মঙ্গলবার, ১৯-নভেম্বর ২০১৯, ০৫:৪২ অপরাহ্ন

বাচ্চুর বিরুদ্ধে প্রমাণ পায় না দুদক!

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০৬:৫৩ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ফের আলোচনায় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। অনেকটা হঠাৎ করেই ধানমন্ডি এলাকার আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস বাচ্চু প্রশ্নে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেন। গত ১৪ অক্টোবর সোমবার তাপস সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির মূল ব্যক্তি ব্যাংকটির তখনকার চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু। সে কারণে তাকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণও করা হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুদক কোনো মামলা করেনি, এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি। তিনি বলেন, “দুদক চেয়ারম্যান যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন তাহলে তার পদত্যাগ করা উচিত।”
শেখ আবদুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান থাকাকালেই বেসিক ব্যাংকের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। প্রায় আট বছর ধরে এই ঘটনা তদন্ত করছে দুদক। কিন্তু তার বিরুদ্ধে এখনো অপরাধের কোনো প্রমাণ পায়নি তারা।
সাংসদ তাপসের বক্তব্যের জবাবে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত পরদিন গণমাধ্যমকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “দুদক তদন্তে এখনও বাচ্চুর বিরুদ্ধে ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পায়নি।”
২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে লোপাটের ঘটনা ঘটে। চার বছর অনুসন্ধানের পর দুদক ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের ২৬ জন কর্মকর্তাসহ ১৫৬ জনের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করে। কিন্তু ওই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু বা পরিচালনা পর্ষদের অন্য কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেনি দুদক। বাচ্চুকে ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় সরকার। ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বাচ্চু।
কিন্তু এরপর তার বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এ নিয়ে গত  প্রায় পাঁচ বছরে কম আলোচনা-সমালোচনা, লেখালেখি হয়নি। তারপরও কোনো টলেনি দুদক তার অবস্থান থেকে। দুদকের এক কথা, বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদন্তে ঋণ কেলেংকারিতে বাচ্চুর সরাসরি জড়িত থাকার জাজ্জ্ল্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, খোদ তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিভিন্ন সময়ে একাধিক বক্তৃতায় বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারিতে বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতার কথা জোর দিয়ে বলেছেন, অ্যাটর্নি জেনালের মাহবুবে আলমও শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন। এতো কিছুর পরও বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না। এমনকি তাকে এসব ঋণ কেলেংকারির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করতে চাচ্ছিলো না দুদক। অবশেষে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৮ সালে তাকে দুদকে তলব করে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেই জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্তই। এতো কিছুর পরও কেন স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন বাচ্চুকে বাঁচানোর জন্য এতোটা সেই প্রশ্নই এখন সবার মুখে।
বাচ্চুর ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকা
লুটপাট হওয়া টাকার ভাগ সরাসরি নিয়েছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। চেয়ারম্যান থাকার সময়ই স্ত্রী শেখ শিরিন আখতার, পুত্র শেখ সাবিদ হাই অনিক ও মেয়ে শেখ রাফা হাইকে সঙ্গে নিয়ে খুলেছিলেন ইডেন ফিশারিজ লিমিটেড নামের একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে মাত্র ১১ মাসেই জমা হয় ১৩ কোটি টাকার বেশি। বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ও নগদে জমা হওয়া এসব টাকার উৎস কী সেই জবানবন্ধী তিনি দিতে পারেননি দুদকে।
আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া টাকা সরাসরি জমা হয়েছে বাচ্চু ও তাঁর ভাই শাহরিয়ার পান্নার ব্যাংক হিসাবে। এভাবে ২০১২ ও ২০১৩ সালে দুজনে মিলে অন্ততঃ ৩০ কোটি টাকার বেশি সরাসরি ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া বাচ্চু নিজে, তার ভাই এবং ছেলে-মেয়ের ভুয়া কোম্পানি খুলে জাল-জালিয়াতির কাগজপত্রের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ঋণ নেয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন ও বাচ্চুর ব্যাংক হিসাব বিবরণীতে এসব তথ্য উল্লেখ রয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২০১৪ সালেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে এসব তথ্য পাঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও দুদক কোনো মামলায় শেখ আবদুল হাইকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। দুদক বলছে, বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না, যা অত্যন্ত হাস্যকর ও রসিকতামূলক বক্তব্য ছাড়া কিছুই নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদন্তে উঠে এসেছে, বিভিন্ন গ্রাহকের ঋণের একটা অংশ সরাসরি জমা হয়েছে আবদুল হাই বাচ্চুর ব্যাংক হিসাবে। ভাগের বাকি অংশ গেছে তার ভাই শাহরিয়ার পান্নার মালিকানাধীন বিএম কম্পিউটারস ও ক্রাউন প্রোপার্টিজের হিসাবে। ব্যাংকটির গুলশান শাখা থেকে এশিয়ান ফুড ট্রেডিংকে ৭৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ঋণ পেয়েই গ্রাহক ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা সরাসরি জমা করেন আবদুল হাই বাচ্চুর ব্যাংক হিসাবে। একই প্রক্রিয়ায় ভাগের আরেক অংশ জমা হয় তার ভাই পান্নার প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। এভাবে গ্রাহকদের ঋণ হিসাব থেকে সরাসরি ৩০ কোটি টাকা নিয়েছেন দুই ভাই বাচ্চু ও পান্না।
চেয়ারম্যানের নিজের কোম্পানি
জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান করা হয়। ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি ইডেন ফিশারিজ লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি খোলেন। নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের পরিচালক হিসেবে রাখেন এ প্রতিষ্ঠানে। যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ে (আরজেএসসি) প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া হয় ৪২/১-ক জাহান প্লাজা, সেগুনবাগিচা। যদিও পরবর্তীতে ওই ভবনে গিয়ে এ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ইডেন ফিশারিজ লিমিটেড যে কাগুজে প্রতিষ্ঠান, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে। এ প্রতিষ্ঠানের সনদ ছাড়া মাছ রপ্তানি ব্যবসা করা যায় না। কিন্তু ইডেন ফিশারিজ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানকে সনদ দেয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 
যদিও নিবন্ধকের কার্যালয়ে ঠিকানা দেখানো হয়েছে সেগুনবাগিচা, কিন্তু ব্যাংকে খোলা হিসাবে ইডেন ফিশারিজের ঠিকানা হলো বনানী ডিওএইচএসের ৪ নম্বর সড়কের ২ নম্বর বাসার পঞ্চম তলা। ওই ভবনে গিয়ে জানা যায়, সেটি বাচ্চুর নিজস্ব ফ্ল্যাট। কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই সেখানে। ২০১৪ সালের ৫ জুলাই পদত্যাগের আগ পর্যন্ত ওই ভবনেই থাকতেন তিনি। ব্যাংকের অনিয়মের পর আলোচনায় এলে ওই বাসা ছেড়ে যায় তার পরিবার। বর্তমানে সেখানে কেউ থাকে না।
বাচ্চুর ব্যাংক হিসাবের বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইডেন ফিশারিজের ব্যাংক হিসাবে ২০১৩ সালের ২ মে ১০টি চেকের মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকা করে ৫ কোটি টাকা তোলা হয়। পরের দিন ওঠানো হয় আরও ১ কোটি টাকা। সেদিন দুটি চেকের মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকা করে নগদ জমা হয় ১ কোটি টাকা। ওই বছরের ১৬ মে দুটি চেকের মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা তোলা হয়। আবার দুটি চেকের মাধ্যমে জমা হয় ৫ কোটি টাকা। কোনো ব্যবসা না থাকার পরও এভাবে মাত্র ১১ মাসেই ১৩ কোটি টাকা জমা হয় এ হিসাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঋণ পাওয়ার পর ভাগের একটা অংশ দিতে হয়েছে চেয়ারম্যান ও তার ভাইকে। এসব অর্থের একটা অংশ জমা হয়েছে ইডেন ফিশারিজের হিসাবে। এমন আরও অনেক হিসাব রয়েছে তাদের। সারা বিশ্বে উত্তোলনের সুবিধার্থে বিদেশি ব্যাংকগুলোতেও হিসাব খুলেছিলেন তারা। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্ডিংস্ এবং সুপারিশের পরও দুদক অত্যন্ত রহস্যজনক কারণে বাচ্চু কেন্দ্রীক তদন্তকে আর সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়নি। বরং বিষয়গুলো সেই অবস্থায়ই ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে।
দুই ভাইয়ের ভাগাভাগি
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব খোলার আগেই বিএস এন্টারপ্রাইজের নামে ঋণ মঞ্জুর করে বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা। দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা না থাকার পরও দফায় দফায় ঋণ বাড়িয়ে ৪০ কোটি টাকা করা হয়। এ ঋণের হিসাব থেকেই শাহরিয়ার পান্নার মালিকানাধীন বিএম কম্পিউটারসে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ও ক্রাউন প্রোপার্টিজের হিসাবে জমা হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এঞ্জেল অ্যাগ্রোকে ৩২ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকটি। এর দেড় কোটি টাকা যায় পান্নার ক্রাউন প্রোপার্টিজের হিসাবে। টাইম ট্রেড ইমপেক্সের ১১ কোটি টাকার মধ্যে ১ কোটি টাকা যায় ক্রাউন প্রোপার্টিজের হিসাবে। এ ছাড়া ২০ লাখ টাকা যায় সিপার আহমেদের হিসাবে। এবি ট্রেড লিংককে ৬৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়, এর মধ্যে ৫০ লাখ টাকা জমা হয় সিপার আহমেদের হিসাবে।
এশিয়ান ফুড ট্রেডিংকে ৭৯ কোটি টাকা ঋণ দেয় গুলশান শাখা। ঋণের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা সরাসরি জমা হয় আবদুল হাই বাচ্চুর ব্যাংক হিসাবে। ব্রাদার্স এন্টারপ্রাইজকে ৭৬ কোটি টাকা দেয় ব্যাংকটি। এর মধ্যে আবদুল হাই বাচ্চুর নামে হওয়া শেখ আবদুল হাই কলেজের হিসাবে যায় ১০ লাখ টাকা।
২০১২ সালের ২২ মে ডেলটা সিস্টেমস লিমিটেডের নামে ৫০ কোটি টাকার ঋণ প্রস্তাব আসে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে। প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির নেতিবাচক মতামত সত্ত্বেও পরদিনই প্রস্তাবটি পর্ষদের সভায় অনুমোদন করা হয়। একই বছরের ১৩ জুন ঋণের অর্থ ছাড় হয়। এ হিসাব থেকেই পরের দিন ক্রাউন প্রোপার্টিজের ব্যাংক হিসাবে ৮ কোটি টাকা জমা হয়। লাইফস্টাইল ফ্যাশনকে দেওয়া ৫৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৮ কোটি টাকা সরাসরি জমা হয় ক্রাউন প্রোপার্টিজের হিসাবে। লাইফস্টাইল ফ্যাশন মেকারের ২১১০-০১-০০০৩৬০৮ নম্বর হিসাব থেকে পান্নার মালিকানাধীন ক্রাউন প্রপার্টিজের ০১-১০৭১৮৪৭-০১ নম্বর হিসাবে ২০১২ সালে এই টাকা স্থানান্তর হয়। এর মধ্যে একদিনেই ১৩ জুন স্থানান্তর হয় ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বাকি টাকা একই দিনে স্থানান্তর হয়েছে কি-না তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত বিবরণ নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাইফ স্টাইল ফ্যাশন মেকার ব্যবসা পরিচালনায় চলতি মূলধনের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) নামে বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে মোট ৫৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে এই পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির নামে গুলশান শাখায় হিসাব খোলা হয় ২০১১ সালের ১৩ এপ্রিল। চলতি হিসাব নম্বর-২১১০-০১-০০০৩৬০৮।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর গুলশানের নিকেতনে বি-ব্লকের ৫নং বাড়ির নার্গিস হোসেন লাইফস্টাইল ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী। তৈরি পোশাক রফতানি ও আমদানি-রফতানি ব্যবসার জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে তিনি ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করেছিলেন ২০০৮ সালের ১৬ জুলাই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখার গ্রাহক লাইফস্টাইল ফ্যাশন মেকারের সঙ্গে বাচ্চুর ভাই পান্নার যোগসাজশ রয়েছে। লাইফস্টাইল ফ্যাশন মেকার অন্য আরেকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকেরও গ্রাহক। প্রতিষ্ঠানটির ওই ব্যাংকের হিসাবে বেসিক ব্যাংক থেকে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ২০১১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্থানান্তর করা হয় ৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
এদিকে দ্রুব ট্রেডার্সকে দেওয়া ১১ কোটি টাকা ঋণেরও ৮০ লাখ টাকা যায় ক্রাউন প্রোপার্টিজে। আর সে সময়ে গুলশান শাখার ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালনকারী সিপার আহমেদের হিসাবে গেছে ৯ কোটি টাকা। তার ভাই শাকিল আহমেদের হিসাবেও গেছে ঋণে অর্থের একটা অংশ।
বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুল হাই যোগদান করার কিছুদিন পরই ব্যাংকটি খারাপ হতে শুরু করে। ২০১২ সাল থেকে ব্যাংকটির খারাপ অবস্থা সম্পর্কে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লে তাকে নিরাপদে পদত্যাগের সুযোগ করে দেওয়া হয়। সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা অনিয়মের জন্য তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবি উঠলেও আমলে নেওয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রীও সংসদে ও বাইরে একাধিকবার বাচ্চুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে দুদক আবদুল হাই বাচ্চুসহ পর্ষদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।  
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাচ্চুর ভাইয়ের ব্যাংক হিসাবে বেসিক ব্যাংকের অর্থ স্থানান্তরের তদন্তু প্রতিবেদন, ব্যাংকের নথিপত্র দুদকের কাছে থাকার পরও এখনও পর্যন্ত বাচ্চুর ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে দুদকের ওই সূত্র জানায়। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও তার ভাই পান্নাকে এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি। বাচ্চু ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকাকালে ঋণের নামে যে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয় তারমধ্যে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৬টি মামলা করা হলেও বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৯ টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান চলছে অত্যন্ত ঢিমেতালে।
বিভিন্ন জনেরা যা বলছেন
সাবেক অডিটর এন্ড কম্পট্রোলার জেনারেল এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান গণমাধ্যমকে এ সম্পর্কে বলেন, “বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে যে সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চু জড়িত সেটা প্রমাণিত। এখন দুদক কেন প্রমাণ পায় না সেটাই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিববেদনে তার জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবেও ওই সময় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাকে বলেছেন, বাচ্চু সাহেব অনেককে ঋণ দিতে বাধ্য করেছেন যাদের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা নেই। এমনকি এমন লোককে ঋণ দিতে বলেছেন যার ওই ব্যাংকে তখন একাউন্টই ছিল না।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদকের এই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংসদীয় কমিটির তদন্তে তার (বাচ্চু) জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু দুদক প্রমাণ পাচ্ছে না। দুদকের উচিত দেশের মানুষের কাছে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করা।”
তিনি বলেন, “দুদক স্ববিরোধী কথাও বলছে। তারা দাবি করেছে, এরমধ্যে পাচার হওয়া দুই হাজার কোটি টাকা তারা উদ্ধার করেছে। কিন্তু কোথায় পাচার হয়েছিল তা তারা বলতে পারছে না।
বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি মামলায় দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান গণমাধ্যমে এ সম্পর্কে বলেন, “বাচ্চুর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত তদন্তে ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলেও তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। আমরা বলছি না যে তিনি জড়িত নন। তিনি জড়িত কী জড়িত না, তা তদন্ত পুরোপুরি শেষ না হলে বলা যাবে না। আমরা কোনো মামলারই চার্জাশিট দেইনি।” কিন্তু কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে সে সম্পর্কে তিনি কিছুই বলতে পারেননি।
দুদক বাচ্চুর কোনো সংশ্লিষ্টতা না পেলেও ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সংসদে তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগকৃত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের দাখিলকৃত কার্যভিত্তিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মিত ঋণ মঞ্জুর, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।”
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৮ অক্টোবর ২০১৯ প্রকাশিত)