মঙ্গলবার, ১২-নভেম্বর ২০১৯, ১১:২৭ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • সংসদীয় কমিটির সভায় প্রাথমিক শিক্ষার ল্যাপটপ ক্রয়ে ওটিএম করার সুপারিশ

সংসদীয় কমিটির সভায় প্রাথমিক শিক্ষার ল্যাপটপ ক্রয়ে ওটিএম করার সুপারিশ

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০৪:৫৩ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩৩৮ কোটি টাকার কাজ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা রুখে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সংসদীয় কমিটি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র শীর্ষ কাগজকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে তোপের মুখে পড়েন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা। 
সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২ সেপ্টেম্বর ‘প্রাথমিক শিক্ষায় ৩৩৮ কোটি টাকার ল্যাপটপ-মাল্টিমিডিয়া ক্রয়ে সিন্ডিকেট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘প্রাথমিক শিক্ষায় ল্যাপটপ-মাল্টিমিডিয়া ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মে এবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জড়ানোর চেষ্টায় সিন্ডিকেট’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন দু’টিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চতুর্থ প্রাইমারি শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পে ২৬ হাজার মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ও সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের কাজ  ‘সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি’ বা ‘ডিপিএম’ এ দেয়ার ব্যাপারে এ মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের সিন্ডিকেট গঠনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। একই সাথে এ কাজটি নির্বিবাদে করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে কৌশলে জড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ কাগজের এ প্রতিবেদন দু’টি প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টিতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটির বৈঠকে অন্যতম শীর্ষ এজেন্ডা হিসেবে এটি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে এ কাজটি ‘ডিপিএম’ এ করা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। 
শিল্প গ্রুপ ওয়াল্টন নেপথ্যে থেকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ কাজটি টেলিফোন শিল্প সংস্থাকে দিয়ে করানোর ফন্দি এটেছিল। টেশিসের মাধ্যমে এ কাজটি সরাসরি ক্রয় এর ব্যবস্থা করতে পারলে চীন থেকে স্বল্প দামে যন্ত্রপাতি ও উপকরণ কিনে সরবরাহ করা হতো বলে জানা গেছে। এতে শুধু সরকারের বিশাল অংকের অর্থই গচ্চা যেত না, একই সাথে ভেস্তে যেত প্রাথমিক শিক্ষাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগও। 
সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ‘ডিপিএম’ এ কাজটি করানোর পক্ষে চেষ্টা চালালেও তাতে সায় ছিল না এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো: জাকির হোসেনের। এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একাংশও টেশিসকে দিয়ে এ কাজ করানোর বিপেক্ষ অবস্থান নেন। তবে সচিব নানাভাবে প্রভাবিত করায় শেষ পর্যন্ত সরাসরি ক্রয় এর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে একটি কমিটি করেন প্রতিমন্ত্রী। এরই মাঝে এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমোদন করিয়ে আনারও উদ্যোগ নেয়া হয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য প্রকল্পের সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়। ‘ডিপিএম’-এ কেনার পক্ষে যে সিন্ডিকেট কাজ করছে তাদের কৌশল ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি অনুমোদন করানো গেলে এ কাজ করাতে তাদের আর বেগ পেতে হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ব্যবহারের এ কৌশলটিও ফাঁস হয়ে গেলে বিপাকে পড়ে সিন্ডিকেটে জড়িতরা। এরই মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সংসদ ভবনে। কমিটির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ প্রকল্পের কাজ ‘ডিপিএম’ এ করানোর চিন্তাভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এ ব্যাপারে কৈফিয়ত তলব করে সংসদীয় কমিটি। কমিটির বৈঠকে টেলিফোন শিল্প সংস্থার অতীত রেকর্ড তুলে ধরে বলা হয়, তাদের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। বৈঠকে কমিটির কোন প্রশ্নেরই যথাযথ জবাব দিতে পারেননি সচিব। কাজটি ‘ডিপিএম’ এ করানোর ব্যাপারে সচিবের অতি উৎসাহের জন্য তাকে তিরষ্কার করা হয় বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র। 
কমিটি এ কাজ ডিপিএম-এ না করার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাথমিক শিক্ষার এই কেনাকাটায় ডিপিএম-এর পরিবর্তে ওটিএম অনুসরণের জন্য কমিটি সুপারিশ করে। কমিটির সদস্য আলী আযম মুকুল, মোশাররফ হোসেন, ইসমাত আরা সাদেক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেন। পরে কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয়া হয়।
জানা গেছে,  প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়, শিডিউল বিক্রি করা হয়, অনুষ্ঠিত হয় প্রিবিড মিটিংও। কিন্তু এরপরই এই কাজ হাতিয়ে নিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি সিন্ডিকেট। ‘ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড’ অনুসরণ করে টেলিফোন শিল্প সংস্থা বা টেশিস এর মাধ্যমে এক সাথে বিশাল এ ক্রয়ের কাজটি করাতে মাঠে নামে সিন্ডিকেট। যা বাস্তবে অসম্ভব বলে মনে করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে ইচ্ছুক একাধিক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, অতীতে এ ধরণের কাজে ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থাকে দিয়ে এত বড় একটি কাজ কোনো রকমের প্রতিযোগিতামূলক দর যাচাই ছাড়াই হাতিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য ছিল ওয়াল্টনকে দিয়ে ওই পণ্যগুলো আমদানি করানো।
এই সরবরাহের টেন্ডারে অংশ নিতে ইচ্ছুক আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বলেছেন, যদি ডিপিএম পদ্ধতিতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ও সাউন্ড সিস্টেম ক্রয় করা হয়, তাহলে চীন থেকে নন-ব্র্যান্ড পণ্য এনে স্টিকার লাগিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকতোনা, এতে ক্ষতিগ্রস্ত  হতো দেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পেতো উচ্চমূল্যে নিম্নমানের পণ্য, পাওয়া যেত না বিক্রয়োত্তর সেবাও। 
আইটি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির জন্যই নয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে প্রকল্প নিয়েছে তার সুফলভোগী হবে দেশের শিশুরা। আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ক্লাসরুম পেলে তারা যেমন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে তেমনি তা শিক্ষার প্রতিও তাদের মনোযোগী করে তুলবে। 
সংসদীয় কমিটির সুপারিশের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও টেশিস এর কর্মকর্তাদের একাংশ মিলে যে সিন্ডিকেট হয়েছিল তাদের অপতৎপরতা নস্যাৎ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন,  সংসদীয় কমিটি বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করায় এ সিন্ডিকেটের মনোবল ভেঙে গেছে, তবে সতর্ক থাকতে হবে, কেন না, তারা এখন এ প্রকল্পটি যাতে ঠিকমতো বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নানাভাবে চেষ্টা করতে পারে, অসহযোগিতা করতে পারে। তাই এ প্রকল্পের কাজ যে পর্যন্ত এসে আটকে গেছে সেখান থেকেই যত দ্রুত সম্ভব শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)