মঙ্গলবার, ১২-নভেম্বর ২০১৯, ১১:২৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • আবরার হত্যায় উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গণ, বিক্ষুব্ধ দেশ

আবরার হত্যায় উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গণ, বিক্ষুব্ধ দেশ

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০৬:০৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মম, বীভৎসভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জাতি বিস্মিত, আতঙ্কগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন। এটাকে সামগ্রিক অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শুধু শিক্ষাঙ্গনই নয়, গোটা দেশ এখন বিক্ষুব্ধ। সাধারণ সচেতন মানুষ সবারই একই বক্তব্য, সরকার দলীয় অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের হাতে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যায় গর্হিত এ ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। শুধু ছাত্র বলে কথা নয়, যে কোনো নাগরিকের ভিন্নমত থাকতেই পারে। তাই বলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে! রাজনীতির নামে এমন জঘন্য ও নৃশংস কর্মকা-ের সাহস পেলো কোথা থেকে। শুধু আবরার হত্যাকা-ই নয়, বুয়েটে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিরীহ ছাত্র নির্যাতনের যেসব কাহিনী এখন ক্রমশঃ বেরিয়ে আসছে? যা এক কথায় বলা যায় অকল্পনীয়! স্বাধীন দেশে শিক্ষাঙ্গনে আর কত লাশ পড়বে? আবরার, রিফাত, নুসরাতের মতো আর কত পিতা-মাতা সন্তানহারা হবে, বার বার কেন শিক্ষার্থীর রক্তে রঞ্জিত হবে পবিত্র শিক্ষাঙ্গন? প্রতিটি মা বাবা এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বুয়েটের মতো দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে পাঠান কিন্তু মানুষ হওয়ার পরিবর্তে খুনি কেন হচ্ছে? এভাবে আর চলবে কতকাল? এ দায় কার?
শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আবরার হত্যার ঘটনাটি মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহল এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সরকারের ভেতরেও এটি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমণি বুয়েট শিক্ষকদের আন্দোলনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, এর পেছনে অন্য কিছু আছে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বিদেশির এমন প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ১১ অক্টোবর শুক্রবার বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিসির এক বৈঠকে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা ছাড়াও বেশ কিছু দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়। ভিসি তার বিলম্বিত পদক্ষেপের জন্য ক্ষমাও প্রার্থনা করেন প্রকাশ্যে। সর্বশেষ শনিবার (১২ অক্টোবর) এ রিপোর্ট লেখার সময় বুয়েট প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ৫ দফা দাবি মেনে নোটিশ প্রকাশের ঘোষণা দেয়। এর প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা ১৩ ও ১৪ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষার জন্য আন্দোলন শিথিল করার কথা জানায়। ১৪ অক্টোবরের পর পুনরায় আন্দোলন শুরু হবে বলে জানানো হয়।
আবরারকে যেভাবে হত্যা করা হয়
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের নিচতলায় ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন আবরার ফাহাদ। গত ৪ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে আবরার ফাহাদ ফেসবুকে বাংলাদেশ ভারতের চুক্তি নিয়ে স্ট্যাটাস দেন, তখন তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ায় বাড়িতে। পরদিন বিকেলে তিনি বাড়ি থেকে বুয়েটের হলে ফেরেন।  হলে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মাথায় রাত ৮টার দিকে আবরারসহ দ্বিতীয় বর্ষের সাত-আটজন ছাত্রকে শেরেবাংলা হলের দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে পাঠান তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাত-আটজন নেতা। তারা আবরার ফাহাদের মুঠোফোন নিয়ে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ঘেটে দেখে। এরপর আবরার ফাহাদকে থেমে থেমে ৫ ঘণ্টা অমানুষিক নির্যাতন চালায় ঘাতকরা। গত ৬ আগস্ট রাতে অমিত সাহার রুমে প্রথম দফায় মারধরের নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল। পরে যোগ দেন অনিক, জিওন, মনির এবং মোজাহিদুলসহ অন্যরা। প্রথম দফায় মারধর চলে রাত ১১টা পর্যন্ত। এরপর রাতের খাবার খাওয়ানো হয় আবরারকে। খাওয়ানো হয় ব্যথানাশক ট্যাবলেটও। দেয়া হয় মলম। দ্বিতীয় দফায় মারধর শুরুর সময় অনিক ছিলেন সবচেয়ে মারমুখী। আবরার এ সময় বারবার বমি করছিলেন। একপর্যায়ে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্নার কক্ষে। সেখানে আবরারের শরীরের ওপর অনিক ক্রিকেট স্ট্যাম্প ভাঙেন। পরে আরেকটি স্ট্যাম্প দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। তৃতীয় দফার মারধর শুরু হয় মুন্নার কক্ষে। তখন মধ্যরাত। নির্মম পিটুনিতে আবরার লুটিয়ে পড়েন। এ হত্যাকা-ে অংশ নিয়েছিল ২৪-২৫ জন। এরপর নিথর দেহ টেনে-হিঁচড়ে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন ঘাতকরা। মাঝ সিঁড়িতে যেতেই তারা বুঝতে পারেন আবরার মারা গেছেন। সিঁড়িতেই মরদেহটি রেখে তখন ওই স্থান ত্যাগ করেন তারা। আবরারের মৃত্যুর পরে মাদক দিয়ে গণপিটুনির নাটক সাজায় খুনিরা। কিন্তু হল  প্রভোস্ট ও ছাত্রকল্যাণের পরিচালকের কারণে তা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, এরপর এ নিয়ে তারা যোগাযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে। সংশ্লিষ্টরা ঘাতকদের আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, তোমাদের কিছুই হবে না। তোমরা হলেই অবস্থান কর। সকালের দিকে হল সরগরম হয়ে উঠলে শুরু হয় ঘাতকদের ছোটাছুটি। সবচেয়ে বেশি মারধর করা অনিক ওরফে মাতাল অনিক দৌড়ে চলে যান তার রুমের দিকে। পরে ডাকা হয় ডাক্তার। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা ওই ডাক্তার আবরারকে দেখে মৃত ঘোষণা করেন। এর ২ মিনিট পর খুনিরা একটি স্ট্রেচারের ব্যবস্থা করেন। স্ট্রেচারটি সিঁড়ির মুখে বারান্দায় রাখা হয়। ২০ মিনিট পর লাশের কাছে আসেন প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান। ঢেকে রাখা কাপড় সরিয়ে আবরারের নিথর দেহে নির্যাতনের চিহ্ন দেখেও অনেকটা নির্ভার ভঙ্গিতে ছিলেন  প্রভোস্ট এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালক। ডিবির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আবরার ছিল খুনিদের টার্গেটে।
যে স্ট্যাটাসের জন্য জীবন দিতে হলো আবরারকে
ফাহাদের সেই স্ট্যাটাস-
১. ৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে। ২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড় লাখ কিউসেক মিটার পানি দেব। ৩. ভারতকে গ্যাস দেয়ার সমালোচনা করে বুয়েটের এই শিক্ষার্থী লেখেন, ‘কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রফতানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব। হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন- ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও, তার মত সুখ কোথাও কি আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
আবরার হত্যায় উত্তাল বুয়েট
ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতার জেরে ছাত্রলীগের হাতে নির্মমভাবে নিহত মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে টানা ছয় দিনের মতো আন্দোলন করছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের হাতে হত্যার ঘটনায় বুয়েটের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, দেশি বিদেশি মিডিয়া কর্মীদের উপস্থিতিতে সগরম ছিল বুয়েট ক্যাম্পাস। বুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান নিয়ে হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে শিক্ষার্থীরা। স্লোগানে আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের ছাত্রত্ব বাতিল, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি নিশ্চিত করা এবং বুয়েটকে সন্ত্রাসমুক্ত করার দাবি জানানো হয়। এসময় আন্দোলনকারীরা ‘খুনিদের ঠিকানা, এই বুয়েটে হবে না’/ ‘সন্ত্রাসীদের ঠিকানা, এই বুয়েটে হবে না’/ ‘শিক্ষা সন্ত্রাস, এক সাথে চলে না’/ ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’/ স্নোগান দেন। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা যে ১০ দফা দেন তার মধ্যে রয়েছে, অভিযুক্তদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে। আবরারের পরিবারের সকল ক্ষতিপূরণ ও মামলার খরচ বুয়েটকে বহন করতে হবে। এই মর্মে অফিসিয়াল নোটিশ প্রদান করতে হবে। মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জন্য বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। অবিলম্বে চার্জশিটের কপি-সহ অফিসিয়াল নোটিশ দিতে হবে। বুয়েটের সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরেও উপস্থিত হয়নি এবং পরে ৩৮ ঘণ্টা পরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে বিরূপ আচরণ করেন এবং কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন তার জবাবদিহি করতে হবে। আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সকল প্রকার শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। 
বুয়েট শিক্ষক সমিতির ৭ দফা
