রবিবার, ২২-সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:৩১ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পিডির দুর্নীতি তদন্ত ধামাচাপা

গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পিডির দুর্নীতি তদন্ত ধামাচাপা

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৬:৫৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ছিন্নমূল মানুষের আশ্রায়নে নেয়া গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে চলছে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতি। প্রকল্পের পরিচালক মাহবুব উল আলম দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা নিজের পকেটে পুরছেন। তার দুর্নীতি আর খামখেয়ালিপনায় ভেস্তে যেতে বসেছে মহৎ উদ্দেশ্যে নেয়া এই প্রকল্পটি। জানা গেছে, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পিডি মাহবুব উল আলমের দুর্নীতি-অপকর্মের কিছু ফিরিস্তি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে চলতি বছরের প্রথমদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই তদন্তের কিছুই হয়নি। এদিকে প্রায় একই সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও প্রকল্প পরিচালক মাহবুব উল আলমের দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল। দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত করিৎকর্মা এই কর্মকর্তা উভয় তদন্তই ধামাচাপা দিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। আর এই ফাঁকে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন তার বেপরোয়া দুর্নীতি-অপকর্ম। 
সূত্র জানায়, ‘ক্লাইমেট ভিক্টিমস রিহ্যাবিলিটেশন’ বা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার জনগোষ্ঠীর পূনর্বাসনের জন্য নেয়া এই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৫ সালে ১৩ অক্টোবর। প্রাথমিকভাবে এজন্য বরাদ্দ ছিল ২৫৮ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর এ প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়ে ৯৪২ কোটি টাকা করা হয়। এই প্রকল্পের আওতা বাড়িয়ে ৫০ হাজার পরিবারকে আশ্রয় দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
গুচ্ছগ্রাম-২ নামের এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক বা পিডি হিসেবে নিয়োগ পান ১৯৮৬ সালের বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মাহবুব উল আলম। তিনি প্রকল্প পরিচালক পদে নিয়োগ পান ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর। মাহবুব উল আলম এর আগে ছিলেন গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের রংপুরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক। মাহবুব উল আলমের দাবি, তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ তাকে ভালোভাবে চেনেন এবং পছন্দ করেন। একারণে মন্ত্রী তখন ডিও লেটার দিয়ে তাকে গুচ্ছগ্রাম-২ প্রকল্পের পরিচালক করে এনেছেন। যেহেতু তিনি মন্ত্রীর প্রিয়ভাজন এবং মন্ত্রীর দফতরের কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ, তাই যত অপকর্মই করেন পার পেয়ে যাবেন- এই বিশ্বাস রয়েছে তার। সে কারণেই মাহবুব উল আলম দুর্নীতিতে এতোটা বেপরোয়া, এমন কথা বলছে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। 
গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেকেরই প্রশ্ন, এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি প্রকল্প। এর বরাদ্দেও সরকার কার্পণ্য করছে না কিন্তু সে অনুপাতে এর সফলতা কোথায়? প্রকল্প বাস্তবায়নে সফলতা থাকুক আর না থাকুক নিজের আখের গোছানোতে পুরোপুরি সফল মাহবুব উল আলম। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, তার লোভের কাছে জিম্মি এই প্রকল্পের সম্ভাব্য সুবিধাভোগী আর প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িতরা। সংক্ষুব্ধরা বলেছেন, প্রকল্পের সবস্তরেই দুর্নীতির কালোথাবা বিস্তার করেন মাহবুব উল আলম। মাটি ভরাট থেকে শুরু করে ঘর বরাদ্দ দেয়া সবকিছু থেকেই নিজের পকেটভারী করেন তিনি। এ কাজে তাকে সহায়তা করার জন্য সব স্তরেই নিয়োজিত আছে তার নিজের পছন্দের লোক। অবশ্য, পছন্দের লোকদের উপরও তিনি পুরোপুরি নির্ভর করেন না। লেনদেন নিজের হাতে সরাসরি ‘ডিল’ করার জন্য প্রায়শঃই মাঠে-ময়দানে চলে যান তিনি।