রবিবার, ২০-অক্টোবর ২০১৯, ০৫:৫৬ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • এনবিআর’র ভ্যাট অনলাইন সিস্টেম ক্রয়ে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতি

এনবিআর’র ভ্যাট অনলাইন সিস্টেম ক্রয়ে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতি

shershanews24.com

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৫:১১ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: মহাবিপর্যয়ে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প। অনলাইনে ভ্যাট আদায় কার্যক্রম সরাসরি তত্ত্বাবধানের ঘোষণা দিয়েও এনবিআর গত ১ জুলাই থেকে তা চালু করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এনবিআর চেয়ারম্যানের তৃতীয় দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ লাভের সম্ভাবনা না থাকায় বিদায়ের আগে একের পর এক অযোগ্য কোম্পানির সাথে চুক্তি করে আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণে এনবিআর-এর শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় চরম অস্থিরতা লক্ষণীয়। একাধিক অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও সিস্টেম সরবরাহকারী নিয়োগ করে এনবিআর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। অস্থিরতার ফলে ভ্যাট অনলাইন চালু করতে আরও জটিলতা সৃষ্টি ও বিলম্ব হওয়ার আশংকা রয়েছে। 
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, দরপত্র মূল্যায়নে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্তৃপক্ষীয় পক্ষপাতের কারণেই মূলতঃ যথাসময়ে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ সম্ভব হয়নি। নির্ধারিত সময়ে চালু না হওয়া এই প্রকল্প বাস্তবায়নে এনবিআর-এর নির্বাচিত ও ক্রয় কমিটির সুপারিশকৃত এসজেডজেডটি-কেএমএমটি-সিনেসিস-ইএটিএল জয়েন্টভেঞ্চারের (জেভি) যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিযোগী ২ দরদাতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনবিআর বস্তুনিষ্ঠভাবে নিষ্পত্তি না করে গোঁজামিল দিয়েছে। মূলতঃ এ কারণেই প্রকল্প বিলম্বিত হয়েছে, যার একক দায় এনবিআর চেয়ারম্যানের বলে জানা যায়। 
এদিকে চীনের এসজেডজেডটি জেভিকে নিয়োগের সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় দরপত্রের সর্বনিম্ন দরদাতার দরে চুক্তি করার জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা স্মার্ট টেকনোলজি অযাচিত প্রস্তাব দিয়েছে। এনবিআর ওই অযাচিত প্রস্তাব গ্রহণ করতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশ নিয়েছে। গণখাতে ক্রয় আইন - পিপিএ এবং গণখাতে ক্রয় বিধিমালা - পিপিআর অনুযায়ী দরপত্র চলমান অবস্থায় কোন দরদাতা দর হ্রাসের প্রস্তাব দিলে দরপত্র সরাসরি বাতিল হয়ে যায়। 
তাছাড়া জরুরি প্রয়োজনে অধিক পরিমাণে পণ্য, কার্য ও সেবা ক্রয় করতে হলে ক্রয় আইনে সর্বনিম্ন দরদাতার কাছ থেকেই তা কেনা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে এনবিআর বর্ধিত চাহিদার জন্য সর্বনিম্ন দরদাতাকে কোন প্রস্তাবই দেয়নি। এমনকি দ্বিতীয় সর্বনি¤œ দরদাতাকেও সুযোগ দেয়া হয়নি। বরং সর্বোচ্চ দরদাতার সাথে যোগসাজশে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে তাদের দেয়া অযাচিত প্রস্তাবই এনবিআর গ্রহণ করেছে, যা বিধিসম্মত হয়নি। এভাবে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ছাড়া তাড়াহুড়া করে একের পর এক অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়ায় এনবিআর এর ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প বড় ধরনের ব্যর্থতার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
২০১৬-১৭ সালের বাজেট বক্তৃতায় তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত ভ্যাট আদায় বৃদ্ধির জন্য ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) ব্যবহার নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। দেশের ১১টি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে ২০১৬ সালে ইসিআর ব্যবহার উপযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৮,০০৭ টি। এর মধ্যে ঢাকার ৪টি ভ্যাট কমিশনারেটে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬,৭৭৬ টি। ঢাকার বাইরের বাকি ৭টি ভ্যাট কমিশনারেটে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১,২৩৯টি।
এনবিআর এর আইসিটি বিভাগ একটি আদর্শ ইসিআর মেশিনের দাম ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে বলে জানায়। এগুলো ক্রয় করে সব প্রতিষ্ঠানে ক্রয়মূল্যে সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত থাকায় এজন্য সম্ভাব্য বাজেট তৈরি করা হয় ১৬ থেকে ২০ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর আপাততঃ ১০ হাজার ইসিআর মেশিন ক্রয় এবং ক্রমে ক্রমে এগুলো সকল প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা দেন। 
দেশের সকল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় কার্যক্রম সরাসরি তত্ত্বাবধানের জন্য এনবিআর অফলাইন ইসিআর এর পরিবর্তে আধুনিক অনলাইন ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য ইএফডি ও সেলস ডাটা কন্ট্রোলারসহ (এসডিসি) পূর্ণাঙ্গ ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইএফডিএমএস) এবং ৫ বছরের ম্যানেজ সার্ভিস ক্রয়ের জন্য গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্রে দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ দেয়া এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানের লিড পার্টনার (প্রধান অংশীদার) হওয়ার সুযোগ দিয়ে দরপত্রের শর্ত সংশোধন করা হয়। দরপত্রে যে কোন অংশীদারের বিগত ৫ বছরে দুটি ভিন্ন দেশে ৫০ লাখ ডলারের দুটি চুক্তিতে একই ধরনের জটিলতর পদ্ধতি/প্রযুক্তির ফিসক্যাল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার শর্ত দেয়া হয়। এছাড়া অনলাইনে ইএফডিএসএস চলমান থাকতে হবে এবং একটি দেশে অন্ততঃ এর আওতায় ৫০ হাজার খুচরো বিক্রেতাদের এটার ব্যবহার থাকতে হবে। এর স্বপক্ষে অভিজ্ঞতার বিবরণ চাওয়া হয়। 
প্রি-বিড বা দরপত্র-পূর্ব সভায় ১৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় ও ১৯টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দলিল কেনে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দরপত্র খোলা হলে মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত তিন সদস্যের কারিগরি সাব-কমিটি গত ১৬ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিল করে। আর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ২৩ এপ্রিল তাদের কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই দিনই ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান এনবিআর এর চেয়ারম্যান মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদন করেন। সফটওয়্যার নির্মাণে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান হলেও কমলিংক ইনফোটেক লি: দরপত্রে যাচিত কতিপয় দলিল দাখিল না করায় এবং চীনের আসিনো কর্পোরেশন কারিগরি চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় নন-রেসপনসিভ ঘোষিত হয়। বাকি ৩টি প্রতিষ্ঠানকে কারিগরিভাবে যোগ্য বা রেসপনসিভ বিবেচনা করা হয়, যদিও এদের এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ২ মে কারিগরিভাবে যোগ্য বিবেচিত ৩ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়। রেসপনসিভ ৩ দরদাতার প্রদত্ত দর হচ্ছে: এসজেডজেডটি-কেএমএমটি-সিনেসিস-ইএটিএল জেভি: ২৪৮,৭২,৬১,৩৮৪ টাকা, এসপার সফটওয়্যার গ্রুপ এন্ড টেকনোভিস্তা জেভি: ২৫৯,২৫,০৯,৬০৩ টাকা  এবং স্মার্ট টেকনোলজি (বিডি) এন্ড ডেইজী জেভি: ৩৩৮,৩৯,১৬,১৩৩ টাকা।
সর্বনিম্ন দরদাতার যোগ্যতা নিয়ে অন্য ২ প্রতিযোগী স্মার্ট টেকনোলজি ও ডেইজী এবং ইন্সপার সফটওয়্যার গ্রুপ লি: ও টেকনো ভিস্তা লি: জেভি পরবর্তী কার্যদিবসে অর্থাৎ ৫ মে রোববার এনবিআর এর দায়িত্বে থাকা অর্থমন্ত্রীর কাছে পৃথক পৃথক ভাবে লিখিত অভিযোগ করে। অভিযোগের অনুলিপি এনবিআরকেও দেয়া হয়। স্মার্ট টেকনোলজির অভিযোগ, দরপত্রের শর্তানুযায়ী অন্য দুই দরদাতার একজনের বিগত ৫ বছরে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নেই। অন্য দরদাতা জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়েতে এধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পেলেও তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে বলে সেখানকার সংবাদপত্রে খবর ছাপা হয়েছে। অন্য দরদাতা ইন্সপার সফটওয়্যার গ্রুপ লি: ও টেকনো ভিস্তা লি: জেভির এর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সর্বনি¤œ দরদাতা এসজেডজেডটি-কেএমএমটি-সিনেসিস-ইএটিএল জেভি’র জয়েন্টভেঞ্চারের লিড পার্টনারের বিগত ৫ বছরে একই ধরনের জটিলতর ব্যবস্থার কোন চুক্তি বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নেই। দুই অভিযোগকারীই দরপত্রের শর্তানুযায়ী এসজেডজেডটি-কেএমএমটি-সিনেসিস-ইএটিএল জেভি’র অভিজ্ঞতার রেফারেন্স যাচাইয়ের অনুরোধ করে।
ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পেশকৃত অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ তথা এনবিআর এর সার-সংক্ষেপে প্রতিযোগী দরদাতাদের অভিযোগের বিষয়ে কোন উল্লেখই করা হয়নি। তবে সার-সংক্ষেপের সংযোজনীসমূহ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, এনবিআর চেয়ারম্যান বিগত ২৩ এপ্রিল যে কারিগরি প্রতিবেদন অনুমোদন করে যোগ্য বিবেচিত (রেসপনসিভ) তিন দরদাতার আর্থিক প্রস্তাব খোলার অনুমোদন দিয়েছিলেন, ৭০দিন পর গত ৩ জুলাই তিনিই ওই কারিগরি প্রতিবেদন বাতিল করে দিয়েছেন। এর জন্য কোন কারণ বা যৌক্তিকতা দেখানো হয়নি। এনবিআর চেয়ারম্যানের পক্ষে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের উপ-কমিশনার কাজী রেজাউল হাসান ৩ জুলাই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ককে জানান,“........ইতিপূর্বে দাখিলকৃত মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান (ক্রয়কারী কার্যালয়ের প্রধান) এর নির্দেশক্রমে বাতিলকরণ পূর্বক পুনরায় মূল্যায়ন প্রতিবেদন দাখিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হল।” অন্য সংস্থার সদস্যসহ ৮ সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি নজিরবিহীন দ্রুততায় ১দিনের মধ্যে ৪ জুলাই পুণঃমূল্যায়ন সম্পন্ন করে।
বাতিলকৃত মূল মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি বাংলায় ছিল। কিন্তু পুণঃমূল্যায়ন প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে এবং এতে ‘পোস্ট কোয়ালিফিকেশন ভেরিফিকেশন’ বা ‘যোগ্যতা-উত্তর যাচাই’ নামে একটি অধ্যায় যোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ‘যোগ্যতা-উত্তর যাচাই’ এর সময় অসফল দরদাতাদের কাছ থেকে সর্বনি¤œ দরদাতার যোগ্যতা সম্পর্কে বহুবিধ অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, দরপত্রের শর্তানুযায়ী এদের ২টি দেশে সম্পূর্ণ সিস্টেম সরবরাহের অভিজ্ঞতা না থাকা। কেবলমাত্র দাখিলকৃত কাগজপত্র থেকে তাদের কি পরিমাণ অভিজ্ঞতা রয়েছে তা যাচাই করা সম্ভব নয়। সরেজমিনে পরিদর্শনেই কেবল তাদের প্রকৃত সামর্থ্য জানা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত ই-মেইলে ইতিবাচক তথ্য পাওয়া গেছে। যাচাইকরণে এদের যন্ত্র সকল চাহিদা পূরণ করেছে। ”
তবে প্রাপ্ত তথ্যের স্বপক্ষে ‘যোগ্যতা-উত্তর যাচাই’য়ে কমিটি কোন কোন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং ওই সব প্রতিষ্ঠান থেকে কি ধরণের তথ্য পাওয়া গেছে তার বিবরণ বা তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ই-মেইল সংযুক্ত করেনি বা এ বিষয়ে বিশদ কোন তথ্যও দেয়নি। প্রকৃত তথ্য পাওয়ার জন্য ওই সকল দেশের বা প্রযোজ্যক্ষেত্রে পাশর্^বর্তী দেশের  বাংলাদেশ মিশন থেকেও সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষমতা ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশে প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী ক্রয় প্রস্তাব নাকচ করতে পারেন। ক্রয় আইন ও বিধিমালায় মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাতিলের কোন সুযোগ নেই। এনবিআর চেয়ারম্যান অবৈধভাবে মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাতিল করেছেন। তার নির্দেশক্রমে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি নতুন ফরমায়েশি দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। কি কারণে মূল্যায়ন প্রতিবেদন বদল করা হয়েছে তাও ক্রয় কমিটির জন্য তৈরি সার-সংক্ষেপে বা বাতিল করার আদেশে উল্লেখ করা হয়নি। আর্থিক প্রস্তাব খোলার পর কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন বদল নজিরবিহীন। আর এ বিষয়টি ক্রয় কমিটি তথা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারী প্রধানমন্ত্রীর কাছে গোপন করা হয়েছে। নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে ৪ জুলাই, কিন্তু কমিটির সদস্যরা মূল্যায়নে পক্ষপাত করেন নি বা এর সাথে তাদের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা বা স্বার্থ নেই মর্মে একক ও যৌথ প্রত্যয়ন দিয়েছেন ২৬ মে।
গত ২৪ জুলাই সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় চীনের এসজেডজেডটি ইলেক্ট্রনিক কোম্পানি ও কুনমিং মোবাইল টেকনোলজি জেভি’কে ট্যাক্স-ভ্যাটসহ ৩১৫ কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ৯৫৭ টাকা কার্যাদেশ দেয়ার সুপারিশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশে অবস্থানের কারণে ওই সুপারিশ অনুমোদনের জন্য অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় দরপত্রের সর্বোচ্চ দরদাতা স্মার্ট টেকানোলজি (বিডি) লি: তাদের সর্বোচ্চ ৪২৯ কোটি ৭৫ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৮ টাকা দরকে (ভ্যাট-ট্যাক্সসহ) অযাচিতভাবে ১১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৫১ হাজার ৫৩১ টাকা কমিয়ে সর্বনি¤œ দরদাতার ৩১৫ কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ৯৫৭ টাকা দরে কার্যাদেশ পাবার প্রস্তাব দেয়। এনবিআর ওই অযাচিত প্রস্তাব গ্রহণ করতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশ নিয়েছে। 
ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতার লীড পার্টনার স্মার্ট টেকানোলজি (বিডি) লি: কম্পিউটার/হার্ডওয়্যার বিক্রেতা, কোন সফটওয়ার কোম্পানি নয়। এত বড় জটিল ও ব্যাপকভিত্তিক এবং দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও উপযুক্ত লোকবল, কোনটাই এদের নেই। এছাড়া এর বিদেশি অংশীদার ডেইজী টেকানোলজি বুলগেরিয়ার কোম্পানি হলেও তারা চীনে তৈরি ইএফডি বিক্রি করে মাত্র। এর আগে এদের কাছ থেকে ইসিআর আমদানি করে বাংলাদেশি একটি কোম্পানি পরবর্তীতে চুক্তি অনুযায়ী আফটার সেলস সার্ভিস পায়নি। ফলে ডেইজী টেকানোলজি’র তৈরি ইসিআরগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ঠ হয়ে আছে। তাই ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে এদের সাথে ‘সরাসরি ক্রয় চুক্তি’তে সরকারের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবেনা। বরং প্রকল্পটি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা রয়েছে।
এনবিআর এর পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম বছরে ১০ হাজার ইএফডি, পরবর্তী ৪ বছরে আরও ৯০ হাজার ইএফডি, ৫ বছরে মোট ১ লাখ ইএফডি, ৫ শ’ এসডিসিসহ ব্যাকএন্ড মানেজ সার্ভিস কেনার কথা থাকলেও গত ১৭ জুলাই অর্থমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে ৩০-৪০ লাখ ইএফডি/এসডিসি মেশিন ক্রয়/স্থাপন করতে হবে। অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে ৩১ জুলাই জানিয়েছেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরেই ৯০ হাজার ৩ লাখ ইএফডি, ১৫ শ’ এসডিসিসহ ৫ বছর ম্যানেজ সার্ভিস কেনা হবে। এজন্য ক্রয় আইন পিপিএ-এর ৬৮ ধারায় জরুরি প্রয়োজন দেখিয়ে এবং পিপিআর-এর বিধি ৭৬ এর মাধ্যমে দরপত্র ছাড়া কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠিয়েছেন। যা ৩১ জুলাই সার্কুলেশনের মাধ্যমে কমিটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের দ্বিতীয় দফা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। অভিযোগ উঠেছে, তৃতীয় দফায় তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ লাভের সম্ভাবনা না থাকায় বিদায়ের আগে একের পর এক অযোগ্য কোম্পানির সাথে চুক্তি করে আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণে এনবিআর এর শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় চরম অস্থিরতা লক্ষণীয়। এই অস্থিরতার ফলে ভ্যাট অনলাইন চালু করতে আরও জটিলতা সৃষ্টি ও বিলম্ব হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)