রবিবার, ২৯-মার্চ ২০২০, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • পিডিবিতে নিয়োগ পদোন্নতি পদায়নে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য

পিডিবিতে নিয়োগ পদোন্নতি পদায়নে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ মার্চ, ২০২০ ০৪:৫৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রশাসন ক্যাডারের নবম ব্যাচের কর্মকর্তা জহুরুল হক উপসচিব থাকাকালে পিডিবিতে প্রেষণে সচিব পদে নিয়োগ পান ২০১৩ সালে। ইতিমধ্যে দুই দফায় পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে তিনি প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব। এখনো বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডেই (পিডিবি) বহাল রয়েছেন। প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে একই সংস্থায় কর্মরত আছেন। যদিও সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ নেই। বর্তমানে পিডিবির সদস্য (প্রশাসন) পদে আছেন। মাঝে কিছুদিন চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পিডিবিতে জহুরুল হক এত মধুর সন্ধান পেয়েছেন যে, কোনো ক্রমেই এই সংস্থা ছাড়তে রাজি নন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছেন।
সূত্রমতে, একই প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে গোটা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, লুটপাট ও অবৈধ অর্থ আয়ের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে প্রকৌশলীদের দুর্নীতি-অপকর্মে সহযোগিতা করা এবং তাদের দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার কাজে অন্যতম ভূমিকা পালন করছেন। দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের প্রাইজ পোস্টিং এবং সৎ ও যোগ্য প্রকৌশলীদের হয়রানিরও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে জহুরুল হকের বিরুদ্ধে। এছাড়া নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং নতুন নিয়োগে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তার সিন্ডিকেট। শীর্ষ কাগজে ইতিপূর্বে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ এখন পিডিবির ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পদোন্নতি-পদায়নকে ঘিরে ব্যাপকহারে ঘুষ বাণিজ্য শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী থেকে উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতিকে ঘিরে ব্যাপকহারে ঘুষ বাণিজ্যে নেমে পড়েছেন জহুরুল হক ও তার সিন্ডিকেট। এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ দালাল প্রকৌশলীর সহযোগিতায় পদোন্নতির টোপ দিয়ে  অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। এর আগে পিডিবিতে চাকরি প্রার্থীদের সাথে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে জনবল নিয়োগেও ব্যাপকহারে ঘুষ বাণিজ্য করে যাচ্ছেন জহুরুল। পিডিবিতে প্রতিবছরই বিভিন্নপদে কয়েক’শ নিয়োগ হয়। এসব নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্য করতে পিডিবিতে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যে কারণে প্রশাসনে বার বার পদোন্নতি হলেও ঘুরে ফিরে পিডিবিতেই পোস্টিং নিয়ে থেকে যাচ্ছেন তিনি। পিডিবির বদলি বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক জহুরুল দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার চরিত্র নিয়েও পিডিবিতে নানা মুখরোচক কথা প্রচারিত আছে। 
প্রশাসনের উপসচিব থাকাকালে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সচিব পদে যোগ দিয়েছিলেন জহুরুল হক। এর দেড় বছরের মাথায় ২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল প্রশাসনের যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পান তিনি। কিন্তু পদোন্নতি পেয়েও পিডিবিতেই একই পদে পোস্টিং নেন। এই পদোন্নতির দেড় বছরের মাথায় ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট বিদ্যুৎখাতের এই মূল প্রতিষ্ঠান পিডিবির সদস্য (অর্থ) পদ বাগিয়ে নেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পিডিবির চেয়ারম্যানের পরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পদ হিসেবে পরিচিত সদস্য (প্রশাসন) পদে পোস্টিং নেন। এর কয়েক মাসের মাথায় ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরও ওই একই পদে পোস্টিং নেন। এভাবেই গত প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে একটানা পিডিবিতেই আছেন প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা। 
যদিও অতীতে প্রশাসন ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তা পিডিবিতে এতো দীর্ঘ সময় থাকার সুযোগ পাননি অথবা চেষ্টাও করেননি। কিন্তু প্রশাসনে দুই দফায় পদোন্নতি পেয়েও জহুরুল হক বার বার ঘুরেফিরে পিডিবিতেই পোস্টিং নিচ্ছেন কেন? দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ খাতের মূল প্রতিষ্ঠান পিডিবিতে জহুরুল হকের থেকে যাওয়ার নেপথ্য স্বার্থটা আসলে কী? সংশ্লিষ্ট মহলে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রশ্ন দানা বেঁধেছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ এই বিদ্যুৎখাতে। কিন্তু এই খাতের ব্যাপক লুটপাটের কারণে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। যার ভার জনগণের উপর পড়েছে। মূলত পিডিবিতে বিদ্যুৎখাতের লুটেরাদের সঙ্গে জহুরুল হক এক গোপন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যে সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাপক দুর্নীতি-জালিয়াতির মাধ্যমে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন। পিডিবির নিয়োগ-পদোন্নতি-পদায়নের ক্ষেত্রেও জহুরুল হকের এই দুর্নীতির থাবা রয়েছে। এবার পিডিবিতে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পদোন্নতি-পদায়ন নিয়েও ব্যাপক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে  সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী থেকে উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতিকে ঘিরে ব্যাপকহারে ঘুষ বাণিজ্য চলছে। তার এ কাজে সহযোগিতা করছে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ দালাল প্রকৌশলী। 
