রবিবার, ২০-অক্টোবর ২০১৯, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বিটিসিএল কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রে ভেস্তে গেলো ট্রিপল প্লে সেবা কর্মসূচি

বিটিসিএল কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রে ভেস্তে গেলো ট্রিপল প্লে সেবা কর্মসূচি

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি আর ষড়যন্ত্রে ভেস্তে গেছে ‘এক ক্যাবলে তিন সেবা’ কর্মসচি। এতে বিটিসিএল যেমন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি এ বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদেরও। কথা ছিল ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ নামক প্রকল্পটি শেষ হওয়া মাত্রই একই সংযোগ থেকে ভয়েস কল, ইন্টারনেট ও টিভি ব্যবহারের সুবিধা পাবেন গ্রাহকরা। মূলত এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানি বিটিসিএল ১ সেপ্টেম্বর ২০০৯ সালে ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’(টিএনডিপি) তৈরির ঘোষণা করে। বাস্তবায়নে সুবিধার জন্য টিএনডিপি প্রকল্পটিকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়। লট-এ অংশে ট্রিপল প্লে সেবা বা এক কেবলে তিন সেবা কার্যক্রম চালুর লক্ষে ২০১১ সালে “১৭১ কেএল বা এক লাখ ৭১ হাজার” নামে আরেকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্তু এ কর্মসূচি পুরোপুরিই ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। কারণ তিন সেবার মধ্যে টিভি ব্যবহারের সুবিধাটি চালুই করতে পারেনি, তার আগেই প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে সীমিত কিছু গ্রাহককে যে দুটি সেবা- ভয়েস কল ও ইন্টারনেট দেয়া হয়েছিল সেগুলোও নানা অনিয়ম আর নি¤œমানের সেবার কারণে গ্রাহকরা বিরক্ত ও হতাশ। অনেক গ্রাহক এ সেবা ইতিমধ্যে বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, অবনতিশীল ও বিপদগ্রস্ত বিটিসিএল’র ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এটি ছিল একটি ভালো সুযোগ। কিন্তু সংস্থাটির দুর্নীতিবাজ ও ষড়যন্ত্রকারী কর্মকর্তাদের অপকর্মের কারণে এই সুযোগকে কাজে লাগানো যায়নি। প্রথমত, বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এই প্রকল্পের অর্থে লাগামহীন লুটপাট চালায়। এতে বিদেশিরা তাদের সাহায্যের সিংহভাগই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে, এই চক্রটিও চাচ্ছিল প্রকল্পের কার্যক্রম ভেস্তে যাক। কারণ, তারা বেসরকারি মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এবং টিভি কেবল অপারেটরদের সঙ্গে দীর্ঘদিন আগেই বুকড হয়ে রয়েছে। বিটিসিএল’র ‘এক কেবলে তিন সেবা’ ভালোভাবে চালু হলে মানুষ এই সেবার দিকেই ঝুঁকে পড়তো। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হতো বেসরকারি ফোন, ইন্টারনেট ও কেবল অপারেটররা। 
জানা গেছে, জাপানের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ সহায়তায় বিটিসিএলের নেয়া (টিএনডিপি) প্রকল্পটি শুরু হয়। ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের “১৭১ কেএল বা এক লাখ ৭১ হাজার” প্রকল্পটি দুই দফায় সময় বাড়িয়েও শেষ পর্যন্ত কাজ অসমাপ্ত রেখে ২০১৫ সালের জুন মাসে প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। ওই প্রকল্পের অধীনে যতটা কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে তার ভিত্তিতে শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের কিছু এলাকায় মাত্র ২৬শ’ গ্রাহককে অনেকটা এখন পরীক্ষামূলকভাবে ভয়েস কল ও ইন্টারনেট এই দুই সুবিধা দেয়া হচ্ছে। যদিও প্রকল্পটির শুরুতে বলা হয়েছিল একসঙ্গে ২ লাখ ৩৯ হাজার গ্রাহক ‘একের ভেতর তিন’ এই সুবিধা নিতে পারবেন। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দুই সুবিধাপ্রাপ্ত গ্রাহকের সংখ্যা ২৬শ’ বলে বিটিসিএল’র পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা আরো কম। সীমিত সংখ্যক গ্রাহক এই ট্রিপল প্লে বা ত্রিমাত্রিক সেবা নেটওয়ার্কের নামে পাচ্ছেন শুধু ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সুবিধা। কিন্তু টিভি দেখার সুবিধা এখনও চালুই করতে পারেনি বিটিসিএল। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা শীর্ষ কাগজের এ প্রতিবেদককে বলেছেন, ত্রিমাত্রিক সেবা দেয়ার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপনের ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম করে কাজ অসম্পন্ন রাখায় গ্রাহক সেবা দেয়া এখন প্রায় অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি চালু করতে নাকি আবারো আরেকটি প্রকল্প হাতে নিতে হবে। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সেবার নিম্নমান এবং টিভি ব্যবহারের সুবিধা না থাকার পেছনে দুর্নীতি-অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে। যা এখন দৃশ্যমান। এই দুর্নীতিতে জড়িত আছে প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকর্তা এবং মোবাইল ফোন অপারেটর, ইন্টারনেট ও ডিস ব্যবসার সাথে জড়িত একটি সিন্ডিকেট চক্র। তবে সংশ্লিষ্টরা একে সরকারি মালিকানাধীন সেবাদানকারী এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটিকে নামে মাত্র বাঁচিয়ে রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করাই সিন্ডিকেটের উদ্দেশ্য। বিটিসিএল-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, জনগণকে অত্যাধুনিক সেবা দেয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে নেয়া এ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পরও তার সেবা যে মানুষ পাচ্ছে না তা নিয়ে মন্ত্রণালয় বা বিটিসিএল এর কেউই তেমন গা করছে না। তারা বলেন, এই প্রকল্পটি কার্যকর না করা বা সেবা মানুষকে না দেয়াটা সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্রও হতে পারে। 
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে করা ৮০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) প্রকল্পে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা হরিলুট হয়। তৎকালীন তিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজিজুল ইসলাম, কলিম উল্যা ও মাহফুজ উদ্দীন আহমেদ, প্রকল্প পরিচালক অশোক কুমার মন্ডল এবং পরিচালক (সংগ্রহ) সাহাবুদ্দীনের বিরুদ্ধে অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠে। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রাথমিক অনুসন্ধান ও জাপানি প্রতিষ্ঠান এনইসির অভিযোগেও বিষয়টির সত্যতা মেলে। তবে আদালতে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় বিটিসিএল, ধারণা করা হয় দুর্নীতির ফাইল আর নথিপত্র আগেভাগেই গায়েব করে ফেলা হয়েছিল। 
উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের অর্থে ৪৫০টি সিলিং ফ্যান কেনায় মোট ৫ লাখ ৬৮ হাজার মার্কিন ডলার খরচ দেখানো হয়। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৪ কোটি ৫৫ লাখ! অর্থাৎ প্রতিটি ফ্যানের দাম পড়ছে প্রায় এক লাখ এক হাজার টাকা! এটি নিয়ে ব্যাপক হইচই হয়। অস্বাভাবিক মূল্যের কারণে সংসদীয় কমিটি ক্ষোভও প্রকাশ করে।
‘এক কেবলে তিন সেবা’ প্রকল্পটি বর্তমানে জিপোন নামে পরিচিত। জিপোনের প্রকল্প পরিচালক মো আসাদুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি অনেক বিষয়ই এড়িয়ে যান। প্রকল্পটির পূর্বাপর কিছুই জানেন না বলে এ প্রতিবেদককে জানান। তিনি শুধু বলেন, বিটিসিএলে আর পাঁচটি সেবার চেয়ে এটি ব্যতিক্রম। সারাদেশে পৌঁছতে সময় লাগবে। এর বাইরে আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি। অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ছিলেন অশোক কুমার ম-ল। 
ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ব্যাপারে তিনি কোন তথ্য দেননি এমনকি তাদের কারো ঠিকানা দেয়ার অনুরোধ করা হলেও তা তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, গ্রাহকরা বিরক্ত হবেন এমন হাস্যকর যুক্তি দেখিয়ে গ্রাহকদের কোন তথ্য দেননি বিটিসিএল এর এ কর্মকর্তা।
তথ্যের জন্য বিটিসিএলএ’র বর্তমান মহাব্যবস্থাপক (মেরামত ও সংরক্ষণ) আলিমুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন প্রকল্প পরিচালক আসাদুজ্জামান। কিন্তু আলিমুজ্জামানের কাছে মৌখিক তো নয়ই, লিখিত আকারে কিছু প্রশ্ন করেও উত্তর পাওয়া যায়নি। 
প্রকল্পটির সাথে জড়িত এক কর্মচারী বলেন, এ প্রকল্পটি কাগজে কলমে শেষ হয়ে গেলেও বাস্তবে এখন পর্যন্ত বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এগুলো শেষ না হলে সাধারণ গ্রাহকের কাছে সেবা পৌঁছানো যাবে না। কিন্তু ট্রিপল সেবা সম্পর্কে মাথা ঘামাতে নারাজ বড় স্যারেরা।
