shershanews24.com
জবির ভবন নির্মাণে দুর্নীতি তদন্তে হাইকোর্টের রুল
শনিবার, ১৫ জুন ২০১৯ ১২:৩৭ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্পের নির্মাণ কাজে দুর্নীতি নিয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। মহসীন আহমেদ স্বপন নামে এক ব্যক্তির রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার (২৩ মে) এই রুল জারি করেন। 
রুলে জবির ভবন নির্মাণে দুর্নীতি জালিয়াতি তদন্তে শিক্ষা সচিবের নিষ্ক্রিয়তা ও গাফিলতি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেয়া কেন বে আইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এই দুর্নীতি তদন্তে ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত এবং বিভাগীয় পদক্ষেপ নিতে শিক্ষা সচিবকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. কামাল হোসেইন।
আদালতে মামলার এজাহারে বলা হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্পের নির্মাণ কাজে প্রায় ৭ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে। দরপত্র অনুযায়ী ওই ভবনের ৯টি ফ্লোর নির্মাণের কথা থাকলেও খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে ৬টি ফ্লোর নির্মাণ করেই বিল তুলে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ৯টি ফ্লোর নির্মাণে ৪৫ কোটি ২৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৭ টাকা বরাদ্দ হলেও ৬টি ফ্লোর নির্মাণেই খরচ দেখানো হচ্ছে ৩৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর এতে দরপত্রের ইঙছ এর দেয়া রেট অনুযায়ী এই ৬ ফ্লোরের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানো হচ্ছে। সে হিসেবে ৬৬ শতাংশ কাজ করে বরাদ্দের ৮৩ শতাংশ টাকাই খরচ দেখানো হচ্ছে। অথচ উল্টো সংশোধিত প্রাক্কলনের প্রতিবেদনে টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। 
ভবনের ভিত্তি ১৬ তলার উপযোগী নয় এমন অজুহাতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার ছত্রছায়ায় থাকা দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারচক্র এই কারসাজি করেছে। এমনকি টেন্ডার অনুযায়ী ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে উন্নতমানের মোজাইক করার শর্ত থাকলেও পিপিআর লঙ্ঘন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো টাইলস লাগিয়ে আড়াই কোটি টাকা বেশি বিল হাতিয়ে নিয়েছে।
এভাবে নানা কায়দায় কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিতে গিয়ে নির্মাণ শেষ করতেও বিলম্ব করা হয়েছে। দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ কাজ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেই শেষ করার কথা। এদিকে দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে ভবনের ৩ টি ফ্লোর অসমাপ্ত রাখার বিষয়ে সংশোধিত প্রাক্কলন অধস্তন কর্মকর্তারা অনুমোদনে অসম্মতি জানালেও ইইডি’র প্রধান প্রকৌশলী তাদেরকে চাপ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ নির্দিষ্ট সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ না করা, নির্মাণ কাজে ৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ঠিকাদারের ইচ্ছেমতো মোজাইকের পরিবর্তে টাইলস লাগিয়ে আড়াই কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচসহ নানা অনিয়মের কোনো সুরাহাই হয়নি। প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাকে এসব বিষয় অবহিত করলেও আইনগত পদক্ষেপ না নিয়ে তিনি উল্টো অবৈধ সংশোধিত প্রাক্কলন অনুমোদনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে লিখিত নির্দেশ দেন। এমনকি এই বেআইনি অনুমোদনের জন্য বিভিন্নভাবে তাকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত ১৭ জানুয়ারি নির্মাণ কাজে এসব অনিয়ম দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে প্রকল্পটি দ্রুত ও আইনানুগভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুপারিশসহ ইইডির প্রধান প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দেন ইইডির ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ দেলোয়ার হোসেন। ওই চিঠিতে সংশোধিত প্রাক্কলনকে বেআইনি, অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক পরিমাপের বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এই চিঠির অনুলিপি শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সচিব বরাবরও পাঠিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। প্রধান প্রকৌশলীকে দেয়া ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন-
“মহোদয়ের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, মোজাইক পরিবর্তন করে তদস্থলে টাইলস স্থাপন না করার জন্য স্মারক ইইডি/ডি.এম.সি/বিবিধ/৫৮১ তারিখ: ২৩-১১-২০১৬ মূলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণকে নির্দেশ প্রদান করা হয় এবং স্মারক ইইডি/ডি.এম.সি/৩৬ তারিখ: ২৫-০৯-২০১৭ মূলে টাইলস না করার আইনগত ও প্রযুক্তিগত বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। উপরোক্ত নির্দেশনার পরও নিম্ন স্বাক্ষরকারীকে (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) কোনো প্রকার অবহিত না করেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে দুটি ফ্লোরের সিডিউল আইটেম মোজাইক পরিবর্তন করে তদস্থলে টাইলস স্থাপন করা হয়েছে। যা কোনোক্রমেই আইনগতভাবে সঠিক হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ মোজাইক না করার যুক্তি হিসেবে শব্দদূষণসহ অন্যান্য অযৌক্তিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তিহীন কারণ উল্লেখ করে অতিরিক্ত পরিমাপ প্রদান করে রিভাইজড প্রাক্কলন দাখিল করেছেন। তৎজন্য নির্বাহী প্রকৌশলী মহোদয়কে ইইডি/ডি.এম.সি/৭৮৭ তারিখ: ২৬-০৮-২০১৮ মূলে পত্র প্রদান করা হয়। গত ১৬-০৪-১৭ তারিখে মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় মোজাইক পরিবর্তন করে টাইলস স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।”
চিঠিতে আরো বলা হয়, “এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, দরপত্রটি মূল্যায়ন এবং অনুমোদনের সময় অবশ্যই দরপত্রে দেয় মোজাইক আইটেমসহ অন্যান্য আইটেমের দর সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে (দরপত্র দলিলে মোজাইক ৪২ শতাংশ নিম্নদর, রড ও ঢালাই ৩০ শতাংশ উচ্চদরে)। দরপত্র দলিল বিশ্লেষণে দরপত্রটি ঋৎড়হঃ ষড়ধফবফ বলে বিবেচিত হয়। কাজটির জন্য ৯টি ফ্লোরের দরপত্র মূল্য ছিলো ৪৫.২৪ কোটি টাকা। বাস্তবে ৬ টি ফ্লোর করার জন্য ৎবারংবফ প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার পরিমাণ ৩৭.৭০ কোটি টাকা। দরপত্রের ইঙছ এর দেয়া রেট অনুযায়ী ৬ টি ফ্লোরের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। যদিও রিভাইজড প্রাক্কলনের প্রতিবেদনে টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। মূলত কম দরের আইটেম পরিবর্তন করে তদস্থলে নতুন আইটেম সংযোজন এবং বেশি দরের আইটেমের পরিমাপ অতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে অনুমিত হয়। অনুমোদিত ফ্রন্ট লোডেড দরপত্রের কম দরের আইটেম পরিবর্তন এবং বেশি দরের আইটেমের ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি চ.চ.অ এর আইনের পরিপন্থি এবং ব্যক্তিগতভাবে (যে কোনো কর্তৃপক্ষের) লাভবান হওয়ার নিমিত্তে ঠিকাদারকে সুবিধা প্রদান বলে নিম্ন স্বাক্ষরকারী মনে করেন। সেক্ষেত্রে দরপত্র মূল্যায়ন অনুমোদনসহ স্টিয়ারিং কমিটিকে দরপত্রের আইনগত জটিলতার বিষয়টি অবহিত রেখে আইটেম পরিবর্তন অনুমোদনের দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।”
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন তার চিঠিতে আরো বলেন, “উপরোক্ত যৌক্তিক ও আইনি বিষয়টি বিভিন্ন পত্র মারফত মহোদয়কে উল্লেখ করার পরও বেআইনি, অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক পরিমাপের প্রাক্কলনটি অনুমোদনের সুপারিশ করার জন্য নিম্নস্বাক্ষরকারীকে চাপ প্রদান করা হচ্ছে। এবং কাজটি সময়মতো শেষ না হওয়ার দায়িত্ব নিম্ন স্বাক্ষরকারীর উপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা মোটেই যৌক্তিক নয়। এমতাবস্থায় প্রকল্পটি দ্রুত ও আইনানুগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারী সদয় বিবেচনার জন্য মহোদয়ের নিকট নিম্নত্তোক্ত সুপারিশ পেশ করছেন। ১. দরপত্র মূল্যায়ন, অনুমোদন, সিডিউলে উপযুক্ত আইটেম থাকা সত্ত্বেও নতুন আইটেম সংযোজন, বেশি দরের আইটেমের পরিমাণ অতিরিক্ত বৃদ্ধির বিষয়ে তদন্ত পূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২. পত্রের মর্মানুযায়ী নিম্নস্বাক্ষরকারীর যুক্তিগুলির আইনগত ও প্রযুক্তিগত দিক উপস্থাপন পূর্বক সিডিউল মোতাবেক মোজাইক স্থাপনের কাজ করার জন্য স্টিয়ারিং কমিটিকে পুনরায় অনুরোধ জ্ঞাপন এবং ঠিকাদারকে নির্দেশ প্রদান। উপরোল্লিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করলে প্রকল্পটি দ্রুত, আইনানুগ ও আর্থিক সাশ্রয়ীমূল্যে বাস্তবায়ন হবে বলে নিম্নস্বাক্ষরকারী মনে করেন। সদয় বিবেচনার জন্য রিভাইজড প্রাক্কলনটি মহোদয়ের নিকট প্রেরণ করা হলো।”
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তসহ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর এমন সুনির্দিষ্ট চিঠির পরও ইইডি প্রধান প্রকৌশলী সেই দুর্নীতির পথেই হাঁটেন। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন ছাপা হয়। সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক তোলপাড় হয়। তাতেও সরকারি অর্থ লুটপাটের প্রক্রিয়া থামেনি। ফলে অবশেষে সেটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়াল।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১০ জুন ২০১৯ প্রকাশিত)