রবিবার, ২২-সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:০৯ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • সর্বত্র ক্ষোভ অসন্তোষ: চামড়া নিয়ে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র

সর্বত্র ক্ষোভ অসন্তোষ: চামড়া নিয়ে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: রীতি অনুযায়ী পশু কোরবানীর মধ্য দিয়ে পালিত হলো ঈদ-উল-আযহা। তবে এবার শুধু পশুই কোরবানী হয়নি, কোরবানী হয়ে গেছে গরীবের হকও। কোরবানীর পশুর চামড়ার দামে নজিরবিহীন ধসের পর এমন মন্তব্য করছেন অনেকেই। কোরবানীর চামড়া প্রথাগতভাবেই বন্টন করে দেয়া হয় বিভিন্ন গরীব-মিসকিন, এতিমখানা আর মাদ্রাসাগুলোতে। সাধারণতঃ যিনি কোরবানী দেন তিনিই চামড়া বিক্রি করে সে টাকা নিজের আশ-পাশের গরীব মানুষ, মাদ্রাসা আর এতিমখানার মধ্যে ভাগ করে দেন। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সর্বত্রই বিভিন্ন এলাকায় কোরবানীর পশুর কাঁচা চামড়া কেনার জন্য দল বেধে যুবকরা মাঠে নামেন। কিন্তু এবার সে রকম দৃশ্য খুব একটা ছিল না। চামড়া কেনায় ভাটা দেখে অনেকেই মাদ্রাসা বা এতিমখানায় গিয়ে কাঁচা চামড়া দিয়ে আসেন। আবার অনেক এলাকায় মাদ্রাসা ও এতিমখানার লোকজন ঘরে ঘরে গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেন। 
বাংলাদেশ একসময় চামড়ার বাজার রমরমা ছিল। মাঝারি ধরনের একটি গরুর চামড়া আড়াই-তিন হাজার টকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো ঘটনায় দেখা গেছে, চোররা গরু চুরি করে নিয়ে রাতে জবাই করে মাংস ফেলে রেখে চামড়া নিয়ে গেছে। সেই চামড়ার দামে এবারের কোরবানীর ঈদে এতো ধ্বস নেমেছে যে, এক লাখ টাকা দামের একটি গরুর চামড়া বিক্রি হয় মাত্র দেড়শ’ টাকায়। পরে অবস্থা এমন এক পর্যায়ে নেমে আসে যে, গরুর চামড়া একশ’ টাকারও নিচে নেমে যায়। লাখ টাকার গরুর চামড়া যেমন ১শ’ দেড়শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে তেমনি ২০ হাজার টাকার ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০ টাকায়ও। এমনকি দেশের কোনো কোনো স্থানে চামড়ার দাম না পেয়ে রাস্তার ধারে ফেলে যেতে অথবা মাটিতে চামড়া পুঁতে ফেলতে দেখা গেছে। চামড়ার দাম নিয়ে এমন পরিস্থিতির ফলে গরীব আর এতিমের হক নষ্ট হয়েছে। তার সঙ্গে নষ্ট হয়েছে দেশের এই মূল্যবান সম্পদও। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার দাম নিয়ে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সিন্ডিকেট করে এমনটা করা হয়েছে। প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কোরবানীর পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার, সে দামে কোথাও চামড়া বিক্রি হয়নি, হয়েছে পানির দরে। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দেশে চামড়ার সিন্ডিকেট কি সরকারের চে’ শক্তিশালী?
মাটি চাপা দেয়া হল বিপুল চামড়া
কোরবানীর পশুর চামড়ার দাম নিয়ে সারাদেশেই ছিল একই অবস্থা। কোথাও দাম নেই। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, বগুড়া, কুমিল্লা, নওগাঁ, কুষ্টিয়াসহ দেশের সর্বত্রই চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েন কোরবানীদাতারা। সাধারণতঃ চামড়া বিক্রি করে সে টাকা বন্টন করে দেয়া হয় গরীব মানুষ অথবা এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলোকে। তবে এবার অবস্থাটা এতই নাজুক ছিল যে মাদ্রাসা আর এতিমখানার লোকজনকে পুরো চামড়াও দিয়ে দেন কেউ। অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী ১০০/২০০ টাকা করে চামড়া কিনেছিলেন কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে তারা পড়েন বিপত্তিতে। জানা গেছে, ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা ৫০ থেকে ৫শ’ পিস চামড়া পর্যন্ত কিনেছিলেন। যানবাহনে নেয়া, শ্রমিকের মজুরিসহ তাদের অনেকের খরচ পড়ে যায় তিনশ’ চারশ’ টাকার মতো কিন্তু আড়তে গিয়ে তারা চামড়া বিক্রি করতে পারেননি, একশ’ টাকা পর্যন্ত দাম বলেছেন আড়তদাররা। অনেক জায়গায় গরুর চামড়ার সাথে ছাগলের চামড়া ফ্রি দিয়েও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা আড়তে চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। ফলে এবার চামড়ার ব্যবসায় সবচে’ বেশি মার খেয়েছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। এই মৌসুমী ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই তরুণ ও যুবক। তাদের অনেকেই অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিংবা ধারকর্জ করে চামড়া কেনেন, চামড়া বিক্রি করে দেনা পরিশোধের পর যা থাকে তাই তাদের আয়। এ আয়ের দিকে এসব তরুণ-যুবকরা তাকিয়ে থাকেন, অপেক্ষায় থাকেন কিন্তু এবার চামড়ার দামের পতনের ফলে তাদের অনেকে ক্ষতির শিকার হয়েছেন, দেশের হাজারো মানুষ আটকে গেছে কম-বেশি ঋণের জালে। 
পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে চামড়ার ব্যবসায়ীদের সাথে ট্যানারি মালিকরাই যোগাযোগ করতেন, চামড়া কিনতে বলতেন, অগ্রিম টাকাও দিতেন, তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চামড়া কিনতেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা কিন্তু এবার তার কিছুই হয়নি। 
চামড়ার দাম নিয়ে এমন নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্নস্থানে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ করা হয়। মাটিচাপা দেয়া হয় বিপুল পরিমাণ চামড়া। চট্টগ্রাম, সিলেটে বহু চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেন সাধারণ মানুষ, মৌসুমী বিক্রেতা আর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। অনেকে নদীতেও চামড়া ফেলে দেন। ট্রাকের পর ট্রাক চামড়া ডাম্পিং স্টেশনে ফেলে দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীরা। চট্টগ্রাম নগরীতেই লাখ খানেক চামড়া এভাবে নষ্ট করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি এবার শতকরা ৩০ ভাগ চামড়াই এরিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
ব্যাংক ঋণের কি হলো?
কোরবানীর ঈদে পশুর চামড়া কিনতে প্রতি বছরই ঋণ দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। সোনালী, রূপালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক এই ঋণ দেয়। এবারও ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় চারটি ব্যাংক। এজন্য তাদের বরাদ্দ ছিল ৮০৩ কোটি টাকা। যা গতবারের চেয়ে প্রায় ২শ’ কোটি টাকা বেশি। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৬০৫ কোটি টাকা। এ বছর জনতা ব্যাংকের বরাদ্দ ছিল ৩৩০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংক ২০৩ কোটি। অগ্রণী ব্যাংকের ঋণবাবদ বরাদ্দ ছিল ১৩৫ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের বরাদ্দ ছিল ১৫০ কোটি টাকা। ব্যাংকের নানা সূত্র জানিয়েছে, এই ঋণের মেয়াদ সাধারণত: এক বছর। অর্থাৎ এ বছর কোরবানীর ঈদে ঋণ দেয়া হলে তা পরবর্তী ঈদের আগে পরিশোধ করতে হবে। আগের বছর এ কাজে যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়ে ফেরত দিয়েছে তারাই ঋণ পাবেন। এই ঋণের সুদের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম। জানা গেছে, মাত্র ৭ শতাংশ সুদে এই ঋণ দেয়া হয়। মূলত: ট্যানারিগুলো এই ঋণ নেন, তারা টাকা দেন পোস্তাসহ নানাস্থানের আড়তদারদের। সেখান থেকেই টাকাটা নিচের দিকে যায় অর্থাৎ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত এ টাকা পান। ওই টাকাটা তারা দিয়ে থাকেন অগ্রিম হিসেবে। জানা গেছে, যে পরিমাণ চামড়া এক একটি ট্যানারি কিনবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় তার শতকরা ২০ ভাগ টাকা পর্যন্ত তারা অগ্রিম দেন। এবার এই অগ্রিম টাকা দেননি। চট্টগ্রামের আড়তদাররা অভিযোগ করেছেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের অনেক টাকা বকেয়া ছিল। তারা গতবারের পাওনা টাকা না দেয়ায় এবার চামড়া কেনার মতো টাকাও তাদের হাতে ছিল না আবার আরো লোকসানের মুখোমুখি হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে তারা নিজেরাই চামড়া না কেনার সিদ্ধান্ত নেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সবাই টাকার ঘাটতি দেখাচ্ছেন কিন্তু ব্যাংকগুলো তো টাকা বরাদ্দ রেখেছে সে টাকা কোথায় গেল? তবে ব্যাংকের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, গতবার যারা ঋণ নিয়েছিলেন তাদের অনেকেই টাকা পরিশোধ করেননি, ফলে এবছর তারা নতুন করে কোন ঋণের জন্য আবেদনই করতে পারেননি। তবে ঋণ না পাওয়ায় চামড়া কেনা যায়নি এ যুক্তিকে বাস্তবসম্মত মনে করেন না অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, কোরবানীর ঈদের চামড়ার জন্য ট্যানারি মালিক আর আড়ৎদাররা অন্তত: তিন মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেন, বস্তুতপক্ষে রোজার ঈদে বেশকিছু চামড়া সংগৃহিত হয় আর ওই ঈদের সময় থেকেই চামড়া কেনার জন্য মানসিক ও আর্থিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা। ব্যাংক ঋণের জন্যও যে প্রক্রিয়া তা শেষ হতেও অন্তত:পক্ষে এক মাস সময় লাগে, প্রকৃতপক্ষে এবার চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত প্রায় সব গোষ্ঠীই কারসাজি করে চামড়া কেনা থেকে বিরত ছিলেন, যার ফলে নেমে এসেছে এই বিপর্যয়।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ, যা বলছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা
এবার চামড়ার দাম নিয়ে যে পরিস্থিতি হয়েছে তাতে অনেকেই দায় দেখছেন ট্যানারি মালিক ও কাঁচা চামড়ার পাইকারি ব্যবসায়ীদের। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এবার চামড়ার দাম সুকৌশলে কমিয়ে আনা হয়। কেন না বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ জানিয়েছিলেন তারা সরাসরি মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনবেন না। বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন তাদের হাতে চামড়া কেনার মতো টাকা নেই। বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতানের দাবি, এবার চামড়াখাতের অবস্থা খুব খারাপ। তিনি জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের বকেয়া প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকা। তিনি জানান, টাকা না থাকায় তারা চামড়া কিনতে পারছেন না। তবে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ অবশ্য একটু ভিন্ন কথা বলছেন, তার মতে, তারা চামড়া কিনবেন আরো কিছুদিন পর, যারা চামড়া সংগ্রহ করেছেন তারা যদি চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন তাহলে তারা সরকার নির্ধারিত দাম পেতে পারেন। তিনি পর্যাপ্ত লবন দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। তবে লবনের দাম নিয়েও ঘটেছে কেলেংকারি। জানা গেছে, এবার কোরবানীর আগের রাতে হুট করে লবনের দাম প্রায় দ্বিগুণ করে দেয়া হয়। দু’দিন আগেও ৬০ কেজির এক বস্তা লবন যেখানে বিক্রি হয়েছে ৭শ’ টাকা, সেখানে কোরবানীর আগের রাতে তা বাড়িয়ে করা হয় সাড়ে ১২শ’ টাকার মতো। 
রাজধানীর পোস্তা কাচা চামড়ার আড়ত। সারাদেশ থেকে চামড়া পোস্তায় আসে, তারা চামড়ার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তা বিক্রি করেন ট্যানারিগুলোর কাছে। এখানকার সিন্ডিকেটই বাজারে চামড়ার দামে এমন অস্থিতিশীলতার জন্য প্রধানত: দায়ী বলে মনে করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, কাঁচা চামড়ার পাইকারি ব্যবসায়ীরা নানা ছলছুতোয় চামড়া কেনা থেকে বিরত থাকেন। অবশ্য শুধু তারা নিজেরাই যে এমনটা করেছেন তা নয়, তাদের সাথে যোগ হয়েছিলো ট্যানারির একটি সিন্ডিকেট। এই দুই সিন্ডিকেটের কারণে দেশের চামড়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এবার মোটেও ব্যবসা করতে পারেননি, মৌসুমী ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত উঠেছে। এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলোও পড়েছে বিপাকে। কারণ, তাদের বছরের মূল আয় ছিল এই একটিমাত্র খাতই। অবশ্য কোন কোন চামড়া ব্যবসায়ীর অভিযোগ, কিছু সংকট ছিল, তবে চামড়ার দাম এমনভাবে পড়ে যাওয়ার পেছনে অবশ্যই কোন নোংরা খেলা কাজ করেছে। কেউ বা কোন সিন্ডিকেট পর্দার আড়ালে থেকে চামড়ার ব্যবসা নিয়ে খেলা করেছেন, তারা কতটা লাভবান হয়েছেন তা বোঝা না গেলেও তাদের হঠকারিতার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। তবে সবচে’ ক্ষতির শিকার হয়েছে দেশের মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো। কেন না এই চামড়ার টাকা মূলত: তারাই পেয়ে থাকে।
কাগজে-কলমেই সরকার নির্ধারিত দাম
রেওয়াজ মেনে ৬ আগস্ট চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সীর সাথে চামড়া ব্যবসায়ীদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ঢাকায় লবনযুক্ত গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা ঠিক করা হয়। খাসির চামড়া ১৮-২০ টাকা আর বকরির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ঠিক করা হয় ১৩-১৫ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে চামড়ার দাম না বাড়িয়ে গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে যে দর ছিল সে দরই ঠিক করা হয়। সরকারের নির্ধারিত এ দামে ঢাকায় একটি গরুর চামড়ার দাম অন্তত ১ হাজার টাকা হওয়ার কথা। অথচ সে চামড়া বিক্রি হয়েছে ১শ’ টাকায়। 
চামড়ার দামের এমন পতনের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। তবে তৎক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের কাছে তৎক্ষণে আর কোন চামড়া ছিল না। তারা যে যা দাম পেয়েছেন সে দামেই চামড়া বিক্রি করেছেন বা নষ্ট করে ফেলেছেন। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, চামড়া রফতানির সুযোগ দেয়ায় দেশের ট্যানারিগুলো চামড়ার সংকটে পড়বে। তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, যদি চামড়ার সংকট নিয়ে এতই ভাবনা তাদের থেকে থাকে, তাহলে চামড়া কেনা নিয়ে তারা কেন এত গড়িমসি করলো? কেন চামড়াকে এমন মূল্যহীন করে দেয়া হলো? কেনই বা এমন ক্ষতির মুখোমুখি করা হলো দেশের গরীব মানুষ, মাদ্রাসা আর এতিমখানাগুলোকে?
কি বলছেন মন্ত্রী- নেতারা?
চামড়ার দামের এমন বিপর্যয়কর অবস্থায় মুখ খুলেছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রী। চামড়ার দাম নিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কাউকে ছাড়া হবে না এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে যার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।  
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী বলেন, চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজি আছে।  তিনি বলেন, চামড়া নিয়ে যখনই ভালো উদ্যোগ নেয়া হয় তখনই তার বিরুদ্ধাচরণ করা হয়। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করেই চামড়ার খুচরা মূল্য ঠিক করা হয়েছিল কিন্তু দু:খজনকভাবে বাজারে তার প্রতিফলন ছিল না। তিনি বলেন, কোন অবস্থাতেই চামড়া শিল্পকে ধ্বংস হতে দেয়া হবে না।
অর্থমন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল প্রশ্ন করে বলেন, চামড়ার বিষয়টাও সরকার দেখবে? চামড়ার মালিকরা কত দামে নেবে, কত দামে বিক্রি করবে এটাও কি সরকার দেখবে? তিনি বলেন, এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, যদি কোন সিন্ডিকেট হয়ে থাকে তাহলে বাণিজ্যমন্ত্রী আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। 
বাণিজ্যমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম বলেছেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এটা মাটিতে পুতে ফেলা, রাস্তায় বা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া গর্হিত কাজ। এ ধরণের কাজ যারা করেছেন তারা ঠিক করেননি। তিনি জানান, তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন, ট্যানারি মালিকদের সাথে কথা বলছেন, নিশ্চয়ই সামনে এ নিয়ে আর কোন সমস্যা হবে না। বাণিজ্যসচিবের এ মন্তব্যটির সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ। তাদের মন্তব্য, সচিব হয়তো চামড়া মাটিচাপা দেয়া কিংবা ফেলে দেয়া যে মানুষের ক্ষোভের বহি:প্রকাশ আর প্রতিবাদ তা হয়তো তিনি বুঝতে পারেননি। তাছাড়া গন্ধের কারণে ঘরে রাখা সম্ভব ছিল না বলেই মানুষ চামড়া মাটিচাপা দিয়েছে। সরকারের উচিত ছিল মানুষের এই ক্ষোভ নিরসনে কাজ করা। 
