রবিবার, ২২-সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:২৩ অপরাহ্ন

ডেঙ্গু আতঙ্ক থামছে না

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৭:৫০ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ডেঙ্গুজ¦র আর এর কারণে মৃত্যু থেকে কবে আর কিভাবে রেহাই পাবে দেশের মানুষ? এ প্রশ্নটি এখন মুখে মুখে। কেন না ব্যাপক আকারেই দেশে ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে তাও ২ মাসের বেশি হতে চললো। সরকার প্রথমদিকে বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি এমন অভিযোগ ছিল কিন্তু পরে সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় আর সিটি করপোরেশন ডেঙ্গুজ্বর থেকে মানুষকে বাঁচাতে দৃশ্যত: উঠেপড়েই লাগে। তবে তার ফলাফল কী?
শতশত মানুষ এখনও ছুটছেন হাসপাতালগুলোতে, কেউ রোগী হিসেবে ভর্তি হতে, কেউবা ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে। ডেঙ্গজ্বরে আক্রান্ত হবার ভীতি এখন সব মানুষের মধ্যেই। এ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের মধ্যেও। ডেঙ্গু জ¦র নিয়ে আসা রোগীরা হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না পেয়ে ওয়ার্ডের সামনের বারান্দায় ও মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট চালু করা হয়েছে। ঈদে ছুটিতে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও ছুটি শেষ হবার সাথে সাথে আবারও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।  
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন কম বেশি ২ হাজার রোগী। সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধশত না হলেও বেসরকারি নানা হিসাব বলছে এ সংখ্যা একশ’রও বেশি। মৃত ব্যক্তির তালিকায় আছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের স্ত্রী, পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপির স্ত্রী, সিভিল সার্জন, ডাক্তার, পুলিশের সদস্য, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষ। ডেঙ্গু জ¦রের ভয়ে অনেকে গ্রামে গিয়ে আর শহরে আসছেন না, উচ্চবিত্তদের কেউ কেউ বিদেশ গেছেন বলেও জানা গেছে। 
শিশু হাসপাতালের প্রতিদিন যত শিশু আসছে তাদের মধ্যে ১০০ থেকে ১২০টি শিশুর রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এই সন্দেহে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে শতশত মানুষ আসছেন ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে। ফলে রক্ত পরীক্ষায় চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। হাসপাতালে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেক ডাক্তার ও নার্স।  
ডেঙ্গুর প্রকোপ আর তাতে মৃত্যুর বিষয়টি জনমনে ভীতি জাগায়, তবে এ সময়টিতে সবচে’ বেশি সমালোচিত হয় এডিস মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটির ব্যর্থতার বিষয়টি। ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা মারতে যে ওষুধ ব্যবহার করছে তা অকার্যকর। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণায় সেটি প্রমাণিত হয়েছে। 
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট একটি সিন্ডিকেট মশার ওষুধের মূল্য ৫০ শতাংশ কম দরপত্রে কাজ নেয়। কিন্তু পরে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না করেই বিল তুলে নিয়ে যায়। মশা মারার ওষুধ কেনায় সিন্ডিকেটের প্রভাবের বিষয়টি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম সিন্ডিকেটের স্বীকার করেছেন। ভবিষ্যতে সিন্ডিকেটভুক্ত দুই প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ওষুধ নেবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন।
ঠিকাদার নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে ব্যাপক হইচই হয়েছে। সরকার, হাইকোর্ট সর্বোপরি মানুষের নানামুখী চাপে জরুরিভিত্তিতে বিদেশ থেকে উন্নতমানের ওষুধ আনার সিদ্ধান্ত নেয় সিটি করপোরেশন, সে ওষুধের নমুনা দেশে এসেছে, তার পরীক্ষামূলক ব্যবহারও হয়েছে কিন্তু তারপরও আর বিষয়টি নিয়ে কোন পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘রিস্ক কমিউনিকেশন থিওরি’ মানা হচ্ছে না। ডেঙ্গু থেকে বাঁচার উপায় বা  ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করেনি ব্যানারে এই কথাগুলো বলছেন মন্ত্রী-মেয়ররা। তবে মানুষ তদের কথা কতটা বিশ্বাস করে? বা তাদের ওপর কতটা আস্থা আছে মানুষের? 
