রবিবার, ২০-অক্টোবর ২০১৯, ১২:৫৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠিত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকা হরিলুট

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠিত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকা হরিলুট

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৪:১৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব খাতের আয় হলে সেই অর্থ দ্রুততম সময়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতরের এ রকমের আয়ের অর্থ মাসের পর মাস, এমনকি প্রায় এক বছর ধরে অধিদফতরের ব্যাংক একাউন্টে রেখে দিয়েছে। এ থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ, তাও নগদ লেনদেনের মাধ্যমে। এখন এই টাকার কোনো হিসাব দিতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। 
জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালক (প্রশাসন) দায়িত্ব নিতে গিয়ে এই অনিয়ম ধরা পড়ে। নতুন পরিচালক (প্রশাসন) সঙ্গে সঙ্গে চিঠি দিয়ে ওই ব্যাংক একাউন্টের লেনদেন স্থগিত করেন। ইতিপূর্বে পরিচালক (প্রশাসন) এর দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক (প্রশাসন)কে চিঠি দিয়ে ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে জবাব চান। কিন্তু উপপরিচালক (প্রশাসন) এর সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। হিসাবরক্ষক নাসিরউদ্দিনও এ অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে সদুত্তর দিতে পারেননি। ফলে এরপর পরিচালক (প্রশাসন) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য চিঠি লেখেন। মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। 
গত ৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও শৃঙ্খলা) এর নেতৃত্বে এ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১০ কর্মদিবসের সময় দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পার-২) শারমিন আক্তার জাহান স্বাক্ষরিত তদন্ত কমিটি গঠনের এই চিঠিতে বলা হয়, উপর্যুক্ত ও সূত্রোক্ত স্মারকের প্রেক্ষিতে পরিচালক (প্রশাসন), স্বাস্থ্য অধিদফতরের রূপালী ব্যাংক, মহাখালী শাখার হিসাব নং ২৩৯১ এর পরিচালনা বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ (কপি সংযুক্ত) তদন্তপূর্বক মতামতসহ আগামী ১০ (দশ) কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। তদন্তের দায়িত্ব পাবার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও শৃঙ্খলা) শেখ মুজিবর রহমান ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে কার্যক্রম শুরু করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক একাউন্টের লেনদেন স্থগিত রাখার জন্য তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। 
জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো: আমিরুজ্জামান গত ২৯ এপ্রিলে অবসরে যাওয়ার পর ওই পদের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করছিলেন উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মুনশী মো. ছাদুল্লাহ। নিয়ম অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদফতরের যাবতীয় অর্থনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন করে থাকেন পরিচালক (প্রশাসন), সেই হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ওই দায়িত্ব পালনকালে অধিদফতরের ব্যাংকিং কার্যক্রমও পরিচালনা করেছেন মুনশী ছাদুল্লাহ। নতুন পরিচালক (প্রশাসন) পদে নিয়োগ পান ডা. শহিদ মো. সাদিকুল ইসলাম। গত ৪ জুলাই তিনি এ দায়িত্বে যোগদান করেন। কিন্তু তার কাছে অধিদফতরের ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় অনেক অসংগতি ধরা পড়ে। উপপরিচালক মুনশী ছাদুল্লাহ খুব বেশি দিন ব্যাংক হিসাব পরিচালনার দায়িত্ব পালন না করলেও নতুন পরিচালক তার কাছ থেকে হিসাব বুঝে নিতে গিয়েই নানা অসংগতি দেখতে পান। পরে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে তিনি দেখতে পান দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় নানা অনিয়ম আর তহবিল তসরূপের মতো ঘটনা ঘটে আসছে। 
গত বছর স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীন বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে টেলিটক এর মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া বাবদ বিভিন্ন সময় আয় হয় ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৫০ টাকা। টেলিটক ২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট এক চিঠিতে চেকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৪ হাজার ৫০ টাকা, একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর আরেক চিঠিতে চেকের মাধ্যমে ৯৫ লাখ ৪২ হাজার ৪শ’ টাকা, ৪ ডিসেম্বর এক চিঠিতে দুই কোটি ১৭ লাখ ৯৪ হাজার চারশ’ পঞ্চাশ টাকা এবং এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একপত্রের মাধ্যমে ২ কোটি ৮৮ লাখ ২৯ হাজার একশ’ ৫০ টাকা প্রদানের কথা জানায়। এসব চেক প্রত্যেকটি অধিদফতরের ব্যাংক হিসাবে তাৎক্ষণিকভাবে জমাও দেয়া হয়েছে।
সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার নিয়ম অনুযায়ী, এই টাকা রাজস্ব আয় হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সরকারি কোষাগারে তা জমা হওয়ার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর এই টাকার পুরোটা কোষাগারে জমা না দিয়ে বেশিরভাগ টাকাই রূপালী ব্যাংকে নিজস্ব একাউন্টে রেখে দেয় এবং এখান থেকে খরচ করতে থাকে। জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এই টাকার মধ্যে জমা দেয়া হয়েছিল মাত্র ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৬ হাজার চারশ’ ৫০ টাকা। অবশিষ্ট অর্থাৎ ৫ কোটি ৬ লাখ ২৩ হাজার ৬শ’ টাকা অধিদফতরের নিজস্ব একাউন্টে জমা রাখা হয়। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৬ হাজার ৪শ’ ৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়। দেখা গেছে, অক্টোবরের আগে দু’দফায় টেলিটক থেকে চেকের মাধ্যমে যে টাকা স্বাস্থ্য অধিদফতর পেয়েছিল সেই টাকাই  চালানের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে। এরপরে দু’দফায় টেলিটক ৫ কোটি ৬ লাখ ২৩ হাজার ৬শ’ টাকা স্বাস্থ্য অধিদফতরকে দিলেও সে টাকা কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি।  
সরকারি কোষাগারের টাকা সংস্থার নিজস্ব তহবিলে জমা রাখার কোনো বিধান নেই বলে জানিয়েছেন, একজন শীর্ষস্থানীয় সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, কোন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা অধিদফতর যদি কোন খাত থেকে রাজস্ব আয় করে থাকে তাহলে যত দ্রুত সম্ভব তা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দিতে হবে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                             
সরকারি সংস্থার লেনদেনে কোনো নগদ জমা বা উত্তোলনের সুযোগ নেই কিন্তু দেখা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই হিসাব থেকে অহরহ নগদ অর্থ উত্তোলন ও জমা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। 
সূত্র জানায়, গত ৪ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সদস্য (প্রশাসন) হিসেবে ডা. শহিদ মো. সাদিকুল ইসলাম যোগ দেয়ার পর অধিদফতরের অর্থনৈতিক লেনদেনে অনিয়ম আর অসংগতির বিষয়টি উপলব্ধি করেন। তিনি এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেও মুনশী সাদুল্লাহ নিজের দায়ভার এড়াতে চেক বই, ব্যাংক একাউন্ট ব্যালেন্সসহ অন্যান্য কাগজপত্র গোঁজামিলের মাধ্যমে নতুন পরিচালক (প্রশাসন) সাদিকুল ইসলামের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করেন। কিন্তু সাদিকুল ইসলাম এসব গোঁজামিলের কাগজপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।
জানা গেছে, রূপালী ব্যাংক মহাখালী শাখার হিসাব নং (০৪৩০০২০০০২৩৯১) এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরের লেনদেন হয়ে থাকে। অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শহিদ মো: সাদিকুল ইসলাম গত ২২ আগস্ট চিঠি দিয়ে ওই হিসাবের কার্যক্রম (লেনদেন) সাময়িক স্থগিত করার জন্য ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপককে একটি চিঠি দেন। একই চিঠিতে তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের নামে পরিচালনা করা ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্য চান। এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট অর্থাৎ ব্যাংকে চিঠি দেয়ার দিন পর্যন্ত লেনদেনের হিসাব বিবরণী চাওয়া হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই সময়ের লেনদেনের পুরো হিসাব স্বাস্থ্য অধিদফতরকে দিয়েছে। 
লেনদেনের ওই হিসাব বিবরণী থেকে দেখা যায়, এই আট মাসের বেশি সময়ে অসংখ্যবার এই হিসাব নাম্বারে নগদ টাকা উত্তোলন, এমনকি কখনো কখনো নগদ জমাও দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে এ বছরের ১১ জুলাই চার বার নগদ টাকা উত্তোলন করা হয়। প্রতিবারই উত্তোলন করা হয় সমান পরিমাণ অর্থাৎ ১ লাখ ২৮ হাজার ২শ’ ৮২ টাকা করে। ১৪ জুলাই চার দফায় উত্তোলন করা হয় একই পরিমাণ করে অর্থ। ৪ জুলাই নগদ জমা দেয়া হয় ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৬শ’ ৫০ টাকা। 
আবার দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবরক্ষক মো: নাসিরউদ্দিনও দুই দফায় ওই একাউন্ট থেকে ৪২ লাখ টাকার বেশি উত্তোলন করেছেন। এরমধ্যে ১০ জুলাই, ২০১৯ ইং তারিখে  ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮শ’ ৫১ টাকা, পরের দিন অর্থাৎ ১১ জুলাই উত্তোলন করেন ৪০ লাখ ৮৫ হাজার ৩শ’ ৩৮ টাকা। এই টাকা তিনি কোন খাতে খরচ করেছেন, এর জবাব পরিচালক (প্রশাসন) সাদিকুল ইসলামকে দিতে পারেননি। অথচ এই টাকা উত্তোলনের সময় সাদিকুল ইসলামই পরিচালক (প্রশাসন) এর দায়িত্বে ছিলেন। তাকে না জানিয়ে কেন ওই টাকা উত্তোলন করা হলো এবং কোন খাতে খরচ করা হলো সেই জবাব হিসাবরক্ষক নাসিরউদ্দিন ও উপপরিচালক মুনশী ছাদুল্লাহ দিতে পারছেন না। 
উপপরিচালক ছাদুল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি পরিচালককে (প্রশাসন) মৌখিকভাবে জানান, ওই টাকা নগদ উত্তোলন করে প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু পরিচালক (প্রশাসন) এ সময়ে প্রশিক্ষণের জন্য নগদ কোন টাকা বরাদ্দের বিষয়টি অনুমোদন করেননি বলে জানা গেছে। 
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাংক হিসাব পরিচালনার ব্যাপারে হিসাবরক্ষক নাসিরউদ্দিনকে অফিসিয়ালি কোনো দায়িত্ব দেয়া হয়নি, তারপরও তিনি কীভাবে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করছেন এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নাসিরউদ্দিন ইতিপূর্বে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পে কর্মরত থাকাকালে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন। এরপর তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এখন অধিদফতরে তার মূল পদ হিসাবরক্ষক হলেও বাজেট সহকারীর উচ্চপদে তাকে পদায়ন করা হয়েছে। দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত, এ কারণেই তিনি অধিদফতরের ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের বেশ পছন্দের। আর তাই অধিদফতরের সিনিয়র কর্মচারীদের ডিঙিয়ে তাকে বাজেট সহকারী পদে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 
অধিদফতরের ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় সংঘটিত এই অনিয়ম এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন সম্পর্কে উপপরিচালক মুনশী মো. ছাদুল্লাহর এবং হিসাবরক্ষক নাসিরউদ্দিনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে জানার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)