shershanews24.com
মন্ত্রীর প্রশ্রয়ে দুর্নীতিতে বেপরোয়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান
বুধবার, ০২ জানুয়ারী ২০১৯ ০৭:৫৪ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: চাকরি জীবন শুরু করেছিলেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চিফ ইনস্ট্রাকটর হিসেবে। সেখান থেকে তদবিরের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক। এরপর বিধিবহির্র্ভূতভাবে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ। অধ্যক্ষ পদে পদোন্নতি। পদোন্নতি পেয়েই সিনিয়র যোগ্য কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে একলাফে হয়ে গেলেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (ভোকেশনাল)। সেই থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে। রেকর্ড ভেঙেছেন অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি, লুটপাট ও স্বেচ্ছাচারিতায়। বলতে গেলে দুর্নীতির লাগামহীন ঘোড়ায় চড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গোটা কারিগরি শিক্ষাখাত। অধিদপ্তরের পরিচালক থাকাকালেই মহাজালিয়াতির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিতে নিজে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে শ’ শ’ কোটি টাকা।
বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েই নানাখাতে খরচের নামে ভুয়া ভাউচারে তহবিল লুটপাট, ভুয়া শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, বিভিন্ন কেনাকাটায় ইচ্ছেমতো ব্যয়, সভা-সেমিনারের নামে মোটা অঙ্কের সম্মানী ভাতা গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নামে বড় অংকের চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে নতুন বিভাগ-ট্রেড খুলতে সহায়তা, ফল জালিয়াতি, ঘুষবাণিজ্যসহ একের পর এক লাগামহীন দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন। এসব অপকর্মে কেউ তাকে বাধা দেওয়ার সাহসও পায়নি। কারণ, তিনি মন্ত্রীর লোক। মন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক। 
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত। কিন্তু সব অভিযোগই ধামাচাপা পড়ে আছে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পরোক্ষ ইশারায়। তার আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েই দিনে দিনে দুর্নীতিতে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। এমনকি ভাউচার জালিয়াতি করে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকার তহবিল লুটের একাধিক ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হলেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে নামকাওয়াস্তে সতর্ক করে মোস্তাফিজুর রহমানকে ক্ষমা করে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, মোস্তাফিজুর রহমান ইতিপূর্বে বিধিবহির্ভূতভাবে অধিদপ্তরের পরিচালক পদে যোগ দেয়ার পর থেকেই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। একইসঙ্গে বেসরকারি কারিগরি স্কুল-কলেজের এমপিও কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। এ রকম প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসংখ্য অনিয়ম দুর্নীতি জালিয়াতির হোতা মোস্তাফিজুর রহমান শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তিনি এখন একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি- ফ্ল্যাটের মালিক। তার আয়বহির্ভূত সম্পদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠিও দিয়েছে এনবিআর। 
সূত্রমতে, বোর্ড চেয়ারম্যানের পদ বাগিয়ে নিতে তিনি নামের সঙ্গে যে ডক্টরেট ডিগ্রি লাগিয়েছেন তা নিয়েও রয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। তদন্তে ডিগ্রি ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় নামের আগে তা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু এতো কিছুর পরেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বহাল-তবিয়তেই রয়ে গেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। তার লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতিতে অকার্যকর হয়ে পড়ছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। সরকার কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিলেও এই বোর্ড পরিচালিত হচ্ছে উল্টো স্রোতে। চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুরের নেতৃত্বে অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
