে গেছে।
রাজউক পূর্বাচল প্রকল্পের প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ পুরনো, অতীতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এসব হয়েছে, তবে সেসব বরাদ্দের ক্ষেত্রে অন্ততঃপক্ষে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো, আইওয়াশ হলেও কিছু নিয়ম-কানুন মানার চেষ্টা করা হতো। এসব কারণে যতই অনিয়ম করা হোকনা কেন ওইসব বরাদ্দ নিয়ে বেশিরভাগ সময়ই আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সুযোগ কম ছিল, তবে এবার বরাদ্দ দেয়ার পুরো প্রক্রিয়াটা হয়েছে বেআইনিভাবে তাই এ যাত্রায় বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা পড়েছেন বিপাকে। কেন না, হাইকোর্টের আদেশ ইতিমধ্যেই তাদের বিপক্ষে গেছে। আপিল বিভাগ থেকেও তাদের পক্ষে কোনো ফল আসবে বলে আশা করছেন না। যদিও এখন পর্যন্ত আপিল বিভাগে আবেদনই করা হয়নি। শুধু তাই নয়, প্লট বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেরাই অনিয়মের আশ্রয় নেয়ায় তারা নিজেরা বিষয়টি নিয়ে আদালতেরও দ্বারস্থ হতে পারবেন না। আবার এ টাকা যারা নিয়েছেন তাদেরকে ধরাও হয়তো আর সম্ভব হবে না কেন না মূলব্যক্তি, সংস্থার চেয়ারম্যান আবদুর রহমান এরইমধ্যে রাজউক ছেড়ে গেছেন। আবার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের জায়গা থেকে যদি ধরা হয় সে সময় গণপূর্ত ও গৃহায়ণমন্ত্রী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী নেই, এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসেছেন নতুন মন্ত্রী। ফলে প্লট পাওয়ারা পড়েছেন বিপাকে। তাদের আম-ছালা দুটোই যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। তবে তারচে’ বেশি ভয়, বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ানোয়। বরাদ্দ পাওয়া এবং দেয়ার সাথে জড়িতদের যদি এই বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাতে আদালতে তলব করা হয় তাহলে তাদের শুধু প্লট আর টাকাই ঝূঁকিতে পড়বে না, বের হয়ে আসবে অবৈধভাবে এসব প্লট বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের নাম-ধাম, পরিচয়। 
অবশ্য রাজউকের পক্ষ থেকে এখনো প্লট পাওয়া ব্যক্তিদের আশ^স্ত করা হচ্ছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে, বরাদ্দ হওয়া প্লটগুলোর বৈধতার জন্য সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবে রাজউক এবং অনুমতি মিলবেও। তবে রাজউকের এমন আশ্বাসে মোটেও ভরসা করতে পারছেন না প্লট বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা। কেন না, তারা নিজেরা বিষয়টি খুব ভাল করেই জানেন, এই প্লটগুলো তৈরি করা হয়েছে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে, আর বরাদ্দটা দেয়া হয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে। তাই তাদের ভাবনায় এখন যতোটা না প্লট পাওয়ার ভাবনা তারচে’ অনেক বেশি হচ্ছে, কিছুটা হলেও টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ক্ষেত্রে অবশ্য রাজউকের করণীয় একটাই আছে আর তা হচ্ছে রাজউকের যে সভায় এই প্লটগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল সে সভার সিদ্ধান্ত বাতিল করা। গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীপদে নতুন মুখ আর রাজউকের চেয়ারম্যান পদে নতুন ব্যক্তি আসায় আইনি জটিলতা এড়াতে এমনটা চাইলেই হয়তো করা যেতে পারে কিন্তু এই প্লট কেলেংকারির সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করা এবং কত টাকার বিনিময়ে এসব প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগার ঘটনায় ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্ত করে সে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এতে মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। রাজউকের এই ৮৪ প্লট কেলেংকারি হোতাদের নাম-ধাম প্রকাশ করলে তাতে এই ভাবমূর্তি আরো বাড়বে, মন্ত্রণালয় তা করে কি না এখন সেটাই দেখার বিষয়।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৯ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)