তবে সবকিছুর মূলে রয়েছে একশ্রেণির কর্মকর্তার পকেট ভরার ফন্দি। কেন না বিটিসিএল এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিও নতুন কিছু নয়। এমনটাই বলেছেন, বিটিসিএল এর বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। একটা সময় ছিল ল্যান্ডফোনের একটি লাইন পেতে গ্রাহকরা মাসের পর মাস অপেক্ষা করতেন। টিএন্ডটির একটি লাইন পাওয়া ছিল একটি পরিবারের কাছে উৎসবের মতো। দিনে দিনে পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটেছে যে, এক সময়ের এতো জনপ্রিয় সেবাটি বর্তমানে সরকারি অর্থায়ন ছাড়া চলতে পারে না। সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ দিনের পর দিন ল্যান্ডফোন বিকল হলেও সংশ্লিষ্ট অফিসে জানিয়েও মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয় না। গ্রাহক সেবা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দীর্ঘদিনের। দিন দিন গ্রাহক বৃদ্ধি হবার কথা থাকলেও কমতে কমতে একেবারে তলানিতে এসে নামছে। এর আয়ও মারাত্মকভাবে কমছে। বিটিসিএল এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বেসরকারি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির বহুল ব্যবহারেই ল্যান্ডফোনের এমন বেহাল দশা বলে দূষছেন। 
অথচ এক ক্যাবলে তিন সেবা চালু হলে গ্রাহক সংখ্যা নিঃসন্দেহেই বাড়তো। দেশের ঢাকাসহ সারাদেশে বিটিসিএল এর কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ না থাকায় অনেকটা আরাম আয়েশে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। আধুনিক যুগে সরকারি এ সেক্টরটি সবার মান ভাল রাখলে কয়েক লাখ মেধাবী তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতো। সরকারকে এ খাতে ভর্তুকীও দিতে হতো না। 
অভিযোগ উঠেছে, ল্যান্ডফোন, ইন্টারনেট সেবার দুরাবস্থা ও ধীর গতি এবং টিভি-ভিডিও সেবা চালু না হওয়ার পেছনে প্রতিষ্ঠাটির কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত। যারা ডিশ টিভি ও ইন্টারনেট সেবা দেয় তাদের সাথে যোগসাজশে কর্মকর্তারা কৌশলে এটি বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। তবে একথা মেনে নিতে নারাজ বিটিসিএল কর্মকর্তারা। তাদের মতে, কারিগরি ত্রুটির কারণেই নাকি গ্রাহক পর্যায়ে সেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এ ত্রুটি দূর করতে বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। টাকা পাওয়া যাচ্ছে না বলে ট্রিপল প্লেও চালু করা যাচ্ছে না। 
প্রকল্পটিতে ছিল এনজিএন-ভিত্তিক সফট-সুইচের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির টেলিফোন, টিভি এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা যাবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বমানের টেলিযোগাযোগ সেবা, যেমন ফাইবার টু দ্য বিল্ডিং, ফাইবার টু দ্য হোম ও ফাইবার টু দ্য অফিস সেবা দেয়া সহজ হবে। ফলে গ্রাহকরা একই সঙ্গে ভয়েস, ভিডিও এবং ডাটা সেবা উপভোগ করতে পারবেন। ইন্টারনেট সেবা গ্রাহক পর্যায়ে দেয়ার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিং এ দেয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা বিলের ৭% পাবেন। কঠিন শর্ত, গ্রাহকের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। যা এখন চুক্তিতেই রয়েছে বাস্তবে নেই।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির গলা কাটা কলরেট, ইন্টানেট ব্যবসার মাধ্যমে অতিরিক্ত বিল আদায়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ডিস লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্নের মতো দুর্ভোগ ও প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পেত মানুষ। কম খরচে ভাল সেবা পেত সাধারণ গ্রাহক ও এরসঙ্গে আসতো বিপুল পরিমাণে রাজস্ব। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভয়েস কল, ইন্টারনেট ও ডিস ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করছে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানটি সরকারের দেয়া অর্থ ছাড়া চলতে পারছে না। খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে ঢাকাসহ দেশের ল্যান্ডফোনের অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রম। লাখ লাখ টাকা বিল বকেয়াসহ ক্যাবল চুরি, খারাপ এবং মেরামতের অভাবে গ্রাহক একবারেই নিম্ন পর্যায় নেমে এসেছে। শুধুমাত্র সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ অফিস ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে ল্যান্ডফোন ব্যবহার নেই বললেই চলে। গ্রাহক টানতে অবশেষে মাসিক ১৫০ টাকার অফার ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি, তারপরও সাড়া মিলছে না সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির ল্যান্ডফোন সেবায়।
অভিজ্ঞমহলের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ‘এক কেবলে তিন সেবা’ প্রকল্পটি বিটিসিএল-কে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একটি ভালো সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগটি কাজে লাগানো যায়নি শুধুমাত্র দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অপকর্মের কারণেই। অভিযোগ আছে, ২০১৫ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে কেটি মারুবেনিকে ৪০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। শুধু তা-ই নয়, সে সময় বিটিসিএলের যন্ত্রপাতি বুঝে নেয়ার (পিএটি) কমিটিকে পাশ কাটিয়ে বিলটি পরিশোধ করা হয়েছে। প্রকল্পের কোনো দায়-দায়িত্ব আর ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নেই। 
২০১১ সাল থেকে জাপানের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকার ঋণ সহায়তায় বিটিসিএলের নেয়া টিএনডিপির প্রথমাংশ লট-বি’র মাধ্যমে ট্রিপল প্লে সেবা দেয়ার জন্য উন্নত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে শুরু থেকেই এ প্রকল্প ঘিরে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জাপানি ইয়েনে মূল্য পরিশোধের শর্ত লঙ্ঘন করে মার্কিন ডলারে মূল্য পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়ায় প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে যায়। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বসানোর আগেই যন্ত্রপাতি স্থাপন দেখিয়ে ঠিকাদারকে মূল্য পরিশোধের চেষ্টাসহ বিভিন্ন কারণে দফায় দফায় এ প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক ওঠে। অভিযোগ ওঠে, বিওকিউ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যয় বরাদ্দ চূড়ান্ত করার চেষ্টা নিয়েও। এই প্রকল্পের অপর অংশ লট-বি’র দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। আদালতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলে। মামলায় হেরে যায় বিটিসিএল। অথচ গৃহীত প্রকল্পের লট-বি অংশটি নানা অপকৌশলে শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবায়ন করা হয়নি। লট-বি’র মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলা শহরে নিরবছিন্ন অত্যাধুনিক ফাইবার অপটিক কেবল নেটওয়ার্ক স্থাপন করার কথা ছিল এবং পর্যায়ক্রমে প্রথমে রাজধানী, পরে বিভাগীয় ও জেলা শহরে একই সংযোগে ত্রিমাত্রিক সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ছিল। লট-বি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ অংশের জন্য বরাদ্দ ঋণও জাইকা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি টিএনডিপি প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের প্রমাণ পায়। 
এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি ছিল হতাশাজনক। দু’দফায় সময় বাড়িয়েও অগ্রগতি না হওয়ায় অবশেষে ২০১৫ সালের জুনে প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। যদিও ক্রমাগত লোকসানে অস্তিত্ব সংকটে পড়া বিটিসিএলকে লাভজনক করতেই ব্যয়বহুল ‘এক ক্যাবলে তিন সেবা’র মত প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, তবে শুরু থেকেই কেবল টিভি, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সেবাদাতা ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রকল্প নিয়ে আপত্তি করে। তাদের মদদেই নানা কৌশলে প্রকল্পের কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের কারণেই যেনতেনভাবে জোড়াতালি দিয়ে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প (টিএনডিপি) শেষ করা হয়। বিটিসিএলের টিএনডিপি থেকে এখন পর্যন্ত দেশের নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ যা কিছু হয়েছে তার নিবিড় তদন্ত করে অনিয়মের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে সংস্থাটির মধ্য থেকেই। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, টেলিযোগাযোগ খাত ঘিরে থাকা ধান্দাবাজ চক্রের জাল ছিন্ন করা না গেলে সরকারের মহৎ লক্ষ্য বাস্তবায়ন অসম্ভব। আর এখনো যদি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় তাহলে প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে সত্যিকার অর্থেই ট্রিপল প্লের উন্নত টেলিকম সেবা পৌঁছানো সম্ভব, যা বিটিসিএল-কে নতুন জীবন এনে দিতে পারে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)