বোর্ড চেয়ারম্যানের দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিনি বাসার চুলা, এসির গ্যাস চার্জ, বেসিন মেরামত, এনার্জি সেভিংস লাইট ও টিউব কেনা, ব্যক্তিগত মোবাইল এমনকি বিয়ে বাড়ির গিফটের টাকাও বোর্ড তহবিল থেকে পরিশোধ করেন। বোর্ডের আর্থিক বিষয়াদি সচিবের এখতিয়ারভুক্ত হলেও মোস্তাফিজুর রহমান নিজে অবৈধভাবে সরাসরি ঠিকাদার, ক্যাশিয়ার, উপপরিচালক (হিসাব) ও স্টোর অফিসারকে আদেশ দিয়ে আর্থিক কার্যাদি সম্পাদন করেন। 
যোগ দিয়েই অনিয়মের শুরু
২০১৫ সালের ১০ মার্চ দুপুরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে মোস্তাফিজুর রহমানের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই দিন বিকেলেই তিনি সেখানে যোগ দেন। সেদিন থেকেই কারিগরি শিক্ষা বোর্ড যে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে তার চিত্র উঠে এসেছে বোর্ডের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সচিব ড. মো. আবদুল হক তালুকদার কর্তৃক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দেয়া এক অভিযোগে।
ওই অভিযোগপত্রে তিনি লিখেছেন, “২০১৫ সালের মার্চ মাসে মোস্তাফিজুর রহমান বোর্ডে যোগদান করেন। তার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের আদেশটি বহন করে নিয়ে আসেন সাইক ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মালিক মো. ইয়াহিয়া। ইয়াহিয়া দম্ভভরেই তখন ঘোষণা দেন যে, ৩০ লাখ টাকার বেশি খরচ করে তিনি মোস্তাফিজুর রহমানকে বোর্ডের চেয়ারম্যান করে এনেছেন। কাজেই এখন থেকে বোর্ড তার নির্দেশে পরিচালিত হবে।”
“ঘোষণার ধারাবাহিকতায় মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সাইক ইনস্টিটিউটের মালিক ইয়াহিয়া তার ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানকে বিধি বহির্ভূতভাবে ময়মনসিংহে স্থানান্তর করেন। যা ছিলো বিদ্যমান প্রবিধানমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। পরবর্তীতে অনায়াসেই তিনি তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আসন ও টেকনোলজি অবৈধভাবে বৃদ্ধি করে নেন। নিজে নতুন বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তার বন্ধু ও অন্যদের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করিয়ে দেয়ার নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নিজের জমি ও ভবন না থাকা সত্ত্বেও তিনি নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও টেকনোলজি বৃদ্ধি করিয়েছেন। এভাবে ইয়াহিয়া এখন অন্তত ১০ টি প্রতিষ্ঠানের মালিক।”
সরকারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব আবদুল হক তালুকদার ওই অভিযোগপত্রে আরো লিখেছেন, “দুর্নীতিবাজ মোস্তাফিজুর রহমান চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েই প্রথমে বিভিন্ন প্রলোভন, প্রতিশ্রুতি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের মতো করে দুর্নীতিগ্রস্তদের দিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠন করেন। এ লক্ষ্যে নিজের বাসায় কর্মচারীদের ডেকে নিয়ে ভুড়ি ভোজ করানো, অর্থ প্রদান, টেলিফোনে সরাসরি কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে এ কাজটি সম্পন্ন করা হয়। এরপর ‘বোর্ডে প্রশাসন ক্যাডারের সচিব চাননা’ বলে ইউনিয়ন এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আমার বিরুদ্ধে দস্তখত সংগ্রহ করেন। কিন্তু অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী দস্তখত করতে অপরাগতা প্রকাশ করলে তার এ মিশন স্থগিত হয়ে পড়ে।” 
এই ইউনিয়ন এখন চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুরের ক্যাডার বাহিনী হিসেবে কাজ করে। বোর্ড চেয়ারম্যানের মদদে ইউনিয়নের কাজ হলো প্রতিনিয়ত কর্মকর্তাদের কক্ষে তালা লাগানো, বোর্ডে ঢুকতে না দেয়ার হুমকি, বোর্ডের ডিজিটাল এটেন্ডেন্ট মেশিন ভেঙে ফেলা, দুর্নীতিতে বাধা দানকারী কর্মকর্তাদের গালিগালাজসহ নানা অপকর্ম। 