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের কাজ পাওয়া কিংবা আশ্রয়ের জন্য ঘর পেতে পিডিকে দিতে হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। এরমধ্যে মাটি ভরাটের কাজে খাদ্যশস্য ক্রয়ে পিডিকে দিতে হয় প্রতি টনে ৩ হাজার টাকা, প্রতিটি ঘর তৈরির কাজ পেতে দিতে হয় ৬ হাজার টাকা করে। এতো গেল যারা কাজ পাবেন তাদের দেয়া টাকার কথা, যে নি:স্ব মানুষগুলোকে ঠাঁই দিতে এই প্রকল্প, সেই মানুষগুলোকেও আশ্রয়ের ঘর বরাদ্দ পেতে দিতে হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই টাকা দিতে পারলেই তারা ঘরের বরাদ্দ পান, পদে পদে টাকা দিয়ে কাজ পাওয়ার পর ঠিকাদার যে কাজ করেন তার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিযোগ উঠেছে, নামকাওয়াস্তে কাজ শেষ করেন ঠিকাদার। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তা পাশ করিয়ে দেন, আর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তো মাহবুব উল আলম আছেনই। এতে নির্মাণকৃত ঘরের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে, একই সাথে ঝুঁকি থাকে এসব ঘরে বসবাসকারীদের জীবনেরও। প্রতিটি ঘর নির্মাণে খরচ দেখানোও হয় প্রকৃত খরচের তুলনায় অনেক বেশি।
জানা গেছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি করলেও টাকা-পয়সার ব্যাপারে মাহবুব উল আলম অন্যের ওপর নির্ভর করেন খুবই কম, তাই  যেসব এলাকায় গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের ঘরের সংখ্যা বেশি মাহবুব উল আলম নিজেই সেসব এলাকায় যান। টাকা-পয়সা নিয়ে আলোচনা আর লেনদেন নিজেই করেন। 
গণমাধ্যমে খবর প্রকাশসহ নানাভাবে প্রকল্পের পিডি মাহবুব উল আলমের দুর্নীতির বিষয়টি এতই প্রবল আলোচনায় আসে যে চলতি বছরের প্রথমদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়। তবে মাহবুব উল আলমের তদবিরের চাপে হাফিজুর রহমান সেই তদন্তকাজ আর এগিয়ে নিতে পারেননি। ইতিমধ্যে হাফিজুর রহমান অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ায় তদন্তটি সেখানেই থমকে যায়। নিয়ম অনুযায়ী হাফিজুর রহমান দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাবার সময় গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের তদন্তের কাজ অসমাপ্তের কথা জানিয়ে একটি চিঠি লিখে যান। কিন্তু ইতিমধ্যে প্রায় চার মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী এ ব্যাপারে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের কথা থাকলেও সেটি হয়নি। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান চিঠিটি সচিব বরাবর লিখলেও সেটি সচিব পর্যন্ত আর পৌঁছায়নি। করিৎকর্মা মাহবুব উল আলম মাঝপথেই এ চিঠি গায়েব করে রাখার ব্যবস্থা করেন। এভাবেই ধামাচাপা পড়ে যায় তদন্ত প্রক্রিয়াটি। প্রায় একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তটিও ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন তিনি। দুদক তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করলেও শুরুতে তিনি নানা ছলচাতুরি করে সেখানে হাজির হননি। পরবর্তীতে মাহবুব উল আলমের নানাবিধ তদবির আর প্রচেষ্টায় দুদকের তদন্তও এক পযায়ে ঝিমিয়ে পড়ে। উল্লেখ্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রসঙ্গে গত সপ্তায় ভূমিসচিব মো. মাক্ছুদুর রহমান পাটওয়ারীর কাছে শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, বিষয়টি তার নলেজে ছিল না। সচিব শিগগিরই এ তদন্তকাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য অন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন বলে জানান।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারের অনেক প্রকল্পই মার খায় ওই প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে। এর একটি জ¦লন্ত উদাহরণ হচ্ছে গুচ্ছগ্রাম-২ প্রকল্প ও এর পরিচালক মাহবুব উল আলম। সরকারের একটি সদিচ্ছার অপমৃত্যু ঘটাচ্ছেন মাহবুব উল আলম এমন মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভূক্তভোগীরা আশা করছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ আর দুদক মাহবুবের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সক্রিয় হবে। তারা বলেন, শুধু একজন প্রকল্প পরিচালকের দুর্নীতি বন্ধের জন্যই নয় কিংবা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই নয়, এই প্রকল্পের দুর্নীতি বন্ধ করে একে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে, ভূমিহীন-আশ্রয়হীন মানুষের আশ্রায়ন নিশ্চিতে সরকারের আকাঙ্খা পূরণের জন্যই। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৯ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশিত)