শুক্রবার, ০৬-ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:০১ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • চিড়িয়াখানার আধুনিকীকরণ প্রকল্প: পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দুর্নীতি

চিড়িয়াখানার আধুনিকীকরণ প্রকল্প: পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দুর্নীতি

shershanews24.com

প্রকাশ : ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০৬:৩০ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ঢাকাস্থ জাতীয় চিড়িয়াখানায় শুধু দুর্নীতি মামলার আসামিকে প্রকৌশলী নিয়োগেই নয়, সংস্থাটির আধুনিকীকরণ কার্যক্রমের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগেও বড় ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে তদন্তও শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্রমতে, বছরের পর বছর ধরে লাগামছাড়া অনিয়ম ও দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে থাকা চিড়িয়াখানা সরকারি অর্থে পরিচালিত হলেও এর মান বলতে কিছু নেই। বস্তুতঃপক্ষে চিড়িয়াখানা পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার এক অভয়ারণ্যে। 
বিভিন্ন সময় এর মানোন্নয়নে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও সরকারের অমনোযোগিতা আর জবাবদিহীতার অভাবে এসব টাকায় চিড়িয়াখানার কোন উন্নতি হয়নি, উন্নতি হয়েছে একশ্রেণির কর্মকর্তার। ঢাকাস্থ মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানা ও রংপুর চিড়িয়াখানা আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। আধুনিকীকরণের রূপরেখা তৈরির জন্য একটি প্রকল্পও নেয়া হয়। এখাতে বরাদ্দ হয় ৩৪ কোটি ২ লাখ টাকা। কিন্তু এ টাকা খরচেও চলছে নয়-ছয়। সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ এখন এই আধুনিকীকরণ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ, আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা তৈরির জন্য যে প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেটির যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অধীনে থাকা জাতীয় চিড়িয়াখানা এবং রংপুর চিড়িয়াখানা আধুনিকীরণ প্রকল্পটি দেখভাল করছেন মিরপুরস্থ জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রধান কিউরেটর ড. এস এম নজরুল ইসলাম। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা সেই প্রতিষ্ঠানেরই উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হওয়ায় এ প্রকল্পটি আদৌ ঠিকঠাক মতো এগোবে কি না তা নিয়ে আগে থেকেই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। তাছাড়া আর্থিক দিক থেকে চিড়িয়াখানার কোন কর্মকান্ডই স্বচ্ছ নয়। এই প্রকল্পটিকেও নিজের আখের গোছানোর কাজে ব্যবহার করছেন নজরুল ইসলাম। শুধু তাই নয়, তার খামখেয়ালিপনা, স্বেচ্ছাচারিতা আর অনিয়মের কারণে একটি ভাল উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে এমন অভিযোগ এ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, চিড়িয়াখানার কিউরেটর নজরুল ইসলাম এর আগে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের কেনাকাটায় বড় ধরনের ভুল করায় বাংলাদেশকে প্রায় তিন কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন, নজরুল ইসলামের খুঁটির জোর কোথায়? তবে কেউ কেউ বলছেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে খুশি করেই নিজের পদ তো ধরে রেখেছেনই উপরন্ত একটি নতুন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের পদটিও বাগিয়ে নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সঠিক ও লাগসই পরিকল্পনা করা। কেননা পরিকল্পনাটি যদি যুঁতসই না হয় তাহলে কোনভাবেই প্রকল্পটি মানসম্পন্ন হতে পারে না। আর এমন পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন যোগ্যতাসম্পন্ন পরামর্শক বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তবে এক্ষেত্রে জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর নজরুল ইসলাম যোগ্যতা বা নিয়ম-নীতি এমনকি নৈতিকতারও ধার ধারেননি। দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত ও আট মামলার আসামি প্রকৌশলী মো. আলী আকবরকে পরামর্শক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে আলী আকবরের বিরুদ্ধে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে এ মামলাগুলো করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 
শুধু একজন অযোগ্য পরামর্শকই নয়, এবার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগেও চরম দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। জানা গেছে. মডার্ন ইঞ্জিনিয়ার্স প্ল্যানার্স এন্ড কনসালটেন্টনস লি. নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এ কাজের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল। তবে কোন কারণ দেখানো ছাড়াই ওই প্রতিষ্ঠানকে ‘নন-রেসপন্সিভ’ করা হয়। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটি কারণ জানতে চাইলেও তার কোন জবাব দেয়া হয়নি। জানা গেছে, মডার্ন ইঞ্জিনিয়ার্স প্ল্যানার্স এন্ড কনসালটেন্টনস লি. এ ধরনের কাজে যথেষ্ট অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান। কক্সবাজারের ডুলহাজারা সাফারি পার্কের সৌন্দর্য্যবর্ধন, মাস্টার প্ল্যান তৈরি ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। অথচ যে প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের স্থানীয় অংশীদার পাথমার্ক এসোসিয়েটেড লি. এর এমন কোন অভিজ্ঞতা নেই। প্রকল্প পরিচালক নজরুল ইসলাম ও মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি আজিজুর রহমান ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে অদক্ষ প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। মডার্ন ইঞ্জিনিয়ার্স সরাসরিই এমন অভিযোগ করেছে। জানা গেছে, যদিও মডার্ণ ইঞ্জিনিয়ার্স তাদের লিখিত অভিযোগে শুধু এ দুজনের নাম উল্লেখ করেছে কিন্তু বস্তুত চিড়িয়াখানার সকল অপকর্মের নাটের গুরু অসীম কুমার দাসও এই দুর্নীতিতে নেপথ্যে থেকে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে।
‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণা করার কারণ জানার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন করার পরও তা না জানানোয় মডার্ন ইঞ্জিনিয়ার্স প্ল্যানার্স এন্ড কনসালটেন্টনস লি. মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু সচিব কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে অনিয়মের অভিযোগ করে প্রতিকার চান। কমিটি বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সাথে নেয়। অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়ের সচিবকে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠন হলে মডার্ন ইঞ্জিনিয়ার্সের পক্ষ থেকে সরাসরিই তথ্যসহ উল্লেখ করা হয়, ঘুষের বিনিময়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মডার্ণ ইঞ্জিনিয়ার্স তদন্ত কমিটিকে প্রকল্প পরিচালক কর্তৃক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় ও তার নিকট ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্ত কমিটি এ বিষয়টিকে আমলে না এনে পুরো অনিয়ম ধামাচাপা দিয়ে রাখে।
অবশেষে মডার্ন ইঞ্জিনিয়ার্স এ বিষয়ে তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদন করেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র অনিয়ম তদন্ত ও পুনঃমূল্যায়নের আবেদনের পাশাপাশি দায়ি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আবেদন করা হয়েছে। দুদকের সংশ্লিষ্ট শাখা বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বলে জানা গেছে। দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন চিড়িয়াখানা মূলতঃ শিশুদের চিত্তবিনোদনের স্থান। নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই তারা দেখেছেন চিড়িয়াখানার পরিবেশ মোটেই ভালো নয়, তাই একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর এর সূত্র ধরেই চিড়িয়াখানার উন্নয়নে সত্যিই যাতে কিছু কাজ হয় তা নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন তারা, বিষয়টি নিয়ে সেভাবেই এগোনোর জন্য এরইমধ্যে নির্দেশ ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমনকি প্রাথমিকভাবে পরামর্শক, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত করার পাশাপাশি এই প্রকল্পের কাজ যে পর্যন্ত হয়েছে তাতে কতটা অনিয়ম আর দুর্নীতি হয়েছে আলাদাভাবে তাও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৮ অক্টোবর ২০১৯ প্রকাশিত)