রবিবার, ২২-সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:১৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ গবেষণাগার প্রকল্পে চলছে হরিলুট
৬৬ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ গবেষণাগার প্রকল্পে চলছে হরিলুট

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট, ২০১৯ ০৬:১৭ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে “প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার স্থাপন” প্রকল্পটি বিগত ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৬৬ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। যা ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের যাত্রাতেই শুরু হয় অনিয়ম-দুর্নীতি। প্রকল্পের ডিপিপি-তে ৪র্থ গ্রেডের কর্মকর্তাকে প্রেষণে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করার কথা থাকলেও তৎকালীন মহাপরিচালক গোপন বোঝাপড়ার মাধ্যমে ডা. মো. মোস্তফা কামাল নামের ৬ষ্ঠ গ্রেডের উপজেলা পর্যায়ের একজন জুনিয়র অদক্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেন। যদিও পরবর্তী পর্যায়ে ডা. মোস্তফা কামাল পদোন্নতি লাভ করে ৫ম গ্রেডে পদোন্নতি লাভ করেন। কিন্তু ডিপিপি অনুযায়ী তিনি ৪র্থ গ্রেডের কর্মকর্তা এখন পর্যন্ত হতে পারেননি।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োজিত হওয়ার পর পরই ডা. মোস্তফা কামাল নানান প্রক্রিয়ায় অবৈধ আয়ের কাজে মনোনিবেশ করেন এবং একের পর এক দরপত্র আহ্বান করেন। ডিপিপিতে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়োগের বিধান থাকলেও ভাগ কমার ভয়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়োগ প্রদান করেন নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ৬৬ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি টাকারও অধিক নির্মাণ কাজে ব্যয় করা হয়েছে। এসব কাজের প্রায় প্রত্যেকটিই সর্বোচ্চ দরপ্রদানকারীকে প্রদান করা হয়েছে। এতে সরকারের কয়েক কোটি টাকা ক্ষতি হলেও নিজের পকেট ভরেছে। মোহাম্মদ বিল্ডার্স নামে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক হানিফ মোহাম্মদ সুজন সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করার পরেও  মোস্তফা কামাল সংশ্লিষ্ঠদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সব কিছু ম্যানেজ করে নেন। সংশ্লিষ্ট দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন ও কার্যাদেশসহ আনুসঙ্গিক কাগজপত্রাদি যথাযথভাবে তদন্ত করলেই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হবে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, প্রকল্প পরিচালক ডা. মোস্তফা কামালের অনিয়মের বিরুদ্ধে দুদকে পেশ করা একটি অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলেও সেই তদন্ত যথাযথভাবে এগুচ্ছে না। ডা. মোস্তফা কামাল সংশ্লিষ্ট মহলে তদবির চালিয়ে এই তদন্ত থামিয়ে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 
নিয়মানুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরই যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। অথচ অবকাঠামো নির্মাণ কাজ অনেকটা বাকি থাকতেই ডা. কামাল নিজে আর্থিকভাবে সুবিধা প্রাপ্তির আশায় প্রায় ২৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় কাজ সম্পন্ন করেছেন। দরপত্র আহ্বানের পূর্বে ডা. মোস্তফা কামাল একেক প্যাকেজের জন্য একেক ঠিকাদারের সাথে একান্ত বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। এসব গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে নানা রকমের অপকৌশল ও কারসাজি করে তিনি প্রত্যেকটি প্যাকেজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাওয়া নিশ্চিত করেন। দরপত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের সুবিধা অনুযায়ী যন্ত্রপাতির স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করেন। এতে অন্য ঠিকাদারদের দরপত্র নন-রেসপনসিভ করতে সুবিধা হয়।
যেমন খঈ গঝ গঝ নামক একটি যন্ত্রপাতি জাপানের সিমারজু কোম্পানির হুবহু স্পেসিফিকেশন দরপত্রে দিয়ে দরপত্র আহবান করে বাংলাদেশের একমাত্র এজেন্টকে কাজটি দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। যথাযথভাবে খতিয়ে দেখলেই এই অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ বেরিয়ে আসবে। এক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক মোস্তফা কামাল সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কাছ থেকে নগদ ৩৫ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি অন্যান্য মালামাল ইউরোপের নিলেও কেবল এই আইটেমটি জাপানের নিয়েছেন। এছাড়া অপর একটি আইটেমের দুইবার দরপত্র আহ্বান করেও ঠিকাদারের সাথে বনিবনা না হওয়ায় কার্যাদেশ প্রদান না করে রেখে দিয়েছিলেন এবং সংশোধিত ডিপিপিতে ২ কোটির পরিবর্তে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা দর ধরেছেন।
