রবিবার, ২০-অক্টোবর ২০১৯, ১২:৪৮ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের বিদায়, সিন্ডিকেটের কী হবে?

আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের বিদায়, সিন্ডিকেটের কী হবে?

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৮:২৮ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: আইন মন্ত্রণালয় কি সাবেক আইন সচিব জহিরুল হকের ছায়া থেকে মুক্তি পাবে? আইন মন্ত্রণালয়ে কান পাতলেই শোনা যায় এ কথাটি। আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে গত ৭ আগস্ট সরকারি চাকরি থেকে বিদায় নেন তিনি। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আইন সচিবের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আবু সালেহ মো: জহিরুল হক। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে তার অবসরের স্বাভাবিক সময় হলেও সে সময় তাকে দু’বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়।  এ মেয়াদ শেষ হয় গত ৭ আগস্ট। চার বছরেরও বেশি সময় আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকাকালে তিনি অনেকটা এক হাতে দাপটের সঙ্গে চালিয়েছেন মন্ত্রণালয়। এ সময় একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে মন্ত্রণালয়ে। নিয়োগ বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে এ সিন্ডিকেট। সচিব জহিরুল হকের প্রত্যক্ষ মদদ আর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এই সিন্ডিকেট আইন মন্ত্রণালয়ে অনেক বেআইনি ও অবৈধ কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সচিবালয়ে তিনি পরিচিত ছিলেন দুলাল হিসেবে। তাকে বলা হতো আইন মন্ত্রণালয়ের আদরের দুলাল। তার বিদায় অনুষ্ঠানে তারই ঘনিষ্ঠ এক সহকর্মী তাকে ‘আইন মন্ত্রণালয়ের আদরের দুলাল’ হিসেবেই অভিহিত করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের ‘আদরের দুলাল’ বিদায় নিলেও তার ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।
দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের কাছে কার্যতঃ জিম্মি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অপেক্ষায় ছিলেন জহিরুল হকের বিদায়ের জন্য। কেন না তারা মনে করেছিলেন, সচিব জহিরুল হক বিদায় নিলে এই সিন্ডিকেট দুর্বল হয়ে পড়বে। জানা গেছে, আইন মন্ত্রণালয়ের সদ্যবিদায়ী সচিব জহিরুল হকের পিএস (দায়িত্বপ্রাপ্ত) জামশেদ আলম ও ব্যক্তিগত সহকারি আবু কায়ছারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটে আরো ছিলেন আইন মন্ত্রণালয়েরই বিভিন্ন পদে কর্মরত মো: জালাল, আবুল কালাম, কিবরিয়া, রোজি বেগম, ফয়সাল, কিবরিয়া, রাসেল প্রমুখ। 
আইন মন্ত্রণালয়ের বদলি আর নিয়োগের ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, জেলা পর্যায়ের একটি পদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা হস্তক্ষেপ করতো, শুধু হস্তক্ষেপই নয় এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেছে এ সিন্ডিকেট। জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রার আর নিকাহ রেজিস্ট্রার  নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেট ছিল বেপরোয়া। মন্ত্রণালয়ের অনেক ফাইলই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে, তাই ফাইল আটকে কার্যোদ্ধার করায় তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। ‘ফুয়েল ছাড়া ফাইল নড়ে না’ এ কথাটি একটু যেন বেশিই সত্য ছিল এই সিন্ডিকেটের কাছে।
নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেয়া নিয়ে দুর্নীতির বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। সংশ্লিষ্টরা বলছে, নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সবসময় দু’টি বিষয় কাজ করে আর তা হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয় আর অর্থ। তবে জহিরুল হকের সিন্ডিকেটের কাছে রাজনীতি বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, একমাত্র বিবেচ্য ছিল টাকা। কে কত টাকা দিতে পারতো তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করতো নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি। আবার অনেক সময় টাকা নিয়েও নিয়োগ দিতে পারতো না, কেন না দেখা গেছে, একই স্থানের জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকেই টাকা নিয়ে বসে আছে এই সিন্ডিকেট। নিয়োগে দুর্নীতির শিকার হয়ে আইন সচিবের কাছে আবেদন করেও কোন প্রতিকার মেলেনি, আর মিলবেই বা কী করে? যেখানে সচিবের প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এসব কাজ করছে সিন্ডিকেট।