সূত্র বলছে, পিডিবিতে প্রতিবছরই কারিগরি ও সাধারণ মিলিয়ে বিভিন্নপদে কয়েক’শ নিয়োগ হয়। এসব নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্য করতে পিডিবিতে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে জহুরুল হকের ছাত্রছায়ায়। যে কারণে প্রশাসনে বার বার পদোন্নতি হলেও ঘুরে ফিরে পিডিবিতেই পোস্টিং নিয়ে থেকে যাচ্ছেন তিনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পিডিবিতে জহুরুল হকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট সব ধরনের নিয়োগকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাপক বাণিজ্য করছে। কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পরই এই সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়। পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল প্রকাশ থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলে তাদের তৎপরতা। লিখিত পরীক্ষা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা পিডিবির বাইরের হলেও এদের ম্যানেজ করেন পিডিবির কর্মকর্তারাই। অনেকেরই অভিযোগ, মৌখিক পরীক্ষা আইওয়াশ মাত্র। ভাইভা কমিটির কেউ কেউ নিয়োগ দুর্নীতির সাথে সরাসরি জড়িত এবং তারা নিজেরা তাদের পাওনা বুঝে পেয়েই নিয়োগের ক্ষেত্রে নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব সারেন মাত্র। গত দুই-তিন বছরে পিডিবি এবং এর অধীনস্থ ও আওতাধীন বিভিন্ন শাখায় নানা পদে যেসব নিয়োগ দেয়া হয় তার মধ্যে আছে সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী পরিচালক (প্রশাসন), সহকারী পরিচালক (নিরাপত্তা ও অনুসন্ধান), উপ সহকারী প্রকৌশলী, উচ্চমান সহকারী। এসব নিয়োগে প্রায় সবক্ষেত্রেই নিয়োগ বাণিজ্য ও জালিয়াতি হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। পিডিবির নিয়োগের লিখিত পরীক্ষাগুলো নেয়া হয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, বুয়েট বা ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে। এরপর পিডিবির অভ্যন্তরীণ নিয়োগ কমিটি ‘ভাইভা’ বা মৌখিক পরীক্ষা নেয়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, লিখিত পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত হওয়ার পরই নিয়োগে দুর্নীতির বিশেষ প্রক্রিয়া শুরু হয়। বুয়েট বা ঢাবির যে বিভাগ বা প্রতিষ্ঠান লিখিত পরীক্ষা নেয় তারা ফলাফল পাঠানোর পর যেসব চাকরিপ্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন সেইসব ক্রমিক নম্বরধারীদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তাদেরকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণের প্রলোভন এবং নিয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলে লেনদেনের আপোষরফা করে। এভাবে আগেই উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের কাছ থেকে চুক্তিকৃত অর্থের একটি অংশ নেয়া হয়। পরীক্ষার্থীরা জানতেও পারেন না যে, পরীক্ষায় মেধার বলেই টিকেছেন তারা। 
উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ এবং লেনদেনের বিষয়টি সুরাহা হওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে অর্থ দিতে রাজি হওয়া ব্যক্তিরা সবাই উত্তীর্ণ হন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে পিডিবির যেসব ব্যক্তি বা দালাল চাকরিপ্রার্থীদের সাথে যোগাযোগ করেন, উত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের ওপর আস্থা ও বিশ^াস বেড়ে যায়। তখন তারা চাকরিপ্রাপ্তি অনেকটা নিশ্চিত মনে করেই ওইসব ব্যক্তির সাথে লেনদেন করেন। এভাবে টাকা দিয়ে নিজেদের নিয়োগ নিশ্চিত করে প্রকৃত মেধাবীরাও। 
শুধু টিকে যাওয়া প্রার্থীদের সাথেই নয়, অন্যদের সাথেও যোগাযোগ করা হয়। যখন কোনো প্রার্থীর সাথে যোগাযোগ করে নিয়োগ সিন্ডিকেটের লোকজন ওই প্রার্থীর নাম, পরিচয়, ঠিকানা, পরীক্ষার ক্রমিক নম্বর, কোথায় পরীক্ষা হয়েছে এসব তথ্য জানায় তখন ওই চাকরিপ্রার্থীর মনে তেমন কোন প্রশ্ন জাগে না, তাদের দৃঢ় ধারণা জন্মায় তারা এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত এবং তারা চাইলে নিয়োগ দিতে পারবেন। এতে চাকরিপ্রার্থীরা কোনো রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই ঘুষ লেনদেন করে। প্রার্থীদের বেশিরভাগই এভাবে নিয়োগ পাওয়ায় তাদের কেউই এ বিষয়ে অন্য কারো সঙ্গে আলোচনা করেন না। এভাবে ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি নিয়মিত বিষয় ও সাধারণ ঘটনায় পরিণত করেছেন জহুরুল হক সিন্ডিকেট। 
পিডিবির নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ নিয়ে এমন প্রতারণাই শুধু নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারচুপির মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দেয়ারও অভিযোগ এসেছে পিডিবির বিরুদ্ধে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, বুয়েট বা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় যার অধীনে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয় সেই কমিটিকে ম্যানেজ করে পরীক্ষার খাতা বা ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়। আর এভাবে অযোগ্য প্রার্থীরাও পিডিবিতে নিয়োগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, প্রতারণার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়। লিখিত পরীক্ষার ফলাফল এলে তা প্রকাশ না করে দীর্ঘদিন গোপন রেখে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের এ অভিযোগ পিডিবিতে ব্যাপক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এমনকি অভিনব প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পিডিবিতে এ ধরনের নিয়োগের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ শীর্ষ কাগজের হাতেও এসেছে। ওইসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছর তথ্য অধিকার আইনে নিয়োগ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছিল পিডিবির কাছে। তথ্য অধিকার আইনে এসব তথ্য চাওয়া হলেও পিডিবি কর্তৃপক্ষ গোপনীয়সহ নানা কারণ দেখিয়ে সে সব তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এতেই প্রমাণিত হয় জহুরুলের নেতৃত্বে পিডিবির দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট নিয়োগসংশ্লিষ্ট দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৬ মার্চ ২০২০ প্রকাশিত)