এছাড়া ল্যাব শুরু হওয়ার একবছর আগেই নিজে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ল্যাবরেটরি রিএজেন্ট ও কেমিক্যাল ক্রয় করে রেখেছেন, যা অত্যন্ত নি¤œমানের। এসব দ্রব্যাদি বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে ক্রয় দেখানো হয়েছে। একইভাবে নিজের দফতরে ব্যবহারের জন্য যথাযথ দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৪২ লাখ টাকার আসবাবপত্র ক্রয় দেখিয়ে পুরো অর্থ প্রকল্প পরিচালক আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ, তিনি বর্তমানে অফিসে যে আসবাবপত্র ব্যবহার করছেন তা সবই কোয়ারেন্টাইন প্রকল্পের। ডা. কামাল প্রকল্পের অর্থে একটি মাইক্রোবাস ক্রয় করেছেন ৪০ লাখ টাকা দিয়ে, একটি পিকআপ ৫৮ লাখ ও জিপ ৭২ লাখ টাকা দিয়ে। যেহেতু এখনো ল্যাব পরিচালনার কার্যক্রম শুরু হয়নি, কাজেই এর আগে কেবল জিপ হলেই চলত। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে প্রকল্প পরিচালক মাইক্রোবাসটি নিজের বাসায় ব্যবহার করছেন এবং এটি ক্রয়কালে ১০  লাখ টাকা বেশি দেখিয়ে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
সংশোধিত ডিপিপিতে অতিরিক্ত ৫৯ কোটি টাকার মধ্যে ৩৮ কোটি টাকা যন্ত্রপাতি খাতে রাখা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির যে দর ধরা হয়েছে তা বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ইতিমধ্যে ডা. মোস্তফা কামাল কয়েকজন ঠিকাদারের সাথে আলাদাভাবে গোপন মিটিং করেছেন এবং তাদের সাথে দফা-রফা করেই ৩টি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করেছেন। বাকিগুলোর দফা-রফা না হওয়ায় দরপত্র আহ্বান করেননি। তবে তথ্যমতে, লেনদেনের বোঝাপড়া হয়ে গেলে শিগগিরই এগুলোর দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।
জানা গেছে, ডা. মোস্তফা কামালের সাথে বিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালামাল ক্রয়ের স্পেসিফিকেশন কামালই ঠিক করে ঠিকাদারদের অনূকুলে ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে অথরাইজেশন এনে দরপত্র দাখিল করার ব্যবস্থা করেন। সূত্রমতে, যন্ত্রপাতি টার্নকি বেসিস না হলে প্যাকেজের পরিবর্তে লট বাই লট হলে এবং স্পেসিফিকেশন তৈরি কমিটি ডা. মোস্তফা কামালের কনসালটেন্ট এর পরিবর্তে বিভাগীয় বর্তমান চাকরিতে কর্মরত অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দিয়ে করা হলে এধরনের একচেটিয়া দুর্নীতির সুযোগ থাকতো না এবং তাতে যথাযথ বাজারমূল্যে মানসম্পন্ন মালামাল পাওয়া যেতো।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তার মতে, ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হতে যাওয়া এই ল্যাব বিশেষ কোন কাজে আসবে না। দেশের প্রত্যেক বিভাগে/জেলায়/উপজেলায় বিভিন্ন পশুখাদ্য উৎপাদনসহ এগ্রোবেসড প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের কেউই ঢাকায় মালামাল পরীক্ষা করার জন্য আসবে না। কারণ, আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ৯টি FDIL (Field desease investigation Laboratory), , ঢাকার কাজী আলাউদ্দীন রোডে Central desease investigation Laboratory (CDIL)  এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সদর দফতরে Neutration Laboratory আছে এবং এসব ল্যাবরেটরিতেই এ ধরনের যাবতীয় পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পরীক্ষাগার গুলোতে সব মিলিয়ে ২০ কোটি টাকা খরচ করে মেশিনারিজ ক্রয় করা হলে এগুলোকে অত্যাধুনিক ল্যাবে পরিণত করা যেত এবং যে উদ্দেশ্যে কথিত  Quality Laboratory করা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি কল্যাণকর হতো। আর এতে সরকারের অন্তত ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হত।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহা পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান দেশের স্বার্থে আলোচ্য ল্যাবটি নিম্মান করা হচ্ছে এবং অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরী করার লক্ষ্যে যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হচ্ছে বিধায় খরচ ও বেশি হচ্ছে। তবে পিডির দূর্নীতির বিষযটি তিনি অবগত নহেন বলে জানান।
সকলের ধারণা এ বিষয়ে দুদকের মাধ্যমে সামগ্রিক বিষয়টি তদন্ত করা হলে থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে এবং প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে অনিয়ম, পিডি কর্তৃক নিম্নমান ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মসহ সকল দুনীতি বেড়িয়ে আসবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৯ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)