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, এ সরকারের সমস্যা হচ্ছে জনগণের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। কোথায় জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কোন শিল্পের ক্ষতি হলো সে ব্যাপারে সরকারের কোন মাথাব্যথা নেই, এতে দেশের ক্ষতি হয়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন দলের কারসাজির কারণেই কোরবানীর পশুর চামড়ার দাম কম। তিনি বলেন, একটি সিন্ডিকেটের জন্য চামড়ার দাম পড়ে গেছে এই সিন্ডিকেটের পেছনে আছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা।
চামড়াখাত কি ষড়যন্ত্রের শিকার? দুশ্চিন্তায় মাদ্রাসা আর এতিমখানা
এবার বোরো ধানের দামে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়েছেন কৃষক, ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে জমিতে ধান পুড়ে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অনেক স্থানেই কৃষকরা জানিয়ে দিয়েছেন, তারা আর বোরো ধান চাষ করবেন না। এরপর গরুর দুধের দাম আর তা সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন খামারীরা। সবশেষ চামড়ার দাম নিয়ে তৈরি হলো তেলেসমাতি কারবার। এ ঘটনায়ও মানুষ চরম ক্ষুব্ধ। সচেতনমহল বলছে, মানুষের এসব ক্ষোভ মেটানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেই। শুধু কথার কথা বলে তারা একের পর এক ইস্যু ধামাচাপা দিয়ে যাচ্ছে। 
চামড়া আর চামড়াজাত জিনিসপত্র বাংলাদেশের অন্যতম রফতানি পণ্য। আমাদের দেশে সারাবছর যে পরিমাণ চামড়া আহরিত হয় তার অর্ধেকই হয় কোরবানীর ঈদে। এবারের ঈদের পর চামড়া নিয়ে যা হয়েছে তার ভেতরে এ শিল্পের বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছেন কেউ কেউ। এ ষড়যন্ত্র যে শুধু বাইরের লোকজনই করছে তা নয়, এটা এই খাতের বিশেষ করে ট্যানারি শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কারো কারো ‘স্যাবোটাজ’ এর শিকারও হতে পারে দেশের চামড়াখাত। অনেকেই বলছেন, হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পকে সাভারে নেয়ার বিষয়টি যারা মানতে পারেননি তারাই হয়তো ষড়যন্ত্র করে চামড়াখাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী কোন রকম রাখঢাক না করেই বলেছেন, ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণেই চামড়ার দাম কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারসহ সবাই বুঝেছেন যে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দামে এমন বিপর্যয় ঘটানো হয়েছে, এখন সরকারের উচিত এই সিন্ডিকেটকে খুঁজে বের করে তাদের আইনের কাঁঠগড়ায় দাঁড় করানো।
কোরবানীর পশুর চামড়া দেশের কওমি মাদ্রাসা, এতিমখানা আর লিল্লাহ বোর্ডিং এর আয়ের অন্যতম উৎস। এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বার্ষিক ব্যয়ের একটি বড় অংশই আহরণ করে কোরবানীর পশুর চামড়া থেকে। এবার চামড়ার দাম না পাওয়ায় তাদের আয় হয়েছে খুবই সামান্য। কোন কোন প্রতিষ্ঠান কোন টাকাই পায়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িতরা এ ঘটনায় খুবই হতাশ, শুধু হতাশই নন তারা এ নিয়ে দু:শ্চিন্তায়ও আছেন। নিশ্চিত আয়ের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় তারা বিপাকে পড়বেন, এতিমখানা আর লিল্লাহ বোর্ডিং চালাতে গিয়ে পুরো একটি বছরই হয়তো তাদের হিমশিম খেতে হবে এমনটাই আশংকা এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িতদের। মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সারা বছর তাদের যে ব্যয় তার একটি বড় অংশ আসে কোরবানীর পশুর চামড়া থেকে। ৩/৪ মাসের খরচ তারা কোরবানীর চামড়া থেকেই পেয়ে যান। এজন্য প্রতি বছরের মতো এবারও বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা চামড়া সংগ্রহ করেছেন কিন্তু বিক্রি করতে না পেরে দু’দিন পর তারা চামড়া ফেলে দিয়েছেন কেন না চামড়া সংরক্ষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, আর কাঁচা চামড়ার উৎকট গন্ধে মাদ্রাসা ও এর আশপাশের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল তাই তারা চামড়া ফেলে দিয়েছেন। একজন মাদ্রাসা শিক্ষক আফসোসের সাথে বলেন, গরীব ও এতিমের হক নষ্ট করে চামড়ার মূল্য কমানোর জন্য সিন্ডিকেট করা হয়েছে, যারা এ কাজ করেছেন অবশ্যই আল্লাহ তাদের বিচার করবেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশিত)