শনিবার, ১৯-অক্টোবর ২০১৯, ১১:০২ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • নগর উন্নয়ন অধিদফতর: তদন্ত কমিটির সুপারিশ উপেক্ষিত,বহাল তবিয়তে বিতর্কিত পরিচালক

নগর উন্নয়ন অধিদফতর: তদন্ত কমিটির সুপারিশ উপেক্ষিত,বহাল তবিয়তে বিতর্কিত পরিচালক

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৭:৩৮ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: নগর উন্নয়ন অধিদফতর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা। এই অধিদফতরের পরিচালক ড. খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিককে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে কার্যতঃ অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সংস্থাটিতে। ড. তৌফিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা আর অসদাচরণের অভিযোগ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন তারা, গঠিত হয়েছিল তদন্ত কমিটি। সে কমিটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ড. তৌফিক অদক্ষ এবং তাকে পরিচালক পদে রেখে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকা- পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তারপরও কেটে গেছে তিন মাসেরও বেশি সময় কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে নিজ পদে ড. খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিক। এতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তাদের প্রশ্ন ড. তৌফিকের খুঁটির জোর কোথায়? 
যেসব অভিযোগ ড. তৌফিকের বিরুদ্ধে
১৯৬৫ সালের ১৭ জুলাই নগর উন্নয়ন অধিদফতর প্রতিষ্ঠিত হয়। নগর উন্নয়ন, দেশের নগর এলাকাগুলোতে ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং নগরায়ন কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পাদন করে এই প্রতিষ্ঠানটি। এর বর্তমান পরিচালক ড. খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিক। জানা গেছে, চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা (উপ-পরিচালক) তৌফিককে পরিচালকের চলতি দায়িত্ব দেয়া হয় উপ-পরিচালকের পদে তারচে’ সিনিয়র ফারজানা সমীরউদ্দিনকে ডিঙিয়ে। ২০১৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তাকে পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদায়ন করা হয়। তবে তিনি চলতি দায়িত্বে থাকলেও কোথাও তা উল্লেখ করেন না। পূর্ণ পরিচালকের মতোই কাজ-কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নগর উন্নয়ন অধিদফতরে নিজের খামখেয়ালিপনা বাস্তবায়নের কেন্দ্রে পরিণত করেছেন তৌফিক। কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বন্টনে তিনি চরম স্বেচ্ছাচারী আচরণ করছেন, জ্যেষ্ঠতার ধার ধারছেন না, এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, নিজে অনিয়মের মাধ্যমে এবং জ্যেষ্ঠতা লংঘনের মাধ্যমে পদে অধিষ্ঠিত হওয়ায় তার কাছে এসব নিয়মের কোন দাম নেই। জানা গেছে, নিজের বিশ^স্ত ও আস্থাভাজন বলেই পরিকল্পনা কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ৫ নাম্বারে থাকা আক্তারুজ্জামাকে উপ-পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অপর একটি বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব দিয়েছেন ড. তৌফিক।
ভূক্তভোগীদের অভিযোগ, আইনের অজ্ঞতার জন্য তিনি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের ন্যায্য পাওনা থেকেও বঞ্চিত করছেন। সিএল, বিনোদন ছুটি, জিপিএফ লোন সবকিছুর ক্ষেত্রেই তিনি মনগড়া নিয়ম কানুনে পরিচালনা করেন। পদে পদে হেনস্তা করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তিনি পুরো অধিদফতরে ঘন ঘন বদলি আর পদায়নের এক আতংকজনক পরিবেশ তৈরি করে রেখেছেন। 
আর দুর্নীতি বা আর্থিক ক্ষেত্রে তিনি কোন কিছুর তোয়াক্কা করেন না। জানা গেছে, তিনি একজন অনভিজ্ঞ ও জুনিয়র ব্যক্তিকে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা তৌফিকের সব দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের সহযোগী। চলমান সকল প্রকল্প ও রাজস্ব বাজেটের ছোট-বড় যে কোন পরিমান চেক থেকে তিনি শতকরা ১% হারে কেটে রাখেন। এছাড়া প্রিন্ট না করে এবং সফটওয়্যার না কিনে প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন ড. তৌফিক।  নিজস্ব একটা দুর্নীতিবাজ বলয় তৈরি করে তিনি নিজের পকেট ভারী করছেন এবং তার দুর্নীতিতে সহায়তাকারী একটি ক্ষুদ্র অংশও এর ভাগ পাচ্ছে।
মুখ খুলছেন বঞ্চিত ও নির্যাতিতরা
ড. তৌফিক নগর উন্নয়ন অধিদফতরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই এখানে কর্মরত ব্যক্তিদের সাথে বিরূপ মনোভাব দেখাতে শুরু করেন। নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, আধিপত্য পাকাপোক্ত করতে তিনি অনেকটাই স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। যতই দিন গড়িয়েছে ততই নিজের স্বরূপ প্রকাশ করতে থাকেন তিনি। আর তাই তৌফিকের স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন নগর উন্নয়ন অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা তৌফিকের অপসারণের দাবিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। এতে আঁতে ঘা লেগেছে তৌফিকের। তিনি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে মন্ত্রণালয়ে পাল্টা অভিযোগ করেছেন। 
যা বলা হয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে
এ বছরের ১০ মার্চ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ.ম রেজাউল করিমের কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়। নগর উন্নয়ন অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দেয়া ওই স্মারকলিপিতে নগর উন্নয়ন অধিদফতরের পরিচালকের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিকের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তার নানা কর্মকা- ও তার ফলে অধিদফতরের কর্মরত ব্যক্তিগণ যেসব সমস্যার মুখোমুখি এবং প্রতিষ্ঠান যেসব ক্ষতির শিকার হচ্ছে তা তুলে ধরা হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়, অধিদফতরের নিজস্ব কর্মকর্তা হয়েও তিনি এখানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য কতটা আতংকে পরিণত হয়েছেন। ক্রয়, নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির তথ্যও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহারে স্বেচ্ছাচারিতা, কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের মতো বিষয়গুলোও উদাহরণসহ তুলে ধরা হয়েছে এতে। নগর উন্নয়ন অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেছেন, ড. তৌফিকের অসদাচরণ, স্বেচ্ছাচারিতা, আইন বহির্ভূত ব্যবহার ও কর্মরতদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার মানসিকতার কারণে এই অধিদফতরে চাকরি করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে এবং সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা মানসিক ও পারিবারিক জীবনে বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হচ্ছেন।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি
পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রেক্ষিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত ১১ মার্চ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অডিট) মো: ইমরুল চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং যুগ্মসচিব (প্রশাসন শাখা-২) মো: ইসমাইল হোসেন ও উপসচিব (প্রশাসন-৩ শাখা)কে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিকে ড. খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তদন্ত করে ১০ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ২ মে ওই কমিটি সচিব বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত প্রতিবেদনে ড. তৌফিকের বিরুদ্ধে নগর উন্নয়ন অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে দেয়া স্মারক লিপিতে উল্লেখিত অভিযোগগুলো তুলে ধরা হয়। যাতে বলা হয়, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর পর চলমান প্রকল্পগুলোতে তার পছন্দমতো পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছেন, তিনি নিজে তিনটি গাড়ি ব্যবহার করেন। ফলে অফিসের অন্য কর্মকর্তারা গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন না। তিনি ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত নগর উন্নয়ন অধিদফতরের কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করে ওই নির্বাচন পরিচালনায় গঠিত কমিশনের ঘোষিত ফলাফল স্থগিত ঘোষণা করেছেন। নির্বাচিত প্যানেল পছন্দ না হওয়ায় তিনি ওই ফলাফল বাতিল করেন, তবে নির্বাচিতরা এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নির্বাচন বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ দেন এবং নির্বাচিত কমিটি দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।  
ড. তৌফিকের ব্যাপারে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী স্মারকলিপিতে স্মাক্ষর করেছেন তাদের বক্তব্য গ্রহণ করে তদন্ত কমিটি। কমিটির কাছে নিজেদের বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীই পিছপা হননি, যার জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে ড. তৌফিককে পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেই ফারজানা সমীরউদ্দিন তদন্ত কমিটিকে জানান, ড. তৌফিক কর্মে তার জুনিয়র হলেও তিনি পরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়ার পর তাকে সম্মান করেই নিজ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ড. তৌফিক তাকে নানাভাবে হেনস্তা করেন এমনকি তার নিজের দায়িত্ব পালনেও নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। ড. তৌফিক পরিচালক হওয়ার আগে ফারজানা বেগম ‘শেয়ার’ করে গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পেলেও তিনি সে সুযোগ বন্ধ করে দেন। ফারজানা বেগম জানান, তাকে কোন দায়িত্বে না রেখে ওএসডি করে রাখা হয়েছে। 
নগর উন্নয়ন অধিদফতরের সিনিয়র প্ল্যানার শাহীন আহম্মেদও তদন্ত কমিটির কাছে ড. তৌফিকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, অসদাচরণের অভিযোগ করেন। বৈঠকের ভেতরেই ড. তৌফিক অধস্তন কর্মকর্তাদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন বলে জানান শাহীন আহম্মেদ।
শুধু এসব অভিযোগই নয়, জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে উর্ধ্বতন পদে নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র প্ল্যানার শরীফ মো. তারিকুজ্জামান অভিযোগ করেছেন, তাকে প্রকল্প পরিচালকের পদে নিয়োগ দিয়ে তার জ্যেষ্ঠ একজনকে তার অধীনে দিয়েছেন অধিদফতরের পরিচালক। এতে কাজে অসুবিধা হচ্ছে এবং তিনি মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন। তদন্ত কমিটির কাছে আরো কয়েকজন যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তারা বলেছেন, ড. তৌফিক অধিদফতরে অহেতুক গ্রুপিং সৃষ্টি করে কর্মপরিবেশ নষ্ট করছেন। স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করা ১০১জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে তদন্ত কমিটি ২২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। হয়রানিমূলক বদলি, জিপিএফ লোন না দেয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ সত্বেও ছুটি না দেয়া, বেতন আটকে রাখা, ডিউটি করতে না দেয়াসহ নানাভাবে হেনস্তার শিকার একাধিক ব্যক্তি সরাসরি কমিটির কাছে বক্তব্য দিয়েছেন এবং লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। তারা সবাইই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করার বিষয়টি তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকার করেছেন। 
তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপারে ড. তৌফিকের বক্তব্য শোনেন পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ব্যক্তিদের বক্তব্যও গ্রহণ করেন। ড. তৌফিক তদন্ত কমিটিকে জানান, তিনি আইনানুযায়ী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন, জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে পদায়নের ব্যাপারে সাফাই গেয়ে তিনি বলেন, আহমেদ আখতারুজ্জামানকে উপ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে কেন না তার জ্যেষ্ঠ পাঁচজনের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা চলমান ছিল এবং অন্য চারজনকে বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তাদের কাউকে দায়িত্ব দিলে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমস্যা হতো। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, গাড়ি ব্যবহার, প্রিন্ট না করেও বিল উত্তোলন, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নিয়োগের মতো বিষয়গুলোতে যে সব অভিযোগ উঠেছে তার সবই অস্বীকার করেছেন ড. তৌফিক। ড. তৌফিকের এসব অভিযোগ অস্বীকার করাকে পরিহাস করে এখানকার কর্মকর্তারা বলেছেন, তার কথায় মনে হচ্ছে, নগর উন্নয়ন অধিদফতরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই তার শত্রুপক্ষ, তারা তার বিরুদ্ধে গায়েবি অভিযোগ করেছেন! অথচ ড. তৌফিকের সব অনিয়ম আর দুর্নীতির প্রমাণই আছে এবং তদন্ত কমিটির কাছে তারা তা দাখিলও করেছেন।
তদন্ত কমিটির মতামত
অভিযোগকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাক্ষ্য, প্রমাণ আর অভিযুক্ত ড. তৌফিকের বক্তব্য এবং নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে দেয়া মতামতে বলা হয়, ড. তৌফিককে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের কোন ব্যত্যয় ঘটেনি, সরকার যোগ্য মনে করেই তাকে নিয়োগ দিয়েছে। জানা গেছে, তদন্ত কমিটির এ মতামতে নগর উন্নয়ন অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ড. তৌফিককে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, ‘জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন’ অবশ্যই সাধারণ প্রথার লঙ্ঘন।
কমিটির কাছে শতকরা ১ ভাগ টাকা কেটে রাখার বিষয়টি ড. তৌফিক অস্বীকার করতে পারেননি, তিনি জানিয়েছেন অফিসের নানাবিধ খরচ মেটাতে তিনি এ অর্থ রাখতেন। তদন্ত কমিটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে ঠিকাদারদের কাছ থেকে শতকরা ১ টাকা গ্রহণ করার বিষয়টি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া একাই তিনটি গাড়ি ব্যবহার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানিমূলক বদলি, কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে বলেও জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। তাছাড়া তদন্ত কমিটি ড. তৌফিকের ব্যক্তিগত ব্যবহার, আচার-আচরণ, ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গালিগালাজ করার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরণের ভাষা কাম্য নয়। 
কমিটি বলেছে, অধিদফতরে ১৪০/১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত, তাদের মধ্যে ১০১জনই পরিচালকের বিরুদ্ধে স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন। তারা পরিচালকের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন। এতেই প্রমাণিত হয় যে, নগর উন্নয়ন অধিদফতরে পরিচালকের সাথে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে। কমিটি আরো বলেছে, এই সমস্যাটি মূলতঃ পরিচালকের আচরণগত কারণে তৈরি হয়েছে। ড. খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিকের দক্ষতার অভাব রয়েছে বলেও সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। সবশেষে কমিটি ষ্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে ড. তৌফিককে তার পদে বহাল রেখে নগর উন্নয়ন অধিদফতরের কার্যক্রম সুচারুরূপে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। 
নগর উন্নয়ন অধিদফতরের পরিচালক ড. তৌফিককে অদক্ষ হিসেবে বলেছে তদন্ত কমিটি, অথচ নগর পরিকল্পনার কাজটি মূলতঃ দক্ষতানির্ভর। একজন অদক্ষ ব্যক্তির হাতে এই সংস্থাটি থাকার অর্থ শুধু এই প্রতিষ্ঠানটিকেই অকার্যকর করে তোলাই নয়, তার সুদূরপ্রসারী পড়তে পারে নগর পরিকল্পনাসহ এই সংস্থার যাবতীয় কর্মকা-েও। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ড. তৌফিককে সরিয়ে অতিশীঘ্র একজন দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিকে এর দায়িত্ব দেয়া হবে এটাই নগর উন্নয়ন অধিদফতরে কর্মরত ব্যক্তিদের দাবি।
মন্ত্রণালয়ের সচিবের মন্তব্য
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকারের কাছে সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেখেছি। যেহেতু ড. তৌফিক প্রতিষ্ঠান প্রধান তাই তাকে বদলি করতে হলে মন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। মন্ত্রী মহোদয় হজ পালনে বিদেশে আছেন। তিনি দেশে এলে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৯ আগস্ট ২০১৯ প্রকাশিত)