সাঈদ খোকন প্রথমে ডেঙ্গুকে গুজব বললেও পরে স্বীকার করেন, এ জ¦র ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ডেঙ্গুতে ছেলে হারা মা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উপকরকমিশনার চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন- ‘মাননীয় মেয়র, রাষ্ট্র কি আমার বাচ্চার নিরাপত্তা দিতে পেরেছে? ডেঙ্গুজ্বরে আমি আমার প্রাণের অধিক প্রিয় একমাত্র ছেলেকে হারালাম। এখন আমিও ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ছয় দিন ধরে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছি। আমার মেয়ের দুই বছর বয়সে একবার ডেঙ্গু হয়েছিল। আপনি কি নিশ্চয়তা দিতে পারেন আমার মেয়ের আর ডেঙ্গু হবে না? সদ্য ছোট ভাই হারানো আমার ছোট্ট মেয়ে তার মাকেও যখন হাসপাতালের বেডে দেখছে, তখন তার মনের অবস্থা অনুধাবন করার অনুভূতি কি আল্লাহপাক আপনাকে দিয়েছেন? নাকি আমার এই লেখাটিও আপনার কাছে একটি গুজব।’  
দুই সিটি করপোরেশন স্বচ্ছতার সঙ্গে কার্যকর ওষুধ কেনার ব্যাপারে যেমন গুরুত্ব দেয়নি, তেমনি বিজ্ঞানীদের তথ্যের প্রতিও তারা চরম অবহেলা দেখিয়েছে। আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেঙ্গু ভাইরাস বাহক এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহারে মরছে না। ঢাকা শহরের এডিস মশা ওষুধের শক্তি সহ্য করেই টিকে যায়। গত বছরের ২২ মে এই গবেষণার ফলাফল স্বাস্থ্য অধিদফতর ও দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা। তবে সে সময় নির্বাচনী বছরের কথা উল্লেখ করে অকার্যকর ওষুধের বিষয়টি যাতে চার দেয়ালের বাইরে না যায় সেজন্য হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। 
ডেঙ্গু বাংলাদেশে যখন ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই সময়ে ভিন্নচিত্র পড়শি ভারতের কলকাতায়। ডেঙ্গু সমস্যা মোকাবেলায় গত পাঁচ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার সুফল পেয়েছে তারা। 
বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে এ বছর জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারিতে ডেঙ্গু জ¦র দেখা দিলেও বিস্তার ঘটেছে মে-জুন মাস থেকে। তখন সিটি কর্পোরেশনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। মশা নিধনের ওষুধের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি টাকা, তবে আদৌ কোনো ওষুধ এসেছে কি না আর আসলেই বা কি ধরণের আর কোন মানের ওষুধ এসেছে তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। কেউ কেউ রসিকতা করে বলছেন, সিটি করপোরেশন জনগণকে সতর্ক করে দিচ্ছে! মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, এটাই বা কম কী!
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের কারণে ডেঙ্গুজ্বর আর এডিস মশার বিষয়টি কিছুটা হলেও আড়ালে চলে গিয়েছিল, তবে সে সময়েও মৃত্যুর সংখ্যা কম ছিল না। মানুষ আবার রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে, প্রতিবারই ঈদের পরে মানুষ নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরে পথে নানা ভোগান্তি, দুর্ঘটনা আর হয়রানির বিষয়টি মাথায় নিয়ে, এবার তারা ফিরছেন আরেকটি বাড়তি ভয় নিয়ে আর তা হচ্ছে ডেঙ্গু আর তাতে মৃত্যু। এ ভয় দূর করতে সিটি করপোরেশন কি পদক্ষেপ নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৯ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশিত)