রবিবার, ২০-অক্টোবর ২০১৯, ০৫:৫২ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • সরকারের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন স্বাস্থ্যসচিব

সরকারের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন স্বাস্থ্যসচিব

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৬:৪৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সরকার তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করেছে জনগণের তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। সেইসঙ্গে সরকারি কর্মকা-ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সরকারের লক্ষ্য। কিন্তু এই আইনের থোড়াই কেয়ার করছেন স্বাস্থ্যসচিব মো. আসাদুল ইসলাম। গাজীপুরের তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে দুর্নীতির মহোৎসব চললেও সে ব্যাপারে কোন গা করছেন না তিনি, উপরন্তু তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই সচিব। 
তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যন্ত্রপাতি এবং মালামাল ক্রয় সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তথ্য সরবরাহের ব্যাপারে তারা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের কাছে অনুমতি চেয়েও পাচ্ছেন না। এদিকে শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সচিবের সঙ্গে মৌখিক যোগাযোগ এবং লিখিতভাবে আপিলও করা হয়েছে। তারপরও সচিব তথ্য প্রদানের ব্যাপারে নির্দেশ বা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এক্ষেত্রে সচিব তথ্য অধিকার আইন সরাসরি লঙ্ঘন বা এক কথায় বলা যায় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে তথ্য অধিকার আইন, আছে শক্তিশালী ও সক্রিয় তথ্য অধিকার কমিশন। এমন পরিস্থিতিতেই একজন সচিব একটি মেডিকেলের দুর্নীতির তথ্য ঢেকে রাখতে বা চেপে যেতে কেন এত মরিয়া তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন আছে। 
মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটির চিকিৎসা সরঞ্জামসহ নানা সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি-লুটপাট ও সিন্ডিকেট নৈরাজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদের নামে নতুন প্রতিষ্ঠিত এ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণে বিগত বছরগুলোতে সরকার শ’ শ’ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ সেই অর্থের তেমন কোনো সুফল পাচ্ছে না। এর কারণ, সরকারের বরাদ্দ করা এসব অর্থের সিংহভাগই ঢুকেছে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের পকেটে। বিগত সময়ে এই অঢেল বরাদ্দের কেনাকাটায় কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। এমনও তথ্য জানা গেছে, অনেক যন্ত্রপাতি বা আসবাবপত্র কেনা-ই হয়নি, কিন্তু বিল পরিশোধ হয়ে গেছে। যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে সেগুলোর মূল্যও দেখানো হয়েছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও আকাশচুম্বি। যে মডেল ও যে দেশের যন্ত্রপাতির কথা দরপত্রে বা কার্যাদেশে বলা হয়েছে সেসব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। করা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি। মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রয়োজন নেই বা ব্যবহার করা যাচ্ছে না- এমন যন্ত্রপাতি-মালামালও কেনা হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপন করার পর সেগুলো চালুও করা যায়নি, এগুলোর বিলও পরিশোধ করে দেয়া হয়েছে। সিন্ডিকেট করে এভাবে সরকারি অর্থের হরিলুট হয়েছে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা সরকারি ডাক্তার-কর্মচারী ছাড়াও ব্যবসায়ী মাফিয়াচক্র। 
এসব লুটপাট-অপকর্মের চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরার জন্য সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডের উপর অনুসন্ধান চালানো হয়। তারই অংশ হিসেবে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ‘অফিসিয়ালি’ তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন তথ্যই দেননি। তারা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের দোহাই দিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে তথ্য না দিতে বলার বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে জানান, তথ্য প্রদানের অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু শেষাবধি সে তথ্য পাওয়াই যায়নি, অবশেষে তথ্য অধিকার আইন মেনে শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে আপিল করা হয়। যেহেতু সচিব আপিল কর্তৃপক্ষ তাই তার কাছেই আপিল করা হয়েছিল। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী আপিলের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সচিব যেসব পদক্ষেপ নেয়ার কথা সেই সময়ও ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। কিন্তু সচিব এ ব্যাপারে শীর্ষ কাগজের প্রতিবেদককে ফোনে জানিয়েছিলেন যে, তথ্য সরবরাহের জন্য মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। অথচ বাস্তবে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সচিবের পক্ষ থেকে পাঠানো এ ধরনের কোনো চিঠি হাতে পাননি বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। 
তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী আপিল কর্তৃপক্ষ ১৫ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করার কথা। তথ্য অধিকার আইনের ২৪ (৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘আপিল কর্তৃপক্ষ উপধারা (১) বা (২) এর অধীন আপিল আবেদন প্রাপ্তির পরবর্তী ১৫ (পনের) দিনের মধ্যে (ক) আপিল আবেদনকারীকে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করিবেন; অথবা (খ) তদবিবেচনায় গ্রহণযোগ্য না হইলে আপিল আবেদনটি খারিজ করিয়া দিবেন’। 
অর্থাৎ ১৫ দিনের মধ্যে আপিল আবেদনটি নিষ্পত্তি করতে হবে। তথ্য না পেয়ে স্বাস্থ্য সচিবের কাছে আপিল করা হলেও তিনি এ ব্যাপারে শুনানির জন্য কোন নোটিশই দেননি। তথ্য অধিকার আইনের অধীনে ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা প্রজ্ঞাপনের ৬ অনুচ্ছেদে শুনানির মাধ্যমে আপিল নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। ৬ অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়েছে যে, “৬(৩) আপিলকারীকে শুনানির জন্য অন্যূন ৩ দিন পূর্বে শুনানির তারিখ সম্পর্কে অবহিত করিতে হইবে। ৬(৪) আপিলকারী শুনানির সময়ে ব্যক্তিগতভাবে অথবা তাহার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি উপস্থিত থাকিতে পারিবেন। ৬(৫) যেক্ষেত্রে আপিল কর্তৃপক্ষ এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, আপিলকারী আপিল কর্তৃপক্ষের সম্মুখে শুনানিতে অংশগ্রহণ করিতে বাধাগ্রস্থ হইয়াছেন সেইক্ষেত্রে আপিল কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আপিলকারীকে শুনানির জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করিবেন।”   
অথচ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম এই আপিল সুরাহার ব্যাপারে কোনো নোটিশই আপিলকারীকে প্রদান করেননি। এমনকি তিনি অন্য কোনো ব্যবস্থাও নেননি। যদিও তিনি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তথ্য প্রদানের জন্য চিঠিতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাস্তবে তার এই বক্তব্যের কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কারণ, তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন তারা সচিবের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো চিঠি পাননি। 
শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে সচিবের কাছে সর্বশেষ আপিল করা হয়েছিল গত ৩০ জুন। সেই অনুযায়ী আপিল মীমাংসার সময়ও ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, সচিব মো. আসাদুল ইসলাম সরকারের আইন-কানুনের কোনো তোয়াক্কা করছেন না। বলা যায়, এক্ষেত্রে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন সচিব।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম নিজেকে একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করে থাকেন। নিকটজনদের কাছে তিনি একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতও, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তিনি শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দুর্নীতির চিত্র ঢেকে রাখতে এত মরিয়া কেন? সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, আসাদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ মন্ত্রণালয়ের আদ্যোপান্ত সব তার জানা। তিনি নিজেকে একজন সৎ কর্মকর্তা দাবি করেন, তবে তার এখনকার আচরণে এই সততার দাবি নিয়েও জনমনে সন্দেহের ডালপালার বিস্তার ঘটছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, তাহলে কি তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চরম দুর্নীতির সাথে সচিবের কোন সংশ্লিষ্টতা আছে? তিনি নিজেও কি এর সুফলভোগী? তিনি কী তাহলে সততার আবরণে কৌশলে অন্য কিছু করছেন? অবশ্য, চাকরির শেষ জীবনে এসে অনেক ভালো কর্মকর্তাও কেউ কেউ নীতি-আদর্শ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আখের গোছানোর ধান্দায় নেমে পড়েন। আসাদুল ইসলাম সেরকমেরই কিছু করছেন কিনা, এমন প্রশ্নও রেখেছেন কেউ কেউ।
সচিব আসাদুল ইসলামের কর্মকা- নিয়ে এতো যখন প্রশ্ন, তারই মধ্যে পাওয়া গেলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. আসাদ হোসেন শীর্ষ কাগজের এ প্রতিবেদকের কাছে অনেকটা বোমা ফাটানোর মতো তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেছেন, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কেনাকাটার তথ্য তারা সরবরাহ করতে পারছেন না স্বাস্থ্যখাতের গডফাদার বলে পরিচিত সেই মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর বাধার কারণেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী-সচিব উভয়ের সঙ্গেই গডফাদার মিঠুর দহরম-মহরম সম্পর্ক। মিঠু, আফতাব, সাজ্জাদ মুন্সী- এদের দ্বারা সচিব আসাদুল ইসলাম ম্যানেজড। আর এ কারণেই সচিব সরকারের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তথ্য প্রদানে বাধা দিচ্ছেন। অবশ্য, অধ্যক্ষ ও প্রকল্প পরিচালক আসাদ হোসেন নিজেও তথ্য প্রদানে আগ্রহী নন। কারণ তথ্য প্রকাশ হলে তিনিই তো প্রথম ফেঁসে যাবেন। বিগত সময়ে মিঠু, আফতাব ও সাজ্জাদ মুন্সীর হয়ে প্রকল্প পরিচালক আসাদ হোসেন এবং তার আগের প্রকল্প পরিচালক সুভাস চন্দ্র সাহা এ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পের কেনাকাটায় ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছেন।
গাজীপুর জেলা সদরের একমাত্র এই হাসপাতালটি এক সময় ছিল ৩৩ শয্যার। কয়েক বছরের মধ্যে হাসপাতালটি মেডিকেল কলেজে রূপান্তর এবং ৫শ’ শয্যায় উন্নীত করায় শ’ শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ হয় এখানে। প্রশ্ন উঠেছে, বাস্তবে সে বরাদ্দের টাকা কতটা ব্যয় হয়েছে এই হাসপাতালের উন্নয়নে? কতটা সুফল পাচ্ছেন, এই হাসপাতালের রোগী? এই মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন যেসব শিক্ষার্থী, তারাই বা কতটা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন সে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কেন না সার্বিক অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের এবং জনমনে এ ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, এই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি পরিণত হয়েছে লুটপাট আর দুর্নীতির আখড়ায়। আর তাই শীর্ষ কাগজ এই হাসপাতালের জন্য সরকারের যে ব্যয় বরাদ্দ তা কতটা আসলেই খরচ হয় বা যথাযথভাবে খরচ হয় কি না সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে পায় হাসপাতালের সিন্ডিকেটের দুর্নীতি-লুটপাটের নানা খবর। শীর্ষ কাগজ ইতিমধ্যে এই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দুর্নীতির কিছু চিত্র ধারাবাহিক দুটি প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে। 
সর্বশেষ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্যখাতে গত এক দশক ধরে একচ্ছত্র সিন্ডিকেট করা মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু দেশের অন্যান্য হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের মতো গাজীপুরেও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন। আফতাব আহমেদ ও সাজ্জাদ মুন্সীর সঙ্গে যোগসাজাশ করে অনেক কাজ এরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। বিশেষ করে প্রকল্প এবং মেডিকেল কলেজের কেনাকাটা অনেকটাই হয়েছে মিঠুর হাত দিয়ে। সারাদেশের মতো এখানেও চরম নৈরাজ্য চালিয়েছেন গডফাদার মিঠু। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে লুটপাট চালিয়েছেন তিনি। হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারের বিপুল অংকের অর্থ।
উল্লেখ্য, রুহুল হক স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে মিঠু দেশের চিকিৎসা বা মেডিকেল সার্ভিসের ঠিকাদারির পুরোটার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, রুহুল হকের সঙ্গে মিঠুর ছিল সরাসরি লেনদেনের সম্পর্ক। রুহুল হকের ছেলেকে নিজের ব্যবসায়িক অংশীদার করে তারা দেশে-বিদেশে গড়ে তোলেন হাসপাতালসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শুধু তৎকালীন মন্ত্রীপুত্রই শুধু নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এ সময়ে কাজ করা সচিবসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই জড়িয়ে পড়েন মিঠুর সিন্ডিকেটে। ২০১৪ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদে নতুন মুখ হয়ে আসেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ার কথা বললেও তা তো হয়ইনি উল্টো অল্প দিনের মধ্যে সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মিঠুর দুর্নীতি আর দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের বিষয়টি শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও ছড়িয়ে পড়ে, দুর্নীতি বিষয়ক পানামা পেপারস-এ নাম এসেছিল এই মিঠুর। 
তার ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করলেও পরে তা বেশি দূর এগোয়নি। প্রভাবশালীদের নানা তৎপরতায় সে তদন্ত এখন হিমাগারে। তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও দুদক কাজ শুরু করেছে। কিন্তু এখানকার দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন স্বয়ং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব। 
ভূক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার, হাসপাতালের সুবিধাভোগীসহ সবারই দাবি, তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দুর্নীতির আসল চিত্র যাতে আড়ালে না পড়ে যায় সে ব্যাপারে সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে দুদকের তদন্তকারী দলকে। নয়তো নামে তদন্ত হবে কিন্তু দুর্নীতির কিছুই ধরা পড়বে না, বরং দুর্নীতি নেই এমন একটা সনদ পেয়ে যাবে তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দুর্নীতিবাজ চক্রটি। কেনাকাটার লিখিত পুরো এবং প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে দুদককে। কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে বের করতে হবে। তাহলেই সম্ভব হবে দুর্নীতি-অনিয়ম চিহ্নিত করা। গাজীপুরের এই হাসপাতালের দুর্নীতিবাজ চক্রটির মুখোশ দুদক উন্মোচন করতে সক্ষম হবে এমনটাই সবার আশা।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)