shershanews24.com
রেলওয়ের ‘অবৈধ’ নিয়োগবিধি ‘বৈধ’ হচ্ছে বাংলা অনুবাদে!
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২০ ০৬:১৫ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com


সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: আদালতের আদেশে ‘অবৈধ’ হওয়া রেলওয়ে নিয়োগবিধিটি কোনো রকম পরিবর্তন না করেই শুধুমাত্র ইংরেজি থেকে হুবহু বাংলায় অনুবাদ করে এটিকে ‘বৈধ’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। যদিও সামরিক সরকারের আমলে প্রণীত পুরনো এই নিয়োগবিধি ২০১১ সালেই বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তারপরেও দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ও বিতর্কিত বিধিমালা দিয়েই রেলওয়ের নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি অব্যাহত ছিলো। 
জানা গেছে, সামরিক শাসন আমলে ১৯৮৫ সালে তৈরি করা ওই নিয়োগ বিধিটি এখন কার্যকর আছে কিনা বা বৈধ কিনা- এ ব্যাপারে প্রশ্ন দেখা দিলে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত চান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পরিষ্কার বলা হয়, সামরিক শাসন আমলে তৈরি করা এ নিয়োগ বিধিটি আদালতের রায় অনুযায়ী অবৈধ ঘোষিত হয়েছে এবং এ নিয়োগ বিধির অধীনে কোনো কার্যক্রম চালানো বৈধ হবে না। তারপরও ইতিমধ্যে সাড়ে চার মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও নতুন নিয়োগ বিধি তৈরি না করে ‘জনবল সংকট’র খোঁড়া যুক্তিতে পুরাতন নিয়োগ বিধিতে কাজ চালানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু, এরপর নতুন নিয়োগ বিধি আদৌ তৈরি হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যা্েচ্ছ।
সরকারের বিপুল অর্থে পরিচালিত রেলওয়েতে নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়মই মানা হতো না। সবকিছুই চলছিলো নিজেদের মতো করে। সরকারের অন্যান্য দফতর-অধিদফতরের কর্মচারী নিয়োগে যেভাবে নিয়োগ কমিটি গঠন এবং যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে রেল অধিদফতর তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বেচ্ছাচারি কায়দায় চলছিল এতোদিন। ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধিতে অবৈধভাবে সেই স্বেচ্ছাচারি প্রক্রিয়া জায়েজ করে নেয়া হয়েছিল। সরকারের অন্যান্য দফতর-অধিদফতরের কর্মচারী নিয়োগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও পিএসসির প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হলেও রেল অধিদফতর সকল কার্যক্রম নিজেরা এককভাবে চালাচ্ছিলো। যদিও রেল অধিদফতর পুরোপুরিভাবে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত একটি অধিদফতর। স্বেচ্ছাচারি কায়দায় নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় ্খানকার নিয়োগ কার্যক্রমে দুর্নীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অনেককাল ধরেই রেল বিভাগে নিয়োগ দুর্নীতি বহুল আলোচিত বিষয়। কোনো ধরনের যোগ্যতা অভিজ্ঞতা না থাকলেও পোষ্য কোটার নামে ব্যাপকহারে অদক্ষ, অযোগ্যদেরকেও রেলওয়েতে দেদারসে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পোষ্য কোটার অনেক ভুল ব্যাখ্যাও দেয়া হয়।
আদালতের রায়ে বিতর্কিত এ নিয়োগবিধি বাতিল হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বিধিমালায় সব ধরনের নিয়োগ- পদায়ন, পদোন্নতি হলেও রেলওয়ের স্বার্থান্বেসী মহল সরকারের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নীতিমালা পরিবর্তন করতে দেয়নি। এরমধ্যে নিয়োগবিধি আধুনিকায়নে ২০১৪ সালে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সে সময় একটি খসড়া বিধিও করা হয়। কিন্তু সেই খসড়া বিধি আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিজেদের সুবিধার্থে এটিকে ধামাচাপা দিয়ে নিজেদের মতো করে নিয়োগ,পদোন্নতি, পদায়ন চালাতে থাকে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে সামরিক সরকারের সময় প্রণীত আইন ও বিধি বাতিল হওয়ার পর দুই দফায় বিভিন্ন সংস্থার ১৬৬টি আইন ও বিধিকে সুরক্ষা আইনের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু তখন রেলওয়ের এ নিয়োগবিধি অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর পরে দীর্ঘ সময় পার হলেও বিষয়টি থেকে নজর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে রেলওয়েতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে বড় ধরনের একটি নিয়োগ চূড়ান্ত করার আগে পুরনো নিয়োগবিধিতে তা বৈধ হবে কি না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বোধোদয় ঘটে। ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯  জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বাতিল হয়ে যাওয়া ওই নিয়োগবিধি সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হয়। গত বছরের ১৬ অক্টোবর এর জবাবে বাংলাদেশ রেলওয়েতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮৫ সালের জারিকৃত নিয়োগবিধি অবৈধ বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধির অধীন রেলে কোনো নিয়োগ কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগ নেই। কারণ উচ্চ আদালতের নির্দেশে সামরিক সরকারের সময় প্রণীত আইন ও বিধিমালা বাতিল হয়ে গেছে। যদিও দুই দফায় ১৬৬টি আইন ও বিধিকে সুরক্ষা আইনের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে রেলওয়ের নিয়োগবিধি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধি প্রসঙ্গে চিঠিতে বলা হয়, ‘সিভিল আপিল নং-৪৮/২০১১-এ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত রায়ে সংবিধান (সপ্তম সংশোধন) আইন, ১৯৮৬ (১৯৮৬ সনের ১নং আইন)-এর ধারা ৩ এবং বাংলাদেশ সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ১৯ অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষিত হওয়ায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত রায়ে ১৯৭৫ সনের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের জারিকৃত অধ্যাদেশ/নিয়োগবিধিসমূহ অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।’ চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের প্রণীত দুটি সুরক্ষা আইনের তফসিলভুক্ত ৮৫ ও ৮১টিসহ মোট ১৬৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধি অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে এটার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলায় এর অধীনে কোনো নিয়োগ প্রদানের সুযোগ নেই। তাই বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধন ব্যতীত নিয়োগ কার্যক্রম গ্রহণেরও সুযোগ নেই। আর কোনো নিয়োগ ও পদোন্নতি দিতে হলে নতুন বিধি তৈরি করতে হবে। ফলে রেলওয়ের চলমান সব নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয়া হয়।
এমন অবস্থায় নতুন নিয়োগবিধি করতে রেলমন্ত্রীর নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটির প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগে রেলওয়েতে কোনো নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়া হবে না। কিন্তু সম্প্রতি আরেকটি বৈঠক করে বলা হয়, নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। তাই নতুন বিধিমালা হওয়ার আগ পর্যন্ত ২০১১ সালে বাতিল হয়ে যাওয়া ১৯৮৫ সালের অবৈধ বিধি দিয়েই নিয়োগ ও পদোন্নতি চালিয়ে নেয়া হবে। এজন্য ইংরেজিতে লেখা রেলওয়ের অবৈধ নিয়োগবিধিটি হুবহু বাংলায় অনুবাদ করে তা বৈধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ওই বৈঠকে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠিও পাঠনো হয়েছে। তবে এই অনুবাদের বাংলা নীতিমালা দিয়ে রেলওয়ের নিয়োগ-পদোন্নতি কতদিন চলবে তার কোনো সীমারেখা নেই। সূত্র বলছে, এসবই হচ্ছে রেল অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইচ্ছায় এবং তাদের স্বার্থরক্ষার্থে। কারণ নতুন বিধিমালা হলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ কমিটিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, পিএসসি, অর্থবিভাগের প্রতিনিধিদের রাখতে হবে। আর এতে রেল অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২ মার্চ ২০২০ প্রকাশিত)