রবিবার, ২০-অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • এবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জড়ানোর চেষ্টায় সিন্ডিকেট
প্রাথমিক শিক্ষায় ল্যাপটপ-মাল্টিমিডিয়া ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম

এবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জড়ানোর চেষ্টায় সিন্ডিকেট

shershanews24.com

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৬:৩৫ অপরাহ্ন


সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: এবার খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা ডিজিটালকরণ কর্মসূচির ল্যাটপট-মাল্টিমিডিয়া ক্রয়ের অনিয়মে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থার যদিও সক্ষমতা নেই, তারপরও এই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মূলত মালামাল সরবরাহ করবে একটি বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সরকারি ক্রয়ের নিয়মকানুন ওটিএমকে পাশ কাটিয়ে ওই বিশেষ প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দিতেই টেলিফান শিল্প সংস্থা  টেশিস)কে সামনে রেখে এগুচ্ছে দুর্নীতিবাজ চক্র। তাদের এই অপকর্মকে জায়েজ করতে এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও এর সঙ্গে জড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি সার সংক্ষেপ তৈরির জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরকে। প্রকৃত তথ্য গোপন করে সার-সংক্ষেপটি এমন কৌশলে তৈরি করা হচ্ছে যাতে প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তোলেন। একবার প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেলে পরে এ নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে না। সেই কারণেই চক্রটি এ কৌশলে এগুচ্ছে।
চতুর্থ প্রাইমারি শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ও সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা আছে ৩শ’ ৩৮ কোটি টাকা। সরকারি ক্রয়ের এই বিশাল কাজটি উচ্চমূল্যে বাগিয়ে নিতে বেপরোয়া একটি শিল্পগোষ্ঠী বড় অংকের কমিশন বাণিজ্যের অফার নিয়ে মাঠে নেমেছে। প্রতিযোগিতামূলক দর যাচাই ছাড়াই তারা এ বিশাল কাজটি একচেটিয়াভাবে হাতিয়ে নিতে চায়। এজন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাত করেছে তারা। 
ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পণ্যের মান এবং প্রতিযোগিতামূলক দর যাচাই করা সম্ভব হয় না। এতে বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দর পড়ে। লুটপাটের সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। পণ্যের মানও নিম্নমানের হয়। এ কারণে সরকারি কেনাকাটায় ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণ না করার নির্দেশ রয়েছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ইতিপূর্বে সরকারি কেনাকাটায় ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণ না করার কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন। গত ২৬ জানুয়ারি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, তিনি সরকারি কেনাকাটায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি চান না। কেনাকাটায় স্বচ্ছতার স্বার্থে তিনি চান যথাসম্ভব উন্মুক্ত দর পদ্ধতি (ওটিএম)। অর্থমন্ত্রী বলেন, অপচয় রোধ করার জন্য স্বচ্ছতার নিরিখে বা স্বচ্ছতার তাগিদে চেষ্টা করা হবে প্রতিটি সরকারি কেনাকাটা কার্যক্রম ওটিএম করতে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি হচ্ছে কোথাও কোনো অনিয়ম, ব্যত্যয়, ত্রুটি-বিচ্যুতি তিনি দেখতে চান না।
কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বা সরকারের এমন দৃঢ় অবস্থানের পরও ঠেকানো যাচ্ছে না এই অবৈধ ক্রয় পদ্ধতি-ডিপিএম। দুর্নীতিবাজ ও স্বার্থান্বেষী মহল সরকারের বিভিন্ন দফতরকে ম্যানেজ করে নানা কায়দায় ডিপিএম-এ কাজ আদায় করে নিচ্ছে। সর্বশেষ যা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় করতে যাচ্ছে। সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজের বিগত ২ সেপ্টেম্বরের সংখ্যায় ‘প্রাথমিক শিক্ষায় ৩৩৮ কোটি টাকার ল্যাপটপ-মাল্টিমিডিয়া ক্রয়ে সিন্ডিকেট’ শিরোনামে এ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।
কিন্তু জানা গেছে, তারপরও থেমে নেই দুর্নীতিবাজচক্র। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা টেশিসকে সামনে রেখে এগুচ্ছে চক্রটি। বলা হচ্ছে, এক সরকারি প্রতিষ্ঠান আরেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মালামাল কিনবে। 
সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি কাজ নেয়ায় দোষের কিছু হতো না যদি না ইতিপূর্বে এ ধরণের একের পর এক কাজে তারা ব্যর্থ না হতো। জানা গেছে, টেলিফোন শিল্প সংস্থা লিমিটেড এর আগে বাংলাদেশ কম্পিউটার সংস্থার আইসিটি বিভাগের আর্নিং এন্ড লার্নিং প্রজেক্ট, আগারগাঁও এ ৫০০ টির বেশি ওয়াল্টন মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহ করেছে যার বেশিরভাগই এখন অকেজো এবং ব্যবহারের অযোগ্য। তারও আগে ২০১৩ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের অধীনস্থ আইসিটি ফেইজ-১ প্রজেক্টে টেলিফোন শিল্প সংস্থা লিমিটেড কর্তৃক ১৬ হাজার দোয়েল ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে ১২ হাজার ল্যাপটপই অকেজো অবস্থায় অব্যবহৃত থেকে যায়। জানা গেছে, টেলিফোন শিল্প সংস্থাকে সামনে রেখে প্রকারান্তরে এ কাজটিও হাতিয়ে নিতে চায় ওয়াল্টন। এজন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে ’ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড’ অনুসরণ করে টেলিফোন শিল্প সংস্থা বা টেশিস এর মাধ্যমে বিশাল এ ক্রয়ের কাজ হাতিয়ে নিতে চাচ্ছে চক্রটি।
ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড বা ডিপিএম এ ক্রয়ের ক্ষেত্রে পিপিআর এ সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে যা অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলটি নিজেদের স্বার্থে ডিপিএম এর ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, যে সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ও সংযোজিত দ্রব্যসামগ্রী রয়েছে, কেবলমাত্র ওই পণ্যই ডিপিএম পদ্ধতিতে ক্রয় করা যেতে পারে। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ও সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদি পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদিত বা সংযোজিত করার কোন ব্যবস্থা না থাকার পরও ডিপিএম পদ্ধতিতে উপরোক্ত পণ্য সরবরাহ করানোটা পিপিআর নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। 
এছাড়া একে অর্থমন্ত্রণালয়ের অবস্থানের পরিপন্থী বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা। গত জানুয়ারি মাসে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের চর বাগাদি পাম্প হাউস ও হাজীপাড়া রেগুলেটর পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ ডিপিএম এ করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে অর্থমন্ত্রী তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। 
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই কাজটির দরপত্রে অংশ নিতে ইচ্ছুক একটি বিখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, অর্থমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীও যেখানে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা আর প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করতে চান সেখানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কার স¦ার্থে ডিজিটাল করণের এমন একটি কাজ ওটিএম-এ করার পরিকল্পনা করেও তা থেকে সরে আসলো?
তিনি বলেন, সরকার শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটালকরণের বিষয়টি নিয়েই ভাবছে না স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে এ ধরণের কাজ পায় সে ব্যাপারেও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতা তারা অনুভব করেছেন, কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এবারের আচরণ শুধু আইনের ব্যত্যয়ই নয়, বেসরকারি আইটিখাতের প্রতি বিমাতাসুলভও। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আরেকজন উদ্যোক্তা বলেন, দেশে-বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে অনেকেই এ পেশায় আসছে। কিন্তু যদি প্রতিযোগিতা করে সরকারি কাজ করার সুযোগই এসব প্রতিষ্ঠান না পায় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান কখনোই নিজের পায়ে দাঁড়াবে না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই কাজের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  এ কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান, শিডিউল বিক্রি এমনকি প্রিবিড সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই পর্যায়ে এসে টেন্ডার স্থগিত হয়ে গেছে। ডিপিএম-এ ক্রয়াদেশ দেয়ার তোড়জোড় চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ডিপিএম-এ ক্রয় করা হলে সরকার মানসম্পন্ন পণ্য পাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে, কেন না টেশিস যদি এ কাজ পায় তাহলে তারা নিজেরা পণ উৎপাদন করতে পারবে না, আবার তারা সরাসরি আমদানিও করবে না, তারা এ কাজ দেবে পেছন থেকে এ প্রকল্পের কাজ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠা ওয়াল্টনকে। ওয়াল্টন যদি আমদানি করা পণ্যই তাদের সরবরাহ করে তাহলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন মাঝে আরেকটি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিষ্ঠানকে মধ্যস্বত্ত্বভোগী হিসেবে রাখছে?
জানা গেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ কাজ ডিপিএম এর মাধ্যমে করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন পাওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করেছে, এজন্য একটি সারসংক্ষেপ তৈরিরও কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন কোনভাবে পাওয়া গেলে বিষয়টিকে সরকারের শীর্ষ মহলের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দেখানো যাবে, তাই তারা এখন যে কোনভাবেই হোক বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন আনার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)