রবিবার, ২০-অক্টোবর ২০১৯, ০১:৩৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রে রেল: পরিণতি দুর্ঘটনা-শিডিউল বিপর্যয়

দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রে রেল: পরিণতি দুর্ঘটনা-শিডিউল বিপর্যয়

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৮:২৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: অনিয়ম মুক্ত হচ্ছে না সাধারণ মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য যানবাহন রেলগাড়ি। রেলের কর্মী নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন, কেনা-কাটা, টেন্ডার, যন্ত্রাংশ তৈরি ও মেরামত, টিকেট বিক্রি, গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোতে ক্যাটারিং সিস্টেম, বিনা টিকেটের যাত্রীদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে রেল দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সরকার রেলের উন্নয়নে বিভিন্ন সময় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও তা আলোর মুখ দেখছেনা। দেশীয় পরিবহন ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র, ভুল নীতি, দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে পরিকল্পনা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি-অপকর্মের সুযোগে বেড়েই চলেছে নিম্নস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতা। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রেলের সেবা, বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্ঘটনা, প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা। এর সঙ্গে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনাও বাড়ছে। ২ ঘণ্টা থেকে ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত ঈদ-উল-আযহায় দেরিতে ট্রেন চলাচল করেছে। ঈদ যাত্রায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের টিকিট কেটে আবার ট্রেন আসতে দীর্ঘ সময় লেট থাকায় ত্রিমুখী ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে ট্রেনের যাত্রীদের। বছরের পর বছর ধরে রেলে বিশৃঙ্খলা ও লোকসানি খাত হয়ে থাকার পেছনে রয়েছে আরো কিছু কারণ। এর মধ্যে অব্যবস্থাপনা ও জনবল সঙ্কট অন্যতম। চেকআপহীন ট্রেন চলাচল এবং জনবল সঙ্কটের কারণে সারাদেশে ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার লাইনই চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে বাড়ছে লাইনচ্যুতর ঘটনা। অনেক জংশন পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আখড়ায়। ট্রেনের সিট ভাঙাচোরা, চোরাকারবারি ও হকারদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ যাত্রীরা। এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন রেলপথে যাতায়াত করছেন লাখ লাখ মানুষ। 
সূচি বিপর্যয়
একটি লাইনচ্যুত কিংবা দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটলে কয়েক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এর জের টানতে হয় পুরো সপ্তাহ। প্রতিটি আন্তনগর ট্রেন এক সপ্তাহ পর এক দিন বন্ধ থাকে। পুরো সপ্তাহে যেসব ট্রেন বিলম্বে চলাচল করে, বন্ধের পরদিন থেকে সেগুলো স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়। কিন্তু পথে একটি ট্রেনের লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা পুরো প্রক্রিয়া ভন্ডুল করে দেয়। এবারের ঈদযাত্রায় রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে রেলের সময়সূচির ক্ষেত্রে তেমনটাই ঘটে। ঈদযাত্রা শুরুর পর থেকে এই তিন বিভাগে চলাচলকারী সব ট্্েরন ২ থেকে ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে চলে। গত ১৯ আগস্ট রংপুর এক্সপ্রেসটি ঢাকা থেকে লালমনিরহাটে পৌঁছে ২২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট দেরিতে। রেলের হিসাবে, চলতি আগস্টের প্রথম ১৯ দিনে পূর্বাঞ্চলে সাতটি লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। আর পশ্চিমাঞ্চলে লাইনচ্যুত হয়েছে আটটি। এর মধ্যে দুটি লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রধান লাইনে। গত ৯ আগস্ট টাঙ্গাইলে সুন্দরবন ট্রেন লাইনচ্যুত হলে চার ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। টাঙ্গাইল রেলপথ পূর্বাঞ্চলের অধীন। তবে এই পথ ধরে যেসব ট্্েরন চলাচল করে, এর সবগুলোই পশ্চিমাঞ্চলের। পশ্চিমাঞ্চলের অধীনে রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগ। এর মধ্যে ঝিনাইদহে ট্রেন লাইনচ্যুতর কারণে সাড়ে আট ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ট্রেনের সময়সূচি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে ঢাকার পথে ৩২টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। ঈদে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮টি। ঈদের ১৫ দিনে এই পথে কোনো ট্্েরনই সময় মেনে চলতে পারেনি। বিশেষ করে গত ২৬ আগস্ট পযর্ন্ত অনেক ট্রেনকে বিলম্বে চলতে দেখা গেছে। রেলের হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে ৬৩৯টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে ৩৯৯ বার গুরুত্বপূর্ণ পথে লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি সপ্তাহে গড়ে দুটি করে লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। লাইনে সমস্যা হলে কিংবা বগিতে ত্রুটি থাকলে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। রেললাইনে পাথর কম থাকা এবং সিøপার ও নাটবল্টু আলগা হওয়ায়ও ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে থাকে। আর এই সব কারণে অনেক সময় জরাজীর্ণ লাইনে বেশি গতিতে ট্রেন চললে লাইনচ্যুত হতে পারে। এছাড়া একটি বগির নিচের অংশে বিপুল কলকব্জা থাকে। এটাকে ‘আন্ডার গিয়ার’ বলা হয়। কোনো একটা কলকব্জায় ত্রুটি হলেই ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। অনেক সময় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপেও কলকব্জা বিকল হয়ে যেতে পারে। রেলের হিসাবে, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে রেলের পূর্বাঞ্চলে ২৭ বার ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। এর ফলে ট্রেন চলাচলে সার্বিক বিলম্ব হয়েছে ৬৪ ঘণ্টা। পূর্বাঞ্চলে মার্চ-এপ্রিলে ইঞ্জিন বিকল হয় নয়বার। 
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন র্শীষ কাগজকে বলেন, ঈদে স্পেশাল ট্রেনের কারণে নিয়মিত রুটের ট্রেনের শিডিউল বির্পযয় ঘটেছে। তাই এবার থেকে কোনো স্পেশাল ট্রেন রাখা হবে না। নিয়মিত ট্রেনের সাথে অতিরিক্ত যাত্রীবাহী বগি সংযোগ করে ঈদের সেবা দেয়া হবে যাত্রীদের। ফলে নিয়মিত ট্রেনের সাথে চললে শিডিউল বিপর্যয় তেমন একটা হবে না। যাত্রী সেবা নিয়ে তিনি বলেন, মূলতঃ রেলের লোকবলের সংকটের কারণে আমরা সঠিকভাবে যাত্রীদের সেবা দিতে পারছি না। এমনও স্টেশন আছে সন্ধ্যায় বাতি জ¦ালানোর লোক নেই। রেলের জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে, সম্পূর্ণ হলে সেবার মান বাড়াতে পারবো। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী রেলে এখন ২৬ হাজার ৪৩ জনবল আছে। 
কমলাপুর স্টেশনে এক ট্রেন চালকের সাথে আলাপকালে তিনি শীর্ষ কাগজের এই প্রতিবেদককে জানান, অধিকাংশ স্থানে নেই নুড়ি পাথর। লাইন ক্ষয়, দুর্বল সিøপার, নড়বড়ে লাইনের পাত, যা আছে তাও আবার পাহারার অভাবে চুরি হয়ে যায়। সঠিক সময়ে সংস্কারের অভাবে রেলপথে আগাছা আর ঘাসের রাজত্বসহ নানা কারণে রেলপথ দুর্বল থাকে। এসব ঝুকিপূর্ণ পথে একটু গতি বাড়ালেই লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। রেলের সময়সূচি বিপর্যয় সম্পর্কে বিশেজ্ঞরা বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এমনটি হচ্ছে। ট্রেনে কারিগরি ত্রুটি বা সংকেতের ভুলের কারণে দুর্ঘটনা হয়। কিন্তু লাইনচ্যুতটা পুরোপুরি অবহেলার ফল। লাইন, ইঞ্জিন-কোচ রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়নি। আর বিনিয়োগ হয়ে থাকলেও তা অপচয় ও দুর্নীতি হয়েছে। রেল খাতে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে সরকারি নজরদারি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তারা। রেলের সূত্র জানায়, গত ১১ বছরে রেল খাতে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। নতুন লোকবল নিয়োগ হয়েছে ১৩ হাজারের মতো। এরপরও রেলে লাইনচ্যুতির ঘটনা কমেনি, বরং বেড়েছে।