আইন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই সিন্ডিকেটের প্রধান জামশেদ আলম ও আবু কায়ছার আইনসচিব জহিরুল হকের নাম ভাঙিয়ে এসব কাজ করতেন। এরা নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। কায়ছারের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালির লেবুখালিতে তিন তলা দালান বানিয়েছেন তিনি। বরিশালেও রয়েছে তার পাঁচতলা ভবন। নামে- বেনামে তার আরো অনেক সম্পদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার একাধিক সহকর্মী। 
এই সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য উপ-সচিব রেজিস্ট্রেশন নাজমুল হক। সচিবের দপ্তর থেকে ফাইল যেত তার কাছে। আর এই ফাইল নিয়ে যেতেন এ শাখার পিয়ন রাসেল। সিন্ডিকেটের সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত রাসেল ফাইল নিজের ড্রয়ারেই আটকে রাখতেন। লেনদেন শেষ হলে কিংবা দরকষাকষি শেষ হলে যথাস্থানে ফাইল দিয়ে আসতেন রাসেল।
আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব জহিরুল হক বিদায় নেয়ার পর এই সিন্ডিকেটের তৎপরতা আগের মতোই চলছে। তবে সচিবই যেখানে ছিলেন তাদের সব শক্তির উৎস তিনি বিদায় নেয়ায় স্বভাবতই কিছুটা বেকায়দায় পড়েছেন তারা। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এক ধরণের সাড়াশি অভিযান চালানোর জন্য এরিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দাবি উঠতে শুরু করেছে। জানা গেছে, সিন্ডিকেটের বিষয়টি এরিমধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নজরেও এসেছে। তিনি নিজেও মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তির স্বার্থে বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখবেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ।
এরইমধ্যে নিজ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সদ্যবিদায়ী আইন সচিবের ব্যক্তিগত সহকারি ও সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য আবু কায়ছারকে। সরিয়ে দেয়া হয়েছে অফিস সহায়ক আবদুল মজিদকেও। তাদের দু’জনকেই সলিসিটর শাখায় বদলি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলেছে, সচিব জহিরুল হকের হাত থেকে আইন মন্ত্রণালয় রেহাই পেলেও নিষ্কৃতি মেলেনি তার আশীর্বাদপুষ্ঠ দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে। আইন মন্ত্রণালয়কে জহিরুল হকের ছায়ামুক্ত করতে মন্ত্রণালয়ের বর্তমান প্রশাসন শক্তহাতে নেমেছে এবং এরই অংশ হিসেবে এ দু’জনকে বদলি করা  হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আরো কয়েকজন আছেন সম্ভাব্য বদলির তালিকায়। তাদের কাউকে কাউকে ঢাকার বাইরে পদায়ন করা হতে পারে বলেও জানা গেছে।
তবে এই সিন্ডিকেট সদস্যরাও বসে নেই। তারা নানাভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এজন্য তারা যেখানে যা প্রয়োজন তা খরচ করতেও রাজি। আবার কেউ কেউ নিজেদেরকে সংশোধন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কেউ কেউ যাতে অন্ততঃ ঢাকার ভেতরেই থাকা যায় সেজন্যও চেষ্টা তদবির চালাচ্ছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ৮/১০ বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। তারা নিজেরা দুর্নীতি করেছেন আবার তাদের দুর্নীতির সুবিধাভোগীর সংখ্যাও কম নয়, তাই দেখা যাবে এই সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় শেষ পর্যন্ত হয়তো মন্ত্রণালয়ের এই শুদ্ধি অভিযান মুখ থুবড়ে পড়বে। 
অবশ্য এর ভিন্ন মতের সংখ্যাও কম নয়, অনেকে বলছেন, আইন মন্ত্রণালয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হলেও এ মন্ত্রণালয়টি একটি বিশেষ স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ। আইন মন্ত্রণালয়ের বেআইনি কার্যক্রম বা তৎপরতার বিষয়টি একটু বেশিই সমালোচিত হয় আর তাই এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ দুর্নীতি বা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললেও সৎ, নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা সংখ্যাও এখানে কম নয়। মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই মূলতঃ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তারা মনে করেন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তির জন্যই এই সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সিন্ডিকেট ভাঙা গেলে তা শুধু এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে না, একই সাথে আইন মন্ত্রণালয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)