সচিবকে অবরুদ্ধ করে যেভাবে ১০০ চেকে সই নিয়েছিলেন বোর্ড চেয়ারম্যান
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেয়ার মাত্র কয়েকমাসের মাথায় একটি তহবিল থেকে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নেয়ার পথ সুগম করতে বোর্ডের তৎকালীন সচিব আবদুল হক তালুকদারের বিরুদ্ধে নিজের মদদপুষ্ট ইউনিয়ন নেতাদের লেলিয়ে দেন চেয়ারম্যান মোস্তাফিজ। এর প্রেক্ষিতে ইউনিয়ন নেতারা গালিগালাজ ও ভীতিপ্রদর্শন করে ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট রাত ১০ টা পর্যন্ত বোর্ড সচিবকে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখে। একপর্যায়ে হুমকির মুখে সচিবকে ১০০টির মতো চেকে সই করতে বাধ্য করা হয়। ওই চেকের মাধ্যমে চেয়ারম্যান যোগদানের আগের সময়ে বিভিন্ন ভুয়া দায়িত্ব পালন দেখিয়ে সম্মানী হিসেবে প্রায় ১০ লাখ ৫৩ হাজার টাকা অবৈধভাবে আত্মসাত করেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ওই লুটপাটের প্রমাণ মিললেও রহস্যজনক কারণে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি কেবলমাত্র সতর্ক করে মন্ত্রণালয় নিজেদের দায়িত্ব সেরেছে। এতে তার আর্থিক দুর্নীতি থামেনি। বরং তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। পুনরায় তার বিরুদ্ধে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আরো ২৫ লাখ ১৪ হাজার ৪০০ টাকা তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এবং তা তদন্তেরও সিদ্ধান্ত হয়।
ভাউচার জালিয়াতি করে লাখ লাখ টাকা লোপাট
২০১৫ সালের ১০ মার্চ বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েই একের পর এক ভাউচার জালিয়াতির মাধ্যমে ২৫ লাখ ১৪ হাজার ৪০০টাকা আত্মসাত করেন মোস্তাফিজুর রহমান। এ টাকা তার প্রাপ্য ছিল না। তার আগে যারা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের পাওয়ার কথা। যোগদানের আগের সময়ে দায়িত্ব পালন বাবদ সম্মানী দেখিয়ে অন্যের টাকা তিনি ভাউচার জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে নিয়েছেন। আর এটা করতে গিয়ে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সালের ৩১ শে মার্চ পর্যন্ত ভাউচার জালিয়াতি করা হয়। সনদপত্র, নম্বরপত্রের নাম সংশোধন, ডুপ্লিকেট রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র, উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণ, নম্বরপত্র লিখন সম্মানী বাবদ এসব টাকা নেয়া হয়েছে। নথিতে দেখা যায় নম্বর পত্রের বকেয়া সম্মানী বিল বাবদ পহেলা জানুয়ারি ২০০৯ সাল থেকে ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়েছেন ৯ লাখ ৪০ হাজার ৩০০টাকা। এ টাকা উঠানো হয়েছে ২৫শে আগস্ট ২০১৫ সালে। একই সময়ের নম্বর পত্রের বকেয়া সম্মানী বিল (আংশিক) নিয়েছেন ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে ৩০শে আগস্ট ২০১৫ সালে। বিল নং-৪৬৩-এর মাধ্যমে নম্বর পত্রের বাকি অংশ ২ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা তুলে নিয়েছেন। এ ছাড়া সনদ লিখন বাবদ বিল নং-১৫৮৫, তারিখ ১৮ই মে ২০১৫ সালে নিয়েছেন ৪৫ হাজার টাকা। এখানে ২০১৪ সালের ২০শে ডিসেম্বর থেকে ৩১শে মার্চ ২০১৫ সাল সময়ের ভাউচার জালিয়াতি করা হয়। নম্বরপত্র লিখন বাবদ ২০শে অক্টোবর ২০১৪ থেকে ৩১শে মার্চ ২০১৫ পর্যন্ত নিয়েছেন ৪০ হাজার টাকা। এর বিল নং-১৪২৩। তারিখ ১৬ই এপ্রিল ২০১৫। উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণ বাবদ নিয়েছেন ৩০ হাজার টাকা। ১লা জুলাই ২০১৪ থেকে ৩১শে জানুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত সময়ের পারিশ্রমিক বাবদ এ টাকা নেয়া হয়। যার বিল নং-১৩৬৪। তারিখ ২ এপ্রিল ২০১৫। পহেলা মে ২০১৪ থেকে ৩০শে এপ্রিল ২০১৫ পর্যন্ত সনদপত্র, নম্বরপত্রের নাম সংশোধন ও ডুপ্লিকেট রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশ পত্র সংক্রান্ত কাজের পারিশ্রমিক বাবদ নেন ৩১ হাজার টাকা। যার বিল নং-১৬১৪। তারিখ ৩০শে এপ্রিল ২০১৫। অথচ তিনি বোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছেন ২০১৫ সালের ১০ মার্চ।  মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ভাউচার জালিয়াতির এসব প্রমাণ উঠে আসে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে শাাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে কেবলমাত্র সতর্ক করে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর  মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালী স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে দুর্নীতির প্রমাণের কথা উল্লেখ করে মোস্তাফিজুরকে সতর্ক করে দেয়া হয়। এতে বলা হয়, “কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বোর্ড প্রশাসন পরিচালনায় বিচক্ষণতা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং অনিয়মিত পন্থায় প্রাপ্যতাবিহীন অর্থ গ্রহণ করে অনৈতিক কাজ করেছেন, তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় তাকে এ ধরনের কার্যকলাপের জন্য সতর্ক করা হল। ভবিষ্যতে তাকে এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হলো।”
বোর্ড চেয়ারম্যানের মদদে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন ও ভুয়া সার্টিফিকেট বাণিজ্য
 কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়ে এবং পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই বিপুলসংখ্যক ভুয়া শিক্ষার্থীকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ‘পাস’ করিয়ে দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এ দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষাতে এমন ঘটনার তদন্তে কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসে। জানা যায়, অর্থের বিনিময়ে ‘ভুয়া শিক্ষার্থীদের’ পাস করাতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের মদদে একটি চক্র রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি করে। তারা নবম শ্রেণিতে ভুয়া নাম ঠিকানায় কিছু শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে রাখে। দুই বছর পর পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আগে রাতারাতি সেই সব নাম-ঠিকানা পাল্টে যায়। এ ছাড়া ফেল করা শিক্ষার্থীদের পাস দেখানোর মতো অবিশ্বাস্য অনিয়মও পাওয়া গেছে। জালিয়াতি করতে গিয়ে মহিলা মাদ্রাসার নামে পুরুষ শিক্ষার্থীদের পাস দেখানোর ঘটনাও এ বোর্ডে ঘটেছে। জাল-জালিয়াতির পুরো ঘটনা ধামাচাপা দিতে বোর্ডের কম্পিউটার থেকে সব ডাটা মুছে ফেলা হয়েছে। তবে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক তদন্তেই এসব জাল-জালিয়াতি ধরা পড়ে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাদ্রাসা) একেএম জাকির হোসেন ভূঁঞা ও উপসচিব (কারিগরি) সুবোধ চন্দ্র ঢালী তদন্ত চালিয়ে এই জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটন করেন। ২০১৭ সালে কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্তকমিটির ৪০৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সব মিলিয়ে আট ধরনের জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো- কারিগরি শিক্ষাবোর্ড একজনের পরিবর্তে অন্যজনকে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাত্র নয় এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান রেজিস্ট্রেশনের জন্য নাম পাঠাননি, তবু বোর্ড এমন ছাত্রদের নাম রেজিস্ট্রেশন করেছে, একই রোল ও রেজিস্ট্রেশনের বিপরীতে একাধিক নামে প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়েছে, এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ফল জালিয়াতির মাধ্যমে পাস করানো হয়েছে, নবম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলেও ৪.২৩ জিপিএ দেখিয়ে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে এবং নিয়ম না থাকলেও তিন বিষয়ের অধিক বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের দশম শ্রেণিতে তোলা হয়েছে। তদন্ত কমিটি এ ঘটনার জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানসহ সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। দায়িত্বে চরম অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ আনা হয় বোর্ড চেয়ারম্যানের বিরদ্ধে। এই ঘটনায় বোর্ডের তিন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিভাগীয় মামলা করা হলেও বহাল তবিয়তেই থেকে যান দুর্নীতির হোতা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান। 
প্রশ্ন ফাঁসেও মদদ!
২০১৫ সালে বোর্ডের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এই ঘটনায়ও বোর্ড চেয়ারম্যানের মদদের প্রমাণ পাওয়া যায়। বোর্ডের সিস্টেম এনালিস্ট সামসুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু সামসুজ্জামান বোর্ড চেয়ারম্যানের পলিটেকনিক ব্যবসার পার্টনার ও সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। ফলে সামসুজ্জামানের দুর্নীতি-জালিয়াতি আরো বেপরোয়া গতি পায়। বোর্ডে চাকরিরত অবস্থায়ও চেয়ারম্যান সিন্ডিকেটের অনেকেই বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বোর্ডের নিয়ম-কানুন নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার ও তৈরির অভিযোগ আছে। 
দারোয়ান থেকে পদোন্নতি পেয়ে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা
বোর্ডে এমন অসংখ্য কর্মকর্তা আছেন যারা কর্মচারী হিসেবে চাকরি নিয়ে এখন বড় কর্তাব্যক্তি। ওইসব ব্যক্তির অনেকেরই পদোন্নতিতে সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়নি। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার রেকর্ডও কম নয়। আর এর সবই হয়েছে বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বদৌলতে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে কারিগরি বোর্ড অদ্ভুত নিয়ম চলছে। যাদের কাজ কারিকুলাম তৈরির, তারা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতির ভার নিয়ে রেখেছেন। আর মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শন শাখা পুরনো প্রতিষ্ঠানে বিভাগ-কোর্স যুক্ত করার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কারিকুলাম শাখায় নিয়োজিত বেশির ভাগ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম জ্ঞান নেই। দারোয়ান থেকে পদোন্নতি পেয়ে এ শাখায় বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকা লোকও আছে। ফলে তারা কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে কী শিক্ষাক্রম তৈরি করবেন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ- নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও ট্রেড-বিভাগ খোলার কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। লাভজনক ব্যবসা এবং প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা পাওয়া যায় বলে বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী কারিগরি প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। সব কিছু নাকের ডগায় হলেও এ নিয়ে বোর্ড চেয়ারম্যানের কোনো তদারকি বা নজরদারি নেই। বরং তিনি এ থেকে বাণিজ্য করছেন।  বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কেউ কেউ বোর্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসে আছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের একেকটি বিভাগ বা ট্রেডের জন্য ৩-৪টি করে ল্যাবরেটরি থাকতে হয়। সেই হিসাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫-৬টি বিভাগ থাকলে একটি ভবন দরকার। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেখানে সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে একই ল্যাব-ক্লাসরুমকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে পরিদর্শন করানো হচ্ছে। অর্থাৎ, একই অবকাঠামোয় চলছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। বোর্ডের যারা পরিদর্শনে যান তারা বিষয়টি জেনেও না জানার ভান করে আসছেন। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইলের ১০ হাজার ভুল নম্বরপত্র ছাপানো হয়। এতে ১০ লাখ টাকা গচ্চা যায়। কিন্তু এ জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি। 
বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ, অবৈধভাবে পদোন্নতি দেয়ার মতো অসংখ্য অভিযোগও আছে। এসএম শাহজাহান নামে একজনকে কয়েকটি ধাপ ডিঙিয়ে সরাসরি ৫ম গ্রেডে উপপরিচালক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। পদোন্নতির আগে তিনি ৮ হাজার টাকা স্কেলে চাকরি করতেন। এই কর্মকর্তা নি¤œমান সহকারী হিসেবে বোর্ডে যোগ দিয়েছিলেন। তার মতো পঞ্চম গ্রেডে ৭-৮ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। রজব আলী নামে এক কর্মচারীর এসএসসি পাসের দুই সনদ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। দারোয়ান থেকে একজন পদোন্নতি নিয়ে এখন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন। এভাবে এসএসসি পাস আরও বেশকিছু কর্মচারী দিন দিন কর্মকর্তা হয়েছেন। এদের অনেকেই যোগদানের পর বোর্ডের অধীন পরীক্ষায় পাস করে এখন নামের আগে ‘ডক্টর’ ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। 
বোর্ড চেয়ারম্যানের ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রী 
ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে ‘পিএইচডি’ ডিগ্রী কিনে নামের আগে ‘ড.’ বসিয়ে দাপটের সঙ্গে চললেও সনদ হালাল করতে পারেননি কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ‘ভুয়া ডক্টরেট’ ডিগ্রীর প্রমাণ মিলেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানের ডক্টরেট ডিগ্রী যে ভুয়া তা প্রমাণিত হয়েছে। তাকে ইতোমধ্যেই নামের আগে ডক্টর না লেখাসহ অন্যান্য অনিয়মের বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। পিএইচডি ডিগ্রীর ঘটনা তদন্ত করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, তার পিএইচডি ডিগ্রী ভুয়া অথচ এটা ব্যবহার করেই তিনি আজ চেয়ারম্যানের আসনে বসতে পেরেছেন। তদন্তে দেখা গেছে, চেয়ারম্যান ঢাকার কাকরাইলের একটি গলিতে অবৈধভাবে গজিয়ে ওঠা আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি নামের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ডিগ্রী কিনেছেন। অথচ কোন প্রাইভেট ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের শাখার দেশে ডক্টরেট ডিগ্রী দেয়ার কোন সুযোগে নেই। তদন্তকমিটি ও সাংবাদিকদের কাছে চেয়ারম্যানের দেয়া বক্তব্যেও বেরিয়ে এসেছে ডক্টরেট কেলেঙ্কারির প্রমাণ। তদন্ত কমিটির কাছে মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, ‘আমি আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অনলাইনে পিএইচডি করেছি। যার ক্যাম্পাস ছিল কাকরাইলে। কাকরাইলের সেই ক্যাম্পাস আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এখন সেই ক্যাম্পাস আর নেই। এখান থেকে যারা তথাকথিত পিএইচডি ডিগ্রীর সনদ নিয়েছেন তাদের ডিগ্রী তো ভুয়া বা অবৈধ। তাহলে কেন আপনি করলেন? এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, আমেরিকায় এ ধরনের অসংখ্য ইনস্টিটিউট রয়েছে যেগুলোকে সেখানে ব্রিফকেস বা এ্যাপার্টমেন্ট ইউনিভার্সিটি বলে। এগুলো অনলাইনে ডিগ্রী বিক্রি করে। বাংলাদেশে এই ধরনের ইউনিভার্সিটির শাখা বা এজেন্ট থাকলেও এগুলোর আইনগত বৈধতা নেই। ইউজিসির বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপ-পরিচালক জেসমীন পারভীন বলেন, এ ধরনের কোন কাজেই এসব প্রতিষ্ঠানের ডক্টরেট ডিগ্রী দেয়ার সুযোগও নেই। ইউজিসির কর্মকর্তারা এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা সম্পর্কে আরও বলেছেন, এসব এজেন্টদের কাছে যদি কোন ধরনের ডিগ্রী চাওয়া হয় তাহলে তারা আগে ডিগ্রীর দাম নির্ধারণ করবে, কি বিষয়ে ডিগ্রী দরকার এবং কতদিনের মধ্যে ডিগ্রী লাগবে সে অনুসারে টাকা নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান ডিগ্রী দেয়। এমনকি যদি কারও বাড়িতে এসে ডিগ্রী দিয়ে যেতে হয় সেক্ষেত্রে বাড়তি ফি দিলে এসব প্রতিষ্ঠান ডিগ্রী দিয়ে দেবে। টাকার বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া সনদ কখনোই ব্যবহার করা যাবে না এবং এটা অবৈধ বলে উল্লেখ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)