রেলওয়ের দুর্ঘটনা
মৌলভীবাজার কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় গত ২৩ জুন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস ট্র্রেনটি। ঘটনস্থলেই নিহত হয় চার জন, আহত হন শতাধিক যাত্রী। সাম্প্রতিক সময়ের এটি সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। এছাড়া প্রতিনিয়তই ছোটখাটো দুর্ঘটনা বা লাইনচ্যুতি হচ্ছে। ওইসব দুর্ঘটনায় জানমালের বড় ধরনের খতি না হলেও ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়সহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। রেলের হিসাব বলছে, ২০১৪ সাল থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৮৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ১১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। লেভেল ক্রসিংয়ে ৯৬টি দুর্ঘটনা ঘটে। তাদের প্রায় সবাই ক্রসিং পার হতে যাওয়া বাস, মাইক্রোবাস ও ছোট যানবাহনের আরোহী। তবে রেলক্রসিং পারাপারের সময় যেসব পথচারী প্রাণ হারান সেই হিসাব রেল কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে না। দিন দিন রেলপথে লাশের মিছিল দীর্ঘ হলেও কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙতে চাইছে না। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে দুর্ঘটনা রোধে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়ক রেলক্রসিংয়ের পরিবর্তে ফ্লাইওভার, ওভারপাস, আন্ডারপাস নির্মাণ, অননুমোদিত রেলক্রসিং বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় স্থানে অনুমোদিত ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া, ভবিষ্যতে রেলের অনুমতি ছাড়া রেলক্রসিং নির্মাণ রোধ করাসহ নানারকম সিদ্ধান্ত একাধিকবার নেয়া হলেও তা বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেই। এতে করে রেলপথ ও রেলওয়ে ক্রসিংগুলো আতঙ্ক হয়ে আছে। কোন দুর্ঘটনার পর তড়িঘড়ি করে তদন্ত কমিটি হলেও আলোর মুখ দেখে না কমিটির প্রতিবেদন। বাস্তবায়ন হয় না তদন্ত কমিটির সুপারিশ। দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসলেও পরে সবকিছু চলতে থাকে আগের মতো। ফলে রেলের অরক্ষিত ক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনা আর সেইসাথে প্রাণহানি বন্ধ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সারাদেশে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ২৮২ জন। ২০১৭ সালে মারা গেছেন ৩৪৬ জন। ২০১৬ সালে ৩০৫ জন। তবে ঢাকা রেলওয়ের অধীনে নারায়ণগঞ্জ থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু সীমানা পর্যন্ত এলাকায় ২০১৮ সালে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ৮৮ জন।
রেলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেলের আইন অনুসারে লাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে মোট ২০ ফুট এলাকায় যেকোনো মানুষ প্রবেশ করলেই তা আইনত দ-নীয় অপরাধ। এমনকি ২০ ফুটের মধ্যে কোনো গবাদিপশু প্রবেশ করলেও তা আটকের মাধ্যমে বিক্রি করে রেলওয়ের কোষাগারে জমার নিয়ম রয়েছে। এ জন্যই রেল কর্তৃপক্ষ ক্রসিং নিয়ে খুব একটা পাত্তা দেয় না। কর্তৃপক্ষের দাবি, অবৈধ লেভেল ক্রসিং বন্ধ করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে যাবে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি চালকদের অসতর্কতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে বলে দাবি রেল কর্মকর্তাদের।
দুর্বল অ্যাপ সেবা
যাত্রীদের সুবিধার জন্য দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় যোগাযোগ খাত রেলওয়ের ই-টিকেটিং কার্যক্রম চালু করা হয়। কথা ছিল অ্যাপের মাধ্যমে পঞ্চাশ ভাগ টিকিট বিক্রি হবে। যাত্রীরা স্বস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা দেখা গেল উল্টো। রেলওয়ের ই-টিকেটিং কার্যক্রমের দায়িত্ব ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস)-এর উপর। সেবা তো দূরে থাকুক, অদক্ষ এই কোম্পানি এখন রেলযাত্রীদের বিরক্তি আর হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নমানের অ্যাপ তৈরির কারণে সেখানে ঢোকাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। যারা কেউ কেউ ঢুকতে পেরেছেন তাদের কাছ থেকে দ্বিগুণ, তিনগুণ টাকা কাটার পরও টিকেট পায়নি, এলেও তা নির্ধারিত দিনের নয়। শুধু অদক্ষতাই নয়, এই কোম্পানিটির কর্মীরা জড়িয়ে পড়েছেন অনিয়মে। সিএনএসের সংযোজন রেলসেবা অ্যাপ নিয়ে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেশ কিছু রুটের টিকিট ছাড়ার আগেই সেগুলো কাটা হয়ে যাচ্ছে! এর সঙ্গে সিএনএসের অসাধু কর্মীরা জড়িত বলে যাত্রীরা অভিযোগ করছেন। অনলাইন হলেও ২৪ ঘণ্টা টিকেট কাটতে পারেন না যাত্রীরা। প্রতি টিকিটের চার্জ হিসেবে ২০টাকা করে বাড়তি কেটে নেয় সিএনএস। যদি কেউ একসঙ্গে ৪টি টিকেটও কাটে, তাহলেও তাকে ৮০ টাকা বাড়তি হিসেবে প্রদান করতে হয়েছে। রেলের এমন সেবায় সাধারণ যাত্রীরা হতাশা প্রকাশ করেন। ফলে ঈদ মওসুমে টিকিট ছাড়া যাত্রীর সংখ্যা অনেকগুণ বেড়ে যায়। মাইকিং করেও ঠেকানো যায় নি ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ। এতে করে লাভবান হয় ট্রেনে থাকা অসাধু কর্মচারীরা। এমনকি দেখা গেছে, সৈয়দপুরে ট্র্রেনের টিকিটসহ সিএনএসের স্থানীয় প্রতিনিধিকে আটকও করেছিল রেলওয়ে থানা পুলিশ। 
রেলের অ্যাপ ব্যবহারে ভোগান্তি ও ত্রুটি প্রসঙ্গে রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন জানান, যাত্রীদের রেলে টিকেট অ্যাপের মাধ্যমে সংগ্রহ করার দুর্ভোগের কথা জানতে পেরেছি। সেপ্টেম্বরে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস)-এর চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ইতিমধ্যেই টেন্ডার আহবান করা হয়েছে, নতুন কোম্পানির সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করে দায়িত্ব দেয়া হবে। নতুন কোম্পানি দায়িত্ব পেলে যাত্রীসেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে। 
আবার রেলের সবচেয়ে ছোট পদ থেকে বড় পদ, সব ক্ষেত্রেই নিয়োগে লাখ লাখ টাকা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। বরং মুজিবুল হকের আমলে দুর্নীতি-লুটপাট অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরের সুপারিশ দেখিয়ে নিয়োগ, অর্থ নিয়ে খাতায় নম্বর বাড়ানো থেকে শুরু করে প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। রেলের নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ৩০-৪০টি মামলা করেছেন সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী প্রার্থীরা। এতে এখনো রেলের নিয়োগ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে আছে। 
দুর্নীতি ও ব্যর্থতার চিত্র 
স্টেশনে টিকিট বিক্রিতে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। আবার টিকেট ছাড়া টাকা আদায় করে রেল কর্মকতা-কর্মচারীরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অপরদিকে সাধারণ যাত্রীদের ট্রেনের টিকেট চেকাররা যাত্রীদের টিকেট না দিয়ে ডকুমেন্ট ছাড়াই ইচ্ছামতো টাকা আদায় করেন। আর বিপুল অঙ্কের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে কতিপয় অসাধু কর্মকতা পকেটস্থ করছেন। তাছাড়াও ভিআইপি ও বিভিন্ন কোটায় ট্রেনের টিকিট রাখা হয় প্রায় ৩৮ শতাংশ। ট্রেন ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সেগুলো চড়া দামে বিক্রি করেন বুকিং ক্লার্ক থেকে শুরু করে রেলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। 
রেলের উন্নয়নে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ হলেও তা অবকাঠামোগত বা উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ততটা ব্যয় না করে অনেকাংশে পরামর্শক নিয়োগ, ফিজিবিলিটি টেস্ট, ভিজিবিলিটি টেস্টসহ অদৃশ্য নানা ধরনের প্রকল্পে ব্যয় করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্পের মূল কাজ সবেমাত্র শুরু হলেও এ প্রকল্পের জন্য পরামর্শক নিয়োগ, কিংবা ফিজিবিলিটি টেস্ট আগেই সম্পন্ন করতে খরচ করা হয়েছে শত শত কোটি টাকা। আবার ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুত গতির ট্রেন কবে চলবে, কে অর্থায়ন করবে তার কোনো হদিস না থাকলেও এ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ, ফিজিবিলিটি টেস্ট ইত্যাদি শুরু হয়েছে। রেলওয়ের অপারেশন বিভাগের আপত্তি সত্ত্বেও ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয় নিম্নমানের ডেমু ট্রেন। ক্রয় বাবদ বড় অংকের অর্থ খরচ ছাড়াও এ পর্যন্ত ডেমু ট্রেন থেকে রেলওয়ের লোকসান হয়েছে আরো প্রায় ১০০ কোটি টাকারও অধিক বলে রেলসূত্রে জানা গেছে। এ প্রকল্পে যে অর্থ ব্যয় বা গচ্চা গেছে তা দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১০-১২টি নতুন ট্রেন চালু করা যেত।
সরকার রেলের উন্নয়নের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় খুলে মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করলেও শুরুতেই হোঁচট খায়। শুরুতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হলেও তিনি কালো বেড়াল খুঁজে বের করার অঙ্গীকার করে নিজেই সেই বিশেষ বিড়ালের তিলক নিয়ে আউট হন। সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক দায়িত্ব নেয়ার পর সেসময় বলেছিলেন, অতীতের দুর্নীতি নিয়ে কিছু বলতে চাই না। আগে কী দুর্নীতি হয়েছে না হয়েছে তা সবাই জানে। তবে, আজ থেকে রেলে আর কোনো দুর্নীতি হবে না। কোনো দুর্নীতিকে আমি প্রশ্রয় দেব না। টিকিট কালোবাজারি বন্ধ করা, সঠিক সময়ে ট্রেন চলাচল ও ট্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমার মূল লক্ষ্য। কিন্তু সেই মন্ত্রীর এতো আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতিতে খুব একটা কাজ হয়েছে বলে তা তারা নিজেরাও দাবি করতে পারবেন না। তার কথার ফুলঝুড়িতে যাত্রী সাধারণের কোনো লাভ হয়নি। বরং মুজিবুল হকের আমলে দুর্নীতি-লুটপাট অতীতের সব রেকর্ড ছড়িয়ে যায়।
তবে রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, তার প্রধান কাজ হবে রেলের দুর্নীতি দূর করা। রেলের প্রকল্পগুলো যাতে যথা সময়ে শেষ হয় সে বিষয়ে নজর দেয়া। রেলের কর্মী নিয়োগের বিষয়ে অনেকগুলো মামলার জট রয়েছে, এসব দ্রুত সমাধান করা। মন্ত্রী হিসাবে শপথ নেয়ার ৮ মাস পার হলেও দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তেমন কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছেনা। রেলের অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত সিন্ডিকেটের কাছে তিনি নতি স্বীকার করবেন, নাকি এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেল বিভাগকে মুক্ত করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাবেন সেটাই দেখার বিষয়। 
রেল সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এর আগে যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। অনিয়ম-দুর্নীতি, লুটপাট আর নানামুখী সমস্যা থাকার কারণে সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। উন্নয়ন কাজ যদি সংশ্লিষ্ট খাতে দায়িত্বশীলরা বাস্তবায়ন না করে, তবে কোনো দিনই উন্নতি হবে না। তারই ফল হিসেবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এ সংস্থাটি। 
উল্লেখ্য ১৯৮২ সালের আগে রেলওয়ে বোর্ড চালু থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে ছিল না। শর্ষের ভেতর ভূত থাকলে সেই ভূত তাড়ানো যায় না। এ ভূত তাড়াতে সরকারের কঠোর অবস্থান নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। অর্থ বরাদ্দ হবে, সে অর্থের সদ্ব্যবহার হবে না, তা চলতে দেয়া যায় না। রেলকে আধুনিক এবং যুযোপযোগী করে যোগাযোগের সহজ মাধ্যম হিসেবে তোলার ক্ষেত্রে যারা প্রতিবন্ধক হয়ে আছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশিক্ষিত-দক্ষ চালক, সহকারী, পয়েন্টম্যান, গেটম্যান স্টেশন মাস্টারসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাকর্মী ও মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে রেলওয়েকে নিরাপদ জনবান্ধব করতে হবে। তাহলেই রেলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)