ছাত্রলীগের হাতে আবরার হত্যায় শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিবাদ জানায় বুয়েট শিক্ষক সমিতি। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায় বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ বলেন, উপাচার্য ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা আশা করি তিনি তার পদ থেকে পদত্যাগ করবেন এবং যদি তিনি পদত্যাগ না করেন তাহলে আমরা সরকারকে আহ্বান জানাবো তাকে সরিয়ে দিতে। তাদের অন্য দাবিগুলো হলো-আবরারের হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা, আবরার হত্যা মামলার ব্যয় বুয়েট প্রশাসনের বহন করা, বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, হত্যাকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা, অবৈধভাবে দখলে থাকা হলের আসন উদ্ধার করা এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অতঃপর বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ
গত ১১ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনায় বসেন ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। তিনি আবরার হত্যাকা-ের পর নিজের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চান। তিনি স্বীকার করেন তার কিছুটা ভুল হয়েছে, তিনি এজন্য শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।  তিনি বলেন, আবরার তার সন্তানের মতো ছিল। শিক্ষার্থীদের যেমন কষ্ট লাগছে আবরারের মৃত্যুতে তারও অনেক খারাপ লেগেছে। দাবি প্রসঙ্গে বুয়েট ভিসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ভিসির ক্ষমতা বলে আজ থেকে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলো। সাথে শিক্ষক রাজনীতিও। এছাড়া খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, এজাহারভুক্ত ১৯ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা, আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি, নিয়মিত মামলার আপডেট তথ্য প্রদান, শিক্ষার্থীদের শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর ব্যাপারে আশ^স্ত করেন। 
বুয়েট শাখার ১৯ ছাত্রলীগ নেতা বহিষ্কার
আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ইতিমধ্যে পুলিশ ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। ১৩ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। গ্রেফতার আসামিরা হলেন- বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন, অনীক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশারেফ, বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন, গ্রস্থ ও  প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে মুন্না, ছাত্রলীগের সদস্য মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর, মোহাজিদুর রহমান, শামসুল আরেফিন, মনিরুজ্জামান ও আকাশ হোসেন, মিজানুর রহমান (আবরারের রুমমেট), ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা এবং হোসেন মোহাম্মদ তোহা। কায়েকজন খুনি হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। 
বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগের টর্চার সেল!
বুয়েটের প্রায় প্রতিটি হলে রয়েছে সাধারণ ছাত্রদের নির্যাতন করার জন্য টর্চার সেল। শিক্ষার্থীদের র‌্যাগিং ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্রদের জন্য এসব টর্চার সেল ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়াও মদ খাওয়ার, গাঁজা ও ইয়াবা সেবনে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহারের জন্য ছিল একাধিক কক্ষ। শেরে বাংলা হলে ৩০০৪, ২০০৪ ও ২০০৫ এসব কক্ষকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বার বা মিনিবার বলে আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়াও বহিরাগত ছাত্ররাও নেশা করার জন্য দিন-রাত আসা যাওয়া করতেন। প্রায় প্রতি রাতেই এসব কক্ষে পার্টি চলতো। মাতাল শিক্ষার্থীদের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যেতো। এতে আশপাশের কক্ষের শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা হলেও, ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পেতো না। সাধারণত ক্রিকেট স্ট্যাম্প, হকিস্টিক, ও কোমরের বেল্ট দিয়ে টর্চার করা হতো শিক্ষার্থীদের। এছাড়াও চড়-থাপ্পড় ছিল অতিসাধারণ ঘটনা। আর এসব হল নিয়ন্ত্রণ করতো সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। এর ধারাবাহিকতায় মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে গত ৭ অক্টোবর রাতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তবে হলের ছাদেই বেশির ভাগ র‌্যাগিং ও পেটানোর ঘটনা ঘটতো। গত এক বছরে ওই হলে তিন জন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে মারধর ও পুলিশে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শেরে বাংলা হলের নিরাপত্তা প্রহরী নুরুল ইসলাম বলেন, র‌্যাগিং ও মদ খেয়ে নেতাদের মারপিট করা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। কিছুদিন আগে অভিজিৎ কর নামের এক ছাত্রকে চুল বড় থাকার কারণে কান ফাটিয়ে দেয়া হয়। যিনি এই কা- করেছেন তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। প্রতিটি হলেই নির্দিষ্ট কিছু কক্ষ থাকে, যেখানে ছাত্রলীগ সদস্যরা থাকেন। সেখানে তারাই সর্বেসর্বা, অন্য কাউকে সেখানে থাকতে দেওয়া হয় না। এই সব হলে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বহিরাগত এবং সাবেক শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন হলে থেকে আসছেন। ছাত্রলীগ সদস্যরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর এবং নির্যাতন করে বলে প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করে আসছেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। আবরার হত্যার পর শেরে বাংলা হলের কমপক্ষে ৫০ জন আবাসিক শিক্ষার্থী গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।  
কেন্দ্রীয় নেতাদের আশকারায় বেপরোয়া ছাত্রলীগ 
গত প্রায় ১১ বছর ধরে ছাত্রলীগ মূলত আলোচনায় এসেছে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা টেন্ডারবাজির কারণে। ছাত্রলীগ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, এটা কারও অজানা নয়। কিছু শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রীয় নেতারা নিজের পেটুয়া বাহিনী হিসাবে রাখার জন্য অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ক্যাডার বানিয়েছে। বলা যায়, সারা দেশে এরাই এখন ক্ষমতার প্রধান ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। অপরাধ করার ক্ষমতাই তাদের যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ, ছাত্রী হয়রানি, ধর্ষণ, প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি না মানা, হলের সিট দখল করে রাখা, শিক্ষকদের ওপর চড়াও হওয়া ইত্যাদি থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই, যাতে ছাত্রলীগ জড়ায়নি। কেন্দ্রীয় নেতাদের আশকারা, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ছাত্রলীগ দিন দিন সন্ত্রাসী বাহিনী হয়ে উঠেছে। একের পর এক অপরাধ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি ফোনে রেহাই পায় এই ছাত্রলীগ নামধারী অপরাধীরা। ছাত্রলীগের এ সন্ত্রাসী কর্মকা- বন্ধ না হলে ছাত্র রাজনীতি তো বটেই, জাতীয় রাজনীতিসহ সমাজকেও চরম মূল্য দিতে হবে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। অতীতের ছাত্রলীগের এই সব অপরাধের যদি যথাযথ বিচার করা যেত তাহলে আবরারের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীকে জীবন দিতো হতো না।  
আবরার হত্যায় সারা দেশে বিক্ষোভ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ এবং বিচারের দাবিতে রাজধানীসহ দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। এসময় রাজধানীর বিভিন্ন কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমবেত হয়ে প্রতিবাদ জানান। শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দিয়েছিলো অভিভাবকরাও। ‘এই বর্বর জঘন্য হত্যাকা-ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ ব্যানারে ঢাবি অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যার প্রতিবাদে টিএসসিতে বিক্ষোভ মিছিল করে। আবরারের প্রতীকী লাশ নিয়ে টিএসসি থেকে মিছিল করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। মিছিলের পরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে আবরারের গায়েবানা জানাজা নামাজ পড়েন প্রতিবাদী ছাত্ররা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : আবরারের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। প্রধান ফটকসংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে টায়ার জ্বেলে অবরোধ করেন তারা। এ সময় ছাত্ররা বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার স্বার্থ ছাড়া দেশের পানি, গ্যাস, বন্দর ভারতকে দিয়ে দিয়েছে। একই কথা আবরার বলায় তাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আবরারের কথা দেশের সব মানুষের কথা। আবরার হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : আবরার হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাবি (তত্ত) শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান করে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীর প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধের করে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) যশোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে মানববন্ধন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল-সভা, যশোরের মণিরামপুরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে আবরার হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে। সবার একই বক্তব্য মর্মান্তিক এ ঘটনায় যারা জড়িত রাজনীতির নামধারী সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভতিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটতে না পারে। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৪ অক্টোবর ২০১৯ প